মঙ্গলবার, ৩০ নভেম্বর ২০২১, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

চট্টগ্রামের দুই ছাত্রলীগকর্মীর মৃত্যু অতিরিক্ত মদ্যপান, নাকি মদের বিষক্রিয়া?

প্রকাশিতঃ রবিবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২১, ১২:৩২ অপরাহ্ণ

জসীম উদ্দিন, কক্সবাজার  : কক্সবাজার বেড়াতে এসে কলাতলীর একটি আবাসিক হোটেলে ‘অতিরিক্ত মদ্যপানে’ সাইমুন প্রিয়াম (২৫) ও রাফসানুল হক (২৮) নামের দুইজন ছাত্রলীগ কর্মীর মৃত্যুর ঘটনায় রহস্য সৃষ্টি হয়েছে।
শনিবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দিনগত রাত সোয়া দুইটার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রিয়ামের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি আনিস আহমেদ।

এর আগে একই ঘটনায় শুক্রবার (১৭ সেপ্টেম্বর সকালে ছাত্রলীগ নেতা রাফসানুল হকের মৃত্যু হয়।
জানা গেছে, কক্সবাজার ভ্রমণে এসে দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের সহ সভাপতি আনিস আহমেদের রেফারেন্সে ১৫ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারে কলাতলীস্থ হোটেল বে ওয়ান ডাচ এ উঠেন ছাত্রলীগনেতা রাফসানুল হক, রায়হান, সাইমুন প্রিয়ামসহ চার বন্ধু।

সূত্র জানায়, সেখানে তাদেরকে ‘বিষাক্ত মদ’ সরবরাহ করে হোটেল কর্তৃপক্ষের লোকজন। সে মদ পান করার পর ১৬ সেপ্টেম্বর রাতে তিন বন্ধু রাফসানুল হক, রায়হান ও সাইমুন প্রিয়াম অসুস্থ হয়ে পড়েন।

তবে হোটেল কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা সকলে অতিরিক্ত মদ পান করে। এতে তিনজন অসুস্থ হয়ে পড়লে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়ার পথে রাফসানুল হকের মৃত্যু হয়। অপর দুই বন্ধু রায়হান ও সাইমুন প্রিয়ামের অবস্থার অবনতি হলে তাদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রিয়ামের মৃত্যু ঘটে। অন্যদিকে চিকিৎসাধীন রায়হানের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।

হোটেলের রেজিস্ট্রারে দেওয়া ঠিকানা অনুযায়ী, তিন বন্ধুর বাড়ি চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালি এলাকায়। অতিরিক্ত মদ্যপানে মারা যাওয়া দুই বন্ধু চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্ম।

কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মহিউদ্দিন আহমেদ হোটেল কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে জানান, কক্সবাজারে বেড়াতে এসে ১৫ সেপ্টেম্বর কলাতলীর বে ওয়ান ডাচ হোটেলে রাফসানুল হক, রায়হান ও সাইমুন প্রিয়ামসহ চার বন্ধু ওঠে। তারা সকলে অতিরিক্ত মদ পান করে। এতে তিনজন শুক্রবার সকালে অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাদের মধ্যে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাফসানের মৃত্যু ঘটে। অবস্থার অবনতি হলে বাকি দুইজনকে চট্টগ্রামে পাঠানো হয়। সেখানে প্রিয়াম নামের ছেলেটার মৃত্যু হয়েছে।

কক্সবাজার মডেল থানার ওসি তদন্ত বিপুল চন্দ্র দে বলেন, কক্সবাজারে মৃত্যুবরণ করা রাফসানুল হকের লাশ তার পরিবারের কাছে হস্তান্তার করা হয়েছে। সুরতহাল রিপোর্ট পেতে সময় লাগবে। তবে ডাক্তারদের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত মদপানে তার মৃত্যু হয়েছে বলে আমাদের জানানো হয়েছে।

সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের সহ সভাপতি আনিস আহমেদ সস্তায় রুম নিয়ে দেওয়ার কথা বলে তার খালাতো ভাই জামায়াত নেতা ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান সরওয়ার কামালের মালিকাধীন কক্সবাজার কলাতলী হোটেল বে ওয়ান ডাচ এ প্রায় সময় ছাত্রলীগের নেতাকর্মী ও তার পরিচিতজনদের পাঠান। ধারণা করা হচ্ছে, বিনিময়ে আনিস ওই হোটেল থেকে সুবিধা নিয়ে থাকেন।

তবে বিষয়টি অস্বীকার করে চট্টগ্রাম ছাত্রলীগ নেতা আনিস আহমেদ একুশে পত্রিকাকে বলেন, রাফসানুল হক আমার বন্ধ,ু আর প্রিয়াম ছোট ভাই। তাদের মৃত্যুতে আমি শোকাহত। দুইজনের লাশ জানাযার পর পর দাফন করা হয়েছে। আমিও সেখানে উপস্থিত ছিলাম।

তিনি বলেন, হোটেলটির মালিক সরওয়ার আমার খালাতো ভাই হওয়ার কারণে পরিচিত অনেকেই ওই হোটেলে উঠেন। তবে মদপানে মারা যাওয়া দুই ছাত্রলীগকর্মী তার রেফারেন্সে সেখানে যায়নি বলে দাবি তার।

ছাত্রলীগের দুই কর্মী মৃত্যুর বিষয়ে আইনি কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে কিনা জানতে চাইলে আনিস আহমেদ বলেন, তাদের পরিবারের কোনো অভিযোগ নেই। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রাফসানুল হক আর প্রিয়ামের পরিবার হয়তো মেনে নিয়েছেন যে অতিরিক্ত মদ পানে তাদের মৃত্যু হয়েছে। তাই তারা কোনো অভিযোগ করছে না।

এদিকে নির্ভরযোগ্য একটি সূত্রের দাবি, বিভিন্ন সময় ওই হোটেলে বিষাক্ত মদ পান করে আরও তিনজন পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিলো।

এ ব্যাপারে হোটেল বে ওয়ান ডাচ এর মালিক সরওয়ার একুশে পত্রিকাকে বলেন, অতিরিক্ত মদ পানের কারণে দুই ছাত্রলীগকর্মীর মৃত্যু হয়েছে। তারা ব্যাগে ডুকিয়ে বিশেষ কায়দায় হোটেলের কক্ষে মদ ডুকিয়ে পান করেছেন বলে দাবি তার।

তাছাড়া তার মালিকাধীন হোটেলের এর আগে আর কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি বলে দাবি করে সরওয়ার বলেন, আমার হোটেলে মদ বিক্রি করা হয় না। আমার হোটেলের যদি কেউ মদ সরবরাহ করে থাকে তাহলে সিসি ক্যামরায় তা ধরা পড়বে।

কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, অতিরিক্ত মদ খেয়ে নাকি বিষাক্ত মদ খেয়ে ওই দুই যুবকের মৃত্যু হয়েছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ওই হোটেলে আগে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে কিনা তা তদন্ত করা হবে। হোটেল কর্তৃপক্ষের দোষ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান ট্যুরিস্ট পুলিশের এ কর্মকর্তা।

জানা যায়, রাফসানুল হক কোনো পদবীতে না থাকলেও চট্টগ্রাম শহরে ছাত্রলীগের মিছিলের অগ্রভাগে থাকতেন। নগর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের অনুসারী সাইফুল আলম লিমনের কর্মী হিসেবেই ছিলেন দীর্ঘদিন। গেল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের পর চট্টগ্রাম মহানগরীর কোতোয়ালী থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ পাওয়ার আশ্বাসে ভিড়ে যান শিক্ষামন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের বলয়ে। এরপর নগর আওয়ামী লীগের সাবেক সদস্য ও চসিক কাউন্সিলর মামুনুর রশীদ মামুনসহ নওফেল বলয়ের প্রভাবশালী নেতাদের আশীর্বাদ লাভের চেষ্টাও করেন রাফসানুল হক।