বুধবার, ১২ মে ২০২১, ২৯ বৈশাখ ১৪২৮

মুনিয়া ও বসুন্ধরার এমডির বিষয়ে যা বললেন হুইপপুত্র শারুন

প্রকাশিতঃ বুধবার, এপ্রিল ২৮, ২০২১, ১১:০৩ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রাম : রাজধানীর গুলশানের একটি ফ্ল্যাটে কলেজছাত্রী মোসারাত জাহান মুনিয়ার মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু ‘স্ক্রিনশট’ ছড়িয়ে পড়েছে। এসব ‘স্ক্রিনশট’ হুইপপুত্র শারুন চৌধুরীর সঙ্গে মুনিয়ার হোয়াটসঅ্যাপে কথোপকথনের অংশ বলে দাবি করা হচ্ছে।

এসব কথোপকথন কত তারিখের, তা উল্লেখ নেই। সময় ‘টুডে’ বিকাল ৪টা ৪৯ মিনিট। ওই কথোপকথনের শুরুতে শারুনকে ‘হাই’ লিখতে দেখা যায়। ৪টা ৫২ মিনিটে মুনিয়া শারুনকে লেখেন, ‘কেমন আছেন’। শারুন লিখেন, ‘এইতো কোনোরকম। কী অবস্থা তোমার? এরপর মুনিয়া লিখেন, ‘ভালো না’। এরপর লেখেন, ‘উনি তো আমাকে বিয়ে করবে না। কী করব আমি?’ জবাবে শারুন লেখেন, ‘আগেই বলেছিলাম, ওর কথা শুইনো না। ও আমার বউকে বলছে বিয়ে করবে, কিন্তু করে নাই। মাঝখানে আমার মেয়েটা মা ছাড়া হয়ে গেছে। যদিও আমার বউ খারাপ ক্যারেক্টারের একটা মেয়ে।’

মুনিয়া আরও লিখেন, ‘আচ্ছা উনি যদি আমার ক্ষতি করে আপনি থাকবেন আমার পাশে? আপনার উপরও তো উনি রাগ।’ বিকাল ৫টা ১৩ মিনিটে মুনিয়া লিখেছেন, ‘আমার ফ্যামিলিকে দেইখেন আমি মারা গেলে।’ শারুন লিখেন, ‘তুমি কিছু করলে বসুন্ধরা গ্রুপ শেষ হয়ে যাবে।’ অবশ্য এসব কথোপকথনের কোথাও মুনিয়া বসুন্ধরার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েম সোবহান আনভীরের নাম উল্লেখ করেননি। ‘উনি’ বলে সম্বোধন করেছেন।

কথোপকথনগুলোর সত্যতা একুশে পত্রিকার পক্ষ থেকে যাচাই করে দেখা সম্ভব হয়নি। তবে গুগল প্লে স্টোরে এমন কিছু অ্যাপসের সন্ধান পাওয়া গেছে, যেখানে খুব সহজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ‘স্ক্রিনশট’ তৈরি করা যায়।

‘কথোপকথনের’ বিষয়ে জানতে চাইলে সরকারদলীয় হুইপ ও চট্টগ্রামের সাংসদ সামশুল হক চৌধুরীর ছেলে শারুন চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘এসব নতুন ষড়যন্ত্র। আমার নামে কতগুলো ভুয়া স্ক্রিনশর্ট বানাইছে। এটা ডাউনলোড করে আপনিও বানাতে পারবেন। গুগল প্লে-স্টোরে গিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ স্ক্রিনশর্ট মেকার দিয়ে থেকে যে কেউ যে কারো নামে ভুয়া স্ত্রিনশর্ট বানাতে পারে। আমার সাথে আপনার যদি কোনোদিন হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ না হয়, তাহলে আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারবো যে আপনার সাথে আমার যোগাযোগ হয় নাই। পৃথিবীর কোনো টেকনোলজি এটা প্রমাণ করতে পারবে না যে ওর সাথে আমার যোগাযোগ হয়েছে হোয়াটসঅ্যাপে।’

মুনিয়ার বিষয়ে শারুন বলেন, ‘এই মহিলা (মুনিয়া) একবছর আগে গত এপ্রিল তিন তারিখ নাকি চার তারিখে.. তাকে আমি চিনিও না। আমি আদার ম্যাসেজে গেছি, দেখলাম আমাকে অনেকগুলো লেখা পাঠাইছে আমার এক্স ওয়াইফকে নিয়ে। আপনার কি ডিভোর্স হয়েছে? আপনার সাথে কী সাইফার সাথে ডিভোর্স হয়েছে? আমি ভাবলাম কীরে, সে কে? বলল, আমার বয়ফ্রেন্ডের সাথে তার সম্পর্ক আপনি কী জানেন? এই-সেই লিখছে। আমি বললাম, আই এম নট ইন্টারেস্টেট টু টক মাই এক্স ওয়াইফ, হু আর ইউ? বলছে, আপনাকে আমি কিছু তথ্য দিব। আমি বললাম, আমার এক্স ওয়াইফের কোনো তথ্য নিয়ে আমি নট ইন্টারেস্টেট। এতটুকুই। সে তারপর আমাকে কিছু ছবি পাঠাইছে, ভিডিও পাঠাইছে। তার সাথে আমার এক্স ওয়াইফের চ্যাটের কিছু রেকর্ড পাঠাইছে। ওগুলো এভাবে পড়ে আছে। আমি জীবনে হোয়াটসঅ্যাপে এ মেয়ের সাথে একদিনও চ্যাট করিনি।’

তুমি কিছু করলে বসুন্ধরা গ্রুপ শেষ হয়ে যাবে- মুনিয়ার প্রতি এই খুদেবার্তার বিষয়ে শারুন বলেন, ‘এটা ১০০ ভাগ মিথ্যা কথা। পৃথিবীর যে কোনো ফরেনসিক ল্যাবে ওই মেয়ের মোবাইল এবং প্রয়োজনে আমার মোবাইলটা নিয়েও পরীক্ষা করা হোক, নো প্রবলেম। আমি চ্যালেঞ্জ দিলাম। মুনিয়ার সাথে আমার পরিচয় হয়নি। নিজ থেকে আমাকে মেসেজ পাঠিয়েছে। রিপ্লে দিছি। আমি বললাম যে, আমি ইন্টারেস্টেট না আমার এক্স ওয়াইফ কখন কোথায় কী করবে সেটা নিয়ে। আমাকে তদন্ত সংস্থা বললে আমি দেখাবো। আমার তো কোনো ভয় নাই।’

ভুয়া স্ক্রিনশর্ট দিয়ে ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা চলছে বলেও দাবি করেন শারুন। আসলে এ ধরনের মিথ্যা কথা ছড়িয়ে ঘটনাকে ভিন্নখাতে নিয়ে যেতে চায় অপরাধীরা। আসলে তাদের উপর আমার মায়ের গজব পড়েছে। আমার মা কান্না করতে করতে ইফতার করছে একদিন। বলল যে, আমরা কী অপরাধ করলাম সে আমার ছেলের বউটার সাথেও ঝামেলা করলো। আমার নাতিনটাকে এতিম বানাইলো। আজকে আমি সিঙ্গেল ফাদার। বাচ্চাটাকে আমার পালতে হচ্ছে। বুঝেন, কেন ওই মহিলাকে আমি আমার বাচ্চা দেব।’

