শনিবার, ১৯ জুন ২০২১, ৫ আষাঢ় ১৪২৮

করোনা নিয়ে তরুণদের ‘ডেমকেয়ার’ ভাব, খেসারত দিচ্ছে পরিবার!

প্রকাশিতঃ বুধবার, মে ১২, ২০২১, ১১:৪২ পূর্বাহ্ণ

আবছার রাফি : নিঃসন্দেহে এক মনস্তাপপীড়িত সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে গোটা জাতি। হালের সমস্ত জ্ঞান-বিজ্ঞানকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে মাঠে নেমেছে করোনাভাইরাস। চীনের উহান থেকে ত্রাসের সাম্রাজ্য বিস্তৃত করেছে বিশ্বজুড়ে। মানবজাতিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করতে ঘন ঘন পাল্টাচ্ছে রণকৌশল, ধারণ করছে নানা ছদ্মবেশ।

এমন এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে দেশের অধিকাংশ তরুণ স্বাস্থ্যবিধি তো মানছেই না, অধিকন্তু না মানার বিষয়টি গর্বের সাথে উপভোগ করছেন। এর ফলে করোনা-ঝুঁকিতে পড়ছেন সেসব তরুণের পরিবারের বৃদ্ধ থেকে শিশুরা। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় তাদের অনেকের মৃত্যুও হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে দেশ-জাতির ভবিষ্যৎ কতটা বর্ণনাতীত দুর্যোগের মুখোমুখি হতে পারে, তা আর বলার অবকাশ রাখে না।

নগরীর এক মাদ্রাসা মাঠে বন্ধুদের নিয়ে গোলটেবিল বৈঠকের ভঙ্গিতে বসে ছুটিয়ে আড্ডা দিচ্ছেন মো. শাহীন নামের এক যুবক। দুষ্টুমি আর হাসি-তামাশায় বেশ সরগরম হয়ে উঠেছে আড্ডা। এমন প্রাণবন্ত আড্ডা দেখে বুঝার উপায় নেই যে, দেশে করোনাভাইরাস নামে কিছু আছে। শারীরিক দূরত্ব তো নেই, ন্যূনতম মাস্কও পরেনি আড্ডার কেউ। আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে সমানতালে চলছে পাশের টং দোকান থেকে আনা চা-বিস্কিট, আর ফুঁকছেন সিগারেট।

শাহীনকে জিজ্ঞেস করা হয়, সর্বাত্মক লকডাউন আর একের পর এক জারি করা সরকারি বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে কেন এই আড্ডা? ‘আমাদের তো করোনা ধরবে না, ভাই। করোনা ধরবে বড়লোক আর ঘুষখোর, চাঁদাবাজদের। কিছুদিন আগে একটু সর্দি আর শরীর ব্যাথা করেছে। এক দুইদিন পর তাও চলে গেছে।’-জবাব দেন শাহীন

মানলাম আপনার কিছু হচ্ছে না কিন্তু আপনি তো শরীরে বহন করে এ ভাইরাস বাসায় নিয়ে যাচ্ছেন, তাতে কী আপনার পরিবারের বয়স্ক সদস্যরা আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বেন না? কিছুটা বিরস কন্ঠে শাহীন বলেন, ‘না ভাই, তাদের কিছু হবে না, হলে তখন দেখা যাবে।’

এমন চাঁছাছোলা জবাব পেয়ে যে-কারোরই মনে হতে পারে সেই বিখ্যাত প্রবাদ ‘রোম যখন পুড়ছিল, নিরো তখন বাঁশি বাজাচ্ছিল’-এর কথা। এই প্রবাদের শ্রেষ্ঠত্ব যেন ফুটিয়ে তুলছেন শাহীন আর তার বন্ধুরা, এ কথা অবিশ্বাস করার আর জো রইল না। শুধু শাহীনদের এই আড্ডাই নয়, চোখ-কান খোলা রাখলে নগরীর প্রায় অলিগলিতে দেখা যাবে বেশিরভাগ তরুণরা রাতদিন খামখেয়ালিভাবে চলাফেরা করছে আর তাদের মাঝে চলছে উৎসব উদযাপনের মতো স্বাস্থ্যবিধি না মানার হিড়িক।

