
ঢাকা : করোনা মহামারিতে দেশ যখন বিপর্যস্ত তখন আসছে ঘূর্ণিঝড় ‘ইয়াস’। আগামী বুধবার নাগাদ উপকূলে আঘাত হানতে পারে ঘূর্ণিঝড়টি। ইয়াস ঠিক কোন এলাকায় আঘাত হানবে, গতি-প্রকৃতি কী হবে সেটা এখনও নির্ণয় করতে পারেনি আবহাওয়া অফিস। তবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় যে আঘাত হানবে সেটা প্রায় নিশ্চিত।
ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস পেয়ে উপকূলীয় জেলাগুলোতে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ। জানমালের ক্ষয়ক্ষতি ঠেকাতে সরকারের প্রস্তুতিও চলছে পুরোদমে। উপকূলীয় জেলাগুলোতে ইতিমধ্যে জারি করা হয়েছে সতর্কতা। প্রস্তুত রাখা হয়েছে আশ্রয়কেন্দ্র।
এদিকে নতুন ঘূর্ণিঝড়ের কথা শুনে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন সিডর, আইলা, আম্পানে ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় এলাকার মানুষ। প্রায় আট মাস পর সাগরের নোনা পানিমুক্ত হয় কয়রা উপজেলা। আম্পানের ক্ষত এখনো শুকায়নি। এখনো সংস্কার হয়নি ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধও। মাঝেমধ্যে নদীতে সামান্য জোয়ারের পানি বাড়লেই অনেক এলাকার বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়। এমন পরিস্থিতির মধ্যে নতুন করে আবার ঘূর্ণিঝড় আসছে শুনে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন উপকূলীয় এলাকার মানুষ। তাঁরা বলছেন, আম্পানের পর কেবল কিছুটা গুছিয়ে উঠছিলেন। এরই মধ্যে আবার বড় কোনো ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানলে তাঁদের একেবারে নিঃস্ব করে দেবে।
গত বছরের ২০ মে আঘাত হানা আম্পানে কয়রা উপজেলার বেড়িবাঁধের মারাত্মক ক্ষতি হয়। জেলার ৯টি উপজেলায় সাড়ে ৮৩ হাজারের মতো ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে শুধু কয়রা উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ির সংখ্যা ছিল ৫১ হাজার। সুন্দরবনসংলগ্ন ওই উপজেলার ১৫৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই ঝুঁকিপূর্ণ।
কয়রা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইমতিয়াজ উদ্দিন বলেন, বাঁধের যেসব জায়গায় আম্পানে ভেঙে গিয়েছিল, সেসব বাঁধের সংস্কারকাজ এখনো শেষ হয়নি। এখন যদি আম্পানের অর্ধেকের সমান জোয়ারের পানি ওঠে, তাহলে আম্পানের চেয়ে বড় কোনো দুর্যোগে পড়বে মানুষ। অনেকেই নিজেদের গুছিয়ে নিতে কাজ করছিলেন, ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের কথা শুনে এখন সবাই কাজ বন্ধ রেখেছেন।
গত শনিবার উত্তর আন্দামান সাগর এবং আশেপাশের এলাকায় একটি লঘুচাপ তৈরি হয়। এটি ইতিমধ্যে নিম্নচাপে পরিণত হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিলে এর নাম হবে ‘ইয়াস’। নামটি দিয়েছে ওমান। আরবি ভাষায় ইয়াস অর্থ হতাশা।
পশ্চিমবঙ্গের আলিপুর আবহাওয়া দপ্তরের বার্তায় রবিবার বলা হয়েছে, বুধবার সন্ধ্যা নাগাদ পারাদ্বীপ এবং সাগর দ্বীপের মাঝে কোনো এলাকায় আছড়ে পড়বে ইয়াস। মঙ্গলবার অতি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হবে এটি। ৬০ থেকে ৭০ কিলোমিটার বেগে হাওয়া বইতে পারে। ঝোড়ো হাওয়ার গতিবেগ বেড়ে ৮০ কিলোমিটার পর্যন্তও হতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ইতিমধ্যে এক নম্বর দূরবর্তী সতর্ক সংকেত দেখাতে বলেছে। পর্যায়ক্রমে সতর্ক সংকেত বাড়ানো হবে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা।
রবিবার সন্ধ্যায় আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ একেএম রুহুল কুদ্দুস জানিয়েছেন, ঘূর্ণিঝড়টি পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িষ্যা ও বিহার উপকূলীয় এলাকায় আছড়ে পড়তে পারে। বাংলাদেশের খুলনা উপকূলেও আঘাত হানার সম্ভাবনা রয়েছে।
আবহাওয়াবিদ বলেন, ‘ইয়াস’ টানা ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা তাণ্ডব চালাতে পারে। এ সময় বাতাসের গতি ঘণ্টায় গড়ে ১৮০ থেকে ২০০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে।
ঘূর্ণিঝড় বিষয়ে সর্বশেষ বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, পূর্ব-মধ্য বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত সুস্পষ্ট লঘুচাপটি ঘনীভূত হয়ে একই এলাকায় নিম্নচাপে পরিণত হয়েছে। এটি আরও ঘনীভূত হয়ে গভীর নিম্নচাপ এবং পরবর্তীতে ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়ে উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর হতে পারে।
এদিকে সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়টি মোকাবেলায় সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। ইতিমধ্যে ত্রাণ ও পুনর্বাসন প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান জানিয়েছেন, করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় এবার তিন গুণ আশ্রয় কেন্দ্রের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। প্রাণহানি যেন শূন্যের কোটায় থাকে সেই চেষ্টা তারা করবেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও রবিবার ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন।