রবিবার, ২৫ জুলাই ২০২১, ১০ শ্রাবণ ১৪২৮

অভিযুক্ত চাঁদাবাজ দেবাশীষ স্বেচ্ছাসেবক লীগে আলোচনায় আসার নেপথ্যে

প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, জুন ২৪, ২০২১, ৬:০১ অপরাহ্ণ


আবছার রাফি : চট্টগ্রাম নগরে এক প্রবাসীকে গুলি করে ‘চাঁদাদাবির ৭০ লাখ টাকা আদায়ের পর’ আরও ৩০ লাখ টাকা দাবি করার অভিযোগের মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন দেবাশীষ নাথ দেবু। ২০১৮ সালে আদালতে দাখিল করা ওই মামলার চার্জশিটে তাকে প্রধান আসামি করা হয়। প্রায় ৩ বছর আগে চার্জশিট প্রদান করা হলেও রহস্যজনক কারণে এখনো মামলাটির চার্জগঠন হয়নি। এর মধ্যেই সেই দেবাশীষ নাথ দেবু চট্টগ্রামে স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতৃত্বে আসছেন বলে আভাস মিলছে।

স্বেচ্ছাসেবক লীগের চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক, যে কোন একটি পদে দেবু আসছেন- এমন আলোচনা এখন সরকারদলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত সংশ্লিষ্টদের মুখে মুখে। দেবু নিজেকে এমইএস কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক নেতা হিসেবে পরিচয় দেন; যদিও ছাত্রলীগের কোন পদে তিনি ছিলেন না।

সংশ্লিষ্টরা জানান, আওয়ামী লীগ তো নয়ই, দলটির অঙ্গ ও সহযোগী কোন সংগঠনের পদে দেবাশীষ নাথ দেবু ছিলেন না। তাছাড়া তার বিরুদ্ধে কোটি টাকার চাঁদাবাজির ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ আছে। চট্টগ্রামের জোরারগঞ্জের কাটাছরা ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের তেতৈয়া গ্রামের ননি গোপাল নাথের ছেলে দেবুর বৈধ আয়ের উৎসও জানা নেই পুলিশের।

এ রকম একজন ব্যক্তি কীভাবে হঠাৎ করে স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক পদে আসছেন- তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই রাজনৈতিক অঙ্গনে। বিষয়টি নিয়ে খোঁজ নিতে স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ ক্ষমতাসীন দলের বেশ কয়েকজন দায়িত্বশীল নেতার সঙ্গে কথা বলে একুশে পত্রিকা। এতে উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য!

স্বেচ্ছাসেবক লীগের একজন কেন্দ্রীয় নেতা একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘দুই বছর আগে ২০১৯ সালে ঢাকায় যখন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সম্মেলন হয় তখন দেবু ঢাকায় খুব দৌড়াদৌড়ি করে। তার এই তৎপরতা কেন্দ্রীয় কমিটিতে আসার জন্য নয়, নির্মল দাকে (নির্মল রঞ্জন গুহ) প্রেসিডেন্ট বানানোর জন্য ছিল। তখন থেকেই সে মনে হয় চট্টগ্রাম নিয়ে ভাবছিল।’

‘স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় প্রেসিডেন্ট পদে আসার ক্ষেত্রে নির্মল দা চট্টগ্রাম থেকে বড় সাপোর্ট পেয়েছেন, যা দেবুসহ কয়েকজন ব্যবস্থা করেছে। কেন্দ্রীয় সম্মেলনের সময় দেবুসহ চট্টগ্রামের একটি বড় গ্রুপ নির্মল দার জন্য কাজ করেছে। নির্মল দার সঙ্গে দেবুর খুব ভালো সম্পর্ক।’

স্বেচ্ছাসেবক লীগের এ নেতা আরও বলেন, ‘বেশ কিছুদিন ধরে দেবু আমাকেসহ আরও কয়েকজনকে বলছে, ভাই আমার জন্য প্রেসিডেন্ট-সেক্রেটারি দুইজনকে বলতে হবে, আমি কিন্তু প্রেসিডেন্ট ক্যান্ডিডেট। এখন আমরাও যদি দেবুর বিষয়ে পজিটিভ থাকি তাহলে তার জন্য ভালো, আবার নির্মল দার জন্যও সুবিধা হয়। এটাই তো রাজনীতি।’

চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের অনুসারী হিসেবে পরিচিত একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘দেবু আসলে নওফেলের খুব কাছের কেউ নয়। দেবু প্রক্রিয়াটা শুরু করেছে, সেন্ট্রালে যখন সম্মেলন হচ্ছে তার আগে থেকে। যখন চট্টগ্রামে প্রেসিডেন্ট-সেক্রেটারির বিষয় আসছে তখন দুই গ্রুপের দুই নেতা তালিকা দিচ্ছে, তখন সে খুব কৌশলে নওফেলের তালিকায় চলে এসেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘স্বেচ্ছাসেবক লীগের নগর কমিটির পদধারী নেতাদের বাদ দিয়ে দেবুর মাধ্যমে কয়েকটি প্রোগ্রাম করান মহিউদ্দিন চৌধুরী- সেটাকে কাজে লাগিয়ে নওফেলের তালিকায় সে নাম তুলে ফেলেছে। এটা হচ্ছে তার ও নির্মল রঞ্জন গুহের টেকনিক। নির্মল হয়তো বলেছে যে, আমার জন্য সুবিধা হবে তুমি যদি নওফেল বা নাছিরের তালিকাতে চলে আসো, তাহলে তোমাকে জায়েজ করে নিতে আমাদের সুবিধা হবে। এটাই হচ্ছে কাহিনী।’

এদিকে চট্টগ্রাম নগরে নিজের জমিতে বাড়ি করতে যাওয়া বন্ধন নাথ নামের এক প্রবাসীকে গুলি করে ‘চাঁদাদাবির ৭০ লাখ টাকা আদায়ের পর’ আরও ৩০ লাখের জন্য আগ্রাসী হওয়ার অভিযোগে দেবুসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে ২০১৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাঁচলাইশ থানায় মামলা হয়। এরপর ২৪ ফেব্রুয়ারি দেবু ও তার সহযোগি এটিএম মঞ্জুরুল ইসলাম ওরফে রতনকে গ্রেপ্তার করা হয়। দুইজনই তখন স্বেচ্ছাসেবক লীগের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। মামলার বাকি চার আসামিও ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিতে সক্রিয়।

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, নগরীর ষোলশহর ২ নম্বর গেইটের পেছনে বন্ধন নামের ওই প্রবাসীর নয় গণ্ডা (৫৪ শতাংশ) জমি রয়েছে। সেখানে বাড়ি নির্মাণের জন্য ২০১৬ সালে আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ডিজাইন সোর্স লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি করেন তিনি। সেখানে বাড়ি করার জন্য আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের এই নেতারা এক কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেন। সে বছর ৯ ফেব্রুয়ারি দেবুর নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা এসে ডিজাইন সোর্স লিমিটেডের মালিক মেহেদি ও বন্ধন নাথকে ওই জায়গায় আটকে ফেলে। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে দেবু ও রতনসহ অন্যরা বন্ধন নাথকে মারধর করে এবং বন্ধনের পিঠে দুটি গুলি করে আসামি নাজমুল।

মামলায় বলা হয়, ওই ঘটনার পরদিন ২০১৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বন্ধনের পক্ষে পাঁচটি চেকের মাধ্যমে আসামিদের ৭০ লাখ টাকা দেয়। এছাড়া চাঁদাবাজরা তার কাছ থেকে তিনটি নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করিয়ে নেয়। এই ঘটনার তিনি আবার কুয়েতে যান এবং সেখানকার আয় দিয়ে আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানকে ওই টাকা পরিশোধ করেন।

এদিকে চুক্তি অনুযায়ী ভবন নির্মাণ কাজ না হওয়ায় ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করেন তিনি। নতুন করে তার পরিচিত অপর পাঁচ ব্যক্তির সঙ্গে ভবন নির্মাণে নতুন চুক্তি করেন। সে অনুযায়ী কাজ শুরুর জন্য ২০১৮ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ওই জায়গা পরিষ্কার করতে গেলে আসামিরা কাজ বন্ধ করে দিয়ে আরও ৩০ লাখ টাকা দাবি করে। মামলার সঙ্গে পাঁচ আসামির টাকা নেওয়ার ভিডিও ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়।

মামলা দায়েরের পর পাঁচলাইশ থানার তৎকালীন ওসি মহিউদ্দিন মাহমুদের বিরুদ্ধে মানবন্ধনও করে ক্ষমতাসীন দলের একটি অংশ। পরে তাদেরকে অভিযোগের প্রমাণ হিসেবে ভিডিও ফুটেজ, স্ট্যাম্প, ব্যাংক লেনদেনের বিবরণ ইত্যাদি দেখায় পুলিশ। এসব দেখার পর তারা পুলিশের বিরুদ্ধে আর কর্মসূচি পালন করেননি।

এরপর ২০১৮ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর দেবাশীষ নাথ দেবুকে প্রধান আসামি করে আদালতে মামলাটির চার্জশিট দাখিল করে পাঁচলাইশ থানা পুলিশ। চার্জশিটে তথ্য-প্রমাণের মধ্য দিয়ে উঠে আসে, দেবুর নেতৃত্বে চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটেছে, এছাড়া চাঁদাবাজির টাকাও দেবুর ব্যাংক একাউন্টে গেছে। মামলায় দণ্ডবিধির ১৪৩, ৩৪২, ৩০৭, ৪৪৭, ৩৮৪, ৩৮৫, ৩৮৬, ৫০৬ ধারায় অভিযোগ আনা হয়। রহস্যজনকভাবে এখনো চার্জগঠন করে মামলাটির বিচার কার্যক্রম শুরু করা হয়নি। আগামী ৪ আগস্ট মামলাটির পরবর্তী ধার্য্য তারিখ। অন্যদিকে মামলার বাদী বন্ধন নাথ মামলা দায়েরের দিনই সেই যে দেশ ছেড়েছেন তার আর কোন খোঁজ নেই।

এদিকে চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেপ্তার ও চার্জশিটভুক্ত প্রধান আসামি হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে দেবাশীষ নাথ দেবু একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘স্বেচ্ছাসেবক লীগেরই কিছু লোক ইচ্ছা করে এই জিনিসটাকে সাজিয়ে একটা মামলা করেছিলো। বন্ধন নাথসহ সবার সাথে বসে সেটার একটা সমাধান হয়ে গেছে। তারা নিজেরাই ষড়যন্ত্র করে নিজেরাই এই জিনিসটা সাজিয়েছিলো। আমার নামে কোনো থানায় কোনো জিডি নাই, কোনো মামলা নেই। কোনো দোকানদারও বলতে পারবে না, আমার থেকে কেউ এক টাকা পায়। আমি মাস্টার্স পাশ করে ব্যবসা করতেছি পাশাপাশি একটা চাকরিতেও যুক্ত ছিলাম। আমি ব্যবসা-বাণিজ্য আর ঘর ভাড়া দিয়ে চলি।’

কোটি টাকা চাঁদাবাজি মামলার প্রধান আসামি দেবু স্বেচ্ছাসেবক লীগের চট্টগ্রাম কমিটির নেতৃত্বে আসছেন বলে শোনা যাচ্ছে, এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় সভাপতি নির্মল রঞ্জন গুহ একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমি সোশ্যাল মিডিয়াতে দেখছি মামলার ব্যাপারটা। আমি এটা খবর নিয়ে দেখবো। তার বিরুদ্ধে যে মামলা হইছে সেই অভিযোগ যদি সত্য হয়, তাহলে সে কমিটিতে আসতে পারবে না। আমরা কারও ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নিইনি এখনো।’

দেবুর সঙ্গে খুব ভালো সখ্যতা থাকার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমার সাথে কারও ব্যক্তিগত কোনো সখ্যতা নেই, কারো প্রতি আমার ব্যক্তিগত দুর্বলতা নেই, কেউ আমার আত্মীয় না। এ সমস্ত কথা বলে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যারা এগুলো বলে তারা দলের শুভাকাঙ্ক্ষী নয়, তারা ষড়যন্ত্রকারী।’

অন্যদিকে স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনটি দেখভাল করছেন সাবেক সভাপতি বাহাউদ্দিন নাছিম। ফলে কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে তার প্রভাব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বর্তমানে তিনি অসুস্থ থাকায় কেন্দ্র থেকে চট্টগ্রাম মহানগর কমিটি ঘোষণা দিতে দেরি হচ্ছে।

কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, সাবেক মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন ও শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল সমর্থিত প্রার্থী থেকেই নগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক নির্ধারিত হচ্ছে। এজন্য এ দুই নেতা দুইজন করে নাম দিয়েছেন।

মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল দিয়েছেন এমইএস কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক নেতা দেবাশীষ নাথ দেবু ও নগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. সালাহ উদ্দিনের নাম। এই দুইজনের মধ্যে নানা কারণে দেবু এগিয়ে আছেন।

অন্যদিকে আ জ ম নাছির দিয়েছেন চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের প্রাক্তন নেতা আনোয়ারুল ইসলাম বাপ্পী ও চট্টগ্রাম কমার্স কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. হেলাল উদ্দিনের নাম। উক্ত দুইজনের মধ্যে বাপ্পী এগিয়ে আছেন পরিচ্ছন্ন রাজনীতি, ত্যাগ ও বয়স বিবেচনায়।

আ জ ম নাছির উদ্দীন ও মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল সমর্থিত প্রার্থী থেকেই নগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক নির্ধারণ করা হচ্ছে এমন কথা শোনা যাচ্ছে, এ বিষয়ে জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক এ কে এম আফজালুর রহমান বাবু একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘এরকম কিছুই হচ্ছে না। আমার মনে হয় এধরনের গুজব থেকে সকলের দূরে থাকাই ভালো।’

একই বিষয়ে কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি নির্মল রঞ্জন গুহ একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘একটা সফল সম্মেলন হয়েছে। সম্মেলনের পর কমিটির ব্যাপার নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।’