শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

সিএমপির তালিকাভুক্ত ‘সন্ত্রাসীদের’ দলীয় পরিচয় কেন?

| প্রকাশিতঃ ২১ মে ২০২১ | ৯:৫৪ পূর্বাহ্ন


মোহাম্মদ রফিক : চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) চলতি বছর যে হালনাগাদ ‘সন্ত্রাসী তালিকা’ তৈরি করেছে, সেখানে কথিত সন্ত্রাসীদের দলীয় পরিচয় উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশের হিসাবে, নগরের ৩২৩ সন্ত্রাসীর মধ্যে ৪২ জন আওয়ামী লীগের, ৩৮ জন বিএনপির ও ১৩ জন জামায়াতের।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক দলের যে কোন পর্যায়ের কেউ যদি কোন ঘৃণ্য অপরাধ ও দুর্বৃত্তায়নে লিপ্ত থাকে তাদেরকে দল থেকে বহিষ্কার করা উচিত। সন্ত্রাসী যেই হোক তার কোনো দলীয় পরিচয় থাকতে পারে না। আর দলীয় হিসাব-নিকাশ করে পুলিশ সন্ত্রাসী তালিকা তৈরি করলে ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক অপরাধীরা ছাড় পেতে পারেন। আবার দমন-পীড়ন চালানোর জন্য বিএনপি-জামায়াতের লোকজনের নাম সন্ত্রাসী তালিকায় রাখা হয়েছে- এমন অভিযোগও উঠছে।

পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, অপহরণ, দস্যুতা তথা বেআইনি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে যারা সমাজে ত্রাস সৃষ্টি করে আসছে, মূলত সেসব অপরাধীদের সন্ত্রাসী হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পেশাদার সন্ত্রাসীদের সাথে রাজনৈতিক মামলার শিকার মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আবুল হাশেম বক্করসহ যুবদল-ছাত্রদলের একাধিক নেতাকর্মীকে নতুন তালিকায় ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে পুলিশ।

আবার বিএনপি ঘরানার একসময়ের সন্ত্রাসী, যারা দীর্ঘ ১৫ থেকে ২০ বছর যাবত অপরাধ কর্মকাণ্ড থেকে দূরে আছেন, তাদেরকেও নতুন তালিকায় সন্ত্রাসী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় বিস্ফোরকদ্রব্য আইনে দায়ের হওয়া দুই-একটি মামলার আসামিকেও সন্ত্রাসী হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

জানা গেছে, নগরের কোতোয়ালী থানার তালিকাভুক্ত মোট সন্ত্রাসী ৪৪ জন। এই তালিকার ৩২ নম্বরে আছে নগর বিএনপির সদস্যসচিব আবুল হাশেম বক্করের নাম। তার বিরুদ্ধে ১১টি মামলার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রায় সবগুলো মামলা বিস্ফোরক দ্রব্য, বিশেষ ক্ষমতা আইনের ধারায় দায়ের করা। সন্ত্রাসী তালিকায় তার নাম আসায় প্রতিবাদ জানিয়ে ইতিমধ্যে গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়েছে বিএনপি।

এ ব্যাপারে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আবুল হাশেম বক্কর পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ। ছাত্রদল-যুবদলের রাজনীতির মাধ্যমে তৃণমূল থেকে উঠে আসা বক্কর গণতান্ত্রিক আন্দোলনে রাজপথে সামনের সারিতে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। মনে হচ্ছে, সিএমপি সন্ত্রাসীদের কোনো তালিকা করেনি, বিএনপিসহ বিরোধী মত দমনের তালিকা করেছে।’

তিনি বলেন, ‘সরকার দলীয় সন্ত্রাসীরা চট্টগ্রামসহ দেশজুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। সরকারি দলের নেতাদের পৃষ্ঠপোষকতায় পাড়ায়-পাড়ায় তৈরি হয়েছে কিশোর গ্যাং কালচার। তাদের কারণে চট্টগ্রাম শহরসহ সারা দেশ আজ অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে।’

নগর বিএনপির সদস্যসচিব আবুল হাশেম বক্কর বলেন, ‘আমাকে তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী করেছে পুলিশ। বিষয়টি হাস্যকর। গেল সিটি করপোরেশন নির্বাচনের নামে প্রহসনের নির্বাচনে অনেক কাউন্সিলরকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস সৃষ্টির অভিযোগ আছে, তাদেরকে তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। সরকারি দলের অনেক বড় বড় গডফাদারদের বাদ দিয়ে সিএমপি তালিকা করেছে। অবিলম্বে এ তালিকা প্রত্যাহারের দাবি জানাই।”

এদিকে কাজির দেউরির বাসিন্দা ছুট্টু একসময় ছিলেন ছাত্রদল নেতা। ২০০৬ সালে করা সন্ত্রাসী তালিকায় তিনি ছিলেন শীর্ষ সন্ত্রাসী৷ নতুন তালিকায়ও তাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ১৯৯৫-৯৬ সালে কোতোয়ালী থানায় হওয়া ৮টি মামলার তথ্য নতুন তালিকায় তুলে ধরা হয়েছে।

ছুট্টুর প্রতিবেশী আমজাদ আলী বলেন, ‘ছুট্টু একসময় কাজির দেউরি এলাকার ত্রাস ছিল। কিন্তু তিনি এখন কোন ধরনের অপরাধে জড়িত নেই। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন। ২২-২৪ বছর আগে করা মামলার সূত্র ধরে তাকেও হালনাগাদ সন্ত্রাসী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।’

কোতোয়ালী থানার করা সন্ত্রাসী তালিকায় অর্ন্তভুক্ত করা হয়েছে এনায়েত বাজার ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আবদুল মালেকের এক ছেলে সোনা মানিককে (৩২)। তার বিরুদ্ধে আছে ৮ মামলা। সবগুলো মামলার এজাহারে নাশকতার অভিযোগ প্রায় অভিন্ন।

সোনা মানিক বলেন, ‘আমি সব মামলায় জামিনে আছি। আমি কোন পেশাদার সন্ত্রাসী নই। রাজনৈতিক কারণে আমাকে বিস্ফোরকদ্রব্য আইনের মামলায় জড়ানো হয়েছে।’

স্থানীয় বাসিন্দা আলতাফ হোসেন বলেন, ‘সোনা মানিকের বাবা মহানগর বিএনপির রাজনীতিতে জড়িত। তিনি এনায়েত বাজার ওয়াডের সাবেক কাউন্সিলর। তার ছেলে সোনা মানিকও নগর ছাত্রদলের নেতা। মানিক পেশাদার অপরাধী নয়। তবু তাকে সন্ত্রাসী হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।’

ইপিজেড থানার আলী শাহ মাজার নতুন বাড়ির বাসিন্দা আবদুল করিম বক্সের ছেলে হাসান মুরাদকে (৪০) নতুন সন্ত্রাসী তালিকায় বিএনপি নেতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি ইপিজেড থানায় ২০১৩ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে দায়ের হওয়া চারটি মামলার আসামি।

স্থানীয় বাসিন্দা চন্দন রায় জানান, ‘বিএনপির রাজনীতি করলেও কোন অপরাধে জড়িত নেই হাসান।’

ইপিজেড থানার তালিকায় আছেন আবুল বশর নামের একজন। তার বিরুদ্ধে ২০১৫ সালে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে একটি মামলা হয়। হাসান মুরাদ ও আবুল বশর পেশাদার অপরাধী না হলেও তাদের সন্ত্রাসী হিসেবে পুলিশ তালিকাভুক্ত করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

কোতোয়ালী থানার সন্ত্রাসী তালিকায় আছেন মো. জসিম উদ্দিন ওরফে বোমা জসিম। তার বাবার নাম মৃত হায়দার আলী। তার বিরুদ্ধে ২০০০ সালে কোতোয়ালী থানায় বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে একটি মামলা হয়।

একইভাবে কোতেয়ালী থানার একটি মামলার আসামি হয়ে সন্ত্রাসী তালিকায় আছেন আসকার দিঘির পাড়ের মৃত জান মোহাম্মদ খানের ছেলে মো. হাবীব ওরফে রাশেদ (৪২)। তার বিরুদ্ধে আছে ২০০০ সালে কোতোয়ালী থানায় দায়ের করা জননিরাপত্তা (বিশেষ বিধান) এর মামলা।

কোতোয়ালী থানার তালিকার ২২ নম্বরে আছেন কাজির দেউরি এলাকার শফিকুর রহমানের ছেলে হাবীব (৩৬)। তার বিরুদ্ধে আছে দুটি মামলা। একটি ২০০৪ সালে, আরেকটি ২০১৭ সালের ১৭ জুন দায়ের করা। মামলা দুটি এখন বিচারাধীন।

কোতোয়ালী থানায় দায়ের হওয়া একটি মাত্র মামলার আসামি হয়ে সন্ত্রাসী তালিকায় স্থাপন পেয়েছেন নগরের সিআরবি এলাকার আবুল কাশেমের ছেলে মো. শিমুল।

২০১৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর চকবাজার থানায় দায়ের হওয়া এক মামলার আসামি হয়ে সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত হয়েছেন জামাল খান মোমিন রোডের কামাল সওদাগর বাড়ির মৃত ফরিদ আহমদের ছেলে ইকবাল মুন্না (৩০)।

২০১৫ সালের ২৩ জানুয়ারি চকবাজার থানায় বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলার আসামি হয়ে সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত হয়েছেন দুই নম্বর জয়নগর এলাকার মৃত আবদুস ছামাদের ছেলে সালাউদ্দিন লাভু (৪০)।

বায়েজিদ বোস্তামী থানায় ২০১০ সালে দায়ের হওয়া একটি মামলার আসামি হয়ে সন্ত্রাসী তালিকায় ঠাঁই হয়েছে হাজিপাড়ার মৃত শফির ছেলে মিজান (৩০) ও একই এলাকার মো. জাহাঙ্গীরের ছেলে রনির। এই দুজন এখন পলাতক আছেন।

একটি মামলার আসামি হয়ে সন্ত্রাসী তালিকায় স্থান হয়েছে হালিশহর মাইজপাড়ার আবদুল কাদের ও হালিশহর আই ব্লকের জাকির হোসেনের ছেলে ফয়সাল মাহমুদের (২৯)।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিএমপির একজন কর্মকর্তা একুশে পত্রিকাকে জানান, সন্ত্রাসীদের নতুন তালিকা তৈরি করার সময় ক্ষমতাসীন দলের অনেক প্রভাবশালী মন্ত্রী, এমপি প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছেন। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সদিচ্ছা থাকায় শেষ পর্যন্ত সন্ত্রাসীদের তালিকা হালনাগাদ করা সম্ভব হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, শুরুর দিকে থাকলেও অদৃশ্য ইশারায় তালিকা থেকে শেষ মুহূর্তে এসে বাদ পড়েছেন সিআরবির জোড়া খুনের আসামি হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর, পাঠানটুলি ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আবদুল কাদের, চান্দগাঁওয়ের কাউন্সিলর এসরারুল হক এসরাল, লালখানবাজারের আওয়ামী লীগ নেতা দিদারুল আলম মাসুম, লালখানবাজারের বর্তমান কাউন্সিলর আবুল হাসনাত বেলাল, সিআরবির জোড়া খুনের আসামি সাইফুল আলম লিমন ও চকবাজারের নুরুল মোস্তফা টিনুসহ বেশ কয়েজনের নাম।

এ ব্যাপারে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সম্পাদক আইনজীবী আখতার কবীর চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ সন্ত্রাসীদের একটি তালিকা তৈরি করেছে বলে জেনেছি। আইনশৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতীতেও তালিকা করেছিল পুলিশ। কিন্তু পুরনো তালিকায় যেসব শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম ছিল, নতুন তালিকায় তাদের নাম আসেনি।’

তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিকভাবে ভিন্নমত পোষণ করেন এমন ব্যক্তিদের নতুন তালিকায় সন্ত্রাসী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তালিকা যদি হয় দলীয় বিবেচনায়। তাহলে সেটি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সাথে হয়নি। নাগরিকদের প্রত্যাশা দলীয় বিবেচনায় নয়, সত্যিকার সন্ত্রাসীদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হোক। আর অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় যেন পুলিশ আমলে না নেয়। অপরাধীদের দলীয় পরিচয় থাকতে পারে না। তবেই পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে। কারণ রাষ্ট্রযন্ত্র ও পুলিশ প্রশাসন এক নয়।’

হালনাগাদ সন্ত্রাসী তালিকার বিষয়ে একুশে পত্রিকার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে বক্তব্য দিতে রাজি হননি চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর। এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলতে রাজি হননি সিএমপির অন্য কর্মকর্তারাও।