চট্টগ্রাম : লিভার সিরোসিস- নামক জটিল রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী জহুর আহমেদ চৌধুরী।
এর আগে পিজি হাসপাতাল নামে পরিচিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় উদ্বোধন করেছিলেন জহুর আহমেদ চৌধুরী; লিভার সিরোসিসের জটিলতা শুরু হলে সেখানেই তিনি ভর্তি হন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পিজি হাসপাতাল দফায় দফায় দেখতে যান স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম মন্ত্রিসভায় শ্রম ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করা জহুর আহমেদ চৌধুরীকে।
তখন জহুর আহমেদকে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “রাশিয়ায় লিভারের চিকিৎসা ভালো। তুমি সেখানে চলে যাও। এর বাইরে অন্য কোন দেশেও যদি ব্যবস্থা থাকে সেটা আমরা করবো। তুমি প্রস্তুতি নাও। তোমাকে বিদেশ পাঠাবো।”
এরপর জহুর আহমেদকে চিকিৎসার জন্য রাশিয়ায় পাঠাতে প্রস্তাব দেন বঙ্গবন্ধু। কিন্তু বিনয়ের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন আমৃত্যু আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির শ্রম বিষয়ক সম্পাদক পদে থাকা জহুর আহমেদ চৌধুরী।
তখন বঙ্গবন্ধুকে জহুর আহমদ চৌধুরী বলেছিলেন, “লিডার, আমি দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী। আমি যদি দেশের বাইরে চিকিৎসা করতে যাই, তাহলে আমাদের দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে মানুষের অনাস্থা তৈরি হবে, দেশের ক্ষতি হবে। দেশের সুনাম মর্যাদা রক্ষা করা আমাদের দরকার।”
“কষ্ট হলেও আমি যদি এখানে চিকিৎসা নিয়ে জনগণকে দেখাতে পারি যে, দেশে চিকিৎসা করে আমি ভালো হয়েছি। তাহলে আমাদের দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হবে। এটা আমাদের জন্য একটা বড় অর্জন হবে। যে কারণে আমি বাইরে না গেলে বরং ভালো। আমি আমার দেশেই থাকি, আল্লাহর রহমতে আমি এখানে ভালো হয়ে যেতে পারি।” বঙ্গবন্ধুকে এসব বলে আশ্বস্ত করেছিলেন জহুর আহমেদ চৌধুরী। এসব কথা শুনে বঙ্গবন্ধুও জহুর আহমেদকে আর বিদেশে চিকিৎসার জন্য পাঠাতে পারেননি।
দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা তৈরি হবে- এই ভেবে বিদেশ না যাওয়া জহুর আহমেদ সেই লিভার সিরোসিসেই মারা যান ১৯৭৪ সালের পহেলা জুলাই। বঙ্গবন্ধুর প্রস্তাব মেনে বিদেশ গেলে উন্নত চিকিৎসায় হয়তো তিনি ভালো হতেন। কিন্তু আমৃত্যু জনকল্যাণে নিবেদিত জহুর আহমেদ চৌধুরী সেই সুস্থতা চাননি। জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন দেশের প্রতি তার দরদ, দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি তার মমত্ববোধ।
জহুর আহমেদ চৌধুরী সম্পর্কে অপ্রকাশিত এসব তথ্য একুশে পত্রিকা জেনেছে, তাঁরই পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে।
আজ ১ জুলাই চট্টগ্রামে মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, চট্টলশার্দুল খ্যাত জহুর আহমদ চৌধুরীর ৪৭তম মৃত্যুবার্ষিকী। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সতীর্থ ছিলেন তিনি।
লালদিঘীর ময়দানে বাঙ্গালী মুক্তির সনদ ৬ দফা উত্তাপনের আয়োজনটি যে ক’জন মিলে করেছিলেন তিনি তাদের অন্যতম। প্রাদেশিক পরিষদের তৎকালীন সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি বাঙালির পক্ষে। বঙ্গবন্ধু তাকে করেছিলেন স্বাধীন বাংলার মন্ত্রীপরিষদের সদস্য। মুজিবনগর সরকার কর্তৃক গঠিত আঞ্চলিক কাউন্সিল পূর্ব-দক্ষিণ অঞ্চল-২ চেয়ারম্যানও করা হয়েছিল তাকে।
শুধু তাই নয়, রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির সভাপতি হিসেবে চট্টগ্রামে ভাষা আন্দোলন জোরদারেও অগ্রণী ভূমিকা ছিল। আবার আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখার পাশাপাশি তিনি ১৯৬২ সালে শিক্ষানীতি বিরোধী আন্দোলনে তিনি ছিলেন নেপথ্যে কারিগর।
রাজনীতিক ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক জহুর আহমদ চৌধুরীর জন্ম ১৯১৬ সালে, চট্টগ্রামের উত্তর কাট্টলী গ্রামে। তাঁর পিতার নাম আবদুল আজিজ চৌধুরী এবং মাতা জরিনা বেগম। তিনি নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন।
১৯৪০ সালে মুসলিম লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন জহুর আহমেদ চৌধুরী। ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন প্রক্রিয়ায় আরমানিটোলায় অনুষ্ঠিত প্রথম বৈঠকে তিনি চট্টগ্রামের প্রতিনিধিত্ব করেন।
জহুর আহমদ শ্রমিক রাজনীতির সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। আমিন জুট মিলস শ্রমিক ইউনিয়ন, বার্মা অয়েল মিল শ্রমিক ইউনিয়ন, সিটি ট্রান্সপোর্ট ড্রাইভার অ্যাসোসিয়েশনের শ্রমিকদের নেতৃত্ব দেন তিনি। পাকিস্তান ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের সহকারি সম্পাদক ছিলেন।
জহুর আহমদ ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে চট্টগ্রাম কেন্দ্র থেকে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারীর পর আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। তিনি ১৯৬২-এর শিক্ষানীতি বিরোধী আন্দোলনে রাজনৈতিক সহায়তা প্রদান করেন। ছয়দফার আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন এবং গ্রেফতার হয়ে কারাবরণ করেন।
তিনি উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানকালে চট্টগ্রামের রাজনীতিকে সংগঠিত করেন। ১৯৬৯ সালের ২০ মার্চ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে রাওয়ালপিন্ডিতে অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণ নেন তিনি। জহুর আহমদ চৌধুরী ১৯৭০ সালের নির্বাচনে চট্টগ্রামের কোতোয়ালী আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৭১ সালের মার্চের অসহযোগ আন্দোলনে জহুর আহমদ চৌধুরী চট্টগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি চট্টগ্রামে সংগ্রাম কমিটির সদস্য ছিলেন। পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে চট্টগ্রাম শহরের পতন ঘটলে তিনি চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে ভারতের আগরতলা ফিরে যান। সেখানে ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী শচীন সিংহের বাসভবনে বাংলাদেশের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের বৈঠকে তিনি উপস্থিত ছিলেন।
জহুর আহমদ চৌধুরী স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম মন্ত্রিসভায় শ্রম ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। শ্রমমন্ত্রী হিসেবে তিনি জেনেভায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সম্মেলনে (আইএলও কনভেনশন) বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন।
১৯৭৩ সালের সংসদ নির্বাচনে কোতোয়ালী-পাঁচলাইশ আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিযুক্ত হন জহুর আহমেদ চৌধুরী। মোট চারটি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিযুক্ত হন তিনি।
প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা জহুর আহমদ চৌধুরীর সন্তান মাহতাব উদ্দীন চৌধুরী বর্তমানে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।