বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৮ আশ্বিন ১৪২৮

পরীমনির জন্য প্রার্থনা

প্রকাশিতঃ রবিবার, আগস্ট ১৫, ২০২১, ১১:১৭ পূর্বাহ্ণ

শান্তনু চৌধুরী : অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, দেশ এখন তিন ভাগে বিভক্ত। এক ভাগ পরীমনির পক্ষে, অপরভাগ পরীমনির বিপক্ষে। আরেকভাগ মাঝামাঝি অবস্থানে। এরা জুতা আবিষ্কারের মন্ত্রীর মতো, ‘আমারও ছিল মনে’ টাইপের। পাল্লা যেদিকে ভারী সেদিকে ঝুঁকবে। যেহেতু পরীমনি এখন বিত্তশালীদের টার্গেট তাই এ বিষয়ে কথা বলা কিছুটা রিস্কি। তবে তাকে এমন কিছু অপরাধে অভিযুক্ত করা হয়েছে যেগুলো খুব শক্তিশালী নয় বলে ইতোমধ্যে বাঘা বাঘা আইনজীবীরা বলেছেন। কাজেই সাহস নিয়ে আমরা নেটে পাওয়া একটা প্রচলিত কৌতুক দিয়ে শুরু করতে পারি।

একটি মামলায় স্বাক্ষী হিসেবে মুকুল খালার ডাক পড়েছে। আসামিপক্ষের উকিল বিজন মজুমদার খালাকে ঘাবড়ে দেবার জন্য প্রথমেই জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি আমায় চেনেন?’

মুকুল খালা : চিনব না কেন, তুমি তো বিজন। তোমায় ল্যাংটা বয়স থেকেই চিনি আমি। পুরো বখে যাওয়া ছেলে ছিলে। মিথ্যা কথা বলতে। লোক ঠকানোয় ওস্তাদ ছিলে। আরো অনেক গুণ তোমার ছিল, সে সব আর বলছি না সবাইকে শুনিয়ে। নিজেকে মস্ত কেউকেটা ভাবতে, যদিও কানাকড়ির মুরোদ ছিল না। তোমাকে আমি ভালোই চিনি।

বিজন বাবু স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। ভেবে পাচ্ছিলেন না কী করবেন? কোর্টের অপর প্রান্তে বাদী পক্ষের উকিল হারুন খানের দিকে অঙুলি নির্দেশ করে বললেন, ‘ওনাকে চেনেন?’

মুকুল খালা : ওমা চিনব না কেন? ওতো হারুন। ওরে খুব ভালো করেই চিনি। অলস-অকর্মণ্য। কারো সাথে সদ্ভাব নেই। পাঁড় মাতাল। শহরের সবচেয়ে পিশাচ উকিল। বউয়ের চোখে ধুলো দিয়ে তিনটে ছুঁড়ির সাথে ফষ্টিনষ্টি করে। তাদের একজন আবার তোমার বউ। ওরে আমি ছোট থেকেই চিনি।

বিবাদী পক্ষের উকিল রীতিমত অসুস্থবোধ করতে লাগলেন। এমন সময় জজ সাহেব দুই উকিলকে কাছে ডাকলেন। উকিলদ্বয় কাছে যাবার পর নিচু গলায় শান্তস্বরে জজ সাহেব বললেন, দুই গর্দভের একজনও যদি ওই মহিলাকে প্রশ্ন করো যে আমায় চেনে কিনা তাহলে তোমাদের আমি ফাঁসিকাষ্ঠে চড়াব।

এটি নিছকই কৌতুক। এর সঙ্গে পরীমনির যারা ঘনিষ্ঠ ছিলেন তাদের নাম প্রকাশ না করার যে কথা পুলিশ বলেছে তার কোনো সম্পর্ক নেই। পরীমনিকে আটক করে নিয়ে যাওয়ার পর কয়েকদিনে গণমাধ্যম থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এতো বেশি চর্চা হয়েছে এ নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই।

তাহলে এবার কবিতার কথা বলি। রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত কবিতা- ‘দুই বিঘা জমি’। এক জমিদার মিথ্যা মামলা দিয়ে চুরি করে নিয়েছিল দরিদ্র উপেনের দুই বিঘা জমি। সর্বহারা হয়ে উপেন বহুদিন নানা জায়গা ঘুরেফিরে এসেছিল তার নিজ গ্রামে। সেই জমিতে, যা জমিদারবাবু মিথ্যা ডিক্রি জারি করে দখল করেছে, বলা যায় চুরি করেছে। উপেন তারই জমিতে আমগাছতলায় বসে ছিল। দুটো পাকা আম তার কোলের ওপর পড়লে জমিদারবাবু ও তার লোকজন হইহই শুরু করে। উপেনকেই চোর সাব্যস্ত করেছিল।

