শনিবার, ১৯ জুন ২০২১, ৫ আষাঢ় ১৪২৮

তরুণদের ‘স্বপ্নে’ করোনার উপর্যুপরি আঘাত, উত্তরণের উপায় কী?

প্রকাশিতঃ শুক্রবার, মে ৭, ২০২১, ৮:০২ অপরাহ্ণ


আবছার রাফি : বাংলাদেশে বেকারত্ব একটি দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা। দেশে স্বাভাবিক সময়ে এমনিতেই বেকারত্ব লেগে থাকে। তার ওপর করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট সঙ্কটে এখন সেই বেকারত্বের হার বেড়েছে কয়েক গুণ বেশি। তন্মোধ্যে শিক্ষিত বেকার তরুণ-তরুণীরাই রয়েছেন অগ্রভাগে। এ সঙ্কট, অনিশ্চিত জীবন; বিষিয়ে তুলছে শিক্ষিত বেকারদের জীবন।

শুধু চাকরি হচ্ছে না কেবল তা নয়, চাকরি হারাচ্ছেন এমন মানুষের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। সব মিলিয়ে করোনাকালীন বেশ বেকায়দায় পড়েছেন শিক্ষিত তরুণ-তরুণী ও শিক্ষার্থীরা। একদিকে চাকরি না হওয়ায় অর্থাভাব আর অন্যদিকে চাকরির বয়স চলে যাওয়ার শঙ্কা; এ দুই সমস্যার কবলে পড়ে চোখেমুখে হতাশাভরে অন্ধকার দেখছেন দেশের লাখ লাখ শিক্ষিত তরুণ-তরুণী।

মো. সাজ্জাদ হোসেন (২৮)। নগরীর একটি সরকারি কলেজ থেকে ২০১৯ সালে স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন। পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব চড়ে বসে মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান সাজ্জাদের ওপর। তাই পড়াশোনা শেষে হন্যে হয়ে খুঁজছেন চাকরি। এজন্য সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আবেদনও করেছেন ডজনখানেক। কিন্তু কিছুতেই মিলছে না চাকরি। এরইমধ্যে বেড়ে যায় করোনার প্রাদুর্ভাব। কাজেই স্বাভাবিক সময়ে চাকরি পাওয়ার ক্ষীণ সম্ভাবনা থাকলেও তা একেবারে ম্লান হয়ে যায় সাজ্জাদের। এখন বিমর্ষ-বিষণ্ণতাই কেবল সাজ্জাদের সঙ্গী।

তিনি বলেন, চাকরির জন্য কিছু প্রতিষ্ঠানে আবেদন করেছি। কিন্তু তাতে পরীক্ষা হচ্ছে না। পরিবার অনেক কষ্টে আমাকে পড়ালেখা করিয়েছে। এখন আমার উপর পরিবারের খরচ মেটানোর দায়িত্ব এসে পড়েছে। অথচ কিছুতেই কোনো চাকরির সুযোগ হয়ে উঠছে না। কী করব, কোথায় যাব- এমন দুশ্চিন্তায় উদভ্রান্ত সময় পার করছি।

একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. ফোরকান। তিনি নগরীতে একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করতেন। গতবছর করোনার কারণে চাকরি হারান ফোরকান। এখন অনিশ্চিত জীবন নিয়ে হতাশায় ধুঁকছেন তিনি।

ফোরকান বলেন, ‘আমি ২০১৮ সাল থেকে ৪০ তম বিসিএস নিয়ে আটকে আছি। কয়েকদিন আগে ভাইবা দিয়ে আসলাম যেটা এখন আপাতত স্থগিত। একদিকে দীর্ঘসূত্রিতা আর অন্যদিকে ১ মাস আগে সার্টিফিকেটের বয়স ৩০ বছর হয়ে যাওয়ায় নতুন করে কোথাও আবেদন করতে পারছি না। আবার করোনা সংক্রমণের কারণে গত দেড় বছর থেকে বিসিএস বাদে তেমন কোনো পরীক্ষার সার্কুলার হয়নি। আমার মতো অনেকেরই অবস্থা এখন চরম ক্ষতির সন্মুখীন।’

চাকরিপ্রত্যাশীরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হচ্ছে না। আবার যেসব চাকরির পরীক্ষা আধা সম্পন্ন হয়েছে, সেগুলোর চূড়ান্ত ফলও প্রকাশিত হয়নি। একদিকে নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি নেই, অন্যদিকে যেসব বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে সেগুলোও থমকে গেছে। এমন অবস্থায় দিশেহারা হয়ে পড়ছেন এসব চাকরিপ্রত্যাশীরা।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের দাবি কী?

