রবিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩২

‘পরিবেশ ধ্বংসে জড়িতদের টাকায় প্রাণ-প্রতিবেশ পুনরুদ্ধার করতে হবে’

| প্রকাশিতঃ ৭ জুন ২০২১ | ১০:০০ পূর্বাহ্ন


চট্টগ্রাম : পরিবেশবিধ্বংসী কাজে জড়িতদের কাছ থেকে টাকা আদায় করে প্রাণ-প্রতিবেশ পুনরুদ্ধার করার উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন চট্টগ্রামের বিশিষ্টজনেরা। বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে রোববার রাতে একুশে পত্রিকা কার্যালয়ে জলাশয়-জলাধার ও পরিবেশ রক্ষাকমিটি আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এই দাবি ওঠে।

একুশে পত্রিকা সম্পাদক আজাদ তালুকদারের সঞ্চালনায় ‘পরিবেশ-আড্ডা’ শীর্ষক এ আয়োজনে দ্য ডেইলি স্টারের সাংবাদিক মোস্তফা ইউসুফ বলেন, ‘বর্তমানে দেশে উন্নয়নযজ্ঞ চলছে। উন্নত দেশে উন্নয়ন করার আগে পরিবশ রক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া হয়। কিন্তু বাংলাদেশে আমরা দেখছি, আগে উন্নয়ন, পরে পরিবেশ।’

তিনি বলেন, ‘আমরা অনেকেই হয়তো জানি না, চট্টগ্রামে কত বড় একটি ধ্বংসযজ্ঞ হয়ে গেছে পরিবেশের উপর, বনের উপর। ৩০ হাজার একর বনভূমির উপর মিরসরাই ইকোনমিক জোন করা হচ্ছে। এটা পুরোটাই ছিল ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট। এই ইকোনমিক জোন করতে গিয়ে ৫২ লাখের বেশি গাছ কাটা হয়েছে। এই বনাঞ্চল থেকে মানুষ যে উপকার পেত, প্রকৃতি যে উপকৃত হত, সেটা এখন পুরোটাই নাই হয়ে গেছে।’

খড়িমাটি’র প্রকাশক কবি মনিরুল মনির বলেন, ‘বর্তমানে উন্নয়নের নামে ছোট ছোট গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। গাছ কমে যাওয়ার কারণে উষ্ণতা বেড়ে গেছে। পাহাড় কেটে ফেলা হচ্ছে। কর্ণফুলীকে আমরা চট্টগ্রামের প্রাণ বলে থাকি। কর্ণফুলীতে যুক্ত হওয়া চাক্তাই খাল শহরের বিভিন্ন জায়গা জুড়ে আছে। আমরা ছোটকাল থেকে শুনে আসছি, চাক্তাই খালের উন্নয়ন করা হচ্ছে। কিন্তু হয়নি। খালটি সংস্কার না করায় পানি উঠছে।’

স্পোটিভ কোকোলোকোর কর্ণধার শেখ মোহাম্মদ জুলফিকার বিপুল বলেন, ‘পরিবেশ রক্ষায় নাগরিক হিসেবে আমাদের সচেতনতা অনেক কম। ফ্ল্যাট-বাসায় ময়লা ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন আছে। আমি একটি ফ্ল্যাট থেকে বাচ্চাদের ডায়াপার নিচে ফেলে দিতে দেখেছি। এটা কিন্তু সহজে ধ্বংস হয় না। মাসের পর মাস রয়ে যায়।’

তিনি বলেন, ‘পরিবেশ রক্ষার বিষয় শুধু রাষ্ট্র-সরকারের বিষয় না। নাগরিকদের হিসেবে আমাদের সচেতন হতে হবে পরিবেশ রক্ষায়। আমরা নিজেরা নিজেদের অবস্থান থেকে পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারি। যদিও কোন জায়গায় গেলে আবর্জনা ফেলার জন্য আমরা অনেক সময় কিছু পাই না। এ বিষয়ে প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের উদ্যোগ নিতে হবে।’

তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তা এম আজহার উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন পরিবেশ-প্রকৃতি। কিন্তু প্রতিনিয়ত এ পরিবেশকে আমরা নানাভাবে দূষিত করে আসছি। বিশ্বজুড়ে এখন পরিবেশদূষণের মাত্রা ভয়াবহ। এই দূষণ আজ ভয়ংকর ভবিষ্যতের দিকে আমাদের নিয়ে যাচ্ছে। ভয়াবহ পরিবেশদূষণের কবলে পড়ে আজ বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ শঙ্কার মধ্যে রয়েছে।’

চট্টগ্রাম সিটির প্রাক্তন কাউন্সিলর ও নারী নেত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস পপি বলেন, ‘পরিবেশ রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। স্থানীয় প্রশাসনকে শক্তিশালী হতে হবে। বর্ষা আসলে জলাবদ্ধতার জন্য জনপ্রতিনিধিদের বকা শুনতে হয়। কিন্তু জলাবদ্ধতা নিরসনে তাদের তেমন বরাদ্দ দেয়া হয় না। যার কারণে খালগুলো ভরাট হয়ে গেলেও ড্রেজিং হচ্ছে না।’

সৌখিন এন্টিক সংগ্রাহক, শিল্পোদ্যোক্তা তারেকুল ইসলাম জুয়েল বলেন, ‘প্লাস্টিকের কারণে আমরা মহাবিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছি। এ অবস্থায় প্লাস্টিকের আমদানি, রপ্তানি ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পোশাক শিল্পে যেভাবে বন্ড লাইসেন্স নেয়ার মাধ্যমে আমদানি কাপড়ের হিসাব রাখা হয়, একই ভাবে প্লাস্টিকের ব্যাপারেও হিসাব রাখতে হবে। কী পরিমাণ আসছে, কী পরিমাণ ব্যবহার করছি, রিসাইক্লিং হচ্ছে, সব হিসাব রাখা উচিত। তবেই প্লাস্টিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আসবে।’

র‌্যাংকস এফসি প্রোপার্টিজের সিইও তানভীর শাহরিয়ার রিমন বলেন, ‘পরিবেশ রক্ষা করতে হলে আমাদের আচরণ পাল্টাতে হবে। ডেভেলপারদের কেউ কেউ পাহাড় কেটে ভবন বানাচ্ছেন। কেউ পাইলিং করতে গিয়ে ড্রেনে মাটি ফেলে ভরাট করে ফেলছেন। এরপর জলাবদ্ধতার জন্য আমরা মেয়র সাহেবকে দোষারোপ করছি। আসলে আমরা লাভের পেছনে দৌঁড়াতে গিয়ে নদী-খাল ভরাট করে ফেলছি, পাহাড় কেটে ফেলছি, দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ করছি। এই গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের জন্য আমাদের দায় আছে।’

জামালখান ওয়ার্ড কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমন বলেন, ‘চট্টগ্রামে পাহাড় কারা কাটছেন? তারা কিন্তু টকশোতে আসছেন। তাদেরকে অতিথি করে নিয়ে আসা হচ্ছে। তাদের হাত কতটুকু আছে, তা আপনারাও জানেন। পাহাড় কাটা বন্ধে সকল শ্রেণী-পেশার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। পরিবেশ ধ্বংসে জড়িতদের টাকায় প্রাণ-প্রতিবেশ পুনরুদ্ধার করতে হবে।’

পশ্চিম ষোলশহর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোবারক আলী বলেন, ‘পৃথিবীর প্রথম দেশ হিসেবে আমরা পলিথিন নিষিদ্ধ করেছি। কিন্তু সেটি আমরা ধরে রাখতে পারিনি, কার্যকর করতে পারিনি। শহরে যে পাহাড় আছে সেখানে বস্তিবাসীরা বসবাস শুরু করেছে। তারা বাসযোগ্য করার জন্য প্রতিনিয়ত পাহাড় কাটছে। জলাধার আগে যা ছিল, সেখানে পানি জমে থাকতো। কিন্তু জলাধার ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি রাস্তার উপর চলে আসছে। এ অবস্থায় জলাধারগুলোকে রাষ্ট্রীয়করণ করে সংরক্ষণ করতে হবে।’

