বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৮ আশ্বিন ১৪২৮

কোটি টাকার স্ক্র্যাপ গ্যাসসিলিন্ডার ৩৩ লাখ টাকায় বিক্রি!

প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ৯, ২০২১, ৫:২৭ অপরাহ্ণ


একুশে প্রতিবেদক : বিআরটিএ, চট্টগ্রাম সার্কেল পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কোটি টাকা মূল্যের স্ক্র্যাপকৃত ১১ হাজার ৮২৯টি গ্যাসসিলিন্ডার ৩৩ লাখ টাকায় বিক্রি করে দিচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। নামসর্বস্ব পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে গত ৮ সেপ্টেম্বর ‘ইউসুফ এন্টারপ্রাইজ’ নামের এক প্রতিষ্ঠানকে সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির উপপরিচালক মো. শহীদুল্লাহ এবং সহকারী পরিচালক (ইঞ্জি.) এমডি. শাহ আলমের যোগসাজশে বড় ধরনের এ অনিয়ম করা হয়েছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

ভুক্তভোগী চট্টগ্রাম নগরের পূর্ব মাদারবাড়ি এলাকার বাসিন্দা মেসার্স নিজাম ট্রেডার্স এর মালিক মোহাম্মদ নিজাম উদ্দিন আজ শুক্রবার একুশে পত্রিকার কাছে অভিযোগ করে বলেন, “স্থানীয় দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর তৌফক আহমদ চৌধুরীর সাথে বিআরটিএ কর্মকর্তাদের আঁতাত আছে। যার ফলে আমরা সুবিধা করতে পারছি না। তার বিরুদ্ধে তো অনেক অভিযোগ আছে সেটা আপনারা জানেন।”

ভুক্তভোগীরা জানান, পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে শিডিউল বিক্রিতে গড়িমসি করেন। কোন কোন প্রতিষ্ঠানের কাছে শিডিউল বিক্রির সময় সংস্থাটির উপপরিচালক শহীদুল্লাহ নিজেই নিয়মবহিভূতভাবে দর ঠিক করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ আছে।

শুধু তাই নয়, দরপত্রের বাইরে প্রতি পিস গ্যাস সিলিন্ডারের বিপরীতে ‘অফিস খরচের’ নামে ২০০ টাকা করে ‘ঘুষ’ দাবি করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে বিআরটিএ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। এই বিষয়ে ভুক্তভোগীদের দেওয়া বক্তব্য একুশে পত্রিকার কাছে সংরক্ষিত আছে।

বক্তব্য নিতে বৃহস্পতিবার সকাল পৌনে ১১ টার দিকে বিআরটিএ, চট্টগ্রাম সার্কেলের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জি.) এমডি. শাহ আলমের দপ্তরে যান একুশে পত্রিকার এ প্রতিবেদক। মেয়াদোত্তীর্ণ সিএনজি অটোরিকশার স্ক্র্যাপকৃত গ্যাস সিলিন্ডিারের দরপত্রের বিষয়ে জানতে চাইলে শাহ আলম বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কোনও বক্তব্য দিতে পারব না। আপনি (প্রতিবেদক) উপপরিচালকের কাছে যান।’

এরপর উপপরিচালক মো. শহীদুল্লাহ’র দপ্তরে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। বক্তব্য জানতে বৃহস্পতিবার বেলা ২টা ৫৮ মিনিট এবং বিকাল ৩টা ৩১ মিনিট এবং আজ শুক্রবার দুপুর ১২ টা ২৫ মিনিটে কল করলে বিআরটিএ, চট্টগ্রাম সার্কেলের উপপরিচালক মো. শহীদুল্লাহর মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরে তার মুঠোফোনে এসএমএস দিয়েও সাড়া পাওয়া যায়নি।

জানা গেছে, মেয়াদোত্তীর্ণ সিএনজি অটোরিকশার স্ক্র্যাপকৃত ১১ হাজার ৮২৯ পিস গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রয়ের জন্য গত ২৪ আগস্ট ‘ভোরের সময়’ নামে একটি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দরপত্র আহ্বান করেন বিআরটিএ, চট্টগ্রাম সার্কেলের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জি.) এমডি. শাহ আলম। আগ্রহীদের গত ৭ সেপ্টেম্বর বিআরটিএ অফিস থেকে ৫০০ টাকা অফেরতযোগ্য মূল্যে দরপত্র শিডিউল ক্রয় এবং পরের দিন ৮ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টায় টেন্ডার বাক্স খোলার কথা বলা হয়। ৮ সেপ্টেম্বর দুপুরে টেন্ডার বাক্স খুলে বিআরটিএ, চট্টগ্রাম কর্তৃপক্ষ। এতে দেখা যায়, মাত্র ৬টি দরপত্র জমা পড়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো-যথাক্রমে মেসার্স ইসলামিয়া এন্টারপ্রাইজ। এ প্রতিষ্ঠান প্রতিপিস গ্যাস সিলিন্ডারের দর দিয়েছে ১৮৫ টাকা, জেএস করপোরেশন দিয়েছে ১৬১ টাকা, মেসার্স সিরাজ ট্রেডিং দিয়েছে ১৩০ টাকা, এলাহী এন্টারপ্রাইজ দিয়েছে ২৭৫ টাকা, ইউসুফ এন্টারপ্রাইজ দিয়েছে ২৮০ টাকা এবং শতরূপা এন্টারপ্রাইজ দিয়েছে ২৬১ টাকা। এরমধ্যে ‘ইউসুফ এন্টারপ্রাইজকে সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

শিডিউল না পেয়ে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারেননি বিছমিল্লাহ ট্রেডার্স এর প্রতিনিধি কুরবান আলী ঝুমন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে একুশে পত্রিকাকে বলেন, “আমাদেরকে শিডিউল দেয়নি বিআরটিএ। আপনারা জানেন, যার ক্ষমতা আছে তার সবকিছু। বিআরটিএ গোপনীয়তার মধ্য দিয়ে টেন্ডার প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করেছে। বিআরটিএ ছাড়া পুলিশ কমিশনার ও জেলা প্রশাসক কার্যালয়েও টেন্ডার বুথ করা দরকার ছিল। এরকম হলে সবাই শিডিউল কিনতে পারতেন। কিন্তু সংস্থাটি তা করেনি। টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে একটি নাম সর্বস্ব পত্রিকায়। বিজ্ঞপ্তিটা জাতীয় পত্রিকা ইত্তেফাক, সমকাল এবং আঞ্চলিক পত্রিকা পূর্বকোণ বা আজাদীতে দেওয়া উচিত ছিল। এখন সরকারি সব টেন্ডার তো এভাবেই হচ্ছে।” মূলত ইউসুফ এন্টারপ্রাইজকে কাজ পাইয়ে দিতে বিআরটিএ’র কর্মকর্তারা এ অনিয়ম করেছেন বলে অভিমত ভুক্তভোগীদের।

পুরাতন লোহা ব্যবসায়ীরা জানান, সিএনজি অটোরিকশার স্ক্রাপকৃত একটি গ্যাস সিলিন্ডারে ১৭ কেজি ওজনের লোহা আছে। প্রতিকেজি পুরাতন লোহা ৫০ টাকা দর হলে একটি সিলিন্ডারের দাম পড়ে দেড় হাজার টাকা। এ হিসেবে ১১ হাজার ৮২৯ পিস সিলিন্ডারের দাম দাঁড়ায় ১ কোটি ৫৪ হাজার ৬৫০ টাকা।

ব্যবসায়ীরা জানান, সিএনজি অটোরিকশার স্ক্র্যাপকৃত একটি গ্যাস সিলিন্ডারের বর্তমান বাজার মূল্য হবে ৮৫০ টাকা। এক্ষেত্রে ১১ হাজার ৮২৯টি সিল্ডিারের দাম দাঁড়ায় ১ কোটি ৫৪ হাজার ৬৫০ টাকা। ইউসুফ এন্টারপ্রাইজের দেওয়া দর অনুয়ায়ী ১১ হাজার ৮২৯টি গ্যাস সিল্ডিারের দাম দাঁড়ায় ৩৩ লাখ ১২ হাজার ১২০ টাকা। ফলে কোটি টাকা দামের স্ক্রাপকৃত গ্যাস সিলিন্ডার ইউসুফ এন্টারপ্রাইজের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে ৩৩ লাখ টাকায়।

অভিযোগ আছে, কেবল পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে মাত্র ছয়টি প্রতিষ্ঠানের কাছে শিডিউল বিক্রি করে বিআরটিএ। শিডিউল না পাওয়া অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে-জাহেদ এন্টারপ্রাইজ, সুমন এন্টারপ্রাইজ, ইব্রাহিম অ্যান্ড সন্স, শাহ আমানত আয়রণ সেন্টার, নুর এন্টারপ্রাইজসহ অন্তত ২৮-৩০টি প্রতিষ্ঠান।