বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৮ আশ্বিন ১৪২৮

আমেরিকার শিল্পীর গান থেকে পরীমনির ‘ডোন্ট লাভ মি বিচ’

প্রকাশিতঃ শনিবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২১, ১১:২৩ অপরাহ্ণ

শান্তনু চৌধুরী : কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া যে কারো জন্য আনন্দের। সেটা নায়িকা হোক বা সাধারণ মানুষ। কিন্তু ৪ আগস্ট থেকে শুরু করে গেল ২৭ দিনে জনপ্রিয় নায়িকা পরীমনির কর্মকাণ্ড যদি লক্ষ করি তবে বোঝা যাবে সেখানে তিনি যোগ্য নায়িকাই বটে! তাঁর আটক হওয়া থেকে শুরু করে আদালতে হাজিরা দিতে আসা বা প্রতিদিনের কর্মকা- প্রমাণ করেছে তিনি মাথা নোয়াবার নন।

কাশিমপুর কারাগার থেকে বেরিয়ে আসার দিন তিনি যে প্রগাঢ় বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছেন তাতে আবারো প্রমাণ হয় তিনি যোগ্য বটে মনিহারের। পরীমনি যখন শুভ্র বেশে, মাথায় সাদা পাগড়ি জড়িয়ে, সাদা গাড়িতে করে কেন্দ্রীয় কয়েদখানার ফটক দিয়ে বেরিয়ে এলেন, তখন তাঁকে বিজয়ী মনে হয়েছে। এই ক’দিনে তাকে নিয়ে বিতর্ক হয়েছে, নিন্দা-মন্দ দুটোই জুটেছে, দফায় দফায় রিমান্ড ও ২৭ দিন কারাগারে থাকাও এক ধরনের শাস্তি তিনি পেয়েছেন।

কিন্তু এসব ছাড়িয়ে বিপুল মানুষের ভালোবাসাও তিনি পেয়েছেন। বিশেষ করে নারীদের। তাই তার কাছে ফের নিজের বাসায় ফিরে আসার মতো শান্তি আর নেই। যদিও বাসাটি ছেড়ে দেওয়ার নোটিশ দেওয়া হয়েছে ইতোমধ্যে। কিন্তু মুক্তির পর শত শত শুভার্থীর ফুলে ফুলে ভরে গেছে তার বাসা। প্রিয় নানুকে নিয়ে তাঁর মতো করেই হয়তো তিনি ব্যস্ত উদযাপনে। তাঁর আটক থেকে শুরু করে কারামুক্তি পর্যন্ত যেমন প্রতিদিন খবরের উপাদান যোগ হয়েছে তেমনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও তিনি ছিলেন ব্যাপক আলোচনায়।

আর কারাগার থেকে গাড়িতে উঠার সময় হাতের লেখা নিয়ে তো এখন চলছে চর্চা। এর কোনোটাতেই কার কী এসে গেলো সেটা না ভেবে এটা বলা যায়, নায়িকা আলোচনার জন্মতো দিয়ে গেল। পরীমনির ডান হাতের তালুতে মেহেদি দিয়ে লেখা ছিল ‘ডোন্ট লাভ মি বিচ’। লেখার নিচে এমন একটা প্রতীক, শোভন বাংলায় যার অর্থ ‘গোল্ল­ায় যাও’। এই সব কথা ও প্রতীক দিয়ে আসলে কী বলতে চাইছেন পরীমনি? প্রথম আলো’কে তিনি জানালেন, এটা তিনি ‘বিচ’দের উদ্দেশ্যেই বলেছেন।

আমেরিকান জাজ শিল্পী রাসেল গুন এর গানের লাইনটা ছিলো ‘ইরঃপয, ণড়ঁ উড়হ’ঃ খড়াব গব’ . জেলখানা থেকে মুক্তি পাওয়া চিত্র নায়িকা পরীমণির হাতে মেহেদি দিয়ে লেখা ছিলো ‘উড়হ’ঃ ষড়াব সব নরঃপয’। রিমান্ডেও পরীমনি ছিলেন দৃঢ়, মাথা উঁচু করে জেলখানা থেকে আদালত, আদালত থেকে জেলখানায় গিয়েছেন তিনি। শুরুতে যে কথা বলেছিলাম জেলখানা থেকে বেরিয়ে তাঁর দৃঢ়তা ছিল অটুট। তিনি বের হলেন প্রকৃত বীরের মতো। মাথা উঁচু করে নয়, চলনে-বলনে নায়িকাভাব বজায় রেখে। তাকে যখন গ্রেফতার করে বাড়ির বাইরে নিয়ে যাওয়া হয় তখন সে সালোয়ার কামিজ বা শাড়ি নয়, রীতিমত প্যান্ট-শার্ট পরে পুলিশের গাড়িতে উঠেছে।

পরীমনি বললেন, ‘যারা বিচ তাঁদের উদ্দেশ্যে এমন কথা বলেছি। লেখাটা পড়ে যাঁদের মনে হবে, আল্লাহ, আমাকে নিয়ে এটা লিখল-তাঁদের উদ্দেশ্যেই এই লেখা। ওদের তালিকা তো আমি নাম ধরে বলতে পারব না। আমাকে আটক, গ্রেপ্তার এবং কারাগারে নিয়ে যাওয়ার পর তাদের জীবন সার্থক মনে হয়েছে। কেউ কেউ তো খুশিতে নাচাও শুরু করেছে। যেই আমি ফিরে আসছি, অনেকে আবার মিস ইউ, লাভ ইউ বলা শুরু করছে। এই ধরনের ভালোবাসা আমার দরকার নাই। আমি তাদেরকেই বলেছি, তোমরা আমাকে ভালোবাইসো না। আমি যাদের জন্য পরীমনি, যারা সত্যি সত্যি আমাকে অন্তরের মধ্যে বসাইয়ে রাখছে, তাদের আমি সব সময় ভালোবাসি। আজীবন ভালোবাসি।’

আমেরিকান জাজ শিল্পী রাসেল গুন এর গানের লাইনটা ছিলো ‘ইরঃপয, ণড়ঁ উড়হ’ঃ খড়াব গব’ . জেলখানা থেকে মুক্তি পাওয়া চিত্র নায়িকা পরীমণির হাতে মেহেদি দিয়ে লেখা ছিলো ‘উড়হ’ঃ ষড়াব সব নরঃপয’। রিমান্ডেও পরীমনি ছিলেন দৃঢ়, মাথা উঁচু করে জেলখানা থেকে আদালত, আদালত থেকে জেলখানায় গিয়েছেন তিনি। শুরুতে যে কথা বলেছিলাম জেলখানা থেকে বেরিয়ে তাঁর দৃঢ়তা ছিল অটুট। তিনি বের হলেন প্রকৃত বীরের মতো। মাথা উঁচু করে নয়, চলনে-বলনে নায়িকাভাব বজায় রেখে। তাকে যখন গ্রেফতার করে বাড়ির বাইরে নিয়ে যাওয়া হয় তখন সে সালোয়ার কামিজ বা শাড়ি নয়, রীতিমত প্যান্ট-শার্ট পরে পুলিশের গাড়িতে উঠেছে।

এসময় অন্যদের মত সে মুখ ঢেকে, মাথা নিচু করে রাখেনি। মাথা সোজা রেখে স্মার্টলি হেঁটেই গাড়িতে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে খুব কম মানুষই এমনটা পারে। তেজোদ্দীপ্ত পরী মেহেদি দিয়ে হাতের তালুতে জাজ সংগীতের একটি কলি খানিকটা ঘুরিয়ে লিখে নতুন করে তার তেজের জানান দিলেন যেনো।

এবার একজন সত্যিকারের বীরের কথা বলবো। আমরা কতো অযাচিত বিষয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিতর্ক করি। যেগুলো কোনো ইস্যু নয়, এমন বিষয় নিয়ে লিখি। কিন্তু এসবের আড়ালে পড়ে থাকে অনেক বীরের বীরত্বগাঁথা। তাদের নিয়ে হয়তো ফেসবুকে মাতামাতি হয় কম। তিনি ফ্লাইট ক্যাপ্টেন নওশাদ আতাউল কাইয়ুম। এখন তিনি মা-বোনের কবরে শায়িত। অথচ নিজের জীবন দিয়ে শতাধিক মানুষের জীবন বাঁচিয়ে গিয়েছেন তিনি।

পাঁচ বছর আগে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়ে দেড়শ’ মানুষকে বাঁচিয়েছিলেন তিনি ও তাঁর সহ পাইলট। সেবার ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছিল। দিনটি ছিল ২২ ডিসেম্বর। ওমান থেকে ফ্লাইটটি যাচ্ছিল চট্টগ্রাম। ওমানের স্থানীয় সময় তখন রাত তিনটা। গভীর রাতে দেড় শতাধিক আরোহী নিয়ে মাসকট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গর্জন করে আকাশে উড়াল দিতে যাচ্ছিল বাংলাদেশ বিমানের বোয়িং ৭৩৭-৮০০ উড়োজাহাজ। গন্তব্য ছিল চট্টগ্রাম। কিন্তু মাসকট বিমানবন্দরে রানওয়ে থেকে উড়াল দেওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে উড়োজাহাজটিতে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। পরে কন্ট্রোল টাওয়ারে দফায় দফায় যোগাযোগ করে জানতে পারেন ল্যান্ডিং গিয়ারের ডান পাশের চাকার টায়ার ফেটেছে।

তবে শুরু থেকেই যাত্রীদের আতঙ্কিত না হতে বলেন ক্যাপ্টেন নওশাদ আতাউল কাইয়ুম। তিনি ও ফার্স্ট অফিসার মেহেদী হাসান বুঝতেও পারছিলেন, কী ঘটেছে। ১৮ টন জ্বালানি আর উড়োজাহাজটির ওজন ৬০ টন। সব মিলিয়ে ৭৮ টন ওজনের বিশাল উড়োজাহাজের ওমানে জরুরি অবতরণ করাও অসম্ভব। একটু এদিক-সেদিক হলেই বিস্ফোরিত হতো উড়োজাহাজটি। প্রাণ যেতে পারত সব আরোহীর। তবে পাঁচ ঘণ্টা পথ পাড়ি দিয়ে ঢাকায় জরুরি অবতরণ করান ক্যাপ্টেন নওশাদ। জীবন রক্ষা পায় দেড়শ’ যাত্রীর। এই দুঃসহ অভিযাত্রার স্বীকৃতি হিসেবে বৈমানিকদের আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব এয়ারলাইনস পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের প্রশংসাপত্র পেয়েছিলেন।

আর এবার ২৭ আগস্ট শুক্রবার সকালে বিমানের একটি ফ্লাইটে ওমানের মাসকট থেকে ১২৪ জন যাত্রী নিয়ে ঢাকায় ফিরছিলেন নওশাদ। ভারতের আকাশসীমায় থাকা অবস্থায় ৪৪ বছর বয়সী এই পাইলট হৃদরোগে (হার্ট অ্যাটাক) আক্রান্ত হন। এ সময় বিমানটিকে মহারাষ্ট্রের নাগপুরের বাবাসাহেব আম্বেদকর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করানো হয়। পরে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

গেল সপ্তাহে দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনা আরো একজন বীরের কথা বলবো। বাংলাদেশের বিজ্ঞানী ফেরদৌসী কাদরী এশিয়ার নোবেল হিসেবে খ্যাত ম্যাগসেসে পুরস্কার পেয়েছেন। বিজ্ঞানী ফেরদৌসী কাদরী আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী। কলেরার টিকা নিয়ে গবেষণা ও সাশ্রয়ী দামে টিকা সহজলভ্য করে লাখো প্রাণরক্ষায় কাজ করেছেন তিনি। মানুষের জীবন কেমন দেখেন। সুখ, দুঃখ যেন সমান্তরালভাবে রয়ে চলে। পুরস্কার লাভের সেই একই দিনে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে স্বামীকে হারিয়েছেন তিনি।

ফেরদৌসী কাদরীর স্বামী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রির শিক্ষক অধ্যাপক ড. সালেহীন কাদরী বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। পুরস্কার ঘোষণার দিনেই রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি। খুশির দিনে শোকের এমন খবর! জীবন আসলে এমনই।

শান্তনু চৌধুরী সাংবাদিক ও সাহিত্যিক