শনিবার, ১৯ জুন ২০২১, ৫ আষাঢ় ১৪২৮

সাংসদ মিতাকে দুদকের ‘দায়মুক্তি’!

প্রকাশিতঃ রবিবার, মে ৩০, ২০২১, ১:০৪ অপরাহ্ণ


শরীফুল রুকন : ১০ থেকে ২০ শতাংশ ঘুষ নিয়ে ঠিকাদার নিয়োগ, চাঁদাবাজি, স্বজনপ্রীতিসহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠে চট্টগ্রাম-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহফুজুর রহমান মিতার বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য গত বছরের ৬ অক্টোবর সিদ্ধান্ত নেয় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মিতার বিরুদ্ধে ওঠা অসংখ্য অভিযোগ খতিয়ে দেখতে সবমিলিয়ে মাত্র ৪ মাস ২৭ দিন সময় নিয়েছে সংস্থাটি। এরপর চলতি বছরের ২ মার্চ সমস্ত অভিযোগের দায় থেকে সাংসদ মাহফুজুর রহমান মিতাকে অব্যাহতি দিয়েছে দুদক।

শুধু সাংসদ মিতা নয়, দুদকের সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের অবসরে যাওয়ার আগ মুহূর্তে দুর্নীতির অভিযোগ থেকে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের সাবেক কমিশনার এ কে এম নুরুজ্জামান, কাস্টম হাউজের সাবেক যুগ্ম কমিশনার ফিরোজ উদ্দিন আহমেদ, চট্টগ্রাম মহানগর উত্তর জোনের সাবেক আনসার অধিনায়ক আম্মার হোসেন, আনসারের উপমহাপরিচালক নির্মলেন্দু বিশ্বাস, চট্টগ্রামের সাবেক বন সংরক্ষক মো. জগলুল হোসেন, চট্টগ্রাম অঞ্চলের সাবেক বন রক্ষক মো. আব্দুল লতিফ মিয়া ও চট্টগ্রামের সাবেক জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক এবং অতিরিক্ত দায়িত্ব চলাচল ও সংরক্ষণ মো. জহিরুল ইসলামকেও ‘দায়মুক্তি’ দেওয়া হয়েছে।

ইকবাল মাহমুদের বিদায়বেলায় দুদক থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন
চট্টগ্রামের সাংসদ, বন্দর, কাস্টম, বন, খাদ্য ও আনসার কর্মকর্তাসহ অনেকেই…

এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরের প্রধান প্রকৌশলী মাহমুদুল হোসেন খান, হালিশহর খাদ্য গুদামের ব্যবস্থাপক আনোয়ার হোসেন, পাহাড়তলীর কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান, চট্টগ্রামের এলএ শাখার সার্ভেয়ার জেনন চাকমা ও মিরসরাই ভূমি অফিসের জারিকারক আলী আকবরসহ অনেকেই ইকবাল মাহমুদের অবসরে যাওয়ার আগ মুহূর্তে দুর্নীতির অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন।

দুদক সূত্র জানায়, সন্দ্বীপের সংসদ সদস্য মাহফুজুর রহমান মিতার বিরুদ্ধে অভিযোগটি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে কঠোর গোপনীয়তা অবলম্বন করে কমিশন। চলতি বছর অভিযোগ নিষ্পত্তির বিষয়টি অনুমোদন করার পর ২ মার্চ দুদক সচিব ড. মু. আনোয়ার হোসেন হাওলাদার অব্যাহতির বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের কাছে চিঠি দিয়ে জানান। এরপর বিষয়টি মাহফুজুর রহমান মিতাকে চিঠি দিয়ে জানানোর পাশাপাশি মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সিনিয়র সচিবকে অনুলিপি দিয়ে জানানো হয়।

অভিযোগ আছে, গত ৯ মার্চ অবসরে যাওয়া দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের আগ্রহে তড়িগড়ি করে মিতার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শেষ করা হয়েছে। সাধারণত কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে এত দ্রুত দুদকের অনুসন্ধান শেষ করার নজির খুবই কম। এর আগে ক্যাসিনো কেলেঙ্কারিসহ নানা ঘটনায় চট্টগ্রামের পটিয়ার সাংসদ সামশুল হক চৌধুরীসহ সাবেক-বর্তমান মিলিয়ে অন্তত ২১ জন সংসদ সদস্যের দুর্নীতির খোঁজে নামে দুদক। কিন্তু তার কোনোটির কাজ শেষ হওয়ার খবর এখনও আসেনি।

মাত্র ৫ মাসেরও কম সময়ের মধ্যে দুদকের অনুসন্ধানের অনুমোদন থেকে শুরু করে অব্যাহতি প্রদান পর্যন্ত সব ধরনের কাজ সম্পন্ন হওয়া নিয়ে যে প্রশ্ন উঠছে, সে বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় সংসদ সদস্য মাহফুজুর রহমান মিতার কাছে; তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। দুদক বলতে পারবে।’ দুদকে জমা পড়া অভিযোগের বিষয়ে কিছু বলতে চান কি না জানতে চাইলে সাংসদ মিতা বলেন, ‘এসব দুদক জানবে।’

এদিকে দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্ত অনুবিভাগের একজন কর্মকর্তা একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘অভিযোগ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে কমিশন কিছু বিষয়গুলো বিবেচনা নিয়ে থাকে। অভিযোগটি কমিশনের তফসিলভূক্ত অপরাধ কি না, অভিযোগটি সুনির্দিষ্ট ও তথ্যভিত্তিক কি না, অভিযুক্ত ব্যক্তির অভিযোগের সাথে সংশ্লিষ্টতা, অভিযোগের গুরুত্ব ও মাত্রা, অভিযোগের আর্থিক সংশ্লেষের পরিমাণ ও অভিযোগটি আদালতে প্রমাণযোগ্য কি না- এসব বিবেচনা করে কমিশন অনুসন্ধানের অনুমোদন দেয়।’ সাংসদ মিতার ব্যাপারে যে অভিযোগগুলো এসেছে তা অনুসন্ধানের আগে উপরোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনায় নেয়া হয়েছিল বলে জানান তিনি।

দুদক সূত্র জানায়, সাংসদ মিতার বিরুদ্ধে দুদকে আসা অভিযোগের মধ্যে রয়েছে- পূর্বাচলে নিজের মালিকানাধীন রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের নামে ৫০ কাঠা জমি, নিজ নামে পূর্বাচলে আরও ৫ কাঠার জমি, গুলশান-২ রাজউকে একটি ফ্ল্যাট, চট্টগ্রাম হাউজিং সোসাইটি ও ঢাকার মিরপুর হাউজিংয়ে ফ্ল্যাট, নোয়াখালী ও খুলনাতে প্লটের মালিক। অবৈধভাবে অর্জিত বিপুল পরিমাণ অর্থ সাংসদ মিতা তার পিএস জসিম, অফিস কর্মকর্তা মাকসুদ ও ওমর ফারুকের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ায় পাচার করেছেন-এমনও অভিযোগ উঠে এসেছে।

দুদকে জমা পড়া অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, পানি উন্নয়ন বোর্ডের ১৯৭ কোটি টাকার বেড়িবাঁধ নির্মাণ কাজে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স আনোয়ার ল্যান্ডমার্ক, মেসার্স বিশ্বাস বিল্ডার্স ও মেসার্স ডলি কনস্ট্রাকশনের কাছ থেকে ১০ শতাংশ কমিশন আদায় করেছেন এমপি মিতা। শুধু তাই নয়, ঠিকাদারগণ কাজ শুরু করলে সেখানে অনৈতিক হস্তক্ষেপ করে নিজের লোক দিয়ে নি¤œমানের নির্মাণসামগ্রী সরবরাহ করেন তিনি। আর এই কাজ করান তার আস্থাভাজন ছিদ্দিক, সমির মেম্বার, আলাউদ্দিন (প্রবাসী), কালাপানিয়ার টিটুকে দিয়ে। ফলে একদিকে কাজ শেষ হতে না হতে ভেঙে পড়েছে অন্যদিক।

অভিযোগ উঠেছে, সন্দ্বীপে সড়ক ও জনপদ বিভাগের বাস্তবায়নাধীন দেলোয়ার খাঁ সড়ক নির্মাণের ৭২ কোটি টাকার টেন্ডারে (টেন্ডার নম্বর- ২১৯৬৫৪) অনিয়ম করেছেন মিতা। এই রাস্তার টেন্ডারে অংশ নেন তিনজন ঠিকাদার। জানা যায়, আওয়ামী লীগ নেতা ও জেলা পরিষদ সদস্য আফতাব খান অমির প্রতিষ্ঠান ‘র‌্যাভ-আরসি’ সর্বনিম্ন দর আহ্বান করলেও সেই প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ না দিয়ে তৃতীয় সর্বোচ্চ দরদাতা জামায়াত নেতা জাহেদুর রহমান জিলামকে সাড়ে চার কোটি টাকা বেশি দরে কাজ পাইয়ে দিয়েছেন মিতা।

এই রাস্তার টেন্ডার নিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতির পর নির্মাণ কাজেও চলছে ব্যাপক অনিয়ম। রাস্তা নির্মাণে জমি অধিগ্রহণের বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ করার লক্ষ্যে কোনো ধরনের ক্ষতিপূরণ না দিয়ে জোরপূর্বক ভেঙে ফেলা হয়েছে সন্দ্বীপের বিভিন্ন বাজারের শত শত দোকান, ভবন। ক্ষতিগ্রস্ত দোকান ও বিল্ডিং মালিকেরা যখনই ভাঙার কাজে আপত্তি তুলেছেন তখনই নিজস্ব বাহিনী দিয়ে এবং পুলিশের ভয় দেখিয়ে তাদের নাজেহাল করেছেন সাংসদ মিতা।

বিআইডব্লিউটিএ’র গুপ্তছড়া জেটি নির্মাণ দুর্নীতিতেও মাহফুজুর রহমান মিতার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ পাওয়া গেছে। সন্দ্বীপের গুপ্তছড়া ঘাটে ৫২ কোটি ৬৪ লাখ টাকা দিয়ে নতুন একটি জেটি নির্মাণের পরিকল্পনা নেয় সরকার। এই জেটি নির্মাণের কাজটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স এস এস রহমানকে দেওয়ার জন্য ডিও দেন সাংসদ মিতা। অভিযোগ আছে, সাংসদ ১০ শতাংশ কমিশনের বিনিময়ে উক্ত ঠিকাদারকে কাজটি পাইয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করেন।

সরকারের সিদ্ধান্ত মোতাবেক, সকল উপজেলা সদরে একটি করে মডেল মসজিদ নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় সন্দ্বীপেও একটি মডেল মসজিদ নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ঠিকাদারদের অভিযোগ, প্রকল্পের ১৪ কোটি টাকার টেন্ডারে (টেন্ডার নম্বর- ২৭৩৮২১) কোনও ঠিকাদারকে অংশ নিতে না দিয়ে সাংসদ মিতার প্রিয়ভাজন জামায়াত নেতা জাহেদুর রহমান জিলামকে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, উপজেলা সদরে মডেল মসজিদটি নির্মাণ করার কথা থাকলেও সেখানে না করে সদর থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে বাউরিয়া ইউনিয়নে নিজের বাড়ির কাছে মসজিদটি নির্মাণ শুরু করেন তিনি। অভিযোগ আছে, মডেল মসজিদ নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণ না করে জমি দখল করা হয়েছে জালিয়াতির মাধ্যমে। আমেরিকান প্রবাসী আব্দুল মোতালিবের স্বাক্ষর নকল করে জাল দলিল তৈরির মাধ্যমে দখল করা হয়েছে মসজিদ নির্মাণের জমি।

অভিযোগ আছে, ২০১৮ সালের সন্দ্বীপের পিআইও অফিস থেকে টেন্ডার হওয়া ২৭টি ব্রিজের কাজ এমপি মিতা তার নিজস্ব লোকজনের মধ্যে ১৫ শতাংশ টাকা কমিশনের বিনিময়ে ভাগ-বাটোয়ারা করার চেষ্টা করেন। এসময় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স খাদিজা এন্টারপ্রাইজ কাজগুলো করার জন্য ৫ শতাংশ কম দরে টেন্ডার দিলে জীবননাশের হুমকি দিয়ে মিতা সেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিককে সন্দ্বীপ ছাড়া করেন।

টেন্ডার ও কমিশন বাণিজ্যের হাত থেকে রক্ষা পায়নি সন্দ্বীপের শিক্ষা খাতও। অভিযোগ পাওয়া গেছে, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের কাজের টেন্ডারে কোনো ঠিকাদার সাংসদ মিতার অনুমতি ছাড়া অংশ নিতে পারেননি। নির্দিষ্ট পরিমাণ কমিশন দেয়ার বিনিময়ে এই অধিদপ্তরের সকল টেন্ডারে এমপি মনোনিত একজন করে ঠিকাদার অংশ নেন। কমিশন নিয়ে কাজ পাইয়ে দেওয়ার ওয়াদা দিয়ে তা রক্ষা করেন মিতা। ফলে সেই কাজও পায় মিতার আশীর্বাদপুষ্ট ঠিকাদার।

অভিযোগ রয়েছে, মুস্তাফিজুর রহমান ডিগ্রি কলেজ ভবন নির্মাণের ৩ কোটি টাকার দুটি কাজ, মুস্তাফিজুর উচ্চ বিদ্যালয় ভবন নির্মাণের ৩ কোটি ৫ লক্ষ টাকার কাজ (টেন্ডার নম্বর- ২৩১৩৭৯) এবং কালাপনিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ভবন নির্মাণের (টেন্ডার নম্বর- ২৫৯২৫৮) ৪ কোটি ১৩ লক্ষ টাকার কাজ মোটা অংকের কমিশনের বিনিময়ে একক টেন্ডারের মাধ্যমে সমীর মেম্বারকে পাইয়ে দিয়েছেন সাংসদ মিতা। এছাড়া গাছুয়া আদর্শ বালিকা বিদ্যালয়ে ভবন নির্মাণের (টেন্ডার নম্বর ৩৩৮৪৯৬) ৮৫ লক্ষ টাকার কাজ ১০ লক্ষ টাকার বিনিময়ে মামুনকে, বাউরিয়া জি কে একাডেমি স্কুলের ভবন নির্মান ৩ কোটি ৫ লক্ষ টাকার কাজ ৩০ লক্ষ টাকা কমিশন নিয়ে নাদিমকে পাইয়ে দেয়ার বিষয়টিও স্থানীয়দের মুখে মুখে।

একই সাথে ৪ কোটি ১৩ লক্ষ টাকার তিনটি কাজ (কাঠগড় জি এন উচ্চ বিদ্যালয়ে ভবন নির্মাণ, সন্দ্বীপ মডেল হাই স্কুল ভবন নির্মাণ এবং মাইটভাঙা উচ্চ বিদ্যালয় ভবন নির্মাণ) যথাক্রমে চেয়ারম্যান টিটু, ‘লুঙ্গি শামিম’ এবং আলাউদ্দিনকে পাইয়ে দেয়ার অভিযোগও রয়েছে মিতার বিরুদ্ধে। এসব কাজের টেন্ডারে অন্য কোনো ঠিকাদারকে অংশগ্রহণ করতে না দেওয়া ছাড়াও সন্দ্বীপে সকল উন্নয়ন প্রকল্পের কাজে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কমিশন সাংসদ মিতাকে দিতে হয় বলেও অভিযোগ করে জানান এই অধিদপ্তরের নিবন্ধিত কয়েকজন ঠিকাদার।

এভাবে এমপি মিতার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, চাঁদাবাজি, ভূমিদস্যুতা, ১০ থেকে ২০ শতাংশ হারে ঘুষ নিয়ে ঠিকাদার নিয়োগ, অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের বিস্তর অভিযোগ জমা পড়ে দুদকে। এ প্রেক্ষিতে গত বছরের ৬ অক্টোবর মিতার বিরুদ্ধে অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য সংস্থার প্রধান কার্যালয়ের (বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত-১) সহকারী পরিচালক মো. শফি উল্লাহকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর ৮ অক্টোবর মিতাকে চিঠি দিয়ে দুদক কর্মকর্তা শফি উল্লাহ ৩ নভেম্বর সংশ্লিষ্ট নথিপত্র তলব করেন। এসব কাগজপত্র বিবেচনায় নিয়ে অভিযোগ নথিভুক্তির মাধ্যমে নিষ্পত্তি করে সাংসদ মিতাকে অব্যাহতি দিতে সুপারিশ করেন দুদকের সহকারী পরিচালক মো. শফি উল্লাহ। অবশেষে অভিযোগ নিষ্পত্তির মাধ্যমে সাংসদ মিতাকে অব্যাহতি দেয়ার বিষয়টি অনুমোদন করার পর ২ মার্চ সংশ্লিষ্টদের জানিয়ে দেয়া হয়।

এর আগে দুদকের তদন্ত শুরুর পর সমস্ত অভিযোগ মিথ্যা দাবি করে সাংসদ মাহফুজুর রহমান মিতা একুশে পত্রিকাকে বলেছিলেন, ‘আমি একজন জনপ্রতিনিধি, সন্দ্বীপের উন্নয়ন করাই আমার কাজ এবং সেই কাজই আমি করছি। একাদশ জাতীয় নির্বাচনের সময়ও এই গ্রুপটি আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার করেছিল এবং তারাই এখন আমার বিরুদ্ধে আবার অপপ্রচার চালাচ্ছে। সামনে পৌরসভা ও ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তারা পুণরায় অভিযোগগুলো করছে। এই অভিযোগগুলো যারা করেছে এগুলো প্রমাণ করার দায়িত্ব তাদের। আর আপনারা যাদের কাছ থেকে আমার বিরুদ্ধে এই অভিযোগগুলো পেয়েছেন তারা দুদকের কাছেও এই অভিযোগ করেছে।’

শুধু মিতা নয়, চলতি বছরের ১০ মার্চ দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের বিদায় নেয়ার আগে গত পাঁচ মাসে দুই শতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে দুর্নীতির অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয় বলে অভিযোগ উঠে। ৯ মার্চ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ থেকে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের সাবেক কমিশনার এ কে এম নুরুজ্জামানকে অব্যাহতি দেয় দুদক; তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালে।

গত ৩ জানুয়ারি চট্টগ্রাম বন্দরের প্রধান প্রকৌশলী মাহমুদুল হোসেন খানকে দুর্নীতির দায় থেকে অব্যাহতি দেয় দুদক। তার বিরুদ্ধে অতিরিক্ত মূল্যের প্রাক্কলন দেখিয়ে বিনা টেন্ডারে সমঝোতার ভিত্তিতে কার্যাদেশ দিয়ে প্রায় ১০০ কোটি টাকা ক্ষতিসাধনের অভিযোগ ছিল। এ অভিযোগটির অনুসন্ধান শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালে।

এদিকে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আমদানি করা ৩ হাজার ৩৫৩ মেট্রিক টন গম আত্মসাতের অভিযোগ থেকে গত ৯ জানুয়ারি চট্টগ্রামের সাবেক জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক এবং অতিরিক্ত দায়িত্ব চলাচল ও সংরক্ষণ মো. জহিরুল ইসলামকে অব্যাহতি দেয় দুদক; যদিও গম চুরির ঘটনার চার বছর পর ২০১৮ সালের ৭ অক্টোবর একই অভিযোগে তাকে বরখাস্ত করে খাদ্য অধিদপ্তর।

অন্যদিকে গত ৮ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের সাবেক বন সংরক্ষক মো. জগলুল হোসেনকে দুর্নীতির বিভিন্ন অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয় দুদক। দুদক সচিব ড. মু. আনোয়ার হোসেন হাওলাদার স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত এক চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘জগলুল হোসেনের বিরুদ্ধে বদলি ও নিয়োগ সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ নিয়ে বিভিন্ন বিভাগে ও রেঞ্জে বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ অনুসন্ধানে প্রমাণিত না হওয়ায় কমিশন কর্তৃক তা পরিসমাপ্ত করা হয়েছে।’

এছাড়া ২৫ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতির অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয় চট্টগ্রাম অঞ্চলের সাবেক বন রক্ষক মো. আব্দুল লতিফ মিয়াকে; তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু হয়েছিল ২০১৭ সালে। চার বছর পর তাকে অব্যাহতি দেয়া সংক্রান্ত চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘আব্দুল লতিফ মিয়ার বিরুদ্ধে বনবিভাগের জমিতে শিল্পপতিদের শিল্প কারখানা করে দেয়ার সুযোগ করে দেয়াসহ অবৈধভাবে আমেরিকায় বাড়ি ক্রয়, উত্তরা ও মিরপুরে বাড়ি নির্মাণসহ অন্যান্য সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধানে প্রমাণিত না হওয়ায় কমিশন কর্তৃক তা পরিসমাপ্ত করা হয়েছে।’

এদিকে দুর্নীতি দমন কমিশনের সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ অবসরে যাওয়ার আগের পাঁচ মাসে দুদকের অনুসন্ধান থেকে কতজনকে ‘দায়মুক্তি’ দিয়েছেন, তা গত ১৬ মার্চ জানতে চেয়েছিল হাই কোর্ট। দুদকে ‘অনুসন্ধান বাণিজ্য’- শিরোনামে গত ১৪ মার্চ দৈনিক ইনকিলাবে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন নজরে আসার পর স্বপ্রণোদিত হয়ে এ আদেশ দেয় বিচারপতি নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি মহি উদ্দিন শামীমের ভার্চুয়াল হাই কোর্ট বেঞ্চ।
‘দুদকে ‘অনুসন্ধান বাণিজ্য’ শিরোনমের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “বিদায়ের আগে ‘দুর্নীতির বহু রাঘব বোয়ালকে’ ছেড়ে দেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাবেক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ। তাদের দায়মুক্তি আড়াল করতে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন কিছু নিরীহ ও দুর্বল ব্যক্তিকে। সব মিলিয়ে শেষ ৫ মাসে তিনি ২ শতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে দুর্নীতির অভিযোগ থেকে অব্যাহতি (দায়মুক্তি) দেন। তথ্য নির্ভরযোগ্য সূত্রের।”

সূত্রটি জানায়, ইকবাল মাহমুদ বিদায় নেয়ার আগে স্বীয় কৃতকর্মের অনেক দালিলিক প্রমাণই যথাসম্ভব ‘নিশ্চিহ্ন’ করে যান। এর পরও এ প্রতিবেদকের হস্তগত হয় বেশকিছু নথি। সে অনুযায়ী, ২০২০ সালের ১ অক্টোবর থেকে ২০২০ সালের ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত দুই শতাধিক দুর্নীতির অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেন।

সূত্রমতে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগগুলো সত্যিকারার্থে অনুসন্ধান হয়নি। হয়েছে অনুসন্ধান-বাণিজ্য। কথিত ‘নথিভুক্তি’ কিংবা ‘অনুসন্ধান পরিসমাপ্তি’র নেপথ্যে রয়েছে কোটি কোটি টাকার লেনদেন।

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক-টিআইবি) চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে মামলা হয় না কারণ হয়ত তদন্তে শেষ পর্যন্ত কিছু পাওয়া যায় না। কিন্তু সাধারণ মানুষ সেটা বিশ্বাস করে না। তারা মনে করে এই তদন্ত লোক দেখানো। সাধারণ মানুষের ক্ষোভ প্রশমিত করার একটা উপায়। আর আমি মনে করি দুদক গভীর তদন্ত করে না নানা কারণে। আর গভীর তদন্ত না হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয় না। দুদক একটা সীমার মধ্যে কাজ করে। সেটার বাইরে যাওয়া হয়তো তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না।’

দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান বলেছিলেন, সংস্থাটি একটি ‘দন্তহীন বাঘে’ পরিণত হয়েছে। তবে দুদকের মুখপাত্র ও পরিচালক (জনসংযোগ) প্রণব কুমার ভট্টাচার্য একুশে পত্রিকাকে বলেছেন, ‘অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পেলে দুদক কাউকেই ছাড় দেয় না। অনুসন্ধানে কোনো অভিযোগের প্রমাণ না পাওয়া গেলেই কেবল অব্যাহতি দেওয়া হয়। কমিশন কোনো মামলা করলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে করে থাকে।’

দুদক স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না বলে অভিযোগ থাকলেও তা নাকচ করছেন দুদক কমিশনার মোজাম্মেল হক খান; তিনি বলেন, ‘মামলা করার উপযোগী তথ্য-প্রমাণ না পেলে অনুসন্ধান শেষে অব্যাহতি দেয়া হয়ে থাকে। আমাদের কাজে কোনো বাধা নেই। আমরা আমাদের মতো করে স্বাধীনভাবে কাজ করছি। স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তে আমরা যা পাই তাই করি। যে মামলা আদালতে প্রমাণ করা যাবে না সেই মামলা আমরা কেন করব?’