শনিবার, ১৯ জুন ২০২১, ৫ আষাঢ় ১৪২৮

রোহিঙ্গা-সন্ত্রাসী ভাড়া করে আমেরিকা প্রবাসীর পরিবারকে হত্যার পরিকল্পনা ফাঁস!

প্রকাশিতঃ সোমবার, মে ৩১, ২০২১, ১২:২০ পূর্বাহ্ণ

জসিম উদ্দীন, কক্সবাজার : কক্সবাজারের উখিয়ার চাঞ্চল্যকর ফোর মার্ডারের মতো একইভাবে বান্দরবন জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি ঘুমধুম ইউনিয়নের উত্তর বড়ুয়াপাড়া এলাকায় বাদল বড়ুয়া নামের একজন আমেরিকা প্রবাসীর পুরাে পরিবারকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। এ সংক্রান্ত হুমকির একটি ফোনালাপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পাশাপাশি ফাঁস হয়েছে হত্যার পরিকল্পনা।

হুমকি প্রদানের পর গত কয়েকদিন ধরে হত্যার উদ্দেশ্যে ভাড়া করে আনা কয়েকজন সশস্ত্র রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী ওই এলাকায় অবস্থান করছে বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয়রা। সন্ত্রাসীদের আনাগোনার খবরে এলাকায় আতংক ছড়িয়ে পড়েছে।

ঘুমধুম ইউনিয়নের মৃত হরেন্দ্র বড়ুয়ার ছেলে আমেরিকা প্রবাসী বাদল বড়ুয়ার পরিবারের দাবি- জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে মামলা করায় তার চাচা অরিন্দ্র বড়ুয়া, ছেলে রতন বড়ুয়া ও ওই পরিবারের লোকজন মিলে দীর্ঘদিন ধরে তাদের গুম, হত্যার হুমকি দিয়ে আসছে। তারই অংশ হিসেবে এবার তাদের হত্যার জন্য রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী ভাড়া করা হয়েছে।

এর আগে উখিয়ার চাঞ্চল্যকর ফোর মার্ডারের কথা স্মরণ করে দিয়ে একইভাবে হত্যার হুমকি দিয়ে সম্প্রতি আমেরিকা প্রবাসী বাদল বড়ুয়ার কাছে একটি অডিও রেকর্ড পাঠান অরিন্দ্র বড়ুয়ার মালয়েশিয়া প্রবাসী ছেলে রূপন বড়ুয়া। অডিওটি এরমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

এদিকে, শুধু হুমকি দিয়ে বসে থাকেননি বিভিন্ন কারণে স্থানীয়দের কাছে উগ্র হিসেবে পরিচিত অরিন্দ্র বড়ুয়ার পরিবারের সদস্যরা। নুরুল হাকিম নামের স্থানীয় এক যুবক জানান, রতন বড়ুয়ার বাবা অরিন্দ্র বড়ুয়া রোহিঙ্গা জঙ্গী সংগঠন আল-ইয়াকিনের ১০ জন সশস্ত্র সন্ত্রাসীকে ভাড়া করে দেওয়ার জন্য তাকে প্রস্তাব দেন। কিন্তু তিনি এ প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে তা ফাঁস করার পাশাপাশি প্রশাসনকেও বিষয়টা অবগত করেন।

নুরুল হাকিম বলেন, এর আগে আমার বাবা সনজু আলমকেও প্রবাসী বাদল বড়ুয়ার পরিবারকে হত্যার জন্য রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী ভাড়া করে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন অরিন্দ্র বড়ুয়া। কিন্তু আমার বাবা এ জঘন্য প্রস্তাবে রাজি হননি। নুরুল হাকিম আরোও বলেন,আমি অরিন্দ্র বড়ুয়ার উপস্থিতিতে পুলিশকে বিষয়টা অবগত করেছি। এসময় অরিন্দ্র বড়ুয়া দুষ্টুমি করেছেন বলে পুলিশের কাছে দাবি করেন। আর পুলিশকে এ বিষয়ে কিছু না বলার জন্য আমাকে ৫ হাজার টাকাও দিতে চেয়েছেন অরিন্দ্র বড়ুয়া।

স্থানীয় একটি সূত্রের দাবি, অরিন্দ্র বড়ুয়ার ছেলে রতন বড়ুয়া দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এ ব্যাপারে বিভিন্ন থানায় তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও রয়েছে। তার এক রোহিঙ্গা ইয়াবা পার্টনারের মাধ্যমে ৫ জন রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীকে ভাড়া করেছেন রতন বড়ুয়া। ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসীরা যে কোনো মুহূর্তে আমেরিকা প্রবাসী বাদল বড়ুয়ার পরিবারের ওপর সশস্ত্র হামলা চালাতে পারে বলে আশংকা প্রকাশ করেছে পরিবারটি। এমনকি গত কয়েকদিন ধরে উত্তর ঘুমধুম বড়ুয়াপাড়া এলাকার একটি ঘরে এসব সস্ত্রাসীরা অবস্থান করছে এমন গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে।

আমেরিকা প্রবাসী বাদলের বড় ভাই অন্তুপ্রু বড়ুয়া একুশে পত্রিকাকে বলেন, আমার দাদার আগে আমার বাবা মারা যান। দেশের আইন অনুযায়ী আমরা বাবার সম্পদের ভাগ পাই আমরা।কিন্তুু সম্পদের ভাগ তো দূরের কথা, আমার দাদা মৃত্যুর আগে আমাদের সামান্য জমিজমা লিখে দিয়েছিলেন। সে জমিতে আমরা চাষবাস করতাম। এখন সেসব জমিতেও আমাদের চাষবাদ করতে দেওয়া হয় না। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে আমাদের চলাচলের পথ। এখন আমরা অনেকটা অবরূদ্ধ।

তিনি বলেন, আমাদের এলাকাছাড়া করতে রতন বড়ুয়াদের সব ধরনের চেষ্টাই ব্যর্থ হয়ে এখন পুরো পরিবারকে হত্যার জন্য সন্ত্রাসী ভাড়া করেছে। আমরা এখন খুব ভয়ে আছি, নিরাপত্তাহীনতায় আছি। বিষয়টা আমি পুলিশকে অবগত করেছি।

অন্তুপ্রু বড়ুয়া বলেন, এর আগে গত ২ মে আমাকে হুমকি-ধামকি ও মারধর করেছে তারা। এ বিষয়ে গত ৭ মে আমি থানায় উপস্থিত হয়ে একটা জিডি করেছি। জিডি নং ২৬৬। এ ছাড়াও জমি সংক্রান্তের বিষয়ে আদালতে একটা মামলা করেছি। মামালাটির এখন তদন্ত চলছে।

অভিযোগের বিষয়ে রতন বড়ুয়া একুশে পত্রিকাকে বলেন, আমার এক ভাই বাদল বড়ুয়ার পরিবারকে হুমকি দিয়েছিলো বলে শুনেছি। তবে আমি যে তাদের হত্যার জন্য রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী ভাড়া করার কথা বলা হচ্ছে এটা মিথ্যা। তিনি বলেন, আমার বাবা অরিন্দ্র বড়ুয়া কর্তৃক যে নুরুল হাকিম নামের এক যুবককে দিয়ে রোহিঙ্গা আল-ইয়াকিন ভাড়া করার প্রস্তাবের কথা বলা হচ্ছে, বিষয়টা সত্য নয়।’

হাকিম একজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর ছেলে, টাকা পেলে উল্টাপাল্টা বলে। বিষয়টা নিয়ে থানায় বৈঠক হয়েছিলো। মিথ্যা হওয়ায় আমাদের কিছু করতে পারিনি। ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নয় দাবি করে এসব তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার বলে দাবি করেন রতন বড়ুয়া।

নাইক্ষ্যংছড়ি থানার উপ-পরির্দশক (এসআই) ও প্রবাসীর পরিবারের আদালতে দায়ের করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ গোলাম মোস্তাফা একুশে পত্রিকাকে বলেন, জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে মূলত হুমকি-ধামকির ঘটনাটি ঘটেছে। মামলাটি নিরপেক্ষভাবে তদন্তের পাশাপাশি হুমকি-ধামকি ও সস্ত্রাসী ভাড়া করার বিষয়ে খোঁজ খবর নেওয়া হচ্ছে।

জানতে চাইলে নাইক্ষ্যংছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আলমগীর হোসেন একুশে পত্রিকাকে বলেন, গত ৫ বছর ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে দুই পরিবারের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছে। তিনি বলেন, অন্তুপ্রু বড়ুয়ার পরিবারকে যে হত্যার হুমকি বা রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী ভাড়া করা হয়েছে, বিষয়টা আপনার কাছ থেকে জেনেছি। বিষয়টা অবশ্যই খতিয়ে দেখা হবে। আর এ বিষয়ে পরিবারটি অভিযোগ দিলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

প্রবাসী বাদল বড়ুয়ার পরিবারকে হত্যার হুমকি ও রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী ভাড়া করার অভিযোগের বিষয়ে অবগত করা হলে বান্দরবানের পুলিশ সুপার জেরিন আখতার একুশে পত্রিকাকে বলেন, আমি নাইক্ষ্যংছড়ির থানার ওসিকে এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলে দিচ্ছি। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হবে উল্লেখ করে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের হুমকিদাতাদের বিষয়ে তথ্য দিয়ে পুলিশকে সহযোগিতার অনুরোধ জানান এসপি।

আমেরিকা প্রবাসী বাদল বড়ুয়া একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘জায়গাজমির প্রতি আমাদের বিন্দুমাত্র লোভ নেই। বাবার অকাল প্রয়াণের পর আমার দাদার দ্বিতীয় স্ত্রীর সন্তানেরা প্রায়সব সম্পত্তি লুটেপুটে নিয়েছে। আমাদের ভিটেবাড়ি আর যৎসামান্য চাষবাষের জায়গার প্রতিই এখন তাদের লোভ। আমাদের সরলতা ও শান্তিপ্রিয় মনোভাব দেখে আমাদের চাষবাষের জমিগুলো দখলের পাশাপাশি তারা ভিটেবাড়িটিও দখলে মরিয়া হয়ে ওঠেছে। কিছুদিন ধরে আমাদের চলাচলের রাস্তাটিও ব্লক করে রেখেছে।’

প্রবাসী বাদল বড়ুয়া বলেন, ‘আমরা জায়গাজমি চাই না, আমরা বাঁচতে চাই। পরিবারের সদস্যদের প্রতিনিয়ত মৃত্যু-হুমকিতে রেখে প্রবাসজীবন খুবই কষ্টের বেদনাদায়ক। শান্তিতে ঘুমাতে পারি না, কাজ করতে পারি না। একটা দুশ্চিন্তা সবসময় তাড়া করে বেড়াচ্ছে।  উখিয়ার ফোর মার্ডারের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তারা যেভাবে হত্যার পরিকল্পনা করে এগোচ্ছে, এখনই তাদের না থামালে, আইনের আওতায় না আনলে যে কোনো মুহূর্তে ট্র্যাজিক ঘটনার সৃষ্টি হতে পারে বলে আমি আশঙ্কা করছি।’

একুশে/জেইউ/এটি