রবিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩২

‘শৃঙ্খলা ভাঙলে যতবড় প্রভাবশালীই হোন ব্যবস্থা নেব'(ভিডিওসহ)

| প্রকাশিতঃ ২২ এপ্রিল ২০১৭ | ৮:২৩ অপরাহ্ন


চট্টগ্রাম : দলীয় কোন্দল নিরসন করতে গিয়ে চাপের মুখে পড়ার কথা জানিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন তিনি এ চাপের কাছে নতি স্বীকার করবেন না। শনিবার দুপুরে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা জানান।

আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রতি ওবায়দুল কাদের বলেন, দল করবেন, দলের নিয়ম-শৃঙ্খলা মানবেন না, তা তো হবে না। যতবড় প্রভাবশালীই হোন, ব্যবস্থা নেব। আমি প্রতিনিয়তই চাপের মুখে আছি। কিন্তু এ চাপের কাছে আমি নতি স্বীকার করবো না। এখন পথ দুর্গম। এই দুর্গম পথ অতিক্রম করতে হবে।

তিনি বলেন, আমি লড়ে যাব। আমি লড়াই করে তৃণমূল থেকে এখানে এসেছি। আমি আকাশ থেকে নামিনি। মফস্বল শহর হয়ে ঢাকায় গিয়েছি। জীবনের সাড়ে চারবছর জেলে চলে গেছে। যে উদ্দেশ্যে নিয়ে নেত্রী আমাকে দায়িত্ব দিয়েছে, আমি আমার মেধা, শ্রম সবকিছু উজাড় করে নেত্রীর মুখ রক্ষা করবো- এটা আমার শপথ।

ওবায়দুল কাদের বলেন, আমি জানি, আমার অনেক আপন মানুষ অচেনা হয়ে যাবে। আমার অনেক আত্মীয়, অনাত্মীয় হয়ে যাবেন। আমি জানি আমার বহুদিনের ঘনিষ্ঠ কর্মী, আমার উপর ক্ষুব্ধ হবে। ক্ষুব্ধ হয়ে পেছনে গিয়ে আমার বিরূপ সমালোচনা করবে। কিন্তু আওয়ামী লীগকে সুসংহত করতে, সুশৃঙ্খল করতে, শৃঙ্খলাবান্ধব করতে, স্মাট করতে, সংগঠিত শক্তি হিসেবে গড়ে তোলার জন্য আমি শেষ পর্যন্ত লড়ে যাবো। অনেকেই অসন্তুষ্ট হতে পারেন। সেদিকে খেয়াল করার প্রয়োজন আমার নেই।

বক্তব্যের শুরুতেই তিনি বলেন, সব নেতার নাম উচ্চারণ করা, সব নেতার বিশেষণ দেওয়া উচিত না। তৃণমূলে নেতাদের খুশি করার যে প্রবণতা সেটা আওয়ামী লীগের ভবিষ্যতের জন্য শুভ নয়। আপনার হাতে বক্তব্য দিতে সময় আছে ৫ মিনিট, চার মিনিটই আপনি নেতাদের বিশেষণ দিচ্ছেন। এই যে নেতাদের জয়গান গাইতে শুরু করেছেন, নেতাদের খুশি করার যে প্রবণতা সেটা কীভাবে বন্ধ হবে আমি ভাবছি। এই নেতা বন্দনা ছাড়তে হবে যদি আওয়ামী লীগকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হয়।

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, নেতার বন্দনা করে বিএনপি। যুবরাজের বন্দনা। দেশনেত্রীর বন্দনা। এই বন্দনা করতে করতে পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেছে। এই বন্দনার রাজনীতি বন্ধ করুন। নেতারা আসলে কর্মীদের দাঁড় করিয়ে রাখবেন। সাথে ফুল রাখবেন। এতো সময় নষ্ট করার কী দরকার? আমাকে বলেন তো? কোন দরকার আছে?

তিনি বলেন, এখন তৃণমূল থেকে উঠে এসে কেউ তৃণমূলের ভাষণ দেয় না। আমি শুনতে চেয়েছিলাম তৃণমূলের বাস্তব অবস্থা কী? সংগঠন কী অবস্থায় আছে? সাংগঠনিক অবস্থা কীভাবে চলছে? সম্মেলন হয়েছে কিনা? নির্বাচনে কী ফলাফল করে? এসব বিষয় জানার দরকার ছিল। কিন্তু আপনারা তো শুধু রাজনৈতিক গরম গরম বক্তব্যই দিয়েছেন। আজকের সভার মূল আলোচ্য বিষয় চাপা পড়ে গেছে।

ওবায়দুল কাদের বলেন, সূর্যসেনের দেশ। প্রীতিলতার দেশ। মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী ঘুমিয়ে আছে এই মাটিতে। সবুজ পাহাড়ের দেশ। উত্তাল সমুদ্রের দেশ। কর্ণফুলীর জল। বাঙালির চট্টগ্রাম। ভালোবাসি। বারে বারে আসি। ফিরে আসি। কিন্তু যখন আসি দুঃখ পাই। কষ্ট পাই। ব্যথা পাই। যে বিষয়গুলো আজ বলে গেলাম। স্লোগান নেত্রীর নামে হবে। বঙ্গবন্ধুর নামে হবে। কোন নেতার নামে স্লোগান দেওয়ার দরকার নেই। সংক্ষিপ্ত করুন। প্রাসঙ্গিক করুন।

তিনি বলেন, মঞ্চ ভরে গেছে নেতায়। মঞ্চের সামনের ওই আসনে বসে গেছে অনেকেই। ওরা কেউই তৃণমূলের প্রতিনিধি নয়, তারপরও। সবাই মঞ্চে উঠতে চায়। মঞ্চে উঠে নেতার পাশে বসে উজ্জ্বল হাসি বিতরণ করতে চায়। আবার কোনো কারণে টেলিভিশনের ক্যামেরা যদি ধারণ করতে না পারে, তাহলে সেলফি তো আছেই। সেলফি আর সেলফি। আমি ঢাকায় কথা বলতে গিয়ে সেলফির জ্বালায় অস্থির হয়ে যাই। শুধুই সেলফি। কী যে বলবো ভেবে পাচ্ছি না।

বেলা ৩টার দিকে ওবায়দুল কাদের জানতে চান, এই মিটিংটা কতক্ষণ চললো? উপস্থিত নেতারা জানান, সাড়ে ১০টায় শুরু হয়েছে। তখন ওবায়দুল কাদের বলেন, এই মিটিংটা দুই ঘণ্টায় শেষ করা যেত। শুধু বিশেষণ আর অপ্রাসঙ্গিক ভাষণ বন্ধ করা যদি যেত।

তিনি বলেন, আপনাদের কাছে আমার অনুরোধ, আওয়ামী লীগ করে নৌকার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ যারা করে তাদের দলের প্রতি কোনো আনুগত্য, ভালোবাসা, এটা কী আছে? শ্রদ্ধা আছে? এইসব লোকদের কী বলবেন? যে নেতারা এই বিদ্রোহীদের মাঠে নামান, দলের গলা কাটেন, ছুরিকাঘাত করেন, সেই নেতারা বিদ্রোহীদের চেয়েও বেশি দলের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। বিদ্রোহে যে নেতারা উসকানি দেয় তারা বিদ্রোহীদের চেয়েও খারাপ। এখানে-ওখানে কিছু কিছু ঘটনা ঘটছে। এসব আমাদের নজরে আছে। সময়ই বলে দেবে কত ধানে কত চাল।

তিনি বলেন, আমাদের মধ্যে যত ভুল বোঝাবুঝি থাক, ঘরের কথা ঘরেই রাখবেন। ইউনিয়নের আছে উপজেলা, উপজেলার আছে জেলা, জেলার আছে কেন্দ্র। সেক্রেটারির ‍উপর সভাপতি আছে। ঘরের বিচার ঘরে রাখুন। চা দোকানে বসে পার্টির সমালোচনা, নেতার সমালোচনা করলে ইজ্জত বাড়বে না, দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে। ছোটখাট ভুলত্রুটি ঘরোয়াভাবে বসে সমাধান করুন। কথায় কথায় মুখোমুখি, কথায় কথায় মারামারি, কথায় কথায় খুনোখুনি যেন না হয়।

নেতাদের সতর্ক করে দিয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, সবার এসিআর (বাৎসরিক গোপনীয় প্রতিবেদন) আছে বঙ্গবন্ধু কন্যার কাছে, জমা আছে। যারা বিদ্রোহ করছেন, অপকর্ম করছেন, বিদ্রোহে উসকানি দিচ্ছেন, আগামী নির্বাচনে আপনার এসিআরের মুখোমুখি হতে হবে। আমি আবারও বলছি, যারা দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছেন, তারা আগামী দিনগুলোতে সংশোধন না হলে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাবেন না।

তিনি বলেন, ভালো কাজের দৃষ্টান্ত চাই। ভালো বক্তব্য নয়। ভালো ভাষণ দিয়ে জনগণের মন জয় করা যায় না। কারণ জনগণ জানে ভালো ভাষণের সাথে অনেকের কাজের মিল নেই। আমি মন্ত্রী ভালো মানুষ। কিন্তু আমার চারপাশের মানুষ অপকর্ম করবে, কমিশন খাবে। তাহলে মন্ত্রী হিসেবে কী আমি ভালো? জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার মত কাজ করবেন না।

ছাত্রলীগের প্রতি তিনি বলেন, দলের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়, এমন কোনো কাজ হলে সাংগঠনিকভাবে, প্রশাসনিকভাবে আমরা কাউকে রেহাই দেব না। খারাপ খবরের শিরোনাম হওয়া যাবে না। সুনামের ধারায় ফিরে আসুন। তা না হলে আরও কঠিন, আরও কঠোর, কঠিন ব্যবস্থা আমরা নেব। আমরা এত উন্নয়ন, এত অর্জন, এত র্কীর্তি, এত খ্যাতিকে, শেখ হাসিনার কীর্তিকে গুটিকয়েকের অপকর্মের হাতে জিম্মি হতে দিতে পারি না।

তিনি বলেন, আমি আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছে অনুরোধ করব, ছাত্রলীগকে স্বার্থরক্ষার পাহারাদার হিসেবে ব্যবহার করবেন না। তাতে আপনাদেরও ক্ষতি হবে, ছাত্রলীগেরও ক্ষতি হবে। ঘরের মধ্যে আর ঘর করবেন না। ঠিক আছে? অনেক কথা বললাম। কেউ অসন্তুষ্ট হলে আমি দুঃখিত। তবে আমি যা বললাম দলের স্বার্থে বললাম, রাজনীতির স্বার্থে বললাম, আওয়ামী লীগের স্বার্থে বললাম।

বিএনপিকে নিয়ে বিচলিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। বিএনপি এখন সব আন্দোলনে ব্যর্থ। নির্বাচনে ব্যর্থ। কুমিল্লাতে কম ব্যবধানে জয় পেয়েছে তারা। নারায়নগঞ্জে আমাদের এতবড় বিজয়। আমরা এত উচ্ছ্বাস দেখাইনি। বিএনপি ক্ষমতার জন্য বেপরোয়া হয়ে গেছে। বর্তমানে বিএনপি বেপরোয়া ড্রাইভারের মত। কোন সময় দুর্ঘটনা ঘটায় বলা যায় না। তৃণমূলে আওয়ামী লীগ নির্বাচিত হচ্ছে। এই জয়কে জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত নিয়ে যেতে হবে।

চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের প্রথম সহ-সভাপতি ও রাউজানের সাংসদ এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর সভাপতিত্বে সভায় আরও বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ, কেন্দ্রীয় প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ, সাংগঠনিক সম্পাদক এনামুল হক শামীম, সন্দ্বীপের সাংসদ মাহফুজুর রহমান মিতা এবং সীতাকুন্ডের সাংসদ দিদারুল আলম। চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের প্রশাসক এম এ সালামের সঞ্চালনায় তৃণমূলের প্রতিনিধি হিসেবে ২৫ জন বক্তব্য রাখেন প্রতিনিধি সভায়।