শনিবার, ১৯ জুন ২০২১, ৫ আষাঢ় ১৪২৮

ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধে ‘দ্বৈতনীতি’র অভিযোগ!

প্রকাশিতঃ শুক্রবার, জুন ৪, ২০২১, ২:৫৭ অপরাহ্ণ

একুশে প্রতিবেদক : সময়টা ২০১৮ সালের ৩ মার্চ শনিবার। ঘটা করে আয়োজন করা হয় ইস্পাত তৈরি প্রতিষ্ঠান বিএসআরএম এর মিরসরাই সোনাপাহাড়স্থ তৃতীয় বিলেট উৎপাদন কারখানার।

জাঁকজমকপূর্ণ ওই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, তৎকালীন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। কারখানার প্রবেশ মুখ থেকে ভিতর পর্যন্ত এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে স্থাপন করা হয় ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের ছবি সম্বলিত পোস্টার, ব্যানার ও বিএসআরএমের নানা প্রদর্শনী।

লালগালিচায় পা রেখে বিএসআরএম কর্তৃপক্ষের বিশাল বহরের সাথে কারখানায় প্রবেশ করার পর ইংরেজি অক্ষরে লেখা নিজের নামযুক্ত ফলক উন্মোচন করে শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ। ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত হয়ে বিলাসী আতিথেয়তায় গ্রহণ করেন প্রধান অতিথির আসন।

সেদিন বিএসআরএমের কারখানার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেন, অবকাঠামো উন্নয়নে স্টিলের ব্যাপক গুরুত্ব রয়েছে। স্টিল ছাড়া এখন উন্নয়ন কার্যক্রমের কথা ভাবাই যায় না। এজন্য স্টিল হতে হবে বিশ্বমানের। ওই অনুষ্ঠানে বিএসআরএমের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করাসহ বিএসআরএমের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজও সারেন মোশাররফ। পরে বিএসআরএমের হেলমেট পরিধান করে পুরো কারখানা ঘুরে দেখেন তিনি।

মিরসরাইয়ে বিএসআরএমের যাত্রায় সহযোগী হয়ে নিজেই উদ্বোধন ঘোষণা করে তিন বছর পর সেই বিএসআরএম নিয়ে ভোল পাল্টালেন মোশারফ।

তিন বছর আগে বিএসআরএমের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ঘোষণা দিলেন বিএসআরএম কারখানা বন্ধের। আগামী ১ বছরের মধ্যে বিএসআরএমকে তাদের কারখানা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পজোনে সরিয়ে নিতে দিয়েছেন আল্টিমেটামও।

সম্প্রতি মিরসরাই উপজেলায় বিএসআরএমের ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে বারইয়ারহাট, জোরারগঞ্জ, হিঙ্গুলি, ধুমসহ বেশ কয়েকটি ইউনিয়নে পানির তীব্র সংকট দেখা দেয়। এ নিয়ে একুশে পত্রিকার প্রিন্ট ও অনলাইন ভার্সনে ‘ মিরসরাইয়ের ভূ-গর্ভস্থ পানি চুষে নিচ্ছে বিএসআরএম’ শিরোনামে তথ্যবহুল, অনুসন্ধানী সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর ফুসে ওঠে এলাকাবাসী। তাদের ক্ষোভ পরিণত হয় বিক্ষোভে। ‘পানি চাই, পানি চাই, বাঁচতে চাই, জীবন চাই’-এমন স্লোগানে পোস্টার-পেস্টুনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে মিরসরাইবাসী।

গত সোমবার (৩১ মে) বিএসআরএম কারখানার সামনে অনুষ্ঠিত ওই মানববন্ধনের সাথে সংহতি প্রকাশ করে সেখানে হাজির হন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন।

মানববন্ধনে মোশাররফ হোসেন বলেন, বিএসআরএম ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির ভূমিকা পালন করছে। তারা সরকারকে ঠকিয়েছে, মিরসরাইবাসীকে ঠকিয়েছে। বন বিভাগের কর্মকর্তাদের সাথে আতাঁত করে পাহাড় কেটেছে, পাহাড়ি ছরা দখল করেছে। ফেনী নদী থেকে পানি আনার কথা থাকলেও তারা কারখানায় গভীর নলকূপ বসিয়ে ভূ-গর্ভস্থ পানি তুলছে। মিরসরাইয়ের মানুষ খাবার পানি পাচ্ছে না। পানির জন্য ঘরে ঘরে হাহাকার চলছে। এসময় তিনি বিএসআরএম কারখানা মিরসরাইয়ের মানুষের রক্ত চুষে নিচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন।

মোশাররফ হোসেন বলেন, মিরসরাইয়ে বঙ্গবন্ধু শিল্প জোন হচ্ছে। সেখানে এখনো ১২’শ একর জমি খালি আছে। আমি বলতে চাই আগামী ১ বছরের মধ্যে বাইরে যেসকল শিল্প কারখানা রয়েছে সেগুলোকে বঙ্গবন্ধু শিল্প জোনে আসতে হবে। আমরা কোনও শিল্প এখানে হতে দিবো না। কোনও স্ক্রাপ গাড়ি ঢুকতে দেওয়া হবে না।

এসময় ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন দুই মাস বিএসআরএমকে রড় উৎপাদন বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন। ৪ ঘণটার ওই মানববন্ধনে বিএসআরএমের শতশত স্ক্রাপ গাড়ি কারখনার সামনে আটকা পড়ে। পানি সংকটে মিরসরাইয়ের জনগণের সাথে সহমত পোষণ করে বিএসআরএমকে দুষে আসছেন মোশাররফ।

বিএসআরএম ইস্যুতে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফের এই অবস্থানকে ‘দ্বৈতনীতি’ বলছেন অনেকেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রবীণ একজন আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, ‘ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের এ বক্তব্য সম্পূর্ণ স্ববিরোধী। মিরসরাইয়ের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তির এমন আচরণে আমরা সত্যিই মর্মাহত। তার কাছ থেকে আমরা এটা আশা করিনি। কেন তিনি জানতেন না বিএসআরএম ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন করবে? রড উৎপাদন মানেই তো পানি! তাহলে জনগণের পানি সংকট হবে সেটা উদ্বোধনের সময় চিন্তা করার দরকার ছিল। সব চুষে নেওয়ার পর কেন বিএসআরএমের বিরোধিতা? তাহলে কি নতুন করে হিসাবের কোনও গড়মিল হয়েছে?

মিরসরাইয়ের একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করে বলেন, বিএসআরএমকে যিনি পানিশূন্য করার সুযোগ দিলেন সেই তিনিই আবার বিএসআরএমের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। মানুষ এখন আর এত বোকা না। মোশাররফ হোসেন সাহেব এতোদিন কোথায় ছিলেন? যখন পত্রিকায় নিউজ হলো, জনগণ রাস্তায় নামল, তখন তিনি বিএসআরএমের বিরুদ্ধে দু’চার কথা বলে গেলেন। রাজনীতিটা করে গেলেন। উদ্বোধনের সময় পানি সংকটের বিষয়টি কি তার ভাবার দরকার ছিল না?

এদিকে, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের আল্টিমেটাম সম্পর্কে তাদের বক্তব্য তুলে ধরেছে বিএসআরএম কর্তৃপক্ষ। বিএসআরএম কারখানা ব্যাবস্থাপক (মানবসম্পদ) দেলোয়ার হোসেন মোল্লা এ ব্যাপারে গণমাধ্যমকে বলেন, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন সাহেব একজন প্রবীণ নেতা। তার মেধা-প্রজ্ঞা অত্যন্ত প্রখর। তবে তার আল্টিমেটাম কিংবা কথাগুলো হয়তো উপস্থিত আবেগ থেকেই বলে ফেলেছেন। জনসাধারণকে শান্ত রাখার জন্য বা তাদেরকে উশৃঙ্খল পরিস্থিতি থেকে নিবৃত রাখার জন্য তিনি এ কথা বলতে পারেন। তার আল্টিমেটামগুলো পূরণযোগ্য নয়।

তিনি বলেন, মোশাররফ সাহেব আমাদেরকে চারটি আলটিমেটাম দিয়েছেন- ১. কারখানায় কাঁচামাল সরবরাহ বন্ধ রাখতে হবে। ২. কারখানার উৎপাদন আগামী দুই মাসের জন্য বন্ধ রাখতে হবে। ৩. আগামী দুই মাসের মধ্যে ফেনী নদী থেকে পানি সরবরাহের প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করতে হবে। ৪. আগামী এক বছরের মধ্যে কারখানা শিল্পজোন এলাকায় স্থানান্তর করতে হবে।

প্রথমত, আগামী এক বছরের মধ্যে যদি কারখানা স্থানান্তর করতে হয় তাহলে আমরা পরবর্তী দশ মাসের জন্য ফেনী নদী থেকে পানি সরবরাহে ব্যয়বহুল প্রজেক্ট কেন বাস্তবায়ন করবো? দ্বিতীয়ত এত বড় একটি কারখানা এক বছরের মধ্যে স্থানান্তর করা কোনও প্রকারেই সম্ভব নয়। তাই আমরা আশা করছি এমপি মহোদয় তার বক্তব্য থেকে অবশ্যই সরে আসবেন এবং গ্রহণযোগ্য সমাধান দিবেন।