শনিবার, ১৯ জুন ২০২১, ৫ আষাঢ় ১৪২৮

সিডিএ’র লোভের অনলে পুড়ছে নিম্নমধ্যবিত্তদের ‘অনুভূতি’!

প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, জুন ১০, ২০২১, ৪:৪৬ অপরাহ্ণ

মোহাম্মদ রফিক : নগরের বায়েজিদ থানাধীন আরেফিন নগর এলাকায় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক) পুকুর শ্রেণির জায়গা ভরাট করে আবাসিক এলাকা গড়ে তুলছে বলে পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থায় অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। ওই প্রকল্প এলাকায় যেতে চউক ভুক্তভোগীদের জায়গা দখলে নিয়ে রাস্তাও তৈরি করেছে।

বায়েজিদ-ফৌজদারহাট লিংক রোডের পাশে গড়ে উঠা প্রকল্পের বিষয়ে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, চউকের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী তাদের অনুমোদিত লে-আউট প্ল্যানের তথ্য গোপন করে নিজেদের পকেট ভারি করতে পুকুর শ্রেণিসহ আশপাশের প্রায় ২০ একর জায়গায় নতুন আবাসিক এলাকা নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে।

ভুক্তভোগী শহীদুল রহমান নামে এক ব্যক্তির অভিযোগ, ১৯৫৫-১৯৫৬ সালে শিল্পপ্লটের জন্য জালালাবাদ মৌজার প্রায় ২০ একর জমি অধিগ্রহণ করে চউক। এরমধ্যে ১৯৮৮ সালে ‘হর্টিকালচার’ করার জন্য প্রায় তিন একর জায়গা ৯৯ বছরের জন্য এবিএম সিদ্দিক নামের এক ব্যক্তিকে ইজারা দেয় চউক। কিন্তু ওই প্লটে চলাচলের রাস্তা না থাকায় এবং ‘হর্টিকালচার’ বাস্তবায়ন করতে না পারায় ২০০৬ সালের জানুয়ারি মাসে লিজ বাতিল করে চউক।

এদিকে রাস্তাবিহীন হর্টিকালচার প্লটে (নং ৯) ঢোকার শর্তসাপেক্ষে ২০১৯ সালের ২৪ মে শহীদুর রহমানের সাথে সমঝোতা স্মারক চুক্তি সম্পাদন করে চউক। কিন্তু শর্ত ভঙ্গ করায় ২০২০ সালের ১৩ মে সেই চুক্তি বাতিল করা হয়।

শিখা চক্রবর্তী নামে ভুক্তভোগী এক আইনজীবী বলেন, ‘শর্তসাপেক্ষে প্লটে প্রবেশের জন্য চউকের সাথে আমাদের চুক্তি হয়েছিল৷ তারা প্লটে ঢোকার জন্য আমাদের জায়গার উপর দিয়ে রাস্তা বানিয়েছে। শর্ত ভঙ্গ করায় আমরা চুক্তি বাতিল করেছি। চউক পুকুর শ্রেণির জমি ভরাট করে পরিবেশ আইনকে তোয়াক্কা না করে আবাসিক এলাকা গড়ে তুলছে ৷ আমরা সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। তারা আমাদের জায়গার উপর দিয়ে করা রাস্তাটি জোরপূর্বক রেখে দিতে চায়।’

লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়-শিল্পপ্লটের জন্য বায়েজিদ বোস্তামি থানাধীন জালালাবাদ মৌজায় এল এ মামলা মূলে (০৭/১৯৫৫-১৯৫৬ ও ৮৪/১৯৬০-১৯৬১) ৬৪৬/২৫৮ নং আর এস খতিয়ানের ১১৪৮/১১৫০/১১৫২/১১৫৩/১১৫৪ দাগের সম্পত্তি অধিগ্রহণ করে চউক। এরমধ্যে ২ দশমিক ৯৯ একরের ৯ নং শিল্পপ্লটটি ১৯৮৮ সালের ২৪ অক্টোবর ‘হর্টিকালচার’ করার জন্য ৫৮২৬ নম্বর রেজিস্ট্রার্ড ৯৯ সনা (লিজ অব এগ্রিমেন্ট) জনৈক এবিএম সিদ্দিকের বরাবরে প্রদান করে চউক।

প্লটে যাতায়াতের রাস্তা না থাকায় এবং হর্টিকালচার করতে না পারায় ২০০৬ সালের ২৪ জানুয়ারি লিজ বাতিল করে চউক। ভুক্তভোগী শহীদুর রহমান বলেন, ‘১৯৮২ সালের হকুম দখল অধ্যাদেশের ১৭ ধারা লঙ্ঘন করে শিল্পপ্লটের জন্য অধিগ্রহণ করা জমিতে আবাসিক এলাকা গড়ে তুলছে চউক। সংস্থাটি আমার এবং আশেপাশের অনুমোদিত লেআউট ম্যাপের জমিসহ অধিগ্রহণ করার অপপ্রয়াস চালাচ্ছে।

শিল্পপ্লটের জন্য জমি অধিগ্রহণ করে ৬৫ বছর পর ওই শিল্পপ্লটের সম্পত্তিতে আবাসিক প্রকল্প গড়ে তুলতে পারে না। চউক’র অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়ার জন্য আমাদের সম্পত্তি গ্রাস করার পাঁয়তারা করছে। লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেন এডভোকেট শিখা চক্রবর্তী।

আবদুল আলীম নামের এক ভুক্তভোগী চউকের বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেন, জালালাবাদ মৌজার অধীন ৬৫ নং বিএস খতিয়ানের ৮১০/৮১১ বিএস দাগের জমির শ্রেণির কলামে পুকুর ও পুকুরপাড় লিপিবদ্ধ আছে। এর মধ্যে ৮১১ দাগের আন্দর ৪৫ শতক জায়গা পানীয় জলের জন্য ব্যবহার্য তথা পুকুর হিসেবে এবং ৮১০ দাগের ৬৫ শতক পুকুরপাড় হিসেবে লিপি আছে।

বুধবার দুপুরে সরেজমিন দেখা যায়, আবাসন প্রকল্প এলাকায় যাতায়াত করতে বায়েজিদ-ফৌজদারহাট লিংক রোড ঘেঁষে কালভার্ট তৈরি করেছে চউক। ট্রাকে মাটি এনে প্রকল্প এলাকা ভরাট করা হচ্ছে দেদারছে।

প্রকল্প এলাকার পূর্বদিকে পাহাড় ও আবাসিক এলাকা। উত্তর ও পশ্চিমে বস্তিঘর। দক্ষিণে ফৌজদারহাট লিংক রোড। ‘ড্রিমল্যান্ড প্রপাটিজ’ নামের প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাকর্মী শাহ আলম জানান, প্রকল্প এলাকায় বছরে তিন মাস মাটি ভরাট করা হয়। চলতি বছরের মে মাসের শুরুতে আবার শুরু হয়েছে মাটি ভরাটের কাজ। প্রকল্প এলাকায় যেতে সিডিএ’র কোনও রাস্তা নেই। অন্যের জায়গার উপর দিয়ে তারা রাস্তা বানিয়েছে।’

পুকুর ভরাট করে আবাসিক প্রকল্প গড়ে তোলা প্রসঙ্গে চউকের প্রধান প্রকৌশলী হাসান বিন শামস একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘খতিয়ানে পুকুর শ্রেণি হলেও বাস্তবে সেখানে পুকুর নেই। নতুন আবাসন প্রকল্প গড়ে তুলতে প্রয়োজনে খতিয়ান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

ব্যক্তি মালিকানাধীন জায়গা জোরপূর্বক দখলে নিয়ে রাস্তা বানিয়ে প্রকল্প এলাকায় মাটি ভরাট করা হচ্ছে এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে চউকের এ কর্মকর্তা বলেন, ‘স্থানীয় একটি চক্র আবাসন প্রকল্পের বিরোধিতা করছে। অনেকেই জাল দলিল বানিয়ে জায়গার মালিকানা দাবি করছে।’

সিডিএ নগর উন্নয়ন কমিটির মেম্বার এবং চট্টগ্রাম জলাশয়-জলাধার ও পরিবেশরক্ষা কমিটির আহ্বায়ক এডভোকেট রেহানা বেগম রানু বলেন, ‘সিডিএ’র দায়িত্বই হচ্ছে পুকুর জলাশয় রক্ষা করা। রক্ষক হয়ে তারা ভক্ষক হতে পারে না। খতিয়ানে যেখানে সুস্পষ্টভাবে পুকুরের কথা উল্লেখ আছে, সেখানে বাস্তবতা পাশ কাটিয়ে নগরবাসীর আবাসনের চাহিদা পূরণের দোহাই দিয়ে গায়ের জোরে কেউ যদি তা ভরাট করতে চায় তা কখনো সমীচীন হবে না। স্বচ্ছতার স্বার্থে, ন্যায় প্রতিষ্ঠার স্বার্থে সিডিএকে জনগণের সামনে বিষয়টি পরিষ্কার করা উচিত। তারা যদি বুঝাতে সক্ষম হয় যে, এখানে জনস্বার্থের বিষয়টি জড়িত, কোনো পক্ষ ইনজাস্টিসের শিকার হবে না, আবাসন এলাকা সম্প্রসারণের নামে পুকুর শ্রেণির জায়গা ভরাটের চেষ্টা করা হবে না, তখন কারো আপত্তি থাকার কথা নয়।’