অভিভাবকরা বলছেন, করোনা সচেতনতা নিয়ে তরুণদের জন্য আলাদা কোনো আয়োজন নেই বলেই তারা বিষয়টি হালকাভাবে নিচ্ছেন। তরুণদের সামাজিক, পারিবারিক অনেক দায়িত্ব আছে, যা ভুলে গিয়ে সর্বনাশ ডেকে আনাটা কোনো মতেই সমীচীন হবে না, এ বিষয়টা তাদের বুঝা উচিত।

যুবকদের এই ‘ডেমকেয়ার ভাব’ কেন?

যুবকদের শরীরে বৃদ্ধদের চেয়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অধিকতর বেশি। তাই করোনাভাইরাস সহজে কাবু করতে পারে না। এমনকি যুবকরা আক্রান্ত হলেও মৃদু উপসর্গ বা একেবারে উপসর্গহীন থাকে। গুরুতর উপসর্গ থাকে না বলে করোনাকে হালকাভাবে নিচ্ছেন তারা। এজন্য প্রাণবিধ্বংসী করোনাভাইরাসকে থোড়াই কেয়ার করে দেদারছে মাঠ-ঘাট চষে বেড়াচ্ছে দেশের সিংহভাগ তরুণ।

এছাড়া বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় সময় কাটাতে পছন্দ করেন তরুণরা। হৈ-হুল্লোড় তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বলা যায়। আর এজন্যই তরুণরা বাইরে গিয়ে আক্রান্ত হয়ে বাড়ি ফিরে অন্যদের সংক্রমিত করে ফেলছে। যার ফলে পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিদের আক্রান্ত হয়ে গুরুতর পরিস্থিতিতে হাসপাতালে যেতে হচ্ছে। বেড়ে চলছে করোনায় তরুণদের আক্রান্তের সংখ্যা, বয়োজ্যেষ্ঠদের মৃত্যুহার।

যুবকদের ‘ডেমকেয়ার’ ভাবের পরিণতি

আইইডিসিয়ারের বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত বছর ৮ মার্চ করোনা সংক্রমণ শুরুর পর থেকে এ বছরের ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত আক্রান্তদের সবচেয়ে বেশি ৫৪ দশমিক ৭ শতাংশের বয়স ২১ থেকে ৪০ বছর। সংখ্যার হিসাবে তা ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৬৩৪ জন। অর্থাৎ প্রায় ৪ লাখই যুবক।

অন্যদিকে গত বছরের ১৮ আগস্ট এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ‘তরুণরাই নতুন করে বেশি করোনাভাইস ছড়াচ্ছে’ বলে সতর্কবার্তা দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তারা বলছে, বিশ্বে ২০, ৩০ ও ৪০ বছর বয়সীদের দ্বারা খুব সহজেই করোনাভাইরাস ছড়াচ্ছে। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই জানেন না যে, তারা সংক্রমিত। আর এভাবেই তারা বয়স্ক, অসুস্থ ও স্বাস্থ্য সেবার অপ্রতুলতায় ভোগা বাকি ব্যক্তিদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছেন।

কীভাবে যুবকদের ‘ডেমকেয়ার ভাব’ দূর করা যায়

এ বিষয়ে কথা হয় চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বির সঙ্গে। তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘যুবকদের কারণেই কিন্তু আমাদের বয়োজ্যেষ্ঠ জনগোষ্ঠীরা আক্রান্ত হচ্ছেন। এক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মানার কোনো বিকল্প নেই। আমরা বলছি যে, করোনা থেকে ৯৫ শতাংশ সুরক্ষা দেয় মাস্ক। কিন্তু এ বয়সের যুবকদের ভেতর এটা মানার কোনো বালাই নেই; এ ডেমকেয়ার ভাবের কারণে। তবে তারা অনেক সময় লক্ষণহীন থাকে তাদের ইমিউনিটি ভালো থাকার জন্য। কিন্তু তারা যখন বের হচ্ছেন, আর বাসায় আসতেছেন তখন তাদের পরিবারের যে বয়স্ক সদস্যরা আছে যাদের শুধু ইমিউনিটি কম না, তারা ক্রমাগত বিভিন্ন রোগে ভোগে, তারাই আক্রান্ত হচ্ছে। এবং তাদের চিকিৎসা নিতে যদি সামান্য বিলম্ব হলে হাসপাতালে এসে মারা যাচ্ছে।’

সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, ‘আমাদের যুব-জনগোষ্ঠীর কাছে আমাদের অনুরোধ এবং এটা তাদের আত্মীয়-স্বজন এবং পরিবারেরও দায়িত্ব বিনা প্রয়োজনে তরুণরা যেন ঘর থেকে বের না হয়। এবং বের হলে যেন অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে ও মাস্ক ব্যবহার করে। এবং একই মাস্ক প্রতিদিন ব্যবহার করলে হবে না, মাস্ক থুতনিতে লাগাই রাখলে হবে না, গলায় ঝুলিয়ে রাখলে হবে না। যথাযথভাবে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। শুরু থেকে যে কথাগুলো বলছি, এখনও সেই কথাই বলছি।’

একই প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক হাসান শাহরিয়ার কবির একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘জনপ্রতিনিধি যারা আছেন বা মহল্লায় যারা মুরব্বী আছেন অথবা সামাজিক সংগঠক আছেন- তাদেরকে আসলে আমরা সম্পৃক্ত করতে পারি নাই। তরুণরা কিন্তু চেপে দেওয়া কোনো জিনিস বিশ্বাস করবে না, এটা তারুণ্যের একটা ধর্ম। তারা মরে যাবে তারপরেও তাদের চাপিয়ে দিয়ে বিশ্বাস করানো যাবে না। এটা সংগঠন দিয়ে করানো যায়। সেজন্য মহল্লায় যে সমস্ত ক্লাব, সামাজিক সংগঠন আছে বা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে যারা আছেন তাদেরকে সম্পৃক্ত করতে হবে। ইতোপূর্বে তারাও কিন্তু কম এগিয়ে আসেনি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রথম দিকে এগিয়ে এসেছিলো। কিন্তু এবার আসে নাই, আগের মতো নেই সম্পৃক্ততা।’

তিনি আরও বলেন, ‘একই সাথে সরকারের যারা আছেন, স্বাস্থ্য-প্রশাসন, পুলিশ ও সিটি কর্পোরেশন-পৌরসভাকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তাছাড়া তরুণদের বোঝানোর আর কোনো উপায় নেই, যেহেতু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সব বন্ধ। অর্থাৎ আপনি কলেজ-মাদরাসায় এটা শিখাইতে পারবেন না। কারণ এসব তো বন্ধ দেড় বছর ধরে। শিখাইতে হবে যুবকরা যে পাড়ায় থাকে সেই পাড়ার ক্লাবে, সেই পাড়ার সংগঠনে, সে পাড়াতে পজেটিভ মাইন্ডের যারা দেশের জন্য কাজ করে তাদের সম্পৃক্ত করে শিখাইতে হবে।’

‘এক্ষেত্রে তরুণরা সমাজের বিভিন্ন বিষয়ে যাদেরকে অনুসরণ করে, সেটা রাজনৈতিক নেতা হতে পারে, সংগঠনভিত্তিক নেতা হতে পারে, মুরব্বী হতে পারে, বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনের প্রধান হতে পারে, মোটামুটি যাদেরকে তারা দেখে এবং আইকনিক ক্যারেক্টার হিসেবে মানে তাদেকে এগিয়ে আসতে হবে। তাহলে সুফল পাওয়া যাবে।’