বুধবার, ১২ মে ২০২১, ২৯ বৈশাখ ১৪২৮

বাংলাদেশে বিটকয়েনের কী অবস্থা?

প্রকাশিতঃ মঙ্গলবার, মে ৪, ২০২১, ৮:২২ অপরাহ্ণ


একুশে প্রতিবেদক : বিটকয়েন হচ্ছে একটি ভার্চুয়াল মুদ্রা। ডিজিটাল মুদ্রা যার কোন বাস্তব অস্তিত্ব নেই। অর্থাৎ অন্যান্য মুদ্রার মত এটি ধরা ছোঁয়া যায় না; কোন ব্যাংকের ভল্টে কিংবা ক্যাশ বাক্সে এটি রাখা যায় না। এই মুদ্রার কোন নিয়ন্ত্রণকারী দেশ বা ব্যাংক নেই।

বাংলাদেশে ‘অবৈধভাবে’ বিটকয়েনের ব্যবসার অভিযোগে গত ২ মে ঢাকায় ১২ জনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। এরপর বিটকয়েনের বিষয়টি আরেকবার সামনে আসে। আসুন জেনে নিই, এই বিটকয়েন আসলে কী।

২০০৮ সালের শেষের দিকে জাপানের একজন নাগরিক সাতোশি নাকামোতো নামের কেউ বা একদল সফটওয়্যার বিজ্ঞানী এই ‘ক্রিপ্টোকারেন্সির’ উদ্ভাবন করেন। যদিও এই ব্যক্তির আসল নাম বা পরিচয় এখনো জানা যায়নি। নতুন এই ভার্চুয়াল মুদ্রাকে বলা হয় বিটকয়েন। ২০১৩ সালের দিকে এই মুদ্রার দাম ১০ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার পর জনপ্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করে।

গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন বিলিওনিয়ার এলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান টেসলা বিটকয়েনে দেড়’শ কোটি ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়ার পর থেকে এই ডিজিটাল মুদ্রার দাম আবার বাড়তে শুরু করেছে। আজ মঙ্গলবারের (৪ মে) হিসাব অনুযায়ী একটি বিটকয়েন সমান বাংলাদেশি টাকার হিসেবে ৪৭ লাখ ৭ হাজার ৩১০ টাকা।

বিটকয়েন ব্যবস্থায় ইন্টারনেট ব্যবহার করে দুইজন ব্যবহারকারীর মধ্যে নিজেদের পরিচয় প্রকাশ না করেও এটা সরাসরি আদান-প্রদান (পিয়ার-টু-পিয়ার) করা হয়। এই লেনদেনের তথ্য ব্লকচেইন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সুরক্ষিত থাকে, কিন্তু এই মুদ্রার লেনদেন তদারকির জন্য কোন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো কর্তৃপক্ষ থাকে না। এই মাইনারের মাধ্যমে নতুন বিটকয়েন তৈরি হয়।

বিটকয়েন তৈরি বা কেনার পর তা গ্রাহকের হিসাবে জমা থাকে। পরবর্তীতে তিনি সেগুলো ব্যবহার করে পণ্য কিনতে পারেন বা বিক্রি করে দিতে পারেন। বিক্রি করলে বিটকয়েনের পরিবর্তে প্রচলিত অর্থে তা গ্রহণ করা যায়। বিভিন্ন কম্পিউটার ব্যবহার করে লেনদেন করা হলেও সেসব তথ্য কেন্দ্রীয় সার্ভারে হালনাগাদ করা হয়ে থাকে।

বিটকয়েনকে অনেকেই ভবিষ্যতের মুদ্রা বলে মনে করেন। যেহেতু বিটকয়েনে লেনদেনে কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন পড়ে না এবং এর লেনদেনের গতিবিধি অনুসরণ করা যায় না, ফলে এটা মাদক, কালোবাজারি ও অর্থ পাচারে এই ব্যবহার হচ্ছে বলে অনেকেই আশঙ্কা করছেন।

২০১৭ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক বিটকয়েনে লেনদেনের ব্যাপারে সতর্কতা জানিয়ে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, ভার্চুয়াল মুদ্রা কোন দেশের বৈধ কর্তৃপক্ষ ইস্যু করে না বিধায় এর বিপরীতে আর্থিক দাবির কোন স্বীকৃতিও নেই। ভার্চুয়াল মুদ্রায় লেনদেনের দ্বারা মানি লন্ডারিং এবং সন্ত্রাসে অর্থায়ন সম্পর্কিত আইনের লঙ্ঘন হতে পারে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক সতর্ক করে দিয়েছে। এ ধরনের লেনদেনের মাধ্যমে আর্থিক এবং আইনগত ঝুঁকি রয়েছে বলে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক উল্লেখ করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “নামবিহীন বা ছদ্মনামে প্রতিসঙ্গীর সঙ্গে অনলাইনে ভার্চুয়াল মুদ্রায় লেনদেনের দ্বারা মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ সম্পর্কিত আইনের লঙ্ঘন হতে পারে।”

এছাড়া, অনলাইন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে লেনদেনকারী গ্রাহকরা ভার্চুয়াল মুদ্রার সম্ভাব্য আর্থিক ও আইনগত ঝুঁকিসহ বিভিন্ন ঝুঁকির সম্মুখীন হতে পারেন বলে সতর্ক করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

যদিও গত কয়েক বছরে বিটকয়েনের ইকোসিস্টেম বা বাজার ব্যবস্থা সম্প্রসারিত হয়েছে, অনলাইনে বিটকয়েন এক্সচেঞ্জও চালু হয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশেই এখন বিটকয়েনের আইনি স্বীকৃতি আছে। তবে বাংলাদেশসহ অসংখ্য দেশে বিটকয়েন এখনো নিষিদ্ধ। যদিও বাংলাদেশে যারা আউটসোসিং করছেন, তাদের কেউ কেউ বিটকয়েন কেনাবেচা করে থাকেন। কিন্তু অবৈধ হওয়ায় সেটা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না। সাধারণত বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গেই এই লেনদেন হয়ে থাকে। অর্থ আদান-প্রদানে বিদেশে থাকা বন্ধু বা আত্মীয়স্বজনদের সহায়তা নেয়া হয়।

বিটকয়েনের সুবিধা

বিটকয়েন পদ্ধতি নতুন বিষয় হলেও অনেক উন্নত দেশ এটিকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এটাকে পেপালের মতো লেনদেন পদ্ধতি মনে করে এসব দেশ। বিটকয়েনের আরেকটি সুবিধা হল এর নিরাপত্তা। বিটকয়েন ব্যবহার করতে, একটি বিটকয়েন অ্যাড্রেস তৈরি করা লাগে। এই অ্যাড্রেস সাধারণত ৩৪ সংখ্যার হয়। এই কারণেই এটা এতো বেশি নিরাপদ।

বিটকয়েনের জন্য সরকার বা অন্য কারো কাছে হিসাব দিতে হবে না৷ আয়ের উৎস দেখাতে হয় না! এজন্য ব্লাক হ্যাট হ্যাকাররা কোনো কিছুর মূল্য বাবদ বিটকয়েন নিয়ে থাকে। কোনো ব্যবহারকারী যদি নিজে থেকে বিটকয়েনের লেনদেনের হিসাব কাউকে না দেয় তবে এটা কেউ জানতে পারবে না৷

আরেকটি বিষয় হচ্ছে কখনো বিটকয়েন একাউন্ট কেউ ফ্রিজ বা বাজেয়াপ্ত করতে পারবে না। কোনো দেশেরও সরকার না। ব্যাংক ব্যবহার করতে হলে ব্যাংক একাউন্টের জন্য একটা ফি ব্যাংককে প্রদান করতে হয়, লেনদেন হোক বা না হোক। বিটকয়েনের ক্ষেত্রে এ পয়সাও দিতে হবে না। শুধুমাত্র টাকা তুলতে কিছু পরিমাণ ফি নেয়। আরেকটা অন্যতম সুবিধা হচ্ছে বিটকয়েনের অনলাইন বা ইন্টারনেটে তরলত্য, ইন্টারনেটে খুব সহজে ব্যবহার যোগ্য।

বিটকয়েনের অসুবিধা

বিটকয়েন যেহেতু একটি অনলাইন কারেন্সি, এটিকে যখন আপনি ব্যবহার করতে যাবেন তখন একটু ঝামেলায় পড়তে পারেন। কারণ বিটকয়েনকে টাকায় পরিণত করার সুযোগ কম। অবৈধ বলে গণ্য করায় দেশে এখনো বিটকয়েনের বিস্তৃত ব্যবহার হচ্ছে না।

এছাড়া বিটকয়েন যেহেতু অনলাইন কারেন্সি তাই যদি একটি হার্ড ড্রাইভ ক্রাস করে বা ভাইরাস এর ডেটাকে করাপ্টেড করে দেয় তবে আপনি আজীবনের জন্য আপনার একাউন্ট ও টাকা হারিয়ে ফেলবেন! যা কখনোই রিকভার করা সম্ভব হবে না।

বিট কয়েনের দাম বা মূল্য মাঝে মধ্যে অস্বাভাবিকভাবে উঠানামা করেছে। যেমন ২০১১ সালের জুনে বিটকয়েনের দাম ছিল ৯.৯ বা ১০ ডলার। যার দাম মাত্র একমাসের ব্যবধানে ১ ডলারের নিচে নেমে আসে। যদিও এটি বিটকয়েনের ইতিহাস এ সবচেয়ে বড় অবনতি।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখে বিটকয়েন :

র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালন (অপারেশন) কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সরোয়ার বলেন, নিষিদ্ধ বিট কয়েন মানিলন্ডারিংয়ের একটি সোর্স। তবে, এটি ব্যাপকভাবে বাংলাদেশে এখনও প্রচলিত হয়নি। নিষিদ্ধ এই বিট কয়েন কেনা-বেচার সঙ্গে জড়িত অনেকগুলো চক্র আমাদের নজরদারিতে রয়েছে। যারা বিট কয়েনের শিকড় স্থাপনের সঙ্গে জড়িত। আশা করছি, তাদেরকেও আমরা আটক করে আইনের আওতায় আনতে পাবো।

তিনি বলেন, বিট কয়েন এর সংখ্যা খুব সীমিত। এই কয়েন পয়েন্টিংয়ের মাধ্যমে কেনা-বেচা হয়। যেকোনো ধরনের কালো টাকা এক দেশ থেকে অন্যদেশে স্থানান্তরের বা অবৈধ বিজনেস মাদক, অস্ত্র, অবৈধ যন্ত্রপাতি কেনা-বেচার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়।

বিটকয়েন নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থনীতিবিদদের ভাবনা :

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, বাংলাদেশে বিটকয়েনের কোন অনুমোদন নেই। যেহেতু অনুমোদন নেই, সুতরাং এই জাতীয় লেনদেন বৈধ নয়। যদি আমাদের কাছে এই জাতীয় লেনদেনের খবর আসে, তাহলে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অর্থনীতিবিদ নাজনীন আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ক্রিপ্টোকারেন্সির’ ভেতরে বেশ জটিল কিছু বিষয় রয়েছে। যেমন এটার ব্যবসা এখন যেভাবে হচ্ছে, কেউ কিনে রেখে দিচ্ছেন, দাম বাড়লে আবার বিক্রি করছেন। কিন্তু আমাদের দেশে পুঁজিবাজারে যেমনটা হয়েছে, ভালোভাবে না বোঝার কারণে এখানেও কিন্তু প্রতারণার একটা সুযোগ রয়েছে।

বিটকয়েন বাংলাদেশে ব্যবহার করতে হলে আরও অনেক পরিবর্তন প্রয়োজন আছে জানিয়ে নাজনীন আহমেদ বলেন, সেই সঙ্গে যেহেতু পৃথিবীতে এই মুদ্রা ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, ফলে পুরোপুরি এটাকে অস্বীকার করারও উপায় নেই। ফলে পুরোপুরি বন্ধ না করে রেখে এটার ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা করা উচিত। কারণ বিশ্বে যদি একসময় এটা প্রচলিত হয়ে ওঠে, তাহলে সেটার সঙ্গেও খাপ খাইয়ে নিতে হবে। সুতরাং সেই জন্য প্রস্তুতি নিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের একেবারে মুখ ফিরিয়ে না রেখে তাদের এটা নিয়ে গবেষণা করা, যৌক্তিকতা, অযৌক্তিকতা যাচাই করা তৈরি করা উচিত। বিটকয়েন কোথায় যাচ্ছে, সেটার দিকে নজর রাখা উচিত। তাহলে ভবিষ্যতে যদি বিটকয়েনের ওপর বড় লেনদেন করতে হয়, তখন বিপদে পড়তে হবে না।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের জ্যেষ্ঠ গবেষক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য গণমাধ্যমকে বলেন, আমি মনে করি, বাংলাদেশ এখনো এটার জন্য প্রস্তুত নয়। কারণ আমাদের মূলধারার মুদ্রা ব্যবস্থাপনার বাইরে এটা হচ্ছে। শুধু জাতীয় নয়, আন্তর্জাতিকভাবেও এটার ব্যবস্থাপনার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক যে নীতি দরকার, সেটার অভাব রয়েছে। এটার ভেতর এখনো অনেক ধরণের ফটকাবাজি চলছে। এটা নিয়ে আসলে কোন ধরণের প্রাতিষ্ঠানিক, আইনি প্রস্তুতি নেই, তথ্যের অস্বচ্ছতাও আছে। বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক পরিকাঠামো এখনো দুর্বল। শিডিউল ব্যাংকগুলো নাজুক অবস্থায় আছে, দেশ থেকে অর্থ পাচার রোধে বড় ধরণের কোন কার্যকারিতা দেখানো যায়নি। অন্যান্য আর্থিক জালিয়াতি চলছে, তাই এটার ব্যাপারে আমি এখনো অনেক রক্ষণশীল।