
জিন্নাত আয়ুব, আনোয়ারা (চট্টগ্রাম) : বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি সংলগ্ন বেসরকারি কর্ণফুলী ড্রাই ডক জেটিতে খালাস হচ্ছে আমদানি করা স্ক্র্যাপ। এরপর এসব স্ক্র্যাপ ট্রাকে ভরে মেরিন একাডেমি সড়ক, সিইউএফএল সড়ক ও চাতরী চৌমুহনী বাজারের পিএবি সড়ক হয়ে বিভিন্ন স্টিল মিলে নেয়া হচ্ছে।
স্ক্র্যাপ বহন করা ১০ থেকে ১২ টন ওজনের এসব ট্রাক আনোয়ারার যে সড়কগুলোতে চলাচল করছে, সেই সড়কগুলো লোড নিতে পারে ৫ থেকে ৭ টন ওজন- এই তথ্য আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী প্রকৌশলী তাসলিমা জাহানের।
এরপরও ভারি যান চলাচল করায় সড়কগুলোর এখন বেহাল অবস্থা। সড়কের বিভিন্ন স্থানে খানাখন্দ সৃষ্টি হয়েছে। এতে ছোটখাটো দুর্ঘটনার পাশাপাশি ভোগান্তি পোহাচ্ছে মানুষ।
অথচ সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ এর ৩২(২) ধারায় উল্লেখ আছে, “কোনো মোটরযান দ্বারা চালক, যাত্রী, সড়ক ব্যবহারকারী বা সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকিলে, সরকার বা, সরকারের পূর্বানুমোদনক্রমে, কর্তৃপক্ষ, উক্ত মোটরযান বা কোনো শ্রেণির মোটরযানকে সড়ক হইতে প্রত্যাহার বা সড়কে চলাচল বন্ধের নির্দেশ প্রদান করিতে পারিবে।”
একই আইনের ৪৩(৭) ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, “অনুমোদিত লেডেন ওজন, ট্রেইন ওজন বা এক্সেল ওজন এর অতিরিক্ত ওজন বহন করিয়া কোনো মোটরযান সড়ক, মহাসড়ক, সেতু, কালভার্ট, বেইলি ব্রিজ, সড়কের ডিভাইডার, সড়ক বা মহাসড়কের পার্শ্বস্থ অবকাঠামো ইত্যাদির ক্ষতিসাধন করিলে, সংশ্লিষ্ট মোটরযানের মালিক ও চালক সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ক্ষতিপূরণ ৩ (তিন) মাসের মধ্যে পরিশোধ করিতে বাধ্য থাকিবে।”
সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী, আনোয়ারার গ্রামীণ সড়কগুলোতে ভারি যান চলাচল প্রশাসন নিষিদ্ধ করতে পারে। এমনকি সড়কের ক্ষতি করায় জরিমানা করারও সুযোগ আছে। কিন্তু তা না করে প্রশাসনের সংশ্লিষ্টরা হাত গুটিয়ে বসে আছেন। ফলে সড়কগুলো দ্রুত নষ্ট হচ্ছে।

সোমবার সরেজমিন দেখা যায়, মেরিন একাডেমি সড়ক ও সিইউএফএল সড়ক থেকে চাতরী চৌমুহনী বাজারের পিএবি সড়ক পর্যন্ত স্ক্র্যাপ বহন করা ট্রাকগুলোর লম্বা লাইন। এই ভারি গাড়িগুলোর চাপে সড়কে ঠিকমতো চলাচল করতে পারছে না সাধারণ যাত্রীবাহী যানবাহন।
স্ক্র্যাপবাহী ট্রাকগুলোকে ওজনসীমার অতিরিক্ত মালামাল পরিবহন করতেও দেখা গেছে। অতিরিক্ত স্ক্র্যাপ বোঝাই একাধিক ট্রাক সড়কের বিভিন্ন জায়গায় নষ্ট হওয়ায় সোমবার দীর্ঘ যানজটও দেখা গেছে।
আনোয়ারার গ্রামীণ সড়কে এভাবে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হলেও প্রশাসন নির্বিকার রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
আনোয়ারার বাসিন্দা খোরশেদ মানিক বলেন, ‘স্ক্র্যাপ বহন করা ট্রাকগুলো সাধারণ মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। বেপরোয়া চলাচল করায় বেড়েছে দুর্ঘটনাও। এসব দেখার যেন কেউ নেই। যত দুর্ভোগ সাধারণ মানুষের।’
বাসচালক নবী হোসেন বলেন, ‘ভারি ট্রাকগুলোর কারণে যানজট লেগে থাকে সারাক্ষণ। তাছাড়া বেপরোয়া চলাচল, যেখানে ইচ্ছা সেখানে দাঁড়িয়ে থাকে। একসাথে অনেকগুলো ট্রাক বের হওয়ার কারণে যানজট তৈরি হয়। কিছু বললে এসব গাড়ির চালকরা ক্ষমতা দেখায়।’
মেরিন একাডেমি এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা আবছার উদ্দীন বলেন, ‘মেরিন একাডেমি সড়কের পাশে পানি যাওয়ার জন্য ড্রেন ছিল। কর্ণফুলীর ড্রাই ডক থেকে আসা স্ক্র্যাপবাহী ট্রাকগুলোর জন্য ওই ড্রেনটি ভরাট করে রাস্তা করা হয়েছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতে এলাকায় পানি জমে যাচ্ছে। তাছাড়া এসব অতিরিক্ত ওজনের ট্রাকের চলাচলে সড়কে সদ্য করা কার্পেটিং পর্যন্ত দেবে গেছে।’
স্থানীয় একজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এসব ভারি গাড়ি চলাচলের সুযোগ করে দিয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল। তারা স্ক্র্যাপবাহী গাড়িগুলো লোড-আনলোড করে রাতারাতি বড় লোক হতে গিয়ে উপজেলার সাধারণ মানুষকে এমন দুর্ভোগে ফেলে দিয়েছে। যত অনিয়ম, দুর্নীতি আছে এরা সব করে যাচ্ছে। এসব দেখার যেন কেউ নেই।’
জানতে চাইলে আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী প্রকৌশলী তাসলিমা জাহান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আনোয়ারায় সড়কগুলো ৫ টনের বেশি ওজনের যানবাহন চলাচলের উপযোগী নয়। সদ্য কার্পেটিং করা মেরিন একাডেমী সড়কটি গ্রামীণ সড়ক। সড়কটি ৫ হতে ৭ টনের বেশি ওজনের গাড়ি চলার উপযোগী নয়। অথচ এই সড়ক দিয়ে ৩০ থেকে ৪০ টনের গাড়ি পর্যন্ত চলাচল করছে। এরকম হলে তো সড়ক টেকসই হবে না।’
এদিকে স্ক্র্যাপবাহী ট্রাকগুলো সিইউএফএল সড়ক দিয়েও চলাচল করছে। জানতে চাইলে সিইউএফএল’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুর রহিম বলেন, ‘সিইউএফএল সড়কটি দিয়ে ১০ হতে ১২ টনের পণ্যবাহী যান চলাচলের উপযোগী। কিন্তু এই সড়ক দিয়ে বিভিন্ন কারখানার ৩০ থেকে ৪০ টন ওজনের গাড়ি চলাচল করছে। ফলে আমাদের সড়কটি ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিষয়টি আমরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকেও অবহিত করেছি।’
আনোয়ারা চাতরী চৌমুহনী বাজারের ট্রাফিক পুলিশ বক্সের ইনচার্জ টিআই হাবিব হাসান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘এটা সত্য যে, স্ক্র্যাপবাহী গাড়িগুলোর বেপরোয়া চলাচলের কারণে জনগণের দুর্ভোগ বেড়েছে। এই গাড়িগুলোর অনেক চালক নিয়মনীতির তোয়াক্কা করে না। তাদেরকে আইনের আওতায় আনতে আমরা তৎপর আছি।’
এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (বর্জ্য ও রাসায়ন পদার্থ ব্যবস্থাপনা) রোজিনা বেগম বলেন, মাত্রাতিরিক্ত ওজন নিয়ে যানবাহন চলাচল করলে কার্বন নি:সরণ হয় বেশি, ফলে পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাছাড়া শিল্প কারখানার পণ্যবাহী পরিবহনগুলোর চলাচলে কিছু বিধিনিষেধ রয়েছে। এসব তদারকি করবেন স্ব স্ব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণ।’
জানতে চাইলে আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ জুবায়ের আহমেদ একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘স্ক্র্যাপ বহন করা ট্রাকগুলোর ব্যাপারে ইতিমধ্যে কর্ণফুলী ড্রাই ডক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদেরকে একটা সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হবে। ওই সময়ের মধ্যে ট্রাকগুলো চলাচল করতে পারবে। এছাড়া এক্সেল লোড নীতিমালা অনুসারে স্ক্র্যাপ বহন করতে হবে। আইন সবার জন্যই সমান। অমান্য করলে ব্যবস্থা নেব।’