বুধবার, ১২ মে ২০২১, ২৯ বৈশাখ ১৪২৮

চুপ করো শব্দহীন হও

প্রকাশিতঃ সোমবার, এপ্রিল ২৬, ২০২১, ১০:২৪ অপরাহ্ণ

শান্তনু চৌধুরী : অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেছিলেন,‘আজকাল আমাদের দেশে দেখবেন ভালো মানুষেরা বিচ্ছিন্ন। ভালো মানুষদের মধ্যে যোগাযোগ নেই। তারা একা। তারা আলাদা ঘরে শুয়ে একা একা কাঁদেন। পরস্পরকে খুঁজে পান না। কিন্তু যারা খারাপ তারা বেশ সংঘবদ্ধ। এক শয়তান হুক্কা হুয়া দিলে মুহূর্তে হাজার হাজার শয়তান ক্যায়া হুয়া, ক্যায়া হুয়া করতে করতে এগিয়ে আসে।’

এরপরও ভালোরা টিকে থাকে, সত্যের জয় হয়। যদিও টিকে থাকাই চরম সার্থকতা নয়। কিন্তু এই একাকিত্বের সময়টা পার করা দুঃসহ, দুরূহ। বিশেষ করে এই বিরুদ্ধ, বিপন্ন ও বিষময় সময়ে। শত্রুরা সে অদৃশ্য হোক আর দৃশ্যমাণ হোক এতোই শক্তিশালী যে চুপ করে থাকা ছাড়া তখন উপায় থাকে না। এই যে করোনাতে লকডাউন সেই চুপ করে থাকারই নামান্তর। কেউ জানে না, এই নিদানকালে ঠিক কোন বটিকায় স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার হবে, দুঃসময় কাটবে। তাই প্রেসক্রিপশনও আসতে থাকে একের পর এক। এসব করেইতো বেঁচে আছি। সময়ের সাথে সাথে রূপ বদল, রঙবদল যারা করতে পারে, তারাই সুস্থ সবল হয়ে বেঁচে আছে। আর ভালোরা পড়ে পড়ে মার খায়।

এই নিয়ে কতো কথা, কতো গল্প উপন্যাস। এমনকি ধর্মীয় বইগুলোতেও জানতে চাওয়া হয়েছে কেন ভালোদের ওপর এতো অত্যাচার, কেন দুষ্টরা শক্তিশালী। ঠিক সন্তুষ্ট হওয়ার মতো জবাব মেলে না। যেটি মেলে সেটি হলো, এটা নাকি সৃষ্টিকর্তার পরীক্ষা। তাই সবাই যে বার্তাটি দেয় তা হলো ধৈর্য আর ধৈর্য। অপেক্ষার ফল নাকি সুমিষ্ট হয়। আর ক’টা দিন সবুর করো রসুন বুনেছির মতো।

কিন্তু মজা করে মাঝে মাঝে বলতে ইচ্ছে করে, সবুর করতে করতে তো ‘আবদুস সবুর’ হয়ে গেলাম। যার আক্ষরিক অর্থই অত্যধিক ধৈর্য্যধারণকারী। তখনই কোরানের সুরা বনি ইসরাইলের সেই কথাটি মনে পড়ে, ‘হে মানবজাতি তোমাদের বড়ই তাড়াহুড়ো’। কিন্তু তাড়াহুড়ো আরো গভীর হয় যখন সময়ের কারণে কোনো কোনো স্থান নরকসম হয়ে ওঠে। প্রিয় মানুষগুলোর সাথে আনন্দ ভাগাভাগির ফুরসত থাকে না। সেই মানুষগুলোও থাকে না।

শঙ্খ ঘোষ, কবরী, ওয়াসিম-এর মতো কতোজন হারিয়ে যায় বা দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যায়। হয়তো তাদের বয়স হয়েছে, কিন্তু এই যে, দেশের জন্য দশের জন্য কিছু করতে পারা মানুষের সংখ্যা ক্রমে কমে যাচ্ছে। তার বদলে জায়গা করে নিচ্ছে দুর্বল মানুষগুলো সেটি কি ভালো হচ্ছে? কারণ কে না জানে দুর্বলের শাসন বড় ভয়ংকর হয়। তাই তাদের মৃত্যু আফসোসের, হারিয়ে যাওয়া আফসোসের। আবার অনেক জনপ্রিয় মানুষের জীবনটাই হয়তো আফসোসে ভরা।

প্রথম আলো পত্রিকার সম্পাদক মতিউর রহমানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তাই অভিনেত্রী কবরীকে বলতে শুনি, ‘আমার একটা দুঃখ রয়ে গেল, জীবনে আমি একজন ভালো বন্ধু পেলাম না, ভালো স্বামী পেলাম না। সন্তানেরা অনেকটা যার যার মতো করে আছে। কিন্তু সঙ্গ দেওয়ার মতো একজন ভালো মানুষ আমি পাইনি, যাকে বলতে পারি, এসো, এক কাপ চা খাই, একটু গল্প করি। এটাই হয়তো মানুষের জীবন। তবে মানুষের চাওয়ার তো শেষ নেই। মনে হয়, যদি আমার একজন বন্ধু থাকত, তাহলে যখন-তখন তার সঙ্গ পেতাম। এই আনন্দটুকু আমি পাইনি’।

করোনা কাটিয়ে উঠা অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা লিখেছেন, ‘জীবন কতো অনিশ্চিত। প্রত্যেক দিনের লড়াই। জীবন সমুদ্রের মতো বিশাল। কতো ঢেউ পার করতে হয়। কতো বাধার সম্মুখীন হতে হয়। কিন্তু আমাদের আশা হারালে চলবে না। আমাদের ভালোবাসতে হবে। আমাদের স্বপ্ন দেখতে হবে। যারা কষ্ট পাচ্ছেন তাদের জন্য প্রার্থনা এবং আরোগ্য কামনা করছি। ঈশ্বর এই পৃথিবীকে রক্ষা করুন’।

এরপরও মানুষ আশা নিয়ে বেঁচে আছে, আসলে বেঁচে থাকতে হয়। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন কোনো সমাধান নয়। সে কারণে ইব্রাহীম কার্দি মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও মারাঠা সৈন্যদের পেছনে রেখে প্রিয়তমা জোহরার সঙ্গে যোগ দেননি। যেমনটি অনেকে করোনাকালে জীবিকা অনিশ্চিত জেনেও নীতি-নৈতিকতার প্রশ্নে কখনো এক চুলও ছাড় দেন না। ভাঙবো কিন্তু মচকাবো না। আর এই শিক্ষাটি আসে বই পড়া থেকে। লেখকদের মতে, একটি বই মূলত যে বার্তাটি দেয় সেটি হলো নিজের নীতিতে অটল থাকার। এ কারণে নানা ধরনের মানসিক পীড়া থেকে মুক্তি মেলে আর মন পুরো পরিশুদ্ধ নতুনের মতো হয়ে যায়। গল্প উপন্যাস সাহিত্য আপনাকে সবকিছু থেকে পালাতে সাহায্য করে। ইংরেজিতে যাকে বলা হয়, এক্সেপিজম বা পলায়নবাদ। এই পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি অন্য যে কোনো শিল্পের চেয়ে তীব্র ও শক্তিশালী।

তাই শঙ্খ ঘোষের মৃত্যুতে সাংবাদিক ও সাহিত্যিক তুষার আবদুল্লাহ’র কবিতাটি বেশ মনে পড়ে, ‘কতোবার ফোন করেছি/ফোন তুললেই না/কতোবার কড়া নেড়ে এলাম/দুয়ার খুললে না। তোমাকে বার্তা পাঠালাম- ‘শঙ্খ নেই, বাজবে না আর’। উত্তর পাঠালে- দেব ফোন পরে/আটকে আছি বিজ্ঞাপনে’।

নানাভাবে আটকে থাকা মানুষগুলোই হয়তো একসময় ভাঙবে সব অচলায়তন। চুপ করে তখন আর থাকা হবে না। করোনা ভাইরাস নয়, শব্দেরা খেলা করবে এখানে-সেখানে। যেমনটি ওই আশাবাদের কথা শুনিয়ে থাকেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার।

তার আশাবাদের উৎস হচ্ছে ‘আমি বেঁচে আছি’। ভীরুর মতো নয়, কাপুরুষের মতো নয়, বাঁচার মতো বাঁচা। সেটা কেমন আমাদের শরীরের দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শরীরের হাত সামনে যেতে বলে, পা সামনে চলতে বলে, নাক নিশ্বাস ফেলে সামনের দিকে। চাইলেতো নাক পেছনের দিকেও হতে পারতো। তার মানে স্রষ্টাই চান মানুষ সামনের দিকে এগিয়ে যাক। তবে কখনো-কখনো প্রয়োজনে যে পিছিয়ে যেতে হয় না তা নয়। যেমন শের দু’কদম পিছিয়ে যায় আরো বেশি কদম এগিয়ে অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাবে বলে। তাই মনে হয়, এই যে বাঁচতে চাওয়ার যে লড়াই তাই অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করে। কারণ আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন ধৈর্য্য সহ্য হতো না। মনে হতো কখন যে বড় হবো। আর এখন মনে করি কেন যে বড় হলাম। আর বড় যেহেতু হয়েই গিয়েছি তো এই পৃথিবীতে যতোদিন আয়ু আছে সেটা ভালোভাবেই পার করতে হবে। বলতে হবে-

‘সবারই তো বাঁধ আছে, লোভের বন্ধন আছে,
আছে অর্থের লোলুপতা,
তুমি তো শঙ্খ, যুদ্ধের শুরু আর শেষে বেজে উঠো,
ভেঙে দিয়ো অশ্লীল নীরবতা’।

শান্তনু চৌধুরী সাংবাদিক ও সাহিত্যিক