আমি আশা করবো সিডিএ কোনোভাবেই ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে না। কারণ পুকুর অবশ্যই আমাদের সম্পদ, পাহারাদার, জোগানদাতা। সারফেস ওয়াটারের পাশাপাশি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার্য পানির পরিমাণ ৮০ শতাংশ, যার জন্য পুকুরই সবার আগে সহযোগিতার ডানা মেলে দেয়। তাই প্রাচীন পুকুরটির অস্তিত্ব কারা নষ্ট করেছে তাদের চিহ্নিত করে তাদেরকে দিয়েই পুকুরের পুরোনো চেহারায় ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগই এখন সময়ের দাবি।

পুকুর ভরাট করে চউকের আবাসন প্রকল্পের বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগের পরিচালক নুরুউল্লাহ নুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘সিডিএ তো সরকারি সংস্থা। পুকুর-জলাধার সংরক্ষণ করা তাদেরও দায়িত্ব। এখন তারা যদি আইন লংঘন করে সেক্ষেত্রে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কারণ আবাসন প্রকল্প গড়ে তুলতে হলে আমাদের কাছ থেকে ক্লিয়ারেন্স নিতে হবে। তবে এ সংক্রান্ত কোনও অভিযোগ আমরা এখনো পাইনি। সিডিএ’র কাছ থেকেও আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলা সংক্রান্ত কোনও কাগজপত্র পাইনি। যদি পরিবেশ আইন লংঘনের অভিযোগ পাই তাহলে তদন্ত করে সিডিএর বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

জানা গেছে, ফৌজদারহাট-বায়েজিদ লিংক রোডের পাশে আরেফিন নগরে ‘বায়েজিদ হাউজিং’ নামে নতুন আবাসন প্রকল্প গ্রহণ করে সিডিএ। সিডিএ’র তিন একর নিজস্ব জায়গার পাশাপাশি খাস ও ব্যক্তি মালিকানাধীন জায়গা হুকুমদখল করে ১৬৭টি আবাসিক এবং ১৮টি বাণিজ্যিক প্লট গড়ে তোলা হবে। থাকবে ফ্ল্যাট ব্লকও।

জানা গেছে, সিডিএ’র সর্বশেষ আবাসন প্রকল্প অক্সিজেন এলাকায় ‘অনন্যা আবাসিক’। ২০০৮ সালে নেওয়া প্রকল্পটিতে ১ হাজার ৭৪৭টি প্লট রয়েছে। ২০০৮ সালের পর গত ১৩ বছরে আর কোনো আবাসিক এলাকা গড়ে তুলতে পারেনি সিডিএ।

বায়েজিদ হাউজিং নামের এ প্রকল্পটির ডিটেইল প্রজেক্ট প্ল্যান (ডিপিপি) এরইমধ্যে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৫৭ কোটি ৮২ লাখ ৫২ হাজার টাকা। আবাসিক এলাকায় ভূমির দাম ধরা হবে কাঠাপ্রতি ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা।

১৯ দশমিক ৬৫ একর জমির এ আবাসিক প্রকল্পটিতে তিন কাঠার ১২৬টি, চার কাঠার ৭টি এবং পাঁচ কাঠার ৩৪টি আবাসিক প্লট থাকবে। এছাড়া ১৮টি বাণিজ্যিক প্লট এবং ৩৬ দশমিক ৫ কাঠার একটি অ্যাপার্টমেন্ট ব্লক এবং দুটি ইউটিলিটি ব্লক রাখা হয়েছে।

সিডিএর দাবি, ব্যবসা করতে নয়, নগরবাসীর আবাসন সংকট ঘুচানোর জন্য প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য সব কাগজপত্র জাতীয় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস।

আগামী জুন মাস থেকে শুরু হয়ে ২০২৩ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হতে পারে বলে জানা গেছে।