মঙ্গলবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২২, ৫ মাঘ ১৪২৮

চট্টগ্রামে করোনা পরীক্ষার নামে ভয়ঙ্কর বাণিজ্য!

প্রকাশিতঃ শুক্রবার, আগস্ট ১৩, ২০২১, ১২:২২ অপরাহ্ণ

মোহাম্মদ রফিক : স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে বিনা বেতনে যে ব্যক্তি সেবা দান করেন, তিনি স্বেচ্ছাসেবক। এই স্বেচ্ছাসেবা ও মানুষের অনুদানের উপর নির্ভর করে গত বছরের ১৩ জুন হালিশহরে দ্য প্রিন্স অব চিটাগাংয়ে গড়ে উঠেছিল চট্টগ্রাম করোনা আইসোলেশন সেন্টার। তখন প্রতিষ্ঠানটিতে ভর্তি থাকা রোগীদের নমুনা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ল্যাবে পরীক্ষা করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন সিভিল সার্জন।

তিন মাস করোনা রোগীদের সেবা দিয়ে প্রায় এক বছর আগে করোনা আইসোলেশন সেন্টার, চট্টগ্রামের কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়। কিন্তু বন্ধ হয়ে যাওয়া উক্ত প্রতিষ্ঠানটির আইডি ব্যবহার করে এখনো প্রতিদিন ৪০-৫০ জনের বাসায় গিয়ে করোনার নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে; আর রোগীর কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে এক থেকে তিন হাজার টাকা।

এভাবে স্বেচ্ছাসেবার নামে একটি চক্র করোনা রোগীদের কাছ থেকে প্রতিদিন ৪০ হাজার টাকা থেকে লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ ওঠেছে। সবকিছুই করা হচ্ছে অতি গোপনে। বাসায় গিয়ে করোনার নমুনা সংগ্রহের সুযোগের বিষয়ে করোনা আইসোলেশন সেন্টার, চট্টগ্রামের ফেসবুক পেইজ বা গ্রুপে কোনও ধরনের পোস্ট দেখা যায়নি।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম করোনা আইসোলেশন সেন্টার বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি সিভিল সার্জনের মাধ্যমে চবি কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু আইসোলেশন সেন্টারটির সঙ্গে যুক্ত একটি পক্ষ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজসে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা অব্যাহত রাখছে।

যদিও নিয়ম অনুযায়ী, সরকারিভাবে সংগ্রহ করা নমুনাগুলো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়। কিন্তু বন্ধ হয়ে যাওয়া করোনা আইসোলেশন সেন্টার, চট্টগ্রাম এর আইডি ব্যবহার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে এখনো পরীক্ষা অব্যাহত আছে।

গত ১ আগস্ট করোনা আইসোলেশন সেন্টার, চট্টগ্রাম এর আইডি ব্যবহার করে সংগ্রহ করা ৬৮ জনের নমুনা পরীক্ষা করেছিল চবি ল্যাব; এর মধ্যে ৪০ জনের করোনা পজিটিভ পাওয়া গিয়েছিল।

জানা গেছে, নগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম রনির অনুসারী হিসেবে পরিচিত তাজুল ইসলাম শিবলী ও ঐশিক পাল জিতু নামের দুই তরুণ বাসায় গিয়ে করোনার নমুনা সংগ্রহ করে আসছেন। যদিও নমুনা সংগ্রহ করতে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই বলে অভিযোগ আছে। এরপরও তারা নমুনা সংগ্রহ করছেন এবং সেগুলো চবির ল্যাবে পাঠাচ্ছেন।

টাকার বিনিময়ে বাড়িতে গিয়ে নমুনা সংগ্রহ এবং করোনা পরীক্ষা করানোর অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে বেসরকারি একটি ব্যাংকের নিরাপত্তারক্ষী আশরাফ আলীর (৫৩) কাছে। আনোয়ারা উপজেলার বাসিন্দা আশরাফের নমুনা বিশ^বিদ্যালয় ল্যাবে (আইডি নং ২১০৭২৫-১৩১) গ্রহণ করা হয় গত ২৪ জুলাই। ২৫ জুলাই প্রকাশিত ফলাফলে আশরাফ আলীর করোনা ‘নেগেটিভ’ আসে।

আনোয়ারার বাড়িতে গিয়ে নমুনা সংগ্রহ এবং করোনা পরীক্ষা করানোর বিনিময়ে তিন হাজার টাকা তাজুল ইসলাম শিবলী নিয়েছেন বলে একুশে পত্রিকাকে জানান আশরাফ আলী। আশরাফ আলী বলেন, ‘এর আগের পরীক্ষায় আমার করোনা পজিটিভ আসে। ২৫ জুলাইয়ের পরীক্ষায় আমার করোনা নেগেটিভ এসেছে। আপনি করোনা পরীক্ষা করতে চাইলে আমি শিবলীর মোবাইল নম্বর দিচ্ছি, আপনি যোগাযোগ করুন। টাকা-পয়সার বিষয়টি তার কাছ থেকে শুনবেন। হয়তো সাড়ে তিন হাজার টাকা লাগতে পারে।’

একই দিনের ফলাফলে করোনা ‘পজিটিভ’ আসে নগরের হালিশহরের বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসিন্দা শাহ আলমের (৬৫)। বাসায় গিয়ে নমুনা সংগ্রহ এবং করোনা টেস্ট করানোর জন্য তাজুল ইসলাম শিবলী ও ঐশিক পাল জিতু এক হাজার টাকা নিয়েছেন বলে জানান শাহ আলম।

এর আগে দুজন ‘রোগীর’ আত্মীয় সেজে তাজুল ইসলাম শিবলীর সঙ্গে বৃহস্পতিবার (১২ আগস্ট) সকাল ৯টা ১৯ মিনিটে মুঠোফোনে কথা বলেন নগরের বসবাসরত এক যুবক। ওই যুবকের সঙ্গে কথোপকথনের এক পর্যায়ে শিবলী বলেন, ‘নাম-ঠিকানা মেসেজ করে পাঠিয়ে দেন। বাড়িতে আমার লোক যাবে।’ এরপর ওই যুবক বলেন, ‘ভাইয়া খরচপাতি কী লাগবে’। জবাবে শিবলী বলেন, ‘এক হাজার টাকা।’ যুবকটি ফের বলেন, ‘ভাইয়া, দুজন আছেন’। এরপর শিবলী বলেন, ‘দুই হাজার টাকা।’

তবে বাসায় গিয়ে করোনা পরীক্ষার জন্য টাকা গ্রহণের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তাজুল ইসলাম শিবলী। তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমরা মানবতার জন্য কাজ করছি। দুঃসময়ে যখন কোনো ডাক্তার, নার্স বা স্বাস্থ্যকর্মী করোনা আক্রান্ত রোগীর ধারে কাছে যায়নি তখন আমরা ছুটে গিয়েছি। আমরা এখনও শহর কিংবা অজপাড়া গাঁয়ে হতদরিদ্রদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করছি। এরমধ্যে অনেক স্বচ্ছল ব্যক্তিবর্গও আছেন। কেউ হয়তো আমাদের মানবিক কর্মকাণ্ডে খুশি হয়ে সামান্য কিছু টাকা দিচ্ছে। তবে কারো কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহ ও করোনা পরীক্ষার নামে টাকা নেওয়া হচ্ছে না। কেউ খুশি হয়ে হাত খরচের কিছু টাকা দিলেও সেগুলো নিজেদের পকেটস্থ করছি না। সেগুলো জমিয়ে করোনায় আক্রান্ত রোগীর জন্য অক্সিজেন সিলিন্ডার কিনছি।’

এব্যাপারে অভিযুক্ত ঐশিক পাল জিতুর সাথে কথা বলার চেষ্টা করে প্রতিবেদক। কিন্তু তিনি সাড়া দেননি।

টাকার বিনিময়ে করোনা পরীক্ষা প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন সেখ ফজলে রাব্বি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কেউ করোনা পরীক্ষার জন্য টাকা আদায় করছে কিনা, বিষয়টি আমি খোঁজ নিয়ে দেখব। এরপর ব্যবস্থা নেব।’

বন্ধ হয়ে যাওয়া হালিশহর করোনা আইসোলেশন সেন্টারের আইডি ব্যবহার করে টাকার বিনিময়ে কোভিড টেস্ট করার বিষয়টি শুনে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাসান শাহরিয়ার কবীর।
শুক্রবার সকালে তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আশ্চর্য, এটা তো আমি জানি না। হালিশহর ‘প্রিন্স অব চিটাগং’ কমিউনিটি সেন্টারের আইসোলেশন সেন্টারটি আমারা অফিসিয়ালি বন্ধ করে দিয়েছি প্রায় এক বছর আগে। সেটির আইডি ব্যবহার করে কভিড টেস্টের নামে টাকা কামানোর বিষয়টি আমি এখন জানলাম।’

এভাবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের গ্রুপসহ অন্তত ছয়টি সংস্থা বিনামূল্যে নমুনা সংগ্রহের জন্য আমার কাছে অনুমতি চেয়েছিল। তাদের আবেদনগুলো এখনো পড়ে আছে। আমি অনুমিত দিইনি। তাদের বলেছি, নমুনা সংগ্রহের জন্য সরকারি ব্যবস্থাপনাই যথেষ্ট। কারণ মানবসেবার নামে টাকা কামানোর বিষয়টি চলে আসবে। আর এটা নিয়ে জনমনে নেতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি হবে। যাই হোক, হালিশহর করোনা আইসোলেশন সেন্টারের আইডি ব্যবহার করে যারা এসব করছে তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ – যোগ করেন ডা. হাসান শাহরিয়ার কবীর।

এ প্রসঙ্গে সিএমপি’র উপ-কমিশনার (পশ্চিম) আব্দুল ওয়ারিশ একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বাড়ি গিয়ে কেউ নমুনা সংগ্রহ করে অতিরিক্ত টাকা নিলে সেটা দেখবেন চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন। হ্যাঁ, যারা নমুনা সংগ্রহ করছেন তারা মানবসেবার নামে যদি ক্রিমিনাল অফেন্স করেন তখন বিষয়টি দেখবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনী।’

বন্ধ থাকা করোনা আইসোলেশন সেন্টারের আইডি ব্যবহার করে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা এবং নমুনা পরীক্ষার বিনিময়ে টাকা আদায় করা প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের করোনা শনাক্তকরণ ল্যাবের ইনচার্জ প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল ফোরকান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘করোনা আইসোলেশন সেন্টারটি বন্ধ হলেও করোনা পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদের কাছে চিঠি দিয়েছিলেন চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন। এখন কেউ যদি করোনা পরীক্ষার নামে কারো কাছ থেকে টাকা-পয়সা নেয়, সেটি আমাদের দেখার বিষয় না।’

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে করোনা আইসোলেশন সেন্টার চট্টগ্রামের প্রধান সমন্বয়ক নুরুল আজিম রনি ও প্রতিষ্ঠানটির মুখপাত্র অ্যাডভোকেট জিনাত সোহানা চৌধুরীর মুঠোফোনে বৃহস্পতিবার একাধিকবার কল করা হলে তারা রিসিভ করেননি; খুদেবার্তা পাঠিয়েও তাদের সাড়া পাওয়া যায়নি। জানা সম্ভব হয়নি প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোক্তা মো. সাজ্জাত হোসনের বক্তব্যও।