রবিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩২

বর্ণবৈষম্য দূরীকরণ দিবসে এইচডাব্লিউপিএল-এর আহ্বান

| প্রকাশিতঃ ২ এপ্রিল ২০১৭ | ১২:২৫ অপরাহ্ন

ঢাকা : মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র অনুযায়ী, ‘সব মানুষের স্বাধীনতা ও মর্যাদা এবং অধিকার সমান।’ এই নীতির ভিত্তিতে বর্ণবৈষম্য দূরীকরণ দিবস প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই দিবসটি ঘোষণার অনেক সময় পার হয়ে গেলেও বর্ণবৈষম্য মোকাবিলা এবং সমতা ও মানবাধিকারের জন্য সংগ্রাম এখনো চলছে।

১৯৬০ সালের ২১ মার্চ। বর্ণপ্রথার বিরুদ্ধে তৎকালীন দক্ষিণ আফ্রিকার শার্পভিলে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশের গুলিতে ৬৯ জন নিহত হয়। দিনটি স্মরণে ও বর্ণবৈষম্য দূরীকরণে সচেতনতা বৃদ্ধিতে এই দিনকে আন্তর্জাতিক বর্ণবৈষম্য দূরীকরণ দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দেয় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ। সব জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে সব ব্যক্তির অধিকার রক্ষায় বিশ্ব সম্প্রদায়ের আহ্বানে প্রতিবছর আন্তর্জাতিক বর্ণবৈষম্য দূরীকরণ দিবস পালিত হয়ে আসছে। সব ধরনের বর্ণবৈষম্য দূরীকরণই এ দিবসের লক্ষ্য।

Apartheid অর্থ হচ্ছে বর্ণবৈষম্য। এটি শ্বেতাঙ্গদের ভাষা ‘আফ্রিকানস’ এর একটি শব্দ। দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গদের পরিচালিত সরকার আইন জারি করে জাতিকে বিভাজন করে; এর মধ্য দিয়ে কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য দমনমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা চালু করে তারা। ১৯৪৮ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দক্ষিণ আফ্রিকায় জাতীয় পার্টির সরকার একটি দেশ তৈরি করে, যেখানে শ্বেতাঙ্গ সংখ্যালঘুরা কৃষ্ণাঙ্গ সংখ্যাগরিষ্ঠদের উপর আধিপত্য করে। তারা রাষ্ট্রের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ, সংস্কৃতিসহ প্রত্যেক ক্ষেত্রে মৌলিক বিভাজন নীতি বাস্তবায়িত করে। সেই সময়ে, শ্বেতাঙ্গদের শাসিত সরকার এমন নীতি চালু করে যে, শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে সরকারি সুবিধা পৃথক থাকতো। এমনকি একে-অপরের সাথে বিবাহ নিষিদ্ধ ছিল। এছাড়া কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিককের কাজ সীমিত ছিল এবং তাদের শ্রেণীবদ্ধ করে জাতি অনুযায়ী পরিচয়পত্র বহন করতে হত। শ্বেতাঙ্গদের এলাকায় কৃষ্ণাঙ্গরা অবস্থান করতে পারতো না। এমনকি প্রকাশ্যে গোসলখানা ব্যবহারেও আলাদা প্রবেশপথ ব্যবহার করতে হতো।

সোয়েতোয় বিদ্রোহের সময় সেটি একটি কালো জনপদ ছিল। দক্ষিণ আফ্রিকার তৎকালীন সরকার শিক্ষাঙ্গনে শ্বেতাঙ্গদের ভাষা ‘আফ্রিকানস’ ব্যবহারের নির্দেশ দিলে ১৯৭৬ সালের ১৬ জুন সোয়েতোর বিভিন্ন স্থানে আন্দোলন হয়।

বিশ্ব সম্প্রদায়ের চাপে দক্ষিণ আফ্রিকার তদানিন্তন রাষ্ট্রপতি এফ ডব্লিউ ডি ক্লার্ক ২৭ বছর বন্দি রাখার পর বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের নায়ক নেলসন ম্যান্ডেলাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন এবং আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসেরসহ অন্যান্য বর্ণবাদবিরোধী সংগঠনের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। মুক্তির দিনে ম্যান্ডেলা জাতির উদ্দেশ্যে একটি ভাষণ দেন। এই ভাষণে তিনি শান্তি রক্ষা করা ও দেশের শ্বেতাঙ্গ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সাথে সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ্বান জানান। মুক্তির পর নেলসন ম্যান্ডেলা ‘বহু-জাতি নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা’ গঠনের প্রচেষ্টা চালান। তিনি ১৯৯৩ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পান এবং বর্ণবাদের অবসান ঘটিয়ে ১৯৯৪ হতে ১৯৯৯ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।

নেলসন ম্যান্ডেলার মতে, শান্তি হচ্ছে উন্নয়নের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ অস্ত্র, যেখানে সব মানুষ থাকতে পারে। অস্তিত্ব রক্ষায় কৃষ্ণাঙ্গদের সংগ্রামের ২৩ বছর পর দক্ষিণ আফ্রিকা বর্ণবিদ্বেষ প্রথা বিলুপ্তি হয়। আগের সময়ে পৃথক শিক্ষানীতির কারণে শিক্ষার মান আলাদা হয়, বাসস্থান এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ অন্যায়ভাবে দেওয়ায় অর্থনৈতিক ফলাফলে পার্থক্য ছিল। অবিচার এবং বর্ণবিদ্বেষ থেকে বৈষম্য তত্ত্ব সমস্যার কারণে দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিকদের কষ্ট অব্যাহত ছিল। নাগরিকদের মানবাধিকার ও দৃশ্যমান শান্তিপূর্ণ অবস্থান অর্জনের জন্য রাতদিন কাজ করতে হয়েছিল। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের কারণ, বর্ণবাদবিরোধী কাজে পুরো জীবন উৎসর্গ করা এবং শান্তির জন্য লড়াই করা নেলসন ম্যান্ডেলার মনোভাব গভীরভাবে নাগরিকদের অন্তরে গেঁথে যায়।

নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, ‘শান্তি সর্বশ্রেষ্ঠ অস্ত্র’, তাই স্বাধীনতা ও শান্তির জন্য কাজ করুন সর্বশ্রেষ্ঠ অস্ত্র সাথে নিয়ে। ভবিষ্যতের দক্ষিণ আফ্রিকা হবে নানা জাতির সমন্বয়ে।’

বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের মূল বিষয়, দ্বন্দ্বগুলো পরিস্কার হওয়ায় আগামীতে একটি উন্নত বিশ্ব গড়া যাবে। গত শতাব্দিতে দুটি ভয়ঙ্কর যুদ্ধ হয়েছে। এর ফলে পারস্পরিক অধিকারকে সম্মান জানিয়ে বিশ্বকে নিরাপদ রাখতে হবে মানবতাবাদীদের। দেখা যায়, বিশ্ব সম্প্রদায় আওয়াজ তোলার ফলে একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ দক্ষিণ আফ্রিকা অর্জন করতে পেরেছে। এই আওয়াজ অস্ত্র নিয়ে একটি রক্তাক্ত যুদ্ধ করা নিয়ে নয়। এটা অন্তরে পরিবর্তন এনে ধীরে ধীরে শান্তির মানসিকতা তৈরি করে।

শান্তির জন্য আন্তর্জাতিক আইনে এইচডাব্লিউপিএল একটি কথা অন্তর্ভুক্ত করেছে, নাগরিকদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সরকারের আইন হতে হবে, যা শান্তি দ্বারা পরিচালিত হবে। আরও সংযুক্ত করা হয়- মানবাধিকার, নারী এবং জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যগুলো শান্তির মাধ্যমে উপস্থাপন করতে হবে। শিক্ষার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় শান্তি শিক্ষা দেওয়ার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করবে এইচডাব্লিউপিএল। শান্তি শিক্ষা নিশ্চিত করবে- গতিশীল শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, শান্তির জন্য পদচারণা এবং বিশ্বের প্রতিটি অংশে শান্তির সংস্কৃতি স্থাপন।