গড় আয়ু ও কর্মক্ষমতা বাড়ানোর যুক্তিতে সরকারি চাকরিতে অবসরের সময়সীমা বাড়ানো হলেও চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানো হয়নি। সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০ বছর। কোনো শিক্ষার্থীর সার্টিফিকেট বয়স ৩০ পার হলে তিনি আর চাইলেও সরকারি চাকরি করতে পারবেন না। করোনাকালে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বয়সসীমা ৩০ থেকে ৩৫ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়ার দাবিতে মানববন্ধন করেছেন শিক্ষার্থীরা। কিন্তু এখনো এই দাবির প্রেক্ষিতে কোনো সমাধান আসেনি ছাত্র-ছাত্রীদের পক্ষে।

শিক্ষার্থীদের দাবি, করোনাকাল বিবেচনা করে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়াতে হবে। নয়তো করোনার কারণে পিছিয়ে পড়া ছাত্র-ছাত্রীদের জীবন আরও দুর্বিষহ হতে উঠবে।

শুধু সাজ্জাদ বা ফোরকানই নয়, চাকরি না পাওয়া এবং সার্টিফিকেট বয়স চলে যাওয়ার শঙ্কায় মানবেতর সময় পার করছেন দেশের অধিকাংশ শিক্ষিত তরুণ-তরুণী। করোনার সর্বনাশী থাবা যেভাবে তরুণদের স্বপ্নে আঘাত হানছে তাতে সমন্বিত পরিকল্পনা হাতে না নিলে এ সঙ্কট দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হবে বলে ধারণা অভিভাবক মহলের। এতে বেকার তরুণরা নিরুপায় হয়ে পড়লে সামাজিক অনিয়ম-অনাচার বেড়ে যাওয়ারও সমূহ সম্ভবনা তৈরি হতে পারে।

করোনাকালীন বেকারত্বের হালহকিকত
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ জরিপ ২০১৭ অনুযায়ী দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী ৬ কোটি ৩৫ লাখ। তন্মোধ্যে কাজ করেন ৬ কোটি ৮ লাখ। বাকি ২৭ লাখই বেকার পড়ে আছেন। সেই অনুযায়ী, শতাংশ হিসাবে বাংলাদেশে বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ২ শতাংশ। এখানে শিক্ষিত বেকারের হার সবচেয়ে বেশি। প্রতি ১০০ জন স্নাতক ডিগ্রিধারীর মধ্যে ৪৭ জনই বেকার।

২০১৭ পরবর্তী ৩ বছর এ জরিপ বন্ধ থাকা এবং তৎপরবর্তী সময়ে করোনাভাইসের কারণে অর্থনীতি প্রায় অচল হয়ে পড়া; সব মিলিয়ে বলা যায় শিক্ষিত বেকার তরুণদের সংখ্যা অতীতের যে-কোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানে মাত্রাতিরিক্ত হারে বেশি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যারা গত কয়েক বছরের মধ্যে পড়াশোনা শেষ করেছেন, নতুন চাকরির চেষ্টা করছেন, তাদের উচিত হবে শুধুমাত্র কাঙ্খিত চাকরির জন্য বসে না থেকে যা পাওয়া যায়, সেটা দিয়েই কর্মজীবন শুরু করা। সেই সঙ্গে সরকারকে সতর্ক করে দিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুবকদের এই সমস্যা ও সংকটের ব্যাপারে এখনই গুরুত্ব দেয়া শুরু করা উচিত।

শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার নেপথ্যে প্রভাবক কী?

একদিকে শিক্ষিত তরুণের বড় অংশ বেকার হয়ে পড়ায় যেমন বড় ধরণের সঙ্কট তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে হতাশাগ্রস্ত হয়ে আত্মহত্যার পথেও হাঁটছেন কতিপয় বেকার তরুণরা। এক পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে, পারিবারিক কলহ, প্রেমঘটিত জটিলতা, বেকারত্ব, নিঃসঙ্গতা, মানসিক চাপ ও তীব্র বিষন্নতার কারণে গত বছর (মার্চ) করোনা শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত আত্মহত্যা করেছেন ২৮ জন শিক্ষার্থী।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যা প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেছেন, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে শিক্ষার্থীরা শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। এরকম নানাবিধ প্রভাবকগুলোর মধ্যে ‘শিক্ষাজীবন শেষ করার পর চাকুরি না পাওয়া, বঞ্চনা থেকে জীবনের প্রতি হতাশা’- এ বিষয়গুলো বেশি আত্মহত্যার উপর বিশেষভাবে প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীরা।

শিক্ষিত বেকারদের নিয়ে সৃষ্ট সঙ্কট থেকে উত্তরণের উপায় কী?
এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) সমাজতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. ওবায়দুল করিম দুলালের কাছে। তিনি একুশে পত্রিকাকে যা বলেছেন সবই নিচে তুলে ধরা হয়।

‘এখন যে দুর্যোগটা চলছে। দুর্যোগ মানে হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে নষ্ট করে দেওয়া। এই দুর্যোগটা শুধুমাত্র স্থানীয় না, একেবারে বৈশ্বিক। যার ফলে এটা শুধু স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে তা না, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে। আর বৈশ্বিক অর্থনীতি যখন প্রভাবান্বিত হয় তখন সব দেশের অর্থনীতিতেই বিপর্যয় নেমে আসে।

এই বিপর্যয়কে কাটানোর জন্য একটি বিষয় সম্পর্কে বলতে হয়, নিউ নরমাল। নিউ নরমাল হচ্ছে, পৃথিবীতে আমরা যারা আছি আমাদের তো সব সময় দুর্যোগকে মোকাবেলা করে থাকতে হয়। যেমন ঝড়, ভূমিকম্প প্রভৃতি। ইন্দোনেশিয়াতে প্রতিদিনই ভূমিকম্প হয়। তা কম বেশি মাত্রার হয়, বেশি মাত্রার হলে প্রাণ ও সম্পদের হানি হয়।

বলা হচ্ছে, এই যে আমরা কোভিডের সময়টা অতিক্রম করছি সেটাও হচ্ছে একটা দুর্যোগ। অন্যান্য দুর্যোগের মতো এটাকেও আমাদের স্বাভাবিকভাবে নিতে হবে। তবে স্বাভাবিক করার প্রথমে যে ধাক্কাটা লেগেছে সেটার সাথে আমরা পরিচিত নই। সুতরাং সেই ধাক্কাটার সাথে আমাদের পরিচিত হতে হবে। এবং এটাকে এখন বৈশ্বিকভাবে বলা হচ্ছে নিউ নরমাল। তো, আমরা এখন দুর্যোগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। দুর্যোগের মধ্য দিয়ে আগেই আমাদের আন-এমপ্লয়মেন্ট ছিল, হতাশা ছিল। চাকরি-বাকরির ক্ষেত্রে অনেকদিন ধরে লড়াই করতে হয়েছে, চাকরি হয়নি। সেই দুর্যোগটা এখন একটু বেড়েছে- যেটা সামাজিক দুর্যোগ।

আমরা যদি কোভিডকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলি, তাহলে এর প্রভাব হচ্ছে সামাজিক ক্ষেত্রে অর্থাৎ সামাজিক দুর্যোগটা বাড়ছে। এখন এই সামাজিক দুর্যোগ আগে তো কমবেশি আমাদের ছিল, এখন কোভিডের কারণে বাড়তি যোগ হয়েছে বেকারত্ব। এটাকে এডজাস্ট করতে হবে। এডজাস্ট করতে হলে চাকরির সুযোগ বাড়াতে হবে। আসতে আসতে দুর্যোগটা কমে আসবে। যেভাবে একটা গ্লোবাল কমিউনিটি লড়াইতে নামতে চাচ্ছে সেটা যদি সম্ভব হয় তাহলে খুব তাড়াতাড়ি আমরা এটাকে এডজাস্ট করতে পারবো।

দুর্যোগ কমিয়ে এলে আমাদের প্রাইভেট-পাবলিক, এই দুই সেক্টরে সুযোগ বাড়াতে হবে। কারণ মানুষই হচ্ছে সবচেয়ে বড় সম্পদ। মানুষ যদি প্রকৃতির উপর কাজ করে সম্পদ তৈরি করতে পারে তাহলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হবে। আর মানুষ যদি না থাকে তাহলে স্বর্ণ থাকলেও লাভ নেই। সুতরাং মানুষ থাকতে হবে। দক্ষ মানুষ। আমাদের যারা শিক্ষিত তরুণ তারা তো দক্ষ। তাদের জন্য চাকরির সুযোগ যে-কোনোভাবেই বাড়াতে হবে। এবং এটা বাড়াতে গেলে অনেক সময় মনে হয় যে, জাতীয় রাজস্ব থেকে খরচ করতে হচ্ছে, আমাদের যে পরিমাণ কাজ দরকার তার চেয়ে বেশি চাকরি হয়ে যাচ্ছে। ধারণাটি সঠিক নয়। এই চাকরির ফলে তারা যদি কাজ করে তাহলে আরো সুযোগ তৈরি হবে। অর্থনৈতিক উন্নয়নটা আসলে এ সমস্ত কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, সরকার যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে করোনাকে মোকাবেলা করছে। আমাদের এ সমস্যা নিয়েও নিশ্চয়ই সরকার কাজ করবে।