শুক্রবার, ২২ অক্টোবর ২০২১, ৭ কার্তিক ১৪২৮

চট্টগ্রামে রপ্তানিমুখী কারখানায় শ্রমিকদের ১৫ ঘণ্টা কাজ করানো হচ্ছে!

প্রকাশিতঃ বুধবার, অক্টোবর ৬, ২০২১, ১২:১০ পূর্বাহ্ণ

মোহাম্মদ রফিক : চট্টগ্রামে পোশাক তৈরিসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের কারখানার সংখ্যা ১ হাজার ২৫০টি। এর মধ্