প্রথম আলোতে প্রকাশিত একটি সংবাদের বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে শারুন বলেন, প্রথম আলোকে আমি বলেছি একটা, লিখেছে আরেকটা। আমি তো বলি নাই যে, কোনো তদন্ত সংস্থা আমার সাথে যোগাযোগ করছে। আমি বললাম, একজন ব্লগার লন্ডন থেকে কিছু স্ক্রিনশট পাঠিয়ে আমাকে বলছে যে, ভাই এটা সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কী? আমি বললাম যে, এটা ভূয়া। পত্রিকাটি এটাকে লিখে দিয়েছে একটা সূত্র। আমি তো কোনো সূত্রের কথা বলি নাই। ওই ব্লগার আমাকে বলেছে, বসুন্ধরা গ্রুপ আপনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। কিছু স্ক্রিনশর্ট আপনাকে দিলাম। কিছু প্ল্যানিং করে আপনার বিরুদ্ধে ভাইরাল করবে। ওই ব্লগারকে কে জানি দিছে। সে আমাকে দিয়ে বলতেছে, এটা নিয়ে তাদের একটা ব্লগ লিখতে বলা হয়েছে।

বসুন্ধরা গ্রুপের সঙ্গে বিরোধের বিষয়ে শারুন বলেন, ‘বসুন্ধরার এমডি আনভীরের সাথে আমার সাবেক স্ত্রীর রিলেশন ছিল। এর জের ধরে সাবেক স্ত্রীর প্ররোচনায় আমার এবং আমার পরিবারের বিরুদ্ধে নিউজ করে আসছে বসুন্ধরা গ্রুপের মিডিয়াগুলো। সাবেক স্ত্রীকে ডিভোর্সের এক বছর আগে থেকে আনভীরের সাথে সম্পর্ক এবং এটার জের ধরে আমি ডিভোর্স দিই। আমি বসুন্ধরাকে বলেছি কাল আমার ওয়াইফের ছবিটবিগুলো পাবলিশ করবো। তার যে চরিত্র কী, সেটা গোপন রেখে লাভ কী। সে যে ফুলের মতো নাকি সেটা মানুষ জানুক।’

এর আগে গত সোমবার রাতে ঢাকার গুলশানের একটি ফ্ল্যাট থেকে গলায় ওড়না প্যাঁচানো অবস্থায় ২১ বছর বয়সী মুনিয়ার লাশ উদ্ধার করা হয়। পরে তার বোন নুসরাত জাহান তানিয়া গুলশান থানায় একটি মামলা দায়ের করেন, যেখানে বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সায়েম সোবহান আনভীরের বিরুদ্ধে ‘আত্মহত্যায় প্ররোচনার’ অভিযোগ আনা হয়। মামলায় বলা হয়েছে, ওই তরুণীর সঙ্গে ‘প্রেমের সম্পর্ক’ ছিল আনভীরের; গুলশানের ওই ফ্ল্যাটে তার যাতায়াতও ছিল। তবে এসব বিষয়ে সায়েম সোবহানের কোনো বক্তব্য কোনো গণমাধ্যমই পায়নি।

পুলিশের আবেদনে আদালত ইতোমধ্যে সায়েম সোবহান আনভীরের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তবে তিনি আদৌ দেশে আছেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমের খবরে। এ বিষয়ে আজ সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমি স্পষ্ট…. আইন অনুযায়ী আইন চলবে। যে অপরাধী হয়, তাকে আইনের মুখোমুখি হতে হবে, বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।” তবে বিষয়টি যেহেতু তদন্তাধীন, তা শেষ হলেই এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা যাবে বলে মন্তব্য করেন আসাদুজ্জামান খান কামাল।

মৃত মুনিয়া ঢাকার একটি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন। তার বাড়ি কুমিল্লায়; পরিবার সেখানেই থাকে। তিনি ঢাকায় একাই থাকতেন গুলশানের ওই ফ্ল্যাটে। ওই তরুণীর মৃহদেহ উদ্ধারের পর সেখান থেকে তার মোবাইলসহ বিভিন্ন ধরনের আলামত উদ্ধারের সাথে ৬টি ডায়েরি পাওয়া গেছে। এসব ডায়েরিতে কী লেখা আছে, তা যাচাই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী।