বুধবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২২, ৬ মাঘ ১৪২৮

কার স্বার্থে একের পর এক পরিবেশবিধ্বংসী কাজ করছে সিডিএ?

প্রকাশিতঃ রবিবার, আগস্ট ২৯, ২০২১, ১১:৫৮ পূর্বাহ্ণ

জোবায়েদ ইবনে শাহাদত : একদিকে পরিবেশরক্ষার কথা বলে অপরদিকে পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। নগরজুড়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে গিয়ে খোদ সিডিএ-ই পরিবেশের ক্ষতির কারণ হয়ে ওঠেছে।

সর্বশেষ পরিবেশবাদী সংগঠন ও নগরবাসীর দাবি উপেক্ষা করে টাইগারপাসের পাহাড়কে কংক্রিটের জঞ্জালের নিচে ঢেকে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ কাজ শুরু করতে যাচ্ছে সিডিএ। এতে পরিবেশ-প্রকৃতি ধ্বংস হবে জানিয়ে রাজপথে নেমেছে চট্টগ্রামের সর্বস্তরের মানুষ। এমনকি এ ব্যাপারে আপত্তি জানিয়ে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) দফায় দফায় চিঠি দিয়েছে সিডিএকে। কিন্তু এসব চিঠির কোনো উত্তর দেয়নি সিডিএ। এক্ষেত্রে কারো অনুরোধেরই তোয়াক্কা করছে না সংস্থাটি।

চসিকের প্রকৌশল বিভাগ বলছে, কার্যকর বিকল্প উপায় থাকা সত্ত্বেও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের কাজ করতে গিয়ে টাইগারপাসের দৃষ্টিনন্দন দুটি পাহাড়ের সৌন্দর্য মলিন করতে মরিয়া হয়ে ওঠেছে সিডিএ। সিডিএ থেকে যে কানেক্টিভিটির কথা বলা হচ্ছে সেজন্য সেখানে ফ্লাইওভার নির্মাণ না করে সমতলে সড়কটি সংযুক্ত করা যেতে পারে। এই বিষয়ে চসিক প্রস্তাবনা দিলেও এর তোয়াক্কা করছে না সিডিএ।

অন্যদিকে সিডিএ বলছে, পাহাড় না কেটে ফ্লাইওভার নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। ওই অংশে প্রায় ৩০ ফুট উচ্চতার ফ্লাইওভার নির্মাণের জন্য করা হয়েছে নতুন নকশা। নতুন নকশা অনুযায়ী দেওয়ানহাট ওভারব্রিজের উপর দিয়ে বারিক বিল্ডিং থেকে আসা চারলেনের ফ্লাইওভার টাইগারপাস হয়ে লালখানবাজারে এসে মিলবে। চারলেনের এই ফ্লাইওভার থাকবে রাস্তার মাঝখানে, পিলারও রাস্তার মাঝখানে হবে। যদিও এখন পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নকশা কেমন হবে তা স্পষ্ট করে জানায়নি সিডিএ।

চট্টগ্রামের ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ডিএপি) এবং মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী বাটালী হিল থেকে শুরু করে সিআরবি পর্যন্ত এলাকা ‘হেরিটেজ জোন’ হিসেবে চিহ্নিত। টাইগারপাসের পাহাড়গুলোও এই জোনের অন্তর্ভুক্ত। নগরের উন্নয়নের ব্যাপারে প্রচলিত এই দুটি আইনে হেরিটেজ জোনে কোনোভাবেই স্থাপনা করার অনুমোদন দেওয়ার সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্টদের মতে, নিজেদের জেদকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে চট্টগ্রামের ডিএপি ও মাস্টার প্ল্যানকেও তোয়াক্কা করছে না সিডিএ। যদিও সিডিএ’র এই পাহাড়-বিদ্বেষ নতুন নয়। কখনো আবাসন প্রকল্প আবার কখন পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্দেশনা অমান্য করে নির্বিচারে খাড়া পাহাড় কেটে রাস্তা নির্মাণ করছে সংস্থাটি। পাহাড়ের উপর কোপ বসিয়ে জরিমানাও কম গুনতে হয়নি সিডিএকে। শুধু বায়েজিদ লিংক রোড প্রকল্প বাস্তবায়নে নগরীর উত্তর পাহাড়তলি মৌজা, হাটহাজারীর জালালাবাদ মৌজা এবং সীতাকু-ের জঙ্গল সলিমপুর মৌজায় পরিবেশ অধিদপ্তরের শর্ত না মেনেই ছোটবড় প্রায় ১৮টি পাহাড় কাটার অভিযোগও রয়েছে সিডিএ’র বিরুদ্ধে।

এদিকে নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থেকে ফৌজদারহাট এলাকায় লিংক রোড নির্মাণ করতে ২০১৬ সালে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিলেও সে অনুযায়ী কাজ না করে পাহাড় কেটে পরিবেশের ক্ষতি করায় ২০১৭ সালে সিডিএকে দুই দফায় নোটিশ দেওয়া হয়। জরিমানা করা হয় ১০ কোটি টাকা। যদিও রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করে সিডিএকে বেশ কিছু শর্তের বিনিময়ে আড়াই লাখ ঘনমিটার পাহাড় কাটার অনুমতি দিয়েছিল পরিবেশ অধিদপ্তর। পরবর্তীতে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনের পর আড়াইলাখ ঘনফুটের বিপরীতে ১০ লাখ ২৮ হাজার ৭০০ ঘনফুট এবং খাড়াভাবে মাটি কাটার দায়ে সিডিএকে ১০ কোটি ৩৮ লাখ ২৯ হাজার ৫৫৩ টাকা জরিমানা করে পরিবেশ অধিদপ্তর। শুধু তাই নয়, পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে যেসব শর্ত দেওয়া হয়, তার বেশিরভাগই ভঙ্গ করে সিডিএ। সম্প্রতি বৃষ্টিতে সেই লিংক রোড সংলগ্ন পাহাড়ের বিভিন্ন স্থানে মাটি ধসে পড়ে যানচলাচল বিঘিœত হয়। এমনকি ঝুঁকি এড়াতে রাস্তার এক পাশ বন্ধ করে দেওয়াও হয়।

জানা গেছে, ঝুঁকি কমাতে সড়ক সংলগ্ন পাহাড়ের আরও ২ লাখ ঘনফুট মাটিকাটার প্রস্তাব পরিবেশ অধিদপ্তরে জমা দিয়েছে সিডিএ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে একের পর এক পাহাড় কাটতে থাকলে ওই এলাকার পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। এমনটা হলে প্রাণহানির মতন ঝুঁকির কারণ হতে পারে এ রাস্তা। পরিবেশের এ ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া তখন অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।

শুধু তাই নয়, সীতাকুণ্ড থানাধীন সিলিমপুরে আবাসিক এলাকা তৈরি করতে দুটি পাহাড় কেটেছে সিডিএ। আবার পাহাড়কাটা মাটি দিয়েই সিলিমপুর আবাসিকের পশ্চিম পাশের জলাভূমি ভরাটের কাজ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। অভিযোগ আছে, জলাভূমি ভরাট করে সিডিএ ২০১৪ সালে সেখানে ৭০টি প্লট তৈরি করেছে। এ জন্য সিলিমপুর আবাসিক এলাকার পূর্বপাশে কাটা হয়েছে ২০০ থেকে ৩০০ ফুট উঁচু পাহাড়। এর আগে তৈরি করা এক হাজার ২০০ প্লটের জন্যও সিডিএ পাহাড় কেটেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন আরেফিননগর এলাকায় পুকুরভরাট করে সিডিএ আবাসিক এলাকা গড়ে তোলার কাজ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই প্রকল্প এলাকায় যেতে অবৈধভাবে জায়গা দখল করে সিডিএ রাস্তা তৈরি করেছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। সংস্থাটির কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী তাদের অনুমোদিত লে-আউট প্ল্যানের তথ্য গোপন করে নিজেদের পকেট ভারি করতে পুকুরসহ আশপাশের প্রায় ২০ একর জায়গায় নতুন আবাসিক এলাকা নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে বলে অভিযোগ আছে।

