বৃহস্পতিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৫ ফাল্গুন ১৪২৬

কনের বয়স ১৪ বর ১৯, বিয়ে হলো আইনজীবী ভবন মিলনায়তনে

প্রকাশিতঃ মঙ্গলবার, এপ্রিল ২৫, ২০১৭, ৭:২৯ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রাম : বর সাইদুল ইসলাম, বয়স ১৯। কনে জেসমিন আকতার, বয়স ১৪। অপ্রাপ্ত বয়সের এই প্রেমিক-প্রেমিকাকে অতি উৎসাহী হয়ে বিয়ে করিয়ে দিয়েছেন চট্টগ্রাম জজ আদালতের আইনজীবী শাহাদত হোছাইন।

শুক্রবার (২১ এপ্রিল) দুপুর ৩টার দিকে আইনজীবী ভবনের তৃতীয় তলায়, ৩ নম্বর বার মিলনায়তনের হলরুমে এই বিয়ে পড়ান তিনি। আইনজীবী নিজেই সেখানে কাজী ডেকে আনেন। নিজেই উপস্থিত থেকে এই বিয়ে সম্পন্ন করেন।

এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, আইনের মানুষ হয়ে একজন আইনজীবী কী করে আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বাল্যবিবাহ পড়ালেন! দুই শিশু-কিশোরকে বাল্যবিয়ের মাধ্যমে ঠেলে দিলেন ‘অভিশপ্ত’ জীবনে। এক্ষেত্রে তার ‘অতি উৎসাহ’ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ।

জানা যায়, কক্সবাজারের ঈদগা থানার খামারপাড়া জালালাবাদ এলাকার মৃত ফরিদুল আলমের ৬ সন্তানের মধ্যে জেসমিন আকতার সবার ছোট। স্থানীয় ঈদগাহ আদর্শ শিক্ষানিকেতনের নবম শ্রেণীর ছাত্রী সে। জন্মনিবন্ধন সনদ অনুযায়ী তার জন্ম ২০০৩ সালের ৫ জানুয়ারি। সে অনুযায়ী তার বয়স ১৪ বছর ৪ মাস বয়স।

অন্যদিকে সাইদুল হাসান মিরসরাই থানার করেরহাট ভালুকিয়া গ্রামের সফিকুল আলমের পুত্র। জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী তার জন্ম ২০ জুলাই ১৯৯৭। সে হিসেবে ২১ এপ্রিল তার বয়স দাঁড়ায় ১৯ বছর সাড়ে ৯ মাস।

সম্প্রতি বিশেষ বিধান রেখে পাশ হওয়া বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন-২০১৭ অনুযায়ী পুরুষের সর্বনিম্ন বিয়ের বয়স ২১ আর মেয়ের সর্বনিম্ন ১৮ বছর। এক্ষেত্রে আলোচ্য বর-কনে দুইজনই বিয়ের জন্য অনুপযুক্ত, অপ্রাপ্ত বয়স্ক।

সংশ্লিষ্টরা জানান, অপ্রাপ্ত বয়সী প্রেমিক-প্রেমিকা সাইদুল-জেসমিন নামেমাত্র কিছু খরচ নিয়ে বৃহস্পতিবার (২০ এপ্রিল) বিয়ে করতে চট্টগ্রাম জজ আদালতের আইনজীবী শাহাদত হোছাইনের দ্বারস্থ হন। আইনজীবী শাহাদত শুরুতে দুজনকে অপ্রাপ্ত বয়স, আইনগত ঝামেলা ও গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে তাদেরকে মানসিকভাবে দুর্বল করে তুলেন। পরদিন প্রত্যাশিত টাকা নিয়ে আসবে এবং আইনজীবী ভবন মিলনাতয়নে তার মধ্যস্ততায় বিয়ে হবে, বিয়ের কাবিননামার জন্য সংশ্লিষ্ট কাজীকেও তিনি ব্যবস্থা করবেন এই শর্ত ও অঙ্গীকার আদায়ের জন্য আইনজীবী ভবনের তৃতীয় তলায়, ৩ নম্বর বার মিলনায়তনের হলরুমে মধ্যরাত পর্যন্ত তাদের আটকে রাখেন আইনজীবী শাহাদত ও তার সহকর্মীরা। এরপর রাত ১টার দিকে খালি স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়ে দুই নিকটাত্মীয়ের জিন্মায় তাদের ছেড়ে দেন।

খালি স্ট্যাম্পে সই দিয়ে এসেছে, না গেলে বিপদ হতে পারে সেই আশঙ্কায় পরদিন শুক্রবার দুপুরে সাইদুল-জেসমিন দাবিকৃত টাকা ব্যবস্থা করে সেই আইনজীবীকে ফোন করলে তিনি দুপুর ২টার পর চেম্বারে আসতে বলেন। ছেলের ভগ্নিপতি জাহেদুল ইসলাম, মেয়ের মা নূরবাহার বেগমকে সাথে নিয়ে দুপুর আড়াইটার দিকে তারা চেম্বারে উপস্থিত হন। এদিকে আইনজীবী শাহাদত আগে থেকে সংশ্লিষ্ট এলাকার কাজী এনে তার চেম্বারে বসিয়ে রাখেন।

এরপর ৩টার দিকে আইনজীবী শাহাদত হোছাইন ও সংশ্লিষ্ট কাজীসহ কয়েকজনের উপস্থিতিতে ১০ লাখ টাকা দেনমোহরে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়, যা একুশে পত্রিকার হাতে আসা ৩২ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে। এসময় দুইজনের ফি বাবত ছেলের পক্ষ থেকে ১২ হাজার ও মেয়ের পক্ষে ৬ হাজার টাকাসহ সর্বমোট ১৮ হাজার টাকা পরিশোধ করলেও তাতে তৃপ্ত নন আইনজীবী শাহাদত। আরও ১২ হাজার টাকা পরিশোধ করলে বিয়ের কাবিননামা ও হলফনামার কপি দেওয়া হবে জানিয়ে কোনো ডকুমেন্টস ছাড়া তাদেরকে সেদিন বিদায় করে দেন।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয় অ্যাডভোকেট শাহাদত হোছাইনের সাথে। গত শুক্রবার নিজের চেম্বারে সাইদুল ও জেসমিনের বিয়ে হয়েছে কিনা প্রশ্নে তিনি জবাব দেন, হ্যাঁ।

এরপর তার প্রতি প্রশ্ন রাখা হয়, সাইদুলের ২০ বছর ও জেসমিনের ১৪ বছর হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে বিয়ে হয়েছে? এরপরই আগের ‘হ্যাঁ’ বলাটা বেমালুম ভুলে যান অ্যাডভোকেট শাহাদত হোছাইন। বলেন, আমার অফিসে এরকম কোনো বিয়ে হয়নি। অফিসে সাইদুল আর জেসমিন নামে কেউ আসেনি।

আপনার অফিসে বিয়ে হওয়া সংক্রান্ত ভিডিও প্রমাণ আছে বলা হলে অ্যাডভোকেট শাহাদত হোছাইনের জবাব, ‘সম্ভবত আপনাদের ভুল হচ্ছে।’

একটু আগে স্বীকার করলেন যে বিয়ে হয়েছে, আবার অস্বীকার করছেন কেন প্রশ্নে তিনি বলেন, স্বীকার তো আমি করিনি। জেসমিন নামে কেউ আমার অফিসে আসেনি। বিয়েও হয়নি।’ এরপর ফোনের লাইন কেটে দেন তিনি।

জেসমিন আকতার জানান, দেড় বছর আগে আমার বড়বোনের সহায়তায় ফেসবুকে সাইদুল হাসানের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। একবছর আগে আমাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়। এলাকায় মাসুদ নামের এক যুবক স্কুলে যাওয়া-আসার পথে আমাকে প্রায় উত্ত্যক্ত করতো। এ অবস্থায় আমার মা আমাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য পাত্র ঠিক করেন। বিষয়টি সাইদুল জানলে সে আত্মহত্যাসহ নানা ধরনের হুমকি দিতে থাকে। একপর্যায়ে আমরা ঘর থেকে পালিয়ে গিয়ে কোর্ট ম্যারেজ করার সিদ্ধান্ত নিই। অ্যাডভোকেট শাহাদত হোছাইনের সহযোগিতায় গত শুক্রবার আমরা বিয়ে করি।

সাইদুল ইসলাম নিজেকে ইনস্টিটিউট অব কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, ফেনীর ছাত্র দাবি করে একুশে পত্রিকাকে বলেন, আমার বয়স কম সেটা মানি। অ্যাডভোকেট অ্যাফিডেভিটের মাধ্যমে আমাদের বয়স বাড়িয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়ায় আমরা বিয়ে করতে সাহস পেলাম।

তবে তাদের কাছ থেকে খালি স্ট্যাম্পে সই নেওয়া, বেশি অর্থ দাবি করা, পরবর্তীতে ১২ হাজার টাকা বাড়তি পরিশোধের শর্তে কাগজ আটকে দেওয়া এবং আগেরদিন রাত ১টা পর্যন্ত চেম্বারে আটকে রাখার সময় জেসমিনের প্রতি কুদৃষ্টি দেওয়াসহ অ্যাডভোকেট শাহাদত হোছাইনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন সাইদুল হাসান।

চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট রতন কুমার রায় বলেন, ‘কনের বয়স ১৪ হলে সে অপ্রাপ্তবয়স্ক। নাবালক হওয়ার কারণে সে কোনো চুক্তিতে আবদ্ধ হলে সেটা শুরু থেকেই বাতিল হবে। জন্মগতভাবেই বাতিল হবে। কারণ নিকাহনামাটা হচ্ছে একটা চুক্তি। চুক্তিটা নাবালিকার সাথে হওয়ার কারণে জন্মগতভাবেই বাতিল। সুতরাং বিয়েটা পুরোটাই অবৈধ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমার এডভোকেট সাহেব কি ১৪ লিখেছে, নাকি ১৮ লিখে দিয়েছে, সেটা খবর নিন।’

‘অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিয়েতে যদি কোন আইনজীবী সহযোগিতা করে থাকে সেটা পেশাগতভাবে অনৈতিক হবে। সত্যি যদি কেউ এ ধরনের কাজ করে থাকেন, স্বাক্ষর, সিল যদি জেনুইন থাকে, তাহলে তিনি দায় এড়াতে পারবেন না।’ যোগ করেন অ্যাডভোকেট রতন কুমার রায়।

আইনজীবী ভবনের ৩ নং বার মিলনাতয়নে অ্যাডভোকেট শাহাদত হোছাইনের চেম্বারে বিয়ের ভিডিও দেখতে ক্লিক করুন :