বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৮ আশ্বিন ১৪২৮

একুশে পত্রিকা দীপ্তি ছড়াচ্ছে চারদিকে

প্রকাশিতঃ শনিবার, জুলাই ২৪, ২০২১, ৮:৩০ অপরাহ্ণ


হোসেন আবদুল মান্নান : বাইরে শ্রাবণের অঝোরধারা ঝরছে। ঢাকার আকাশ যেন মেঘ-বৃষ্টির চিরায়ত খেলায় মেতেছে। ঋতু বৈচিত্র‍্যের দেশে এ যে প্রকৃতির আশীর্বাদ! ভাবছি, লকডাউনের কঠোরতা ও কার্যকারিতার স্বার্থে ঘরে বসে শব্দের জাল বুননে লিপ্ত থাকাই শ্রেয়। গত রাত থেকেই আমার মনোজগত জুড়ে বিষাদের নীলছায়া নেমে আছে। মুক্তিযোদ্ধা ও একজন সাহসী অথচ সারল্যে-মহত্ত্বে-অকপটে ভরপুর আমাদের সময়ের প্রধান গণসংগীতশিল্পী ফকির আলমগীর -এর অকাল প্রয়াণ হলো।

২.

পাশে অযত্নে পড়ে থাকা সেল ফোনটি হঠাৎ করে আলোকিত হয়ে উঠল। চট্টগ্রাম থেকে কল করেছেন অনুজপ্রতিম ও প্রীতিভাজনেষু সাংবাদিক আজাদ তালুকদার। চমকে উঠি আমি। ক’দিন যাবৎ যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে দেখছি তিনি অসুস্থ। নানাবিধ শারীরিক জটিলতা মোকাবিলা করছেন। ভারতে গিয়ে চিকিৎসার জন্য সরকারি অনুমতিও পেয়েছেন। যা তিনি শুভাকাঙ্ক্ষী ও তাঁর নিত্য শুভার্থিদের জানিয়েছেন। যাক আমার শঙ্কা কেটে গেল।

আজাদ নিজেই তাঁর কথার ভেতরে আমার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক খোঁজ খবর নিতে ভোলেননি। অত্যন্ত বিনয় এবং প্রমিত, পরিশীলিত উচ্চারণে তিনি তাঁর সম্পাদিত ও প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘একুশে পত্রিকা’র দেড় দশক এবং একই পত্রিকার অনলাইন সংস্করণের পঞ্চম বর্ষপূর্তিতে আমার একটি মন্তব্যধর্মী লেখা প্রত্যাশা করেছেন। আমি যে তাঁকে প্রত্যাখান করতে পারব না এমনটি তিনি প্রবলভাবে বিশ্বাস করেন। আমার বিষয়ে তাঁর আস্থার জায়গাটি খুবই মজবুত এক অদৃশ্য ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, আমিও মনে করি।

৩.

ফোন রেখে ভাবছি, যা হোক আজাদের ‘একুশে পত্রিকা’ সম্পর্কে দু’চার কথা বলতে আমার মোটেই কোনও প্রস্তুতির প্রয়োজন নেই। বন্দর নগরী চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা টানা ১৫ বছর অতিক্রম করে চলেছে এবং একই সাথে প্রচার, প্রকাশ, প্রচ্ছদ, মান, রুচি, বিজ্ঞাপন ও ক্রমাগত পাঠকপ্রিয়তা ধরে রেখেছে তা কখনো সামান্য বিষয় হতে পারে না।

আমি আমার সংরক্ষণের ড্রয়ারে হাত রাখলাম। একুশে পত্রিকার পুরোনো কপি খুঁজে বের করেছি। কী আশ্চর্যের বিষয়! গুণে দেখি আমার কাছে মোট একুশটা সংখ্যা আছে একুশে পত্রিকার। যার প্রতি সংখ্যায় আমার ছোট ছোট লেখা কথা বলে যাচ্ছে। অথচ আমি দিব্যি ভুলে বসে আছি। বেশ নস্টালজিক বোধ করছি। দেখলাম, প্রায় সব ক’টা লেখাতেই চট্টগ্রামে চাকরিকালীন বিচিত্র সব ভাবনা প্রতিফলিত হয়েছে।

চট্টগ্রাম থেকে আমার বিদায়কালে “বিদায় চট্টলা” শিরোনামে একটি আবেগঘন লেখা পোস্ট দিয়েছিলাম। পরের সপ্তাহে প্রকাশিত সংখ্যায় আজাদ লিখেছেন, “একজন প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীর জন্য ভালোবাসার নহর”। গত ফেব্রুয়ারি মাসে আমার গ্রামের বাড়িতে কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাসী হামলা হলে নিমিষে সারাদেশে নিন্দার ঝড় উঠে। আজাদ লিখেছিলেন, “লেখক হোসেন আবদুল মান্নান-এর ওপর আঘাত পতনোন্মুখ সময়ের সাইরেন”।

৪.

সম্পাদক আজাদকে আমি চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক থাকার সময় থেকেই চিনি। তখন তিনি একটি ইলেকট্রনিক মিডিয়ার একজন উদীয়মান তরুণ রিপোর্টার। এ ছাড়াও তিনি একাধিক প্রিন্ট মিডিয়া, দৈনিক বা মাসিক পত্রিকায় কাজ করেছেন বলে জানতাম। তাঁর বর্তমান কমিটমেন্ট বা নিজেকে বিলীন করে দেওয়া, নিখুঁত, নির্ভুলভাবে উপস্থাপনার কৌশল ভবিষ্যতেও শিক্ষিত পাঠকশ্রেণিকে টানবে বলে আমার দৃঢ় মত।

৫.

২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিভাগীয় কমিশনার, চট্টগ্রাম হিসেবে আমার যোগদান আর মায়ানমার সরকারের  হত্যাযজ্ঞ, আগুনসন্ত্রাস ও নিপীড়নের শিকার হয়ে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশের কক্সবাজার এলাকায় অনুপ্রবেশ যেন একাকার হয়ে যায়। মাসে কয়েকবার আমাকে উখিয়া-টেকনাফ যেতে হয়েছিল। সে সময় রাখাইন থেকে প্রাণভয়ে বিতাড়িত এক যুবতী মা টেকনাফের নাফনদীর তীর ধরে হাজারো নরনারীর সঙ্গে অজানা অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ছুটে আসছিল। সে হতভাগিনী মা বুঝতেও পারেনি তার বুকে জড়িয়ে থাকা শিশুপুত্রটি অনেক আগেই মৃত্যুবরণ করেছে। পথিমধ্যে যখন সে সম্বিত ফিরে পেল এবং শিশুটির মৃত্যু নিশ্চিত হল; তখনকার সেই করুণ ব্যথাতুর দৃশ্য সেখানকার আকাশ বাতাসকে ভারী করে তুলেছিল।

জানা যায়, বার্তাসংস্থা এপি’র এক বিদেশি ফ্রি-ল্যান্স ফটো জার্নালিস্ট এটি ধারণ করেছিলেন। পত্রিকার সচিত্র  প্রতিবেদনটি সেদিন আমাকে বেদনার্ত ও অশ্রুসিক্ত করে তুলেছিল। পরদিন আমার এই অনুভূতি চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী ‘দৈনিক আজাদী’ এবং আজাদ তালুকদার এর ‘একুশে পত্রিকা’ ছাপিয়ে দেয়। সেই থেকে চট্টগ্রামে আমার লেখালেখি এবং অনেকের মধ্যে আজাদ তালুকদারের নজরবন্দি হয়ে থাকি।

৬.

জানলাম, তাঁর একুশে পত্রিকার অনলাইন সংস্করণের বয়সও পাঁচ হয়েছে। শিশুকাল হলেও মনে হয় যথেষ্ট বুদ্ধির দীপ্তি ছড়াচ্ছে চারদিকে। খবরে মাঝে মধ্যে যেমন শুনি পাঁচ বছরের শিশুকে প্রফেসরের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, নিবেদিতপ্রাণ, পরিশ্রমী ও সাহসী সংবাদকর্মী আজাদকে পূর্বানুমতি দেওয়ায় বিনাবাক্যেই তিনি আমার ফেইসবুক সাহিত্য-সংস্কৃতির গল্পগুলো তাঁর নতুন ভুবনে নিরন্তর স্থান সংকুলান করে চলেছেন। মান, সম্মানবোধ, মর্যাদা, আত্মসমালোচনা আর ইতিবাচক পরিবর্তনের নিত্য-বাহক হয়ে বেঁচে থাক ‘একুশে পত্রিকা’।

শনিবার
৯ শ্রাবণ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ।

হোসেন আবদুল মান্নান গল্পকার, প্রাবন্ধিক