বুধবার, ১২ মে ২০২১, ২৯ বৈশাখ ১৪২৮

ভয়ঙ্কর এক ম্যাজিস্ট্রেটের গল্প!

প্রকাশিতঃ সোমবার, মে ৩, ২০২১, ১১:৩৮ পূর্বাহ্ণ

একুশে প্রতিবেদক : রুদ্রমূর্তিতে দোকানে ঢুকলেন ‘নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট’। ঢুকেই অশ্রাব্য গালিগালাজ! ‘এখানে ভেজাল ওষুধ বানানো হচ্ছে’ বলেই জেল-জরিমানার হুমকি দিলেন। ভয়ে তটস্থ দোকানদারের যখন ত্রাহি অবস্থা তখন পেছন দিক থেকে ‘ম্যাজিস্ট্রেটের’ সহকারি আসেন। ‘কিছু দিলে’ স্যারকে ম্যানেজ করার দায়িত্ব নেন তিনি। দাবিকৃত টাকা নেওয়ার পরই পুরো টিমসহ কেটে পড়েন সেই ‘ম্যাজিস্ট্রেট’!

শুধুমাত্র এই এক দোকানই নয়; এভাবে অসংখ্য প্রতিষ্ঠানে ‘স্ট্রিং অপারেশন’ চালিয়েছেন ভয়ঙ্কর এই ‘ম্যাজিস্ট্রেট’! অভিযানে মামলা-জরিমানার ভয় দেখিয়ে হাজার হাজার টাকা নিয়ে চলে যান তিনি! আর সব শেষে জানা গেল, তিনি কোন ম্যাজিস্ট্রেট নন; একজন প্রতারক! ম্যাজিস্ট্রেট সেজে বিভিন্ন দোকান থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়াই তার কাজ! একুশে পত্রিকার অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ম্যাজিস্ট্রেট নামধারী ভয়ঙ্কর এই প্রতারকের নাম।

তার নাম এস এম মিজান উল্লাহ সমরকন্দি। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার পুরানগড় এলাকায়। ইতোমধ্যেই তার বিরুদ্ধে অন্তত ৬টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। ম্যাজিস্ট্রেটের পাশাপাশি তিনি নিজেকে পত্রিকার সম্পাদক হিসেবেও পরিচয় দেন। মিজানের মতোই প্রতারক তার স্ত্রী পারভীন আক্তার। তাদের প্রতারণার ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হয়েছে শ্রমজীবী দরিদ্র মানুষ থেকে শুরু করে চাকরিপ্রত্যাশী বেকার যুবকও। ‘স্বীকৃতি’ নামে একটি এনজিওর নাম দিয়ে সঞ্চয় ও ঋণদান কর্মসূচি গ্রহণের নামে চট্টগ্রাম নগরসহ বিভিন্ন উপজেলা থেকে সঞ্চয় সংগ্রহ করে সেই টাকা আত্মসাৎ করেছেন পারভীন আক্তার ও মিজান।

পরে চট্টগ্রামের একটি আঞ্চলিক দৈনিকে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে কর্মকর্তাদের কাছ থেকে জামানত সংগ্রহের মিশনে নামেন পারভীন আক্তার। ওই প্রতিষ্ঠানে চাকরি দিয়ে জামানত হিসেবে কর্মকর্তাদের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে বিশাল অংকের জামানত। মাস শেষ হওয়ায় কর্মকর্তাদের বেতন না দিয়ে জামানত ছাড়াই বিদায় করেছেন তাদের। জামানত ও বেতনের টাকা চাওয়ায় একাধিক কর্মকর্তাকে মিথ্যা মামলায় জড়িয়েছেন পারভীন।

জানা গেছে, ওই সময় প্রতিষ্ঠানটির তৎকালীন সীতাকু- শাখার ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আলী বাদি হয়ে স্বীকৃতির নির্বাহী পরিচালক পারভীন আক্তারসহ স্বীকৃতি এনজিওর সাথে সম্পৃক্ত চারজনের বিরুদ্ধে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পর উল্টো প্রতারণার শিকার রেজাউল করিম, ইব্রাহিম, আলী এবং লতিফুল কবির নামে চার কর্মকর্তার নামে মামলা দায়ের করে পারভীন। পরে প্রতারণার অভিযোগে পারভীন র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।

