বুধবার, ২৬ জানুয়ারি ২০২২, ১৩ মাঘ ১৪২৮

সিএমপির অভিযানে ‘হঠাৎ’ ভাটা কেন?

প্রকাশিতঃ রবিবার, আগস্ট ২৯, ২০২১, ১২:৪৭ অপরাহ্ণ

মোহাম্মদ রফিক : চট্টগ্রামের বাসিন্দা পুলিশ কর্মকর্তাদের ‘গণবদলি’, সাবেক সেনা কর্মকর্তা হত্যাকা-সহ নানা ইস্যুর জের ধরে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের তৎপরতায় হঠাৎ স্থবিরতা বিরাজ করছে। থমকে আছে অস্ত্র, মাদক এবং সন্ত্রাস দমন অভিযান।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ওসি প্রদীপকাণ্ড, সিএমপি থেকে ‘চাঁটগাইয়্যা’ পুলিশ কর্মকর্তাদের ‘গণবদলি’ নিয়ে গত এক বছর ধরে এ অস্থিরতা চলছে। মাদক, অস্ত্র এবং দাগী অপরাধী সম্পর্কে সোর্স পুলিশকে তথ্য দিলেও অভিযানে যেতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না সংশ্লিষ্টরা।

নাম প্রকাশ না করে মহানগর ডিবি পুলিশ (উত্তর) বিভাগের এক সদস্য জানান, ডবলমুরিং থানা এলাকার একজন সোর্স পেশাদার এক ছিনতাইকারীর হেফাজতে থাকা বিদেশি রিভলভার উদ্ধারের জন্য তথ্য দিলেও সংশ্লিষ্ট ডিবি পুলিশ কর্মকর্তা অভিযানে যাননি। এভাবে অস্ত্র, মাদক উদ্ধার বিষয়ে সোর্স তথ্য দিলেও পুলিশ এখন অভিযানে যাচ্ছেন না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘গণবদলি’ নিয়ে চট্টগ্রামে পুলিশের মধ্যে আতঙ্ক, অস্থিরতা ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি মেজর (অব.) সিনহা হত্যার আগে টেকনাফজুড়ে ওসি প্রদীপের নানা অপরাধে আশ্রয়দাতা এবং নেপথ্যে থাকা পুলিশ কর্মকর্তাদের আইনের আওতায় না আনায় অনেক পুলিশ কর্মকর্তার মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এসব কারণে স্বাভাবিক কাজের মধ্যে স্থবিরতা এসেছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। এই অবস্থা চলতে থাকলে নগরের আইনশৃঙ্খলাসহ পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে থাকবে কিনা তা নিয়েও আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

প্রসঙ্গত, গতবছর ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। ওই ঘটনায় টেকনাফ থানার তৎকালীন ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের পরিদর্শক লিয়াকত আলীসহ ১৩ জন পুলিশ সদস্য এখন কারাগারে আছেন। সাবেক সেনা কর্মকর্তা হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টির পর গতবছর সেপ্টেম্বরে কক্সবাজারের প্রায় দেড় হাজার পুলিশ সদস্যকে একযোগে বদলি করে বিভিন্ন রেঞ্জে পাঠানো হয়।

সম্প্রতি, চট্টগ্রাম নগর পুলিশ থেকে বদলি হওয়া একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা একুশে পত্রিকাকে বলেন, অনেক অফিসারকে দূরের জেলা খুলনা, রংপুর রেঞ্জে বদলি করা হয়েছে। কিন্তু এ বদলির জন্য তাদের মানসিক প্রস্তুতি ছিল না। অনেকের মধ্যে বিরাজ করছে বদলি-আতংক। ফলে অস্ত্র, ইয়াবা-মাদক উদ্ধার, অপরাধী গ্রেফতারসহ সার্বিক অপারেশনাল কার্যক্রমে প্রাণ পাচ্ছেন না তারা।

এ প্রসঙ্গে সিএমপির এক কর্মকর্তা বলেন, ‘পেশাদারিত্ব থাকলে অপরাধ দমনে কোনো সংকট হবে বলে আমি মনে করি না।’ জানা গেছে, ২০২০ সালের এপ্রিলে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হিসেবে ড. বেনজীর আহমেদ যোগদানের পর আগস্ট-সেপ্টেম্বরে এসে রদবদলের প্রক্রিয়া জোরালো হয়। কক্সবাজারে পরে সিএমপিতে শুরু হয় ‘গণবদলি’।

তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে সিএমপি থেকে অন্তত দুই শতাধিক পুলিশ কর্মকর্তাকে দেশের বিভিন্ন ইউনিটে বদলি করা হয়েছে। এর মধ্যে কনস্টেবল থেকে পরিদর্শক এবং সহকারি কমিশনার থেকে উপ-কমিশনার পদমর্যাদার কর্মকর্তারাও আছেন।

সিএমপির কিছু কর্মকর্তা একুশে পত্রিকাকে জানান, চট্টগ্রামের বাসিন্দাদের বদলির কারণে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ‘বিতর্কিত’ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছেন। আবার অনেকেই কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত না থেকেও বদলির শিকার হচ্ছেন। এতে পুলিশের মনোবল ভেঙে পড়ছে।

এদিকে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে দীর্ঘদিন গা-ঢাকা দেওয়া অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী, দাগী অপরাধী, মাদক ব্যবসায়ীরা পুনরায় সরব হয়ে উঠেছে। এছাড়া ভাটা পড়েছে মাদক, ও ভেজালপণ্য উদ্ধার অভিযানেও। সুনির্দিষ্ট বড় কোনো অভিযোগ ছাড়া অভিযানে যাচ্ছেন না পুলিশ কর্মকর্তারা। আর এ সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে অপরাধীরা ।
জানা গেছে, সিএমপির কর্ণফুলী ও বাকলিয়া থানায় প্রতিমাসে ৫০ থেকে ৬০টি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়ের হতো। এখন প্রতিদিন গড়ে ওই দুই থানায় মামলা হচ্ছে ১০ থেকে ১৫টি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সিএমপিতে শুধু মাদকবিরোধী অভিযানে নয়, সব ধরনের অভিযানে ভাটা পড়েছে। তবে সিএমপিতে স্থবিরতার অভিযোগ মানতে চান না জনসংযোগ কর্মকর্তা অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার আরাফাতুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নিয়েছি তিন মাস হয়েছে। ডিবি বা থানা পুলিশের নিয়মিত অভিযান চলছে।’
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের শীর্ষ এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এখন প্রতিদিনই মাদক ধরা পড়ছে। সুযোগসন্ধানী মাদক ব্যবসায়ীরা নানা কৌশলে কক্সবাজার-টেকনাফ থেকে ইয়াবা আনার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে যাত্রীবাহী বাস এবং পণ্যবাহী ট্রাক ফেরার পথে কেউ কেউ ইয়াবা নিয়ে আসছে। তবে আমরা অভিযান চালিয়ে যাচ্ছি।’

এদিকে নগর পুলিশের কাজে কোনো ধরনের স্থবিরতা নেই বলে জানিয়ে সিএমপি কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তাণভীর বলেন, ‘অস্ত্র, মাদক, অপরাধী গ্রেফতারে আমাদের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত আছে।’