বুধবার, ১২ মে ২০২১, ২৯ বৈশাখ ১৪২৮

মিরসরাইয়ে ‘জলযুদ্ধের’ আশঙ্কা!

ভূগর্ভস্থ পানি চুষে নিচ্ছে বিএসআরএম।।পানির সংকটে লাখ লাখ মানুষ

প্রকাশিতঃ রবিবার, মে ২, ২০২১, ৯:২২ অপরাহ্ণ

এম কে মনির সোনাপাহাড় (মিরসরাই) থেকে ফিরে : দেশের ইস্পাত খাতের অন্যতম প্রতিষ্ঠান বিএসআরএম (বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলস) কয়েক বছর আগে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের সোনাপাহাড় এলাকায় স্থাপন করে প্রায় ১০ লাখ টন বিলেট উৎপাদন সক্ষমতার একটি কারখানা। তার কিছুদিন পর একই এলাকায় পাঁচ লাখ টনের আরও একটি বিলেট কাস্টিং প্লান্ট স্থাপন করে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতি টন বিলেট উৎপাদনের জন্য ১ হাজার ২০০ লিটার পানির প্রয়োজন হয়। সে হিসেবে বিএসআরএমের এই কারখানায় বছরে প্রায় ছয় কোটি ৩৬ লাখ তিন হাজার ঘনমিটার পানি লাগার কথা। এসব পানি কারখানা থেকে চার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ফেনী নদী থেকে সংগ্রহের কথা থাকলেও তা করছে না বিএসআরএম। সাম্প্রতিককালে প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের উদ্যোগে কারখানার ভিতরে ২ থেকে ৩ হাজার ফুট গভীরতাসম্পন্ন প্রায় ১৬টি গভীর নলকূপ স্থাপন করে পানি তোলা শুরু করেছে বলে অভিযোগ ওঠেছে।

এদিকে, প্রতিদিন কী পরিমাণ পানি বিএসআরএম কর্তৃপক্ষ ভূ-গর্ভ থেকে উত্তোলন করছে, তা জানা যাবে প্রতিষ্ঠানটি দৈনিক কী পরিমাণ বিলেট উৎপাদন করছে তা জানা গেলে। কিন্তু এই তথ্যটি বিএসআরএম ছাড়া আর কারও পক্ষে সঠিকভাবে জানা সম্ভব নয়। অন্যদিকে বিএসআরএম’র কারখানার জন্য মাটির নিচ থেকে পানি উত্তোলনের কারণে আশপাশের হিঙ্গুলি ইউনিয়ন, জোরারগঞ্জ ইউনিয়ন, ধুম ইউনিয়ন ও বারৈয়ারহাট পৌরসভা এলাকায় পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। সেখানে পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এসব এলাকার বাসিন্দাদের নলকূপগুলোতে আগের মতো পানি উঠছে না। এখনই বিএসআরএম পানির বিকল্প উৎস না খুঁজলে এবং এভাবে আর কিছুদিন চলতে থাকলে ওই এলাকার কয়েক লাখ মানুষ দীর্ঘমেয়াদে পানি-সংকটে ভুগবে বলে আশংকা করা হচ্ছে। এমনকি ভয়াবহ ভূমিধ্বসের পাশাপাশি ‘জলযুদ্ধ’ হতে পারে বলেও বিশেষজ্ঞরা আশংকা করছেন।

সরেজমিনে ১৯ এপ্রিল সোনাপাহাড় এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বিএসআরএম কারখানার তিন দিকে রয়েছে হিঙ্গুলি ইউনিয়ন, জোরারগঞ্জ ইউনিয়ন, ধুম ইউনিয়ন ও বারৈয়ারহাট পৌরসভা। পূর্বে পাহাড় ও সংরক্ষিত বনাঞ্চল। বিএসআরএম কারখানা সংলগ্ন এসব এলাকায় খাবার পানির তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান। তারা বলেছেন, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা টিউবওয়েল চেপেও একবিন্দু পানি পাওয়া যাচ্ছে না। শুধু টিউবওয়েল নয়, এখানকার বাসিন্দাদের পানির মোটর বা পাম্পেও পানির দেখা মিলছে না। ফলে পানির জন্য হাহাকার বিরাজ করছে এলাকায়।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, বিএসআরএম’র কারখানায় শক্তিশালী পাম্প দিয়ে ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে এলাকাগুলোয় পানির স্তর অস্বাভাবিক নিচে নেমে গেছে। আগে যেখানে ৫০ থেকে ৭০ ফুট গভীরতায় পানি পাওয়া যেতো এখন সেখানে ১২০ থেকে ১৫০ ফুট গভীরতায়ও পানি মিলছে না। এমনকি কিছু এলাকায় ৮০০ ফুট গভীরতায়ও মিলছে না পানি।