আবৃত্তিশিল্পী মিলি চৌধুরী বলেন, ‘সাধারণ মানুষ হিসেবে আমি তো পাহাড় কাটতে পারি না। এই পাহাড় কাটে কিছু সিন্ডিকেট। তাদেরকে সহযোগিতা করে কারা? পরিবেশটাকে আমরা কোথায় নিয়ে যাচ্ছি।’

আলোচনা সভায় একুশে পত্রিকা সম্পাদক আজাদ তালুকদার বলেন, ‘বন সংরক্ষণ করার কথা যেমন একদিকে বলা হচ্ছে, আবার এই বন ধ্বংসের নানা আয়োজনও আমরা দেখতে পাচ্ছি। অপরিকল্পিত উন্নয়ন এবং ইকোসিস্টেমের ওপর বিভিন্ন ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে পরিবেশের যে গুরুতর ক্ষতি সাধন করা হয়েছে, তা পুনরুদ্ধার ছাড়া মানবজাতি সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারবে না।’

আলোচনা সভায় মুখ্য আলোচকের বক্তব্যে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রশাসন ও পরিকল্পনা বিভাগের সদস্য মো. জাফর আলম বলেন, ‘পলিথিন নিষিদ্ধ খুব কম দেশেই আছে। আর আমরা পলিথিন নিষিদ্ধ করে সেটি ধরে রাখতে পারিনি। এটার একটা ব্যবস্থাপনার বিষয় আছে। পলিথিন নদীতে ফেলে সেখান থেকে তুলবো এটা ব্যবস্থাপনা নয়। উন্নত দেশগুলো পলিথিন নিষিদ্ধ করেনি। তারা চমৎকারভাবে এটার ব্যবস্থাপনা শিখেছে এবং করছে।’

আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প করতে দুই থেকে পাঁচ একর জায়গা লাগে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের আনন্দনগর, আরেফিননগর বিশাল বর্জ্য ভাগাড়, সেখানে পাহাড়ের মতো হয়ে গেছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শিখতে হবে আমাদের, কোন উপায় নেই।

তিনি বলেন, ‘আপনি বর্জ্য তৈরি করছেন, কিন্তু সেটির ঠিকমতো ব্যবস্থাপনা করছেন না, এটি অপরাধ। আমরা প্লাস্টিকের ছোট টুকরো ফেলে দিচ্ছি। সেটা পানিতে চলে যাচ্ছে। আর ভুলে খাদ্য মনে করে মাছ খেয়ে ফেলছে। আমি কখনো মনে করছি না, এটা অপরাধ। এই অপরাধবোধ সবাইকে জাগ্রত করতে হবে।’

ইউরোপ-আমেরিকার তুলনায় বাংলাদেশে পরিবেশ দূষণ কিছুই নয় উল্লেখ করে পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের সাবেক পরিচালক জাফর আলম বলেন, ‘শুধু আমরা পরিবেশ দূষণ করছি তা নয়, ইউরোপ-আমেরিকা অনেক বেশি দূষণ করছে। শুধু তাদের দেশে না, আমার দেশে, ভারতবর্ষে তারা পাথর, গ্রানাইড উত্তোলনের জন্য লুন্ঠন করেছে, রেপ করেছে, তারা যা ইচ্ছা তাই করেছে। আমরা ওই তুলনায় কিছুই করিনি। তারপরও আমরা দূষণ কমাতে কাজ করছি। জলবায়ু সম্মেলনে আমরা এই কথাগুলো বলি।’

