বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৮ আশ্বিন ১৪২৮

চিকিৎসায় অবহেলার প্রতিকার কী?

প্রকাশিতঃ রবিবার, সেপ্টেম্বর ১২, ২০২১, ১:২৭ অপরাহ্ণ

শরীফুল রুকন : চট্টগ্রামের বেসরকারি ইমপেরিয়াল হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশনে জন্মের সময়ই এক নবজাতকের বাম হাত ভেঙে পুরোপুরি দ্বিখণ্ডিত হওয়ার পর চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ এনেছেন তার অভিভাবকরা। গত ১৯ আগস্টের ওই ঘটনায় ইমপেরিয়াল হাসপাতালের চেয়ারম্যান প্রফেসর ডা. রবিউল হোসেন বরাবরে অভিযোগ করেছেন ওই নবজাতকের বাবা মোহাম্মদ সালাউদ্দীন। এছাড়া একই বিষয়ে চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ও চট্টগ্রামের সিভিল সার্জনকেও অভিযোগ করা হয়েছে। কিন্তু কোনও ধরনের প্রতিকার মেলেনি।

ওই নবজাতকের মামা শামীম আহমেদ রবিন শুক্রবার (১০ সেপ্টেম্বর) রাতে একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘হাত ভেঙে দুই টুকরো হওয়ার ঘটনায় ইমপেরিয়াল হাসপাতালের চেয়ারম্যান বরাবর অভিযোগ করেছিলাম আমরা।

চেয়ারম্যানের পিএস তানভীর আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবেন বলেছিলেন। এখন তিনি ফোনও ধরেন না। স্বাস্থ্য পরিচালক ও সিভিল সার্জনকেও অভিযোগ করেছিলাম। তারাও কোন ব্যবস্থা নিয়েছে বলে জানতে পারিনি। এখন বাচ্চাকে সুস্থ করতে আমরা ঢাকার এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি করছি।’

২০১৮ সালের জুলাই মাসে চিকিৎসকদের অবহেলায় চট্টগ্রামের সিনিয়র সাংবাদিক রুবেল খান তার আড়াই বছর বয়সী কন্যাসন্তান রাইফাকে হারিয়েছিলেন। বিষয়টি বিএমডিসিকে তদন্তের আদেশ দেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এরপর বিএমডিসির তদন্ত দল রুবেল খানের বক্তব্য না নিয়ে একপেশে প্রতিবেদন জমা দেয় বলে অভিযোগ উঠে। রুবেল খান সেই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে আদালতের আশ্রয় নেন। আদালত বিএমডিসিকে বিষয়টি নতুন করে তদন্তের আদেশ দেয়। রুবেল খান এখনো বিচার পাননি।

এভাবে বিভিন্ন সময় চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসা বা অবহেলার অভিযোগ উঠেছে এবং অনেক সময় রোগীর স্বজনদের বিক্ষোভের ঘটনাও দেখা গেছে। এসব ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত রোগী বা স্বজনরা কতটা আইনি প্রতিকার পান?

প্রতিকারের জন্য দেশে কিছু বিচ্ছিন্ন আইন থাকলেও কোন পৃথক ও পূর্ণাঙ্গ আইন নেই। অবহেলার প্রতিকারের জন্য দণ্ডবিধির ৩০৪, ৩০৪এ, ৩৩৬,৩৩৭, ৩৩৮ ধারা বা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের অধীনে মামলার আশ্রয় নেয়াও সহজ নয়। ফলে একদিকে চিকিৎসায় অবহেলার শিকার রোগীরা প্রতিকার পাচ্ছে এমন উদাহরণ কম, অন্যদিকে প্রকৃত অবহেলা থাকুক বা না থাকুক চিকিৎসকরা রোগী বা তার আত্মীয়-স্বজনদের আক্রোশের শিকার হচ্ছেন। এ ধরণের আক্রোশের একটি কারণ হচ্ছে তারা জানে আইনি প্রতিকার পাওয়া কঠিন।

এদিকে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল বা বিএমডিসি একটি সরকারি সংস্থা। এখানে যারা কর্মরত রয়েছেন তারা সবাই চিকিৎসক। বিএমডিসিতে চিকিৎসকের বা স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ক প্রতিষ্ঠানের অবহেলার বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ করা যায়।

এক্ষেত্রে যে হাসপাতাল বা চিকিৎসক সম্পর্কে অভিযোগ, সেখানে যে সেবা নিয়েছেন তার সকল কাগজপত্র, চিকিৎসক, প্রতিষ্ঠানের নাম, চিকিৎসার তারিখ, সময় সহ সে কেন মনে করছে অবহেলা হয়েছে তার একটি ব্যাখ্যা সহ বিএমডিসির রেজিস্ট্রার বরাবর অভিযোগকারীর সই ও ঠিকানা সহ লিখিত অভিযোগ করতে হবে।

এরপর অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছে সেই অভিযোগের কপি পাঠানো হবে। তাকে কাউন্সিলের কাছে জবাব দিতে নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেয়া হবে। সেই বক্তব্য পাওয়ার পর বিএমডিসি অভিযোগকারীকে সেটি জানাবে। তার সেই বক্তব্যে আপত্তি থাকলে তিনি সেটি গ্রহণ না করার অধিকার রাখেন। অভিযোগ তখন একটি শৃঙ্খলা কমিটির কাছে যাবে । কমিটি যদি মনে করে এই ঘটনার তদন্ত করা প্রয়োজন তাহলে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তারা দরকারে হাসপাতালে যাবে এবং প্রতিবেদন জমা দেবে।

কিন্তু বাস্তবতা হল বিএমডিসিতে অভিযোগ করার বিষয়ে অনেকেই জানেন না। আরও বড় সমস্যা হল বিএমডিসির রাজধানী ঢাকায় কার্যালয় মাত্র একটি। আর সেখানে কেউ অভিযোগ নিয়ে গেলেও তাতে অনেক সময় লেগে যায় বা তেমন একটা প্রতিকারও পাওয়া যায় না। তাই সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি প্রায়শই তার ক্ষোভ হাসপাতাল বা ক্লিনিকেই প্রকাশ করে ফেলেন।

এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবীর চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘চিকিৎসায় অবহেলা বা ভুল চিকিৎসা প্রমাণ করতে পারলে বিচারের ব্যবস্থা আছে। কিন্তু চিকিৎসকদের আইনের আওতায় আনার প্র্যাকটিস নেই। শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য আগে আদালতে প্রমাণ করতে হবে যে এই চিকিৎসাটি ভুল ছিল আর অন্যভাবে করলে সঠিক হতো। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে একজন চিকিৎসক আরেকজনের বিরুদ্ধে সেই সাক্ষ্য দিতে চান না। যার কারণে প্রতিকার পাওয়া যায় না।’

তিনি আরও বলেন, ‘আইনজীবীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ বার কাউন্সিলের রয়েছে। খোঁজ নিলে দেখবেন প্রতি বছর অনেক আইনজীবীর বিরুদ্ধে বার কাউন্সিল কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে। চিকিৎসকের ব্যাপারে বিএমডিসিতে অভিযোগ জানানোর সুযোগ আছে। কিন্তু তারা এ পর্যন্ত কোন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে বলে শোনা যায়নি।’

এদিকে দেশে ২০১৬ সালে ‘রোগী এবং স্বাস্থ্যসেবা দানকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান সুরক্ষা আইন’ নামে একটি আইন প্রস্তাব করে সরকার; কিন্তু এই আইনটি এখনো পাশ হয়নি। আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, চিকিৎসায় অবহেলা বা ভুলের অভিযোগ তুলে চিকিৎসক ও অন্যদের ওপর হামলা এবং তাদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা দেওয়া হচ্ছে। এতে করে চিকিৎসাকর্মীরা স্বাভাবিক পরিবেশে কাজ করতে পারছেন না। পাশাপাশি রোগী যেন কোনো ধরনের হয়রানি, অবহেলা বা ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে জন্যও আইনটির দরকার।

প্রস্তাবিত আইনের ১০ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, স্বাস্থ্যসেবাদানকারী ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনোরকম অবহেলার অভিযোগ কোনো শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী উত্থাপন করলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত না হলে সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যসেবাদানকারী ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা যাবে না। ৯ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, আদালত অবহেলার অভিযোগ গঠনের আগে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ তিনজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক (সহযোগী অধ্যাপক/সিনিয়র কনসালট্যান্টের নিচে নন) সমন্বয়ে গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটির কাছে অবহেলার বিষয়ে মতামতের জন্য পাঠাবেন।

৭ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, পেশাগত দায়িত্ব পালনে বা চিকিৎসা দেওয়ায় অবহেলা বা অপরাধসম অবহেলা অপরাধ বলে গণ্য হবে। কিন্তু এ অপরাধ ‘আমল অযোগ্য’ ও ‘জামিনযোগ্য’ হবে। কোনো ব্যক্তি স্বাস্থ্যসেবাদানকারীর প্রতি সহিংস আচরণ করলে, প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর চালালে তা আমলযোগ্য ও জামিন অযোগ্য হবে বলে প্রস্তাবিত আইনে উল্লেখ করা হয়েছে। আমল অযোগ্য ও জামিনযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে পরোয়ানা ছাড়া অভিযুক্ত ব্যক্তিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পারবে না। পুলিশ তদন্ত করে প্রতিবেদন দিলে পরেই অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা যাবে।

প্রস্তাবিত আইনে চিকিৎসা সেবাদানকারী বলতে চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত নিবন্ধিত চিকিৎসক, নার্স, ওয়ার্ডবয়, মিডওয়াইফ, চিকিৎসা সহকারী অথবা স্বাস্থ্যসেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অন্য ব্যক্তিদের বোঝানো হয়েছে।
আইনে সুনির্দিষ্টভাবে সাতটি বিষয়কে পেশাগত নৈতিকতার আওতায় আনা হয়েছে। এগুলোর ব্যতিক্রম ঘটলে তা অপরাধ বলে বিবেচিত হবে। এই তালিকায় বিএমডিসি স্বীকৃত নয় এমন ডিগ্রি ব্যবহার, কোনো বিশেষায়িত বিষয়ে যথাযথ প্রশিক্ষিত বা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত না হয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষায়িত চিকিৎসা দেওয়ায় যুক্ত হওয়া অপরাধ। এ ছাড়া স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে কোনো মিথ্যা প্রত্যয়নপত্র বা বিল দিলে বা রোগীর কাছ থেকে পারিতোষিক বা পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যয় অংশীদারত্বের ভিত্তিতে নিলে সেটিও অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

তবে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার সময় অবহেলায় রোগীর মৃত্যু হলে সংশ্লিষ্ট সেবাদানকারী ব্যক্তি বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ দ-বিধির ৩০৪-এর ক ধারা প্রয়োগ করা যাবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ধারায় অনধিক তিন বছর কারাদ-ের বিধান আছে। রোগীর জীবন ঝুঁকিপূর্ণ হলে অনধিক তিন বছরের কারাদ- বা দুই লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দ- দেওয়ার বিধান থাকছে। তবে রোগী ও তার স্বজনেরা আইন অমান্য করলে অনধিক তিন বছর কারাদ- বা পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দ-ের বিধান রাখা হয়েছে প্রস্তাবিত আইনে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. আবুল কালাম আজাদ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, এটির খসড়া মন্ত্রিসভায় পাঠানো হয়েছিলো। মন্ত্রিসভা কিছু প্রশ্ন পাঠায়। সেগুলো সংযুক্ত করে আবারো মন্ত্রিসভায় পাঠানো হয়েছে।
কিন্তু অভিযোগ রয়েছে চিকিৎসকদের আপত্তির কারণেই তা এখনো পাশ করা সম্ভব হয়নি। আইনটির খসড়া প্রকাশিত হয় যখন, সেই সময় থেকেই এর সমালোচনা শুরু হয়েছে এই নিয়ে যে এতে রোগী নয় বরং চিকিৎসকদের সুরক্ষার দিকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

ভুল চিকিৎসার অভিযোগে রোগীর আত্মীয়দের সাথে চিকিৎসকদের নানা সময়ে যে বিবাদ, ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে সেই বিষয়টি নজর পেয়েছে বেশি। বিশেষ করে দুটি বিষয় নিয়ে আপত্তি উঠেছে। আর তা হল চিকিৎসকের ভুলের অভিযোগ উঠলে চিকিৎসক বা অন্য সেবা-দানকারীদের সাথে সাথে গ্রেপ্তার করা যাবে না। অন্যদিকে কোনও ব্যক্তি স্বাস্থ্য সেবা-দানকারীদের প্রতি সহিংস আচরণ করলে এবং প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর করলে তা জামিন অযোগ্য অপরাধ হবে বলে গণ্য হবে। আর এ কারণেই অনেকে মনে করছেন চিকিৎসক ও প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষা নিয়ে আইনটিতে বেশি মনোযোগ দেয়া হয়েছে। এসব কারণে নতুন আইনের খসড়ায় রোগী ও চিকিৎসক দুই পক্ষই অখুশি। যার কারণে আইনটি আর পাশ হচ্ছে না। অথচ চিকিৎসক ও রোগী উভয়ের সুরক্ষায় আইন প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অবহেলা সংক্রান্ত কোন বিরোধ বা মামলা হলে তা প্রমাণের আগেই সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের সুনাম নষ্ট হওয়ার আশংকা থাকে যা চিকিৎসা সহায়ক নয়। চিকিৎসায় অবহেলা নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন ও বেশী এখতিয়ারসম্পন্ন আদালত চিকিৎসকদের অতি সতর্ক চিকিৎসায় ঠেলে দিতে পারে এবং চিকিৎসা ধীরায়িত হতে পারে, যার ফলে চিকিৎসা ক্ষতিগ্রস্থ হবার সম্ভাবনা থাকে।

বিএমডিসির কর্মকাণ্ড সাধারণভাবে চিকিৎসা সেবা, চিকিৎসকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ ও সার্টিফিকেট প্রদান, বিদেশী চিকিৎসা শিক্ষার ডিগ্রীর স্বীকৃতি প্রদান, সার্টিফিকেট বাতিল ইত্যাদির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বিএমডিসির মূল আইনে চিকিৎসায় অবহেলার বিষয়টিই উল্লেখ নেই। তবে চিকিৎসা আচরণ বিধিতে অবহেলা ও তার প্রতিকার বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে। বিএমডিসি ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের কাঠামোতে চিকিৎসায় অবহেলা বা অনিয়ম বা ভুল বা আচরণ বিধি লঙ্ঘনের যে প্রতিকারের ব্যবস্থা রয়েছে তা অপ্রতূল।

এদিকে চিকিৎসায় অবহেলাসহ চিকিৎসা সেবার মানোন্নয়নের সমস্যা নিরসনে ২০১৩ সালের ১৮ মার্চ সরকারকে কিছু সুপারিশ করেছে আইন কমিশন। যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, “বিএমডিসি ও বিএমএ-র পরামর্শক্রমে সরকার কর্তৃক চিকিৎসা নির্দেশিকা প্রণয়ন করে তা মেনে চলতে বাধ্যতামূলক করতে হবে। চিকিৎসায় অবহেলার প্রতিকারের জন্য বিশেষ দেওয়ানী আদালত গঠন করা যায়, যেখানে ক্ষতিপূরণ ও আদালতের উদ্যোগে মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিস্পত্তির সুযোগ থাকবে বেশি। তবে গুরুতর অবহেলার ফলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির ক্ষতির প্রতিকারের জন্য দ-বিধির আশ্রয় গ্রহণ কোনও বাধা হবে না।

আদালতে যাবার আগে অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য প্রেস কাউন্সিলের অনুরূপ বিএমডিসিতে যাবার বিষয়টি বিবেচনায় আনা যেতে পারে, যেখানে বিচার না পেলে আদালতে যাওয়া যাবে। সেক্ষেত্রে বিএমডিসির গঠন ও এখতিয়ারের পরিবর্তন আনা যেতে পারে। চিকিৎসক বা চিকিৎসা সহকারীর অবহেলার জন্য সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল বা চিকিৎসা কেন্দ্রকেও দায় বহন করতে হবে। হাসপাতালসমূহে যথাযথ ব্যবস্থাপনা, চিকিৎসা উপকরণ সরবরাহ, প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক নিয়োগ, চিকিৎসক ও চিকিৎসা সহকারীদের জন্য নিরাপদ ও সম্মানীয় পরিবেশ সৃষ্টি বিষয়ে সরকারের বাধ্যবাধকতা।

অনেক সময় চিকিৎসক তার চেম্বারে অন্য একাধিক রোগীর উপস্থিতিতে কোন চিকিৎসা প্রার্থীর বক্তব্য শোনেন এবং পরামর্শ বা ব্যবস্থাপত্র প্রদান করেন। চিকিৎসা প্রার্থীর গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থে এই ধরনের প্র্যাকটিস পরিহার করতে হবে। মেডিকেল কলেজের পাঠ্যসূচিতে চিকিৎসা আচরণবিধি, বিশেষ কাউন্সিলিং বা রোগীর প্রতি সেবামূলক মনোভাব গঠনের উপর জোর দিতে হবে। উল্লিখিত বিষয়াবলী ও অন্যান্য টেকনিক্যাল বিষয় বিবেচনায় নিয়ে আইনের খসড়া প্রণয়নের জন্য চিকিৎসক, আইনজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ সমন্বয়ে একটি কমিটির সহায়তা নেয়া অপরিহার্য।’

উল্লেখিত সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন এখনো পাশ করতে পারেনি সরকার। যদিও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে আইন আছে। যুক্তরাজ্যে চিকিৎসকদের পেশাগত দায়িত্ব, দায়বদ্ধতা ও তাদের পর্যবেক্ষণের কাজটি করে স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা জেনারেল মেডিকেল কাউন্সিল (জেএমসি)। এটি চিকিৎসকদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। একই সঙ্গে তারা রোগীদের স্বার্থের বিষয়টিও দেখাশোনা করে। দক্ষতা, যোগ্যতা ও রোগীদের কল্যাণ বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান যাচাইপূর্বক এই লাইসেন্স ও নিবন্ধন দেওয়া হয়। লাইসেন্স বহাল রাখা হবে কি না, সে বিষয়ে প্রতিবছর চিকিৎসকের সেবা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন করে জেএমসি।

চিকিৎসা-সংক্রান্ত যে কোনো বিরোধে রোগী ও চিকিৎসক অভিযোগ করতে পারে জেএমসিতে। অভিযোগ তদন্তে জেএমসির নিজস্ব তদন্ত দল রয়েছে। তারা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রতিবেদন দেয়। পেশাগত ভুল, অবহেলা কিংবা অন্য কোনো অপরাধ বিবেচনায় চিকিৎসকের লাইসেন্সও বাতিল হতে পারে। যুক্তরাজ্যে চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগে রোগীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়, তবে চরম অবহেলার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের লাইসেন্স বাতিল করা হয়ে থাকে।

এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবীর চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমাদের দেশে বিদেশি চিকিৎসকদের ফ্রি চিকিৎসা দিতে আসতে দেখা যায়। খালি চোখে এটি মানবসেবা মনে হলে, বিদেশিদের চিন্তা থাকে, এখান থেকে অভিজ্ঞতা অর্জন করা। এ দেশে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে গিয়ে যদি ভুল চিকিৎসাও হয়, তাহলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয় না, এটি তারা ভালো করেই জানে, তাই এখানে ছুটে আসে। উন্নত দেশগুলোতে চিকিৎসায় অবহেলা হলে কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের দেশে সেই সুযোগ নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘চিকিৎসায় সতর্কতা অবলম্বনের মান নির্ধারণ, অবহেলার প্রকৃতি, প্রকার এবং তা পরিমাপ ও নিরসনের কার্যকর পদ্ধতি ঠিক করে সমস্যাটি কার্যকরভাবে মোকাবেলার জন্য একটি আলাদা পরিপূর্ণ আইন প্রণয়ন করা উচিত। সরকারি ও ব্যক্তি মালিকানাধীন হাসপাতালগুলোর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা, চিকিৎসার সুবিধাদি এবং সার্বিক মান কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এ বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে পারলে চিকিৎসায় অবহেলার সুযোগও কমে আসবে।’