বাড়ির নলকূপে পানি পাচ্ছেন না জানিয়ে হিঙ্গুলি ইউনিয়নের জামালপুর ৩ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. সোহেল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমার বাড়ির নলকূপের গভীরতা ৮৮০ ফুট হওয়া সত্ত্বেও পানি পাওয়া যাচ্ছে না। এই এলাকায় আমার নলকূপের চেয়ে বেশি গভীরতাসম্পন্ন নলকূপ কমই আছে। আমার নলকূপেই যদি পানি না ওঠে বাকিগুলোর কী অবস্থা এবার বুঝে নিন।’

মধ্যম সোনাপাহাড় এলাকার ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমার বাড়িতে দুটি নলকূপ। একটির গভীরতা ১৩০ ফুট, অন্যটির ১৪০ ফুট। আগে দুটি নলকূপেই ভালো পানি আসতো। এখন কোনোটিতেই আগের মতো পানি পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা চরম পানি-সংকটে ভুগছি। এসব যেন দেখার কেউ নেই।’

একই কথা বললেন স্থানীয় বাসিন্দা জাফর, শাহজাহান। তারা বলেন, আমাদের এলাকায় আগে যে পরিমাণ পানি আমরা পেতাম এখন তার চার ভাগের একভাগও পাচ্ছি না। শত শত টিউবওয়েল ও পানির পাম্প শুকিয়ে চৌচির হয়ে গেছে। কী পরিমাণ পানির কষ্টে আছি, একদিন বাড়িতে না থাকলে বুঝবেন না।’

স্থানীয়রা বলছেন, ‘মিরসরাইয়ে পানি-সংকট দীর্ঘদিনের। পানির স্তর নেমে যাওয়ায় পানি পেতে অনেক কষ্ট হচ্ছে। আগে মোটর চালিয়ে ১ হাজার থেকে ২ হাজার লিটারের পানির ট্যাংক ভর্তি হতে সময় লাগতো আধা ঘণ্টা অথবা ৪৫ মিনিট। এখন ৩ দিনেও ট্যাংক পূর্ণ করতে পারছি না। বাড়ির বৌ-ঝিরা নিয়মিত গোসল, ধোয়া-মোচার কাজ করতে হিমশিম খাচ্ছেন। কী অসহ্য যন্ত্রণায় আমরা ভুগছি বলে বুঝাতে পারবো না।’

এদিকে খিরমুরালী, সোনাপাহাড়, জামালপুর, পৌরসভা, চিনকিরহাট এলাকার প্রায় প্রতিটি বাড়িতে এখন পানির স্তর নেমে গেছে। ব্যবহার ও খাওয়ার পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বাসিন্দারা। সামান্য এক বালতি পানি পেতে পানির পাম্প চালাতে হচ্ছে দুই-তিন ঘণ্টারও বেশি।

পানি-সংকটে ভুক্তভোগী বারৈয়ারহাট পৌরসভার ৩ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা সায়েদ হোসেন বলেন, ২ মাস আগে থেকে পানি-সংকটে পড়েছি। আগে ট্যাংকে পানি জমিয়ে রাখতে পারতাম, এখন তা সম্ভব হচ্ছে না। বারবার মোটর চালানোর কারণে আমাদের গুণতে হচ্ছে আগের চেয়ে দ্বিগুণ, তিনগুণ বিদ্যুৎ বিল। আমাদের এলাকায় এর আগে এই সমস্যা কখনোই ছিল না। বিএসআরএম কারখানায় ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছে।’

এ বিষয়ে বারৈয়ারহাট পৌরসভার মেয়র রেজাউল করিম খোকন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘পানি সংকট একদিনের নয়, বহুদিনের। বিএসআরএম কারখানা স্থাপনের আগে কখনো এ সমস্যা ছিলো না। আমার জানা মতে, ফেনী নদী থেকে বিএসআরএমের পানি তোলার কথা ছিল, কিন্তু তারা কারখানার ভিতরে ১০টি শক্তিশালী ও গভীর নলকূপ বসিয়ে ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন করছে। যার ফলে আশেপাশের এলাকায় পানির লেয়ার নিচে নেমে গেছে। আমাদের এলাকার প্রত্যেক বাড়িতে এখন পানির সংকট চরমে। এমনকি আমার বাড়ির টিউবওয়েলেও পানি পাচ্ছি না।’

পানি-সংকটের বিষয়ে আলাপ হয় জোরারগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মকসুদ আহমদ চৌধুরীর সঙ্গেও। তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘পানির সংকট দেখা দিয়েছে এটি সঠিক। প্রায় বাড়িতে পানি পাওয়া যাচ্ছে না এমন অভিযোগ ভুরি ভুরি। আমার বাড়ির টিউবওয়েলেও পানি নেই। বিএসআরএম এর ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে এলাকায় পানির এ সংকট হয়ে থাকতে পারে। এসব বিষয়ে আমাদের নেতা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এমপি বহুবার তাদের সাথে, এমনকি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়েও আলোচনা করেছেন। সর্বশেষ জেনেছি, ফেনী নদী থেকে বিএসআরএম’র পানি নেওয়ার কথা। কিন্তু এখনো তারা সেটি করছে না।’

তবে স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিরা পানি সংকট দীর্ঘদিনের ও পানি সংকটের জন্য বিএসআরএমকে দুষলেও প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিরা বলছেন ভিন্ন কথা। এ বিষয়ে মিরসরাই উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী আনিস সাঈদ মাহমুদ একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘পানির স্তর নেমে যাওয়া শুধু মিরসরাইয়ের সমস্যা নয়, এটি সারাদেশের সমস্যা। পানির স্তর স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি নিচে নেমে গেছে, এটি প্রাকৃতিক কারণেও হয়ে থাকতে পারে। গরম বেশি হওয়ায় এটি হচ্ছে। বর্ষা আসলে পানির সমস্যা দূর হয়ে যাবে।’

তবে হিঙ্গুলিসহ কয়েকটি ইউনিয়নে সৃষ্ট পানি সংকটে বিএসআরএম একটা প্রভাব ফেলছে বলে এক পর্যায়ে স্বীকার করেন প্রকৌশলী আনিস সাঈদ মাহমুদ। এসময় তিনি প্রতিবেদককে বলেন, ‘আপনি রিপোর্টার মানুষ! রিপোর্টটা যেভাবে ভালো হয় সেভাবে করেন।’

পানি সংকটের কারণ হিসেবে মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মিনহাজুর রহমান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘অনেক সময় গভীরতা ৪০০ ফুট প্রয়োজন হলে সেখানে করা হচ্ছে ১০০-১৫০ ফুট। সেক্ষেত্রে পানি না-ও পাওয়া যেতে পারে। তাছাড়া এটি বিজ্ঞানসম্মত প্রমাণসাপেক্ষ বিষয়।’ এক প্রশ্নের জবাবে ইউএনও বলেন, ‘বিএসআরএম এর ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কোনো অনুমোদন উপজেলা প্রশাসন থেকে দেওয়া আছে কিনা এই মুহূর্তে বলতে পারছি না।’ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার বিষয়টি চিঠি দিয়ে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানিয়েছেন বলেও জানান ইউএনও।

এ প্রসঙ্গে বিএসআরএম এর নির্বাহী পরিচালক তপন সেনগুপ্তের দাবি, বিএসআরএম পানির কোনো সঙ্কট সৃষ্টি করছে না। একুশে পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘কেউ যদি এই অভিযোগ দেন তাহলে তিনি বিএসআরএম-এর ভালো দেখতে পারেন না। আপনি উপজেলা চেয়ারম্যানকে ফোন দিন, উনি বাড়িতে ভালো পানি পাচ্ছেন। আপনি কোন ধরনের লোকের সাথে কথা বলেছেন সেটাই দেখার বিষয়।’

তপন সেনগুপ্ত বলেন, ‘আরও অনেকেই ডিপ টিউবওয়েল ব্যবহার করে, শুধু বিএসআরএমের নাম কেন আসছে? এর কোনো যৌক্তিকতা থাকতে পারে না। কই আমাদের কাছে তো কেউ এরকম অভিযোগ আনেনি। আপনি যদি একটা মোটর অনেকদিন ব্যবহার করেন এবং সেটাকে মেরামত না করেন তাহলে তো পানি পাওয়ার কথা নয়।’
এ বিষয়ে জানার জন্য স্থানীয় সদস্য সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করেও বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। তবে ২০১৯ সালের ২৪ জুন উপজেলায় সমন্বয় সভায় ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেছিলেন, ‘বিএসআরএম কারখানা তৈরির পূর্বে ফেনী নদী থেকে পানি উত্তোলনের কথা ছিল। কিন্তু তাদের কথা আর কাজে কোন মিল নেই। হাইড্রোলিক রিগ বোরিংয়ের মাধ্যমে পানি উত্তোলন করায় এখানকার চার ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় পানি সংকট দেখা দিয়েছে। আমি চাই তারা এই বিষয়ে দ্রুত কার্যকরী প্রদক্ষেপ নিক। অন্যথায় বিষয়টি সংসদে আলোচনা করবো।’

এদিকে সর্বশেষ গত ২৮ এপ্রিল দূর্গাপুর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আনিস রিফাত ফেসবুকে লিখেছেন, ‘করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর মিরসরাইতে বিএসআরএম ডিপ টিউবওয়েল বন্ধ করে ফেনী নদী থেকে পানি না আনলে কারখানা বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেন এমপি। ধন্যবাদ প্রিয়নেতা যুগোপযোগী সিদ্ধান্তের জন্য।’

বিশেষজ্ঞ মতামত

বিএসআরএম কারখানায় ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে মিরসরাইয়ের চার ইউনিয়ন ও এক পৌরসভায় পানি সংকট তৈরির বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের একজন শিক্ষকের কাছে মতামত জানতে চায় একুশে পত্রিকা। নিজের নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ গবেষক যে মতামত দিয়েছেন তা একুশে পত্রিকার পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-

মিরসরাই এলাকায় পানির স্তর নিচে নেমে গেলেও পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হলে সমস্যটা প্রকট হবে না, অল্প সময়ের ভেতরে সমাধান হয়ে যাবে। আর যদি পানির স্তরটা নিচে নেমে যায় ইতিমধ্যে এবং সেখানে যদি পর্যাপ্ত পরিমাণে নিয়মিত বৃষ্টিপাত না হয় আর পানি উত্তোলন অব্যাহত থাকে, তখন সেখানের মাটিতে প্রধানত দুই ধরনের সমস্যা হবে। একটা হচ্ছে উপরের লেয়ারে, আরেকটা নিচের লেয়ারে। যদি ডিপ টিউবওয়েলের মাধ্যমে অতিরিক্ত পরিমাণে প্রতিনিয়ত পানি উত্তোলন করা হয় এবং সেই এলাকায় পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হয় এবং পানির স্তর যদি নিচে নেমে থাকে তাহলে মৃত্তিকা সম্পদের উপরে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়বে অনেক সময় পরে। অর্থাৎ মাটির উপরে দীর্ঘসময় পরে প্রভাবটা পড়বে। উত্তোলনের কারণে কয়েকটা সমস্যা হতে পারে মাটির উপরে। সমস্যাগুলো অনেক দীর্ঘ সময় পরে দেখা দিবে।

মাটিতে পানির পরিমাণ কমতে শুরু করবে এবং দীর্ঘ সময় পরে সেই এলাকায় খরা প্রবণতা দেখা দেবে। এছাড়া ওই মাটিতে পানির পরিমাণ কমে গেলে মাটির ভেতরে যে খনিজ উপাদানগুলা আছে যেটা উদ্ভিদের জন্য অত্যাবশকীয় সেগুলো যথাযথভাবে উদ্ভিদ গ্রহণ করতে পারবে না। ফলে ফসলের বৃদ্ধি ও ফলন কমে যাবে। অন্যদিকে ছোট-বড় সকল উদ্ভিদ পর্যায়ক্রমে খনিজ উপাদানের অভাবে তাদের যে শরীরবৃত্তিয় কর্মকা- আছে সেগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যার ফলে তাদের যে শরীরবৃত্তিয় কর্মকা-ের মাধ্যমে যে জলীয় কণা যাওয়ার কথা সেটা কমে যাবে। এবং সেই এলাকায় দীর্ঘস্থায়ীভাবে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা কমতে শুরু করবে।

উদ্ভিদ যদি একটা এলাকায় কমে যায়, তাদের শরীরবৃত্তিয় কার্যকলাপ যদি ঠিকভাবে না চলে পানির অভাবে তখন দেখা যাবে ওই এলাকার মধ্যে যে জলীয় কণা আছে সেটা কমে যাবে। এবং সেটা আস্তে আস্তে ভূগর্ভস্থভাবে বৃষ্টিহীনতার দিকে চলে যাবে। বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা কমে যাবে। আরেকটি উল্লেখযোগ্য ক্ষতিকর দিক হচ্ছে পানির অভাবে মাটিতে বসবাসকারী অতি অত্যাবশ্যকীয় বা অতি উপকারী কিছু জীবাণু, ক্ষুদ্র অণুজীব থাকে সেগুলো থেকে শুরু করে বৃষ্টিজাতীয় সকল প্রাণী পিঁপড়া উপকারী পোঁকা, কেঁচো; এই ধরনের প্রাণীগুলোর উপস্থিতি আর দেখা যাবে না। মাটিতে যাদের উপস্থিতি অনেক গুরত্বপূর্ণ উদ্ভিদের জন্য। মানে এক কথায় আমরা বলতে পারি, সয়েল ইকো সিস্টেম বা মাটির যে বাস্তুসংস্থান আছে সেটা মারাত্মকভাবে পানির অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এমনিতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বাড়ছে ইদানীং। সেখানে যদি আমরা মাটির নিচের পানি অতিরিক্ত নিতেই থাকি, আর যদি পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হয় আবার সেটা যদি রিফিল হতে না পারে তখন দেখা যাবে আমাদের কী ভয়াবহ অবস্থা হবে। দীর্ঘ সময় পর ভূমিধসের সম্ভাবনাও বাড়বে। ভূমি ধ্বসের সম্ভাবনা বাড়তে পারে সেটার কারণ আমি বলি, সেটা হচ্ছে, বয়েড বৃষ্টি হয়। ওয়াটারটা যখন আপডেট হবে তখন সেখানে বয়েড বৃষ্টি হয়। খালি জায়গার সৃষ্টি হয়। এটা একদিন বা দুইদিনে হয় না। এটা আস্তে আস্তে দীর্ঘসময় পরে সেখানে বয়েড বৃষ্টি হয়। পানিটা কমে গিয়ে এখানে বাতাস থাকে শুধুমাত্র। তখন যদি ভূমিকম্প হয় অথবা পৃথিবীর ন্যাচার অ্যাফেক্টগুলো বিশেষ করে মহাজাগতিক কিছু ব্যাপার থাকে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, ভূমিকম্প। যদি ভূমিকম্প দীর্ঘমাত্রার নাও হয়, কম মাত্রার যদি হয়। বয়েড হয়ে যায়, দীর্ঘ সমস্যাটা আবার পানি দ্বারা রিফিল না হয় তখন দেখা যায় এখানে ভূমিধ্বসটা হয়। ভূমিধ্বসটা হয়ে যাওয়ার একটা সম্ভাবনা থাকে। তবে আমি এসব দীর্ঘমেয়াদী ইফেক্টের কথা বলছি।

আরেকটা বিষয় দেখলাম, ইদানীং একটা সমস্যা দেখা দিচ্ছে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায়। যে ভূগর্ভস্থ পানি আছে মানে গভীর নলকূপ ১৫০ মিটারের উপরে যেগুলো আছে। সেখানে ইদানীং দেখা যাচ্ছে, আয়রনের উপস্থিতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার যে লিমিট আছে সেটা থেকে অনেকগুণ বেশি দেখা যাচ্ছে। মানে বুঝা যাচ্ছে যে, আমাদের উপরের লেয়ারটা প্রায় শেষ হয়ে যাচ্ছে আমাদের বাংলাদেশে। এটা কিন্তু একটা অ্যালার্মিং ইস্যু। এটা আমাদের ন্যাশনাল ক্রাইসিসের দিকে যাবে হয়তো ভবিষ্যতে।

আয়রণের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণটাতে বলা হয়েছে, ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হচ্ছে অতিরিক্ত মাত্রায়। অদূর ভবিষ্যতে দেখা যাবে, আমাদের যে ভূগর্ভস্থ পানি আছে সেখানেও আয়রণের মাত্রা বেড়ে যাবে। এমনিতে আমাদের যে সাধারণ টিউবওয়েল আছে, সেগুলোতে আয়রণ থাকে। ভূগর্ভস্থ পানিতে সাধারণত থাকে না। এখন দেখা যাচ্ছে উপরের লেয়ারটা যখন কমে যাচ্ছে পানি শেষ হয়েছে তখন আয়রণটা দেখা গেলো নিচের দিকে গিয়ে বা সেকেন্ড লেয়ারে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। সেটা আমাদের জন্য অ্যালার্মিং। ভূগর্ভস্থ পানি যদি অব্যাহতভাবে তোলা হয় তখন দেখা যাবে আমাদের সারফেসে ভূমিতে চলে আসবে এই অতিরিক্ত মাত্রার আয়রণ। যেটা আমাদের পরিবেশের জন্য অনেকটা ক্ষতিকর।

আরেকটা পয়েন্ট হচ্ছে, দীর্ঘসময় ধরে আস্তে আস্তে আমরা যখন এই ভূগর্ভস্থ পানিকে ব্যবহার করে ফেলি, তখন দেখা যাবে পরবর্তীতে আমাদের পানির লেয়ারটা আর পাওয়া যাচ্ছে না। এখন তো আমাদের ফার্স্ট লেয়ার প্রায় শেষ। আবার কিছু কিছু জায়গায় দেখা গেলো আমাদের ফার্স্ট লেয়ার শেষ, সেকেন্ড লেয়ার থেকে ওয়াটার আপডেট করা হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা শহরে। যেখানে বেশি গভীর নলকূপ আছে সেসব এলাকায়।

তিনি বলেন, মিরসরাইয়ের সোনাপাহাড় এলাকার বিষয়ে যা শুনছি, তাতে এটা কিন্তু আমাদের জন্য একটু অ্যালার্মিং হবে। কারণ অলরেডি সেখানে ফার্স্ট লেয়ারে পানির স্বল্পতা দেখা দিয়েছে। সেকেন্ড লেয়ার থেকে অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি নিলে ভবিষ্যতে মারাত্মক পানি-সংকট দেখা দিতে পারে।

আর্টিফিসিয়াল যে ওয়াটার রিজার্ভ আছে যেমন রেইন ওয়াটারটাকে বিএসআরএম হারবেস্টিং করে রাখতে পারে, পুকুরের মধ্যে বা বড় জলাধার তৈরি করে রাখতে পারে। ন্যাচারাল যে রিসোর্স আছে আন্ডারগ্রাউন্ড ওয়াটার আছে সেটাকে আমরা শেষ না করে রেইন ওয়াটারটাকে আমরা রিজার্ভ করে রাখি। এবং সেখানটাতে তারা চাইলে ব্যবহার করতে পারবে ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল পারপাসে। আরেকটা কথা হচ্ছে, আমরা রি-সাইক্লিং করতে পারি। ইন্ডাস্ট্রিতে যদি ওয়াটারটা একবার ইউজ করা হয় সেই ওয়াটারটা যে ফেলে দেওয়া হয় সেখানে হাই টেম্পেরেচার হবে। সেখানে হাই টেম্পারেচার হলে ওদের একটা চেম্বার তৈরি করা উচিত। বা রি-সাইক্লিং ফ্যাসিলিটিস করা উচিত। মানে ওদের ওই ওয়াটারটা যেটা ফেলে দেওয়ার কথা। সেটাতে উচ্চমাত্রার আয়রণ থাকবে। সেটাকে ওরা রিফাইন করতে পারে। রিফাইন করে সেটাকে ঠাণ্ডা করে আবার সেটা তারা ইউজ করতে পারে।

এরকম পানি শোধনাগার বা রি-সাইক্লিং তৈরি করা দরকার। কিন্তু এখন বিএসআরএম যেটা করছে বলে শুনছি, সেটা কিন্তু অ্যালামিং আমাদের পরিবেশের জন্য। শিল্পনীতিতে তো অবশ্যই থাকবে, ইন্ডাস্ট্রিয়াল পারপাসে যে পানি ব্যবহার করার কথা সেটার কাছের ওয়াটার সোর্স থেকে পূরণ করতে হবে। কিন্তু বিএসআরএমের ক্ষেত্রে যেভাবে শোনা যাচ্ছে, এভাবে মাটির নিচের পানি নিয়ে ফেললে একসময় পুরো এলাকাতেই পানি শুন্যতা বিরাজ করবে। ফসল হবে না।