দুঃখভারাক্রান্ত মনে উপেন বলেছিল, ‘তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে’। আজকের দিনের কোনো কোনো ক্ষমতাধর ব্যক্তি সেই যুগের জমিদারদের চেয়েও বেশি ক্ষমতাবান এবং দুর্নীতি, মিথ্যাচার ও অন্যায়-অত্যাচারের দিক দিয়ে সেকালের জমিদারদেরও হার মানায়।

সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি আর আন্ডারওয়ার্ল্ডের মধ্যে জৈবিক সম্পর্ক আসলেই কিংবদন্তি। একটির সাথে অপরটির যোগাযোগ নিবিড়। এছাড়া বাংলাদেশে যে নব্য ধনিকশ্রেণি গড়ে উঠেছে তারাতো সিনেমা জগতের নারীদের ‘গণিমতের মাল’ই মনে করেন। তাই সেখানে নিয়মিত দ্বন্দ্ব যেমন হয়, তেমনি কাড়াকাড়িও লাগে। আর হিসেবের একটু ব্যতিক্রম হলেই পরীমনিদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয় মদ রাখার অভিযোগে। অথচ এই ধনিকশ্রেণির প্রতি বাড়িতে বাড়িতে চার্চ করলেই পাওয়া যাবে এমন মিনি বার।

পরীমনির চৌদ্দগুষ্টির নাম ইতোমধ্যে সকলেই জেনেছেন এরপরও লেখার স্বার্থে আরেকটু বলি। তার আসল নাম স্মৃতি। ছোটবেলায় তার মা আগুনে পুড়ে দীর্ঘ দুই মাস ভুগে মারা যান। এরপর মারা যায় পরীমনির বাবা। তাঁর মৃত্যুও স্বাভাবিক নয়। ব্যবসায়িক কারণে তিনি প্রতিপক্ষের হাতে খুন হন। অতএব বাংলা সিনেমার মতো পরীমনি খুব শৈশবে এতিম হয়ে যায়। পরীমনি পালিত হন নানার সংসারে। বরিশালের একটি স্কুল থেকে সে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পায়। এর আগে কেউ এই স্কুল থেকে বৃত্তি পায়নি। শুধু তাই নয়, এখন পর্যন্ত ওই স্কুল থেকে আর একজন শিক্ষার্থীও বৃত্তি পায়নি। এমন মেয়ে যখন সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে চায় তখন পদে পদে বাধা এসে দাঁড়ায়। এর মধ্যে যদি সে তারকা হয় তবে তো কথাই নেই।

এছাড়া পরীমনির ফ্যান, ফলোয়ার বেশি। আমেরিকার প্রখ্যাত বিজনেস ম্যাগাজিন ফোবস যে একশো ডিজিটাল নারীর তালিকা প্রকাশ করেছে তার মধ্যে রয়েছে পরীমনির নাম। তবে একথা ঠিক যে বিত্তশালীদের না ঘাটালে পরীমনির এই পরিণতি হতো না। যেমনটি সালমান শাহর মৃত্যু আত্মহত্যা ছিল, নাকি হত্যাকা- ছিল; সোহেল চৌধুরীকে প্রকাশ্যে কারা কেন গুলি করে হত্যা করেছিল, হত্যাকারীরা কীভাবে এখনও বিচারের ঊর্ধ্বে আছে; এই দুই মৃত্যুতে আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের কতটুকু ভূমিকা ছিল; মডেল তানিয়া মাহবুব তিন্নি হত্যামামলার একমাত্র আসামি সাবেক সাংসদ গোলাম ফারুক অভি কখনও দেশে ফিরবেন কিনা, কখনও তার বিচার হবে কিনা এসব এখনো রহস্য।

মুম্বাইয়ের এক সুন্দরী মারোয়াড়ি এক ব্যবসায়ীর ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার পর বিদায় নিতে হয় চলচ্চিত্র জগত থেকে। তার রূপের দেমাগ ছিল। ক্লাবে যেত, মদ, ড্রাগসও সেবন করত এক-আধটু। মুম্বাইয়ের এক ধনী ব্যবসায়ীর ছেলে তাকে বাসায় পার্টিতে ডেকে নিয়ে শ্নীলতাহানির চেষ্টা করেছিল। চন্দ্রাবতী বাসায় ফিরে ওই মাড়োয়ারিপুত্রের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল। সেও পরীমণির মতো মাড়োয়ারিপুত্রের শক্তির সীমা বুঝতে পারেনি। ওই মাড়োয়ারি রাজনৈতিক ক্ষমতারও অধিকারী ছিল।

শহরের এক পুলিশপ্রধানের সঙ্গে তার ছিল গোপন ব্যবসায়ের পার্টনারশিপ। পুলিশই ওই নায়িকার বিরুদ্ধে চক্রান্তটা সাজায়। তার বাসায় আর দশজন নায়িকার মতো মদের বোতল ছিল। পুলিশ তার সঙ্গে আরও মদের বোতল এবং মাদকদ্রব্য গোপনে বাড়িতে জমা করে। তারপর আকস্মিকভাবে ওই বাড়িতে পুলিশের হামলা। সাংবাদিকদের ডেকে দেখানো হলো মাদকদ্রব্য এবং যৌনক্রিয়ার নানা সরঞ্জাম। তাকে গ্রেপ্তার করা হলো। কলঙ্কের বোঝা মাথায় নিয়ে মেয়েটিকে সিনেমা জগৎ থেকে বিদায় নিতে হলো। কলঙ্ক ও দারিদ্র্য নিয়ে তাকে বাকি জীবনটা কাটাতে হয়েছে।

উপমহাদেশে বলিউড নায়িকা মমতা কুলকার্নি বিয়ে করেন মাফিয়া লিডার বিবেক গোস্বামীকে। সুন্দরী প্রতিযোগী অনীতা আইয়ুবের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল কুখ্যাত দাউদ ইব্রাহিমের। অনীতাকে সিনেমার চরিত্রে না নেওয়ার রাগে দাউদ এক পরিচালককে হত্যাও করেন। জনপ্রিয় অভিনেত্রী দিব্যা ভারতীর মৃত্যু নিয়েও রয়েছে রহস্য। মন্দাকিনীর সঙ্গেও দাউদ ইব্রাহিমের সম্পর্ক নিয়ে চটুল গল্প রয়েছে। সঞ্চয় দত্ত তো মুম্বাই বিস্ফোরণে জড়িত থাকার অভিযোগে জেলও খেটেছেন। হলিউড বিশ্ববিখ্যাত অভিনেত্রী মেরেলিন মনরো খুন হন মাফিয়াদের হাতে।

গুজব আছে, মেরিলিনের প্রেমিক প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি মাফিয়াদের বিরুদ্ধে যাওয়ায় তারা প্রতিশোধ নেয় মেরিলিনের শরীরে বিষ প্রয়োগে হত্যার মাধ্যমে। মনরোকে নিয়ে নিকারাগুয়ার কবি ও বিপ্লবী এর্নেস্তো কার্দেনালের বিখ্যাত ‘মেরেলিন মনরোর জন্য প্রার্থনা’ কবিতাটির কয়েকটি লাইন এখানে তুলে ধরা যায়। যেটি অনুবাদ করেছেন পারভেজ চৌধুরী।

‘পাপ আর তেজস্ক্রিয়তায় পঙ্কিল নশ্বর এ চরাচর।
এসবের জন্যে দোকানের এই তরুণ কর্মচারীর উপর দোষ চাপাতে পারো না
যে অন্যদের মতোই স্বপ্ন দেখেছে একদিন তারকা হবে।
স্বপ্ন তার সত্যি হয়েছে শেষাবধি। (কিন্তু এটা টেকনোকালার বাস্তবতার মতো)
যেভাবে আমরা চিত্রনাট্য দিয়েছি, সে অভিনয় করেছে শুধু;
গল্পটা সাদামাটা, অর্থহীন কিন্তু জীবন থেকে নেওয়া।
দয়াল, ক্ষমা করো তাঁকে।
বিংশ শতাব্দীতে বিশাল এই রিয়েলিটি শো নির্মাণের পেছনে যারা কাজ করেছি
তাদেরও ক্ষমা করো।
হতাশগ্রস্থ, প্রেম-কাঙাল মেয়েটার হাতে মনোচিকিৎসকের পরামর্শে
ভালোবাসাময় অর্ন্তচুক্তির বদলে তুলে দিয়েছি চেতনানাশক’।

পরীমনিকে নিয়ে বাংলাদেশের অন্যতম কবি নির্মলেন্দু গুণ বলেছেন, ‘ওর সুন্দর মুখ থেকে চোখ ফেরানো কঠিন। সৌন্দর্যের একটা সুষম বিকাশ আছে ওর দেহাবয়বে’। হয়তো আপনা মাংসে হরিণা বৈরী! এতো সুন্দর বলেই তার পেছনে এতো শত্রু। সে আনন্দে বাঁচতে চেয়েছে বলেই তাকে নষ্টজন্ম প্রমাণ করতে এতো আয়োজন। পরীমনির জন্য প্রার্থনা। দোষী প্রমাণ হলে শাস্তি তার প্রাপ্য। কিন্তু স্মৃতি থেকে পরী বানানোর কারিগররা যেন মুখ মুছে সাধু না সাজে। ছড়াকার লুৎফর রহমানের একটি ছড়া দিয়ে বলতে ইচ্ছে করে-

‘রূপের জাদুতে মেয়ে কাবু করে ক্ষণিকেই!
পুরুষতান্ত্রিকতা তাই পরীমনিকেই-
ধরিয়াছে, কারণ সে আলোরূপী আলিয়া
বাজাও বাচ্চালোগ তালিয়া রে তালিয়া…
পুরুষতান্ত্রিকতা সমাজের দড়িতে।
(পুরুষের সাথে নারী আসিও না লড়িতে।)’

শান্তনু চৌধুরী সাংবাদিক ও সাহিত্যিক