তিনি বলেন, জলবায়ু তহবিল থেকে টাকা আনার কথা বলা হয়। জলবায়ু তহবিলের ‘তরজমা’ করা হয়েছে, সেখানে একটা তহবিল আছে, প্রতিবার আমরা জলবায়ু সম্মেলনে যাই আর ব্যাগ ভরে নিয়ে আসি। আসলে কিছুই আনা হয় না। জলবায়ু সম্মেলনে অঙ্গীকার করা হয়। ইউরোপ-আমেরিকাকে বলা হয় কার্বন নিঃসরণ কমাতে। আর আমাদেরকে বলা হয়, তোমরা দুধভাত, তোমাদের কার্বন নিঃসরণ কমাতে হবে না, তোমরা বাড়াও। প্রতিবছর আমেরিকায় মাথাপিছু কার্বন নিঃসরণ করে ২২ টন। আমরা করি শুন্য দশমিক ২৩ টন।’

জাফর আলম বলেন, ‘কার্বন নিঃসরণের সাথে শিল্প কারখানার সম্পর্ক আছে, আরাম আয়েশের সম্পর্ক আছে। মিরসরাইয়ের বনভূমিতে ইকোনমিক জোন করা হচ্ছে। এ নিয়ে বিতর্ক বাংলাদেশ শুরু করেনি, সারা দুনিয়া করেছে। অপ্রত্যাশিতভাবে আমরা এখন করছি। কার্বন নিঃসরণ কমানোর অনুরোধ করে প্রত্যখাত হয়ে আমি এ কাজ করছি, এটা বলতে পারবো না। ইউরোপ-আমেরিকায় যখন শিল্পায়ন শুরু হয়েছে, তখন থেকে ঝামেলাটা শুরু। দূষণ করতে করতে এখন তাদের প্রচুর সম্পদ। সুতরাং সবকিছু নেগেটিভভাবে নেওয়ার প্রয়োজন নেই।’

সভাপতির বক্তব্যে জলাশয়, জলাধার ও পরিবেশ রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক, প্রাক্তন কাউন্সিলর অ্যাডভোকেট রেহানা বেগম রানু বলেন, আমি বৃক্ষকে ভালো না বেসে, আমার জানালার পাশের গাছটাকে ভালো না রেখে আমি সুস্থ থাকবো- এটা ভুল ধারণা বলে আমি মনে করি। দক্ষিণ আফ্রিকায় জলবায়ু সম্মেলনে জাফর আলম ভাই গিয়েছেন, সাংবাদিক হিসেবে আজাদ তালুকদার গিয়েছেন, আর পরিবেশকর্মী হিসেবে আমি। সেখানে গিয়ে বুঝেছি, আমাদের এখানে কত কম কার্বন নিঃসরণ হচ্ছে। উন্নত বিশ্বে প্রচুর পরিমাণে কার্বন নিঃসরণের কারণে আমরা এখানে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘দক্ষিণ আফ্রিকায় জলবায়ু সম্মেলনের সময় আমাদের মাননীয় তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ তখন ছিলেন পরিবেশমন্ত্রী। তিনি তখন একটা কথা বলেছিলেন, যেটা আমাকে স্পর্শ করেছিল। তিনি বলেছিলেন যে, আমরা ফ্লাইটে চড়লে কে প্রথম শ্রেণীর নাগরিক আর কে তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক এটা কোন বিষয় না। প্লেন যখন ক্রাশ করবে আমরা সবাই কিন্তু চলে যাবো। ঠিক পৃথিবীটাও এরকম। আপনি পৃথিবীর কোন প্রান্তে পরিবেশ দূষণ করলেন, আর বাংলাদেশে বসে আমি ক্ষতিগ্রস্ত হলাম। তাহলে এ দায় কে নেবে? তাদের কোন আদালতে বিচার হবে? কীভাবে হবে? আমি দাবি জানাই, পাহাড় যারা কাটবে, পুকুর, খাল যারা ভরাট করবে তাদের টাকায় এগুলোর পুনরুদ্ধার করতে হবে।

আলোচনা সভায় সাংস্কৃতিক কর্মী সুমন দেওয়ানজি, একুশে পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার আবছার রাফি ও অফিস সহকারী খুকি নাথ উপস্থিত ছিলেন।