বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৮ আশ্বিন ১৪২৮

ভয় হয় বড় ভয় হয়

প্রকাশিতঃ রবিবার, আগস্ট ২২, ২০২১, ১:২৫ অপরাহ্ণ

শান্তনু চৌধুরী : সপ্তাহ ব্যবধানে কতো কিছু যে ঘটে যায় পুরো পৃথিবীতে। এই ছোট চিঠি দিও কলামে তার সবকিছু নিয়ে আলোচনা করাও সম্ভব হয় না। আলোচনা যে করতে হবে তেমনটিও নয়। মাঝে মাঝে মনে হয় কথা যতো কম বলা যায় ততোই ভালো।

ওই যে গুরুপদ গুপ্তের সেই গানের মতো, ‘ও মানুষ…মানুষ, দুডো কান আর দুডো চোক, দেকপা আর শুনবা…কিন্তু এট্টা মুক তো! ইট্টু কতা কম কবা’।

ধীরে ধীরে আমাদের চোখ বন্ধ হয়ে যাবে, হাত গুটিয়ে নিতে হবে। বুর্জোয়ারা যেভাবে চাইবে পৃথিবী সেভাবে চলবে। সভ্যতার দাসত্ব করা আমাদের নেশায় পরিণত হবে। মানবিক মানুষগুলো হারিয়ে যাবে। এই যে করোনাকাল চলছে, প্রতিনিয়ত বুঝিয়ে দিচ্ছে মৃত্যু বড় নির্মম নিষ্ঠুর। ছেলেবেলায় কাদা-আইলপথ মাড়িয়ে যার বাড়িতে যেতাম ফল কুড়াতে, গরুর দুধ আনতে। সেই ছায়াদিদি হারিয়ে গেলেন। ছেলেবেলায় ‘বাবা’ ডেকে যে মানুষটি বুকে টেনে নিতেন সেই শ্যামল কাকাও নেই।

সাংবাদিকতা পেশায় থেকে কতো কতো মানুষের স্নেহ-ভালোবাসা পেয়েছি, তেমনি একজন চট্টগ্রামের চিত্র সাংবাদিক দিদারভাইও চলে গেলেন। জন্মগতভাবে আমি কিছুটা আবেগী, তাই মৃত্যু মেনে নিতে পারি না। কারো অসুস্থতা আমাকে উদ্বিগ্ন করে তুলে, বিশেষ করে মানুষটা যদি হয় চেনা গণ্ডির  কেউ। তাই একুশে পত্রিকার সম্পাদক আজাদ তালুকদার চিকিৎসার জন্য হায়দাবাদে গেলেও আমি প্রার্থনা জানাই সৃষ্টিকর্তার কাছে। এমন কতো কতো মানুষের জন্য প্রার্থনা করি। কিন্তু সময় সময় প্রিয় মানুষগুলো ছেড়ে যায়।

এক নিমিষে আফগানিস্তান দখল করে নিল তালেবানরা। কতো কতো মৃত্যুর গান সেখানে প্রতিনিয়ত লেখা হচ্ছে তার সঠিক হিসাব কারো কাছে নেই। এর মধ্যে যতোটা জানা যাচ্ছে তাও শিউরে উঠার মতো। বাড়ি বাড়ি গিয়ে সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীদের তালিকা করে মারা হচ্ছে। সাংবাদিককে পাওয়া না গেলে খুন করা হচ্ছে তার আত্মীয় স্বজনকে। এখান থেকে আমি উদ্বেগ জানালে হয়তো কিছু আসে যায় না। কিন্তু তালেবানের বিজয়ের পর আমাদের দেশের কতিপয় লোক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছে তাদের বিজয় উদযাপনে তাতে শঙ্কিত হতে হয়। খবর বেরিয়েছে তালেবানদের সঙ্গে যোগ দিতে অনেকে নাকি বাড়ি-ঘরও ছেড়েছে। হিংসা, বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে ধর্মের নামে-তাই ভয় হয়, বড় ভয় হয়। কারণ এই দেশেই তো এক সময় ধর্মান্ধরা স্লোগান দিয়েছিল, ‘আমরা হবো তালেবান-বাংলা হবে আফগান’।

সাংবাদিকতা পেশায় থেকে কতো কতো মানুষের স্নেহ-ভালোবাসা পেয়েছি, তেমনি একজন চট্টগ্রামের চিত্র সাংবাদিক দিদারভাইও চলে গেলেন। জন্মগতভাবে আমি কিছুটা আবেগী, তাই মৃত্যু মেনে নিতে পারি না। কারো অসুস্থতা আমাকে উদ্বিগ্ন করে তুলে, বিশেষ করে মানুষটা যদি হয় চেনা গণ্ডির  কেউ। তাই একুশে পত্রিকার সম্পাদক আজাদ তালুকদার চিকিৎসার জন্য হায়দাবাদে গেলেও আমি প্রার্থনা জানাই সৃষ্টিকর্তার কাছে। এমন কতো কতো মানুষের জন্য প্রার্থনা করি। কিন্তু সময় সময় প্রিয় মানুষগুলো ছেড়ে যায়।

‘পৃথিবী যখন নিশ্চিন্তে ঘুমোতে যায়, তখনো জেগে থাকি আমরা। পেটে খিদে। বুকে তৃষ্ণা। পরিশ্রান্ত’। যে লিখেছে, তার বয়স মাত্র ১৫। আফগানিস্তান থেকে ইরান হয়ে এসে পৌঁছেছে সুদূর জার্মানিতে। ইয়াসের নিকসাদা একা নয়, তার মতো আরো বহু কিশোর-তরুণ ইউরোপে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে আফগানিস্তানের পরিস্থিতির জন্য। তাদের দিবারাত্রির কাব্য লিখে চলেছে সর্বদা, যখনই সুযোগ মিলছে। সেইসব কবিতা নিয়েই জার্মানিতে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। পুরস্কৃত করা হয় কমবয়সি ৬ জন আফগান কবিকে। তাদের বয়স ১৪ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। নিজেদের কবিতায় সকলেই লিখেছে দেশ ছেড়ে আসার যন্ত্রণা ও ভয়াবহতা। ইয়াসেরের কাছাকাছি বয়সের আরেক কবি লিখেছে, ‘চোখের সামনে গ্রামের সমস্ত মানুষকে মেরে ফেলছিল ওরা। একসময় সেই রক্তপাত বন্ধ হলো। আমরা বুঝতে পারলাম, আজকের মতো রক্তের খিদে শেষ হয়েছে ওদের’।

এক নিমিষে আফগানিস্তান দখল করে নিল তালেবানরা। কতো কতো মৃত্যুর গান সেখানে প্রতিনিয়ত লেখা হচ্ছে তার সঠিক হিসাব কারো কাছে নেই। এর মধ্যে যতোটা জানা যাচ্ছে তাও শিউরে উঠার মতো। বাড়ি বাড়ি গিয়ে সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীদের তালিকা করে মারা হচ্ছে। সাংবাদিককে পাওয়া না গেলে খুন করা হচ্ছে তার আত্মীয় স্বজনকে। এখান থেকে আমি উদ্বেগ জানালে হয়তো কিছু আসে যায় না। কিন্তু তালেবানের বিজয়ের পর আমাদের দেশের কতিপয় লোক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছে তাদের বিজয় উদযাপনে তাতে শঙ্কিত হতে হয়। খবর বেরিয়েছে তালেবানদের সঙ্গে যোগ দিতে অনেকে নাকি বাড়ি-ঘরও ছেড়েছে। হিংসা, বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে ধর্মের নামে-তাই ভয় হয়, বড় ভয় হয়। কারণ এই দেশেই তো এক সময় ধর্মান্ধরা স্লোগান দিয়েছিল, ‘আমরা হবো তালেবান-বাংলা হবে আফগান’।

প্রতিদিন খবর আসছে নানা নারকীয় কাহিনীর। দুঃখগাথা শেষ হওয়ার নয়। আমরা বরং মজার কিছু কাহিনী শুনি। সিনেমা বা বইয়ে আমরা পড়েছি গ্রাম থেকে কেউ শহরে প্রথম প্রথম বেড়াতে এলে নানা কা- করে বেড়ান। তালেবানরা আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল দখলের পরও এমন সব হাস্যরসের জন্ম দিয়ে চলছে। কাবুলের পতনের পরদিনই তালেবান যোদ্ধাদের দেখা গেল শহরের এক বিনোদন পার্কে। রয়টার্সের কাবুলের প্রতিনিধি হামিদ শালিজি এদিন টুইটারে তালেবানদের সেই আনন্দে মেতে ওঠার ভিডিও শেয়ার করেছেন। সেই ভিডিওতে তালেবান যোদ্ধাদের দেখা যাচ্ছে বৈদ্যুতিক বাম্পার গাড়িতে চড়তে।

অন্য এক ভিডিওতে তাদের দেখা যাচ্ছে, ছোট ছোট খেলনা ঘোড়ায় চড়তে। তখন তাদের দেখে কে বলবে, এরাই নির্দ্বিধায় নিরপরাধ মানুষদের হত্যা করে, মহিলাদের উপর চাপিয়ে দেয় কঠোর থেকে কঠোরতম শাসন। মজার বিষয় হলো, এসব জয় রাইডগুলি উপভোগ করার সময়ও তারা কিন্তু গোলাবারুদ ত্যাগ করেনি। আবার একটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে আফগান জাতীয় বাহিনীর থেকে ছিনিয়ে নেওয়া এক সামরিক হেলিকপ্টারে করে হাওয়া খেতে বেরিয়েছে তালেবানরা।

আবার একটি জিমে গিয়ে মনের আনন্দে কসরতও করছে তারা। তবে কাবুল দখল করার আগেও তালেবানদের এরকম শিশুসুলভ আচরণ দেখা গিয়েছে। আফগান জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রাক্তন প্রোগ্রাম ডিরেক্টর তথা মুখপাত্র কবির হাকমল একটি ভিডিও প্রকাশ করেছিলেন। সেই ভিডিওতে এক প্রাদেশিক রাজধানী দখলের পর, সেই প্রাদেশিক রাজধানীর প্রশাসনিক ভবনের ভেতর রীতিমতো গান চালিয়ে আনন্দে কোমর দুলিয়ে নাচতে দেখা গিয়েছিল তালেবান যোদ্ধাদের। হাকমল একে শাসন করার নতুন ধরন বলে কটাক্ষ করেছিলেন। বলেছিলেন, তালেবানদের কাছ থেকে শাসন ব্যবস্থায় এর থেকে বেশি কিছু আশা করা যায় না।

সবচেয়ে মজার হলো, প্রেসিডেন্ট ভবন দখল করার পর এরা যা ইচ্ছে তা করছে। কোনো সৌজন্যতার ধারে কাছে না গিয়ে মেঝেতে বসে, চেয়ারে বসে খাচ্ছে, নাচছে। প্রেসিডেন্টের চেয়ারের ওপর এক যোদ্ধা পা তুলে আয়েশ করে খাচ্ছে। তালেবানদের ক্ষমতা দখলের অনেক ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। অধিকাংশ ভিডিওই কিন্তু উপরের ভিডিওগুলির মতো মজার বা হালকা মেজাজের নয়। যেমন, ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে কয়েকজন তালেবানযোদ্ধা কাবুলের রাস্তায় মাইক্রোফোন হাতে সাংবাদিকের ভূমিকা পালন করছে। শহরের মানুষদের তারা বলছে ‘তালেবানি শাসনের’ অধীনে তারা কতটা খুশি তা সেই মাইক্রোফোনে জানাতে।

পাকিস্তানের সাবেক সিনেটর ও আঞ্চলিক রাজনীতি বিষয়ক বিশ্লেষক আফ্রাসিয়াব খটক এক লেখায় বলছেন, চার দশক ধরে পাকিস্তানে বসবাসরত আফগান শরণার্থী পরিবারগুলো থেকে অধিকাংশ তালেবান যোদ্ধা এসেছে। এমনকি তাদের অধিকাংশই পাকিস্তানে জন্মগ্রহণ করেছে। তালেবানের সঙ্গে তাদের সংযোগ গড়ে ওঠে বিভিন্ন মাদ্রাসার মাধ্যমে। ১৯৮০-এর দশকে আফগান জিহাদের সময় ডলার ও পেট্রোডলারে প্রায় ৩৬ হাজার মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। দরিদ্র আফগান শরণার্থী পরিবারগুলোর তাদের সন্তানদের আধুনিক স্কুলে পাঠানোর সামর্থ্য নেই।

দুর্ভাগ্যবশত পাকিস্তান রাষ্ট্র তার লম্বা দাবি সত্ত্বেও মাদ্রাসা ব্যবস্থার সংস্কার করেনি। বিশেষ করে পাঠ্যক্রম, যার লক্ষ্য ধর্মীয় জঙ্গিবাদের জন্য তরুণদের মগজধোলাই করা। ৯/১১ পর্যন্ত পেশোয়ার, কোয়েটার এর মতো পাকিস্তানি শহরে আফগান তালেবানের অফিসগুলো প্রকাশ্যে পরিচালিত হতো। পরে তালেবান নেতৃত্ব আত্মগোপনে যায়। তারা পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার সুরক্ষাবলয়ে থাকে বলে জানা যায়। আমাদের দেশের অনেক তরুণেরও তো মগজধোলাই হয়ে আছে গেল দু’দশকে। এগুলোর প্রতিকারে আশু কোনো পদক্ষেপ নেই। আর নেই বলেই ভয় হয়, বড় ভয়। আর তাতেই ঘুম নষ্ট হয়।

শান্তনু চৌধুরী সাংবাদিক ও সাহিত্যিক।