র‌্যাব-৭ এর সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) মো. মাহমুদুল হাসান মামুন বলেন, প্রতারক পারভীন আক্তারের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত আমরা ১০টিরও বেশি প্রতারণার মামলার আছে বলে তথ্য পেয়েছি। ঠা-া মাথার প্রতারক পারভীন ও তার স্বামী মিজান উল্লাহ সমরকন্দি এর আগেও আকবরশাহ, রাউজানসহ বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর হাতে আটক হয়েছিলেন। এদিকে এস এম মিজান উল্লাহ সমরকন্দি ও পারভীন ২০১৮ সালের ৬ মে দুপুরে রাঙ্গুনিয়ার রানীরহাট বাজারে ‘চ্যানেল আজাদী’ লেখা স্টিকার লাগানো প্রাইভেট কার নিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে যায়। তারা নিজেদের ম্যাজিস্ট্রেট ও সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে চাঁদাবাজি করার সময় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে আটক হয়। পরে অপরাধ স্বীকার করে মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পায়।

এছাড়া আকবর শাহ থানার নিউ মনসুরাবাদ এলাকার বাংলাদেশ আয়ুর্বেদিক ঔষধালয়ে ম্যাজিস্ট্রেট পরিচয়ে ৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন। ওই ঘটনায় আয়ুর্বেদিক ঔষধালয়ের মহিদুল ইসলাম মহিদ বাদি হয়ে আকবর শাহ থানায় সৈয়দ মিজান উল্লাহ, ফারদিন আহমেদ ও পারভীন আক্তারকে আসামি করে মামলা করেন।

সে সময় আকবর শাহ থানার ওসি জসিম উদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ম্যাজিস্ট্রেট পরিচয়ধারী প্রতারক পারভীন আক্তার ও তার স্বামী মিজান মাইক্রোবাসে ঘুরে ঘুরে কথিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালনা করে। এ আদালতের নামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে তারা টাকা আদায় করে। গ্রেপ্তারের পর তারা জানায়, এর আগে প্রতারণা করতে গিয়ে তারা নগরীর হালিশহর, বন্দর ও জেলার সাতকানিয়ায় গ্রেপ্তার হয়।’

একই পদ্ধতিতে পাঁচলাইশ থানার ষোলশহর এলাকায় জনৈক মীর কাশেমের কাছ থেকে সাড়ে ৮ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন। এ প্রসঙ্গে পাঁচলাইশ থানার ওসি আবুল কাশেম ভুঁইয়া বলেন, ‘প্রতারকরা সরকারি কর্মকর্তা পরিচয়ে অনেক সময় বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে থাকে। এক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা থানায় অভিযোগ দিলে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।’

এদিকে ম্যাজিস্ট্রেসি-প্রতারণার মাধ্যমেই মিজান উল্লাহ সমরকন্দি গ্রুপ খুলে বসেছেন। তার এখন সমরকন্দি ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, সমরকন্দি হজ্জ্ব কাফেলা ট্রাভেলস এন্ড ট্যুর এবং সমরকন্দি প্রিন্টিং প্রেস নামে তিনটি প্রতিষ্ঠান আছে।

আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর দেওয়া তথ্যমতে, মিজান উল্লাহ সমরকন্দির শিক্ষার দৌড় এসএসসি পর্যন্ত। কিন্তু তিনিই বনে গেলেন পত্রিকার সম্পাদক! ‘আলোচিত কণ্ঠ’ নামের পত্রিকার সম্পাদক তিনি! এছাড়া ‘বাংলাদেশ পরিবেশ সাংবাদিক সমিতি’ নামের একটি কথিত সংগঠনের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সহ সভাপতির পদও পেয়েছেন মিজান।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সৈয়দ মিজান উল্লাহ সমরকন্দির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে মিজান একটি গণমাধ্যমকে বলেছেন, তিনি ঢাকা থেকে প্রকাশিত জাতীয় দৈনিক আলোচিত কণ্ঠ পত্রিকার সম্পাদক। তিনি স্বীকৃতি নামের এনজিওর সঙ্গে সম্পৃক্ত। তবে কোনও ধরনের প্রতারণার সঙ্গে জড়িত নন।