শুধু পাহাড় কেটে সিডিএ ক্ষান্ত হয়নি, পাহাড় কেটে নির্মাণ করা অসংখ্য ইমারত ও আবাসন প্রকল্প অনুমোদন দিয়েও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। চট্টগ্রামে অনেক আবাসন প্রতিষ্ঠানের পাহাড়কাটার ঘটনা নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলো সিডিএ’র কাছ থেকে নকশা অনুমোদন নেওয়ার সময় পাহাড়ের উপস্থিতির বিষয়টি জানায় না। আবার প্রকল্প এলাকায় পাহাড় বা টিলা আছে কিনা সে বিষয়ে ‘যাচাই-বাছাই’ না করেই সিডিএ’র অনুমোদন দিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে অনেক।

বায়েজিদ থানাধীন আরেফিননগর বাইপাস রোডের দক্ষিণ-পশ্চিমে পাহাড় কেটে ২৬ তলা ভবন নির্মাণ করার অভিযোগ উঠে স্যানমার প্রপার্টিজের বিরুদ্ধে। পাহাড়কাটা নিয়ে স্থানীয়রা আপত্তি তোলার পরই বিষয়টি পরিবেশ অধিদপ্তরের নজরে আসে। অবৈধভাবে পাহাড়কাটার সত্যতাও পাওয়া যায় পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শনে। যার প্রেক্ষিতে স্যানমার প্রপার্টিজের ‘স্যানমার গ্রিন পার্ক’ শীর্ষক প্রকল্পের স্থানে পাহাড় আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার নির্দেশনা দেয় পরিবেশ অধিদপ্তর। যদিও পাহাড় কেটে নির্মিত ভবনটি নির্মাণের জন্য ভূমি ব্যবহার ও নকশা অনুমোদন দিয়েছিল সিডিএ।

অভিযোগ রয়েছে, সিডিএ’র অনুমোদন নিয়ে খুলশী থানার ইম্পেরিয়াল হিলের ১০৯/সি প্লটের ৪ নম্বর সড়কে ‘স্যানমার গ্রানডি’ নামের ১২ তলা ভবন নির্মাণ করতে প্রায় ৬০ ফুট পাহাড় কেটেছে স্যানমার প্রপার্টিজ। জানা গেছে, পাহাড়কাটার অভিযোগে সম্প্রতি খুলশীর স্থানীয় ১১ জন বাসিন্দার পক্ষে স্যানমারের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে সাহাবুদ্দিন আলম নামে এক ব্যবসায়ী মামলাও করেছেন। মামলায় অভিযোগ আনা হয়েছে, ভবনটি তৈরি করতে গিয়ে ইমারত নির্মাণ আইন ও সিডিএ আইনের কয়েকটি ধারা লঙ্ঘন করা হয়েছে। নির্বিচারে পাহাড় কাটার ফলে ওই স্থানে এখন আর পাহাড়ের চিহ্ন নেই।

এভাবে সিডিএ’র অনুমোদন নিয়ে পাহাড় কেটে ভবন নির্মাণের অহরহ অভিযোগ রয়েছে। জাকির হোসেন রোডে দক্ষিণ খুলশী এলাকায় পাহাড়ের উপর ‘ক্রাউন রিজ’ নামে ৯ তলা উচ্চতার ভবনটি নির্মাণ করতে গিয়েও পাহাড়কাটা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিপরীতে পাহাড় কেটে ১৩ তলা উচ্চতার ‘এপিক অঙ্গন’ নামের একটি ভবন নির্মাণেরও অভিযোগ উঠেছে। চকবাজারের প্যারেড কর্নার এলাকায় পার্সিভ্যাল পাহাড় কেটে ভবন নির্মাণের অভিযোগে এপিক প্রপার্টিজকেও জরিমানা করে পরিবেশ অধিদপ্তর।

এছাড়া পাঁচলাইশ থানার ডক্টরস চেম্বার এলাকায় ‘ফিনলে এমএন মেরি গোল্ড’ নামে ভবন নির্মাণের জন্য ১৭ হাজার ঘনফুট মাটি কাটারও অভিযোগ রয়েছে ফিনলে প্রপার্টিজের বিরুদ্ধে। একই প্রতিষ্ঠানকে কাতালগঞ্জ এলাকায় ১২ হাজার ঘনফুট পাহাড় কেটে বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণের অভিযোগে জরিমানা করেছিল পরিবেশ অধিদপ্তর। খুলশীতে ‘খুলশী গার্ডেন ভিউ হাউজিং সোসাইটিতে’ বিএস জরিপ অনুযায়ী ২১২ ও ২১৩ দাগের প্রায় ছয় একর পাহাড় কেটে এবং ষোলশহরে ষোলশহর মৌজার বিএস ১২২৭১ ও ১২২৮৯ দাগের অংশে ৬ হাজার ৪০০ ঘনমিটার টিলা ও পাহাড় কেটে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ আছে। আর এসব আবাসিক ভবন নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছে সিডিএ।

পাহাড়ের ওপর প্রকল্পগুলোর নকশা সিডিএ কেন এবং কীভাবে অনুমোদন দেয় এই প্রশ্নের উত্তর কারোরই অজানা নয়। সিডিএ’র একশ্রেণীর কর্মকর্তার যোগসাজশে নগরজুড়ে এসব অবৈধ কর্মকা- চলছে বলে অভিযোগ। যার কারণে নিয়ম-নীতি উপেক্ষা করেই পাহাড় কাটার মহোৎসব চলছে।

আবার পাহাড় কাটার এমন ঘটনাও আছে যাকে কেন্দ্র করে সিডিএ ও পরিবেশ অধিদপ্তর পরষ্পরকে দোষারোপ করেছে। পাহাড় কাটার দায় চাপিয়েছে একে অন্যের উপর। সম্প্রতি নগরের জামালখানে গ্রিন্ডলেজ ব্যাংকের পাহাড় কেটে আবাসিক ভবন গড়ে তোলার ঘটনায় পরিবেশ অধিদপ্তর পাহাড় কাটার সাথে সংশ্লিষ্টদের ২৮ লাখ টাকা জরিমানাসহ পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়া ভবিষ্যতে ওই অংশে পাহাড়কাটা ও কোনো ধরনের ভবন নির্মাণ না করার নির্দেশ দেয়।

এরপরই আবাসিক ভবন নির্মাণে অনুমোদনের জন্য সিডিএ’র কাছে আবেদন করে ভবন নির্মাণের সাথে সংশ্লিষ্টরা। যার পরিপ্রেক্ষিতে শর্ত সাপেক্ষে প্রস্তাবিত ভূমিটি ব্যবহার ছাড়পত্রও দেয় সিডিএ। কিন্তু সিডিএ’র দেওয়া শর্তের তোয়াক্কা না করে আবাসনের নামে পাহাড়টি পুনরায় কাটা হয়। তদারকি না থাকায় শর্ত ভঙ্গ করে পাহাড় কাটার বিষয়টিও জানতো না সিডিএ। পাহাড় কাটার দায়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের জরিমানার বিষয়ে জেনেও নামমাত্র শর্তসাপেক্ষে আবাসন প্রকল্পের অনুমতি দেওয়ায় সন্দেহের আঙুল উঠে সিডিএ’র দিকে।

পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে সিডিএ’র দিকে অভিযোগের আঙুল তুলে বলা হয়, পাহাড়ে আবাসন প্রকল্পে জরিমানার অনুলিপি পাঠিয়ে অনুমতি না দেওয়ার অনুরোধের পরও আবাসনের অনুমতি দেয় সিডিএ। যদিও পাহাড়কাটার এমন ঘটনায় উল্টো পরিবেশ অধিদপ্তরকেই দায়ী করে সিডিএ। সিডিএ পাল্টা বক্তব্যে জানায়, প্রাইভেট প্রপার্টির ক্ষেত্রে আর্থিক স্বার্থথাকায় ম্যানেজড হয়ে যায় পরিবেশ অধিদপ্তর। সরকারে দুই সেবা সংস্থার এমন গা-ছাড়া ভাব ও চক্রাকারে দোষারোপ প্রভাবশালী পাহাড়খেকোদের সাথে সমঝোতার ইঙ্গিত বলেও মনে করেন পরিবেশবাদীরা।

নিয়ম অনুযায়ী, মাস্টারপ্ল্যানের ভিত্তিতে যাচাই-বাছাইয়ের পর বহুতল ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেয় সিডিএ। এজন্য ভূমি ব্যবহারের অনুমোদনপত্র, নকশা অনুমোদন, জমির খতিয়ান শ্রেণী, সিডিএ’র বসবাস উপযোগী নকশা অনুযায়ী কাজের সনদ যাচাই করে তারপরই ছাড়পত্র দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। পাশাপাশি অনুমোদন পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট নির্মাণপ্রকল্পে নকশা অনুযায়ী কাজ হচ্ছে কিনা সেটি তদারকির দায়িত্বও সিডিএ’র। কিন্তু এসব নিয়ম যেন বইয়ের পাতাতেই সীমাবদ্ধ, বাস্তবে এর প্রয়োগ তেমন একটা দেখা যায় না বললেই চলে।

নগর পরিকল্পনাবিদ আশিক ইমরান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে ৯০ ভাগ ভবনই সঠিকভাবে অনুমোদন না নিয়ে গড়ে উঠেছে। ভবন নির্মাণের শুরুতে একভাবে অনুমোদন নিলেও তা অনুসরণ না করে পাহাড় কাটতে থাকে। কিন্তু সিডিএ এসব তদারকি করে না। যার ফলে সিডিএ’র নাকের ডগায় এমন কর্মকা- চলছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সিডিএ পাহাড়কাটার বিষয়ে জানলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ম্যানেজ হয়ে যাওয়ার কারণে এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এক্ষেত্রে দায়টা সিডিএকে নিতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা না করে যেনতেনভাবে কাজ করার একটা প্রবণতাও সিডিএর রয়েছে। যেমন লিংক রোডের নকশাটি প্রায় ১০-১২ বছরের পুরোনো। প্রথমে পাহাড় না কেটেই এই প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা ছিল। ইন্টারন্যাশনাল উইমেন ইউনিভার্সিটির মাঝখান দিয়েই সড়কটি যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তাদের আপত্তির কারণে সেখান দিয়ে সংস্থাটি সড়কের কাজ সম্পন্ন করতে পারেনি। যার কারণে অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কেটে তড়িঘড়ি করেই সিডিএ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে।’

এতো গেল ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে সিডিএ’র অনুমোদন নিয়ে পাহাড়কাটার বিষয়। কিন্তু এখানেই অভিযোগের শেষ নয়। বড় বড় পাহাড় কেটে আবাসিক এলাকা করতে সিডিএ’র অনুমোদন পাওয়া যাচ্ছে অতি সহজে। সিডিএ’র অনুমোদন নিয়ে নগরের আকবরশাহ এলাকায় পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হয়েছে ‘রূপনগর আবাসিক এলাকা’। অভিযোগ আছে, এই আবাসিক এলাকা করতে পাহাড়কাটা হয়েছে দুই স্থানে। এছাড়া, আকবরশাহ থানার পূর্ব ফিরোজশাহ নাছিয়া ঘোনায় ‘গাউসিয়া লেকসিটি নিউ আবাসিক এলাকা’ করতেও পাহাড়কাটা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

আবার পাহাড়কাটার এমন ঘটনাও আছে যাকে কেন্দ্র করে সিডিএ ও পরিবেশ অধিদপ্তর পরষ্পরকে দোষারোপ করেছে। পাহাড় কাটার দায় চাপিয়েছে একে অন্যের উপর। সম্প্রতি নগরের জামালখানে ‘গ্রিন্ডলেজ ব্যাংকের পাহাড়’ কেটে আবাসিক ভবন গড়ে তোলার ঘটনায় পরিবেশ অধিদপ্তর পাহাড় কাটার সাথে সংশ্লিষ্টদের ২৮ লাখ টাকা জরিমানাসহ অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়া ভবিষ্যতে ওই অংশে পাহাড়কাটা ও কোনো ধরনের ভবন নির্মাণ না করার নির্দেশ দেয়।

এরপরই আবাসিক ভবন নির্মাণে অনুমোদনের জন্য সিডিএ’র কাছে আবেদন করে ভবন নির্মাণের সাথে সংশ্লিষ্টরা। যার পরিপ্রেক্ষিতে শর্ত সাপেক্ষে প্রস্তাবিত ভূমিটি ব্যবহারে ছাড়পত্রও দেয় সিডিএ। কিন্তু সিডিএ’র দেওয়া শর্তের তোয়াক্কা না করে আবাসনের নামে পাহাড়টি পুনরায় কাটা হয়। তদারকি না থাকায় শর্ত ভঙ্গ করে পাহাড় কাটার বিষয়টিও জানতো না সিডিএ। পাহাড় কাটার দায়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের জরিমানার বিষয়ে জেনেও নামমাত্র শর্তসাপেক্ষে আবাসন প্রকল্পের অনুমতি দেওয়ায় সন্দেহের আঙুল উঠে সিডিএ’র দিকে।

পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে সিডিএ’র দিকে অভিযোগ তুলে বলা হয়, পাহাড়ে আবাসন প্রকল্প করায় জরিমানা করার অনুলিপি পাঠিয়ে অনুমতি না দেওয়ার অনুরোধের পরও আবাসন নির্মাণের অনুমতি দেয় সিডিএ। যদিও পাহাড় কাটার এমন ঘটনায় উল্টো পরিবেশ অধিদপ্তরকেই দায়ী করে সিডিএ। সিডিএ পাল্টা বক্তব্যে জানায়, প্রাইভেট প্রপার্টির ক্ষেত্রে আর্থিক স্বার্থথাকায় ম্যানেজড হয়ে যায় পরিবেশ অধিদপ্তর। সরকারি এই দুই সংস্থার পরস্পরকে দোষারোপ ও দায়সারা গোছের কথা প্রভাবশালী পাহাড়খেকোদের সঙ্গে ‘সমঝোতার’ ইঙ্গিত বলেও গুঞ্জন উঠে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রাম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হলো পরিকল্পিত নগর করা। সিডিএ কোনোভাবেই পাহাড়কাটায় সম্মতি কিংবা অংশগ্রহণ করতে পারে না। কিন্তু পাহাড় কেটে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে সিডিএ যেমন অনুমোদন দিচ্ছে তেমনি বিভিন্ন সময় মেগাপ্রকল্পের আওতায় সংস্থাটিকে আমরা সরাসরি পাহাড় কাটতেও দেখেছি। রক্ষক হয়ে যখন তারা আইন ভঙ্গ করে এবং অন্যকেও ভঙ্গ করার সুযোগ করে দেয় তখন তাদের অপরাধটা সর্বোচ্চ।’

তিনি আরও বলেন, ‘সুশাসন এবং জবাবদিহিতার ঘাটতির কারণেই সিডিএ’র এমন অবৈধ কর্মকা- করতে পারছে। সিডিএ’র সুপারভাইজিং অথরিটি গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের এ বিষয়টি মনিটরিং করা উচিত। পূর্ত মন্ত্রণালয় তদারকি না করায় সিডিএ আইন লঙ্ঘন করে এসব অনিয়ম, অন্যায় করতে পারছে। পরিবেশের যে ক্ষতি সিডিএ করছে তার দায় অনেকটা গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কাঁধেও বর্তায়। এটিও একধরনের দুর্নীতির পর্যায়ে পড়ে। সিডিএ’র এমন অবৈধ কর্মকা- ও ক্ষমতার অপব্যবহার থামাতে না পারলে ভবিষ্যতে সংস্থাটি পরিবেশ বিপর্যয়ের বড় কারণ হয়ে দাঁড়াবে।’ যোগ করেন অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী।

চট্টগ্রামের পাহাড়কাটা নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিদ্যা ইনস্টিটিউটের সাবেক অধ্যাপক এসএম সিরাজুল হক একটি বেসরকারি সংস্থার হয়ে ‘হিল কাটিং ইন অ্যান্ড অ্যারাউন্ড চিটাগং সিটি’ শীর্ষক এক গবেষণা করেন। ২০১১ সালে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়, বিগত সময়ে নগরের ৫৭ শতাংশ পাহাড়কাটা হয়েছে, যার বেশিরভাগই কেটেছে সরকারি সেবাসংস্থাগুলো। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর দায় শুধু সিডিএ’র নয়, পরিবেশ অধিদপ্তরের ওপরেও বর্তায়। পরিবেশ ঠিক রেখে উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য যে সংস্থা নিয়োজিত, তারাই পাহাড় সাবাড় করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। ক্ষেত্রেবিশেষে পাহাড়কাটায় অভিযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করে পরিবেশ অধিদপ্তর দায়সারা দায়িত্ব পালন করলেও সেবা সংস্থা সিডিএ’র এমন কর্মকা-ে কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করে না পরিবেশ অধিদপ্তর। যদিও পরিবেশ অধিদপ্তর বলেছে কোনো ব্যক্তি বা সংস্থা চট্টগ্রামের পরিবেশের ক্ষতি করলে তাকে কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না।

পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মহানগরের পরিচালক মোহাম্মদ নুরুল্লাহ নুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘পরিবেশের ক্ষতি যেই করুক তার বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি। পাহাড় কেটে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করায় সিডিএকে আমরা ১০ কোটি টাকা জরিমানা করেছি। সিডিএ ভবিষ্যতেও যদি পরিবেশের ক্ষতি করে তখনও ছাড় দেওয়া হবে না। তাদের সাথে যোগসাজশের কোনো প্রশ্নই আসে না।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সিডিএ’র আইনে কোথাও বলা নেই যে পাহাড়কাটা যাবে। পরিবেশের ক্ষেত্রে সিডিএ’র আইনে যা আছে আমাদের আইনেও তা আছে। অনেক সময় আমরা সিডিএ’কে অনুলিপিও দিয়ে থাকি। আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করছি। এমনও হয়েছে সিডিএ যে ভবনের অনুমোদন দিয়েছে সেখানে পাহাড়কাটার অভিযোগে আমরা জরিমানা করেছি, কাজও বন্ধ করে দিয়েছি। তারপরও তারা কীভাবে এসবের অনুমোদন দিচ্ছে তা তারাই ভালো বলতে পারবে, বিষয়টা আমাদের বোধগম্য হচ্ছে না।’

এ বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামসের কার্যালয়ে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। সর্বশেষ ২৬ আগস্ট তার কার্যালয়ে গেলে জানা যায়, তিনি সেখানে নেই। পরবর্তীতে তার নাম্বারে বেশ কয়েকবার ফোন করলেও তিনি সাড়া দেননি। একইভাবে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সিডিএ’র পাহাড় কাটার বিষয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সিডিএ’র এমন কর্মকা-ের সঙ্গে একমত নন বলে জানান। একুশে পত্রিকাকে প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ বলেন, ‘দেশের সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থে, জনগণের সুবিধার্থে মাঝে মাঝে আমাদের কিছু বিষয় কম্প্রোমাইজ করতে হয়। যার সুফল কিন্তু দেশের নাগরিকরাই পায়। এক্ষেত্রে সাময়িক ভোগান্তি থাকবেই। এটা আমাদের সকলকেই মেনে নিতে হবে।’

ভূমি ব্যবহারে অনুমোদনপত্র, নকশা অনুমোদন, জমির খতিয়ান শ্রেণী, বসবাস উপযোগী নকশা অনুযায়ী কাজের সনদ যাচাইয়ের ছাড়পত্র দেওয়ার কাজগুলো সিডিএ’র আদৌও সঠিকভাবে করছে কিনা এবং এসব গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে তদারকি করা হচ্ছে কিনা- গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রীর কাছে এমন প্রশ্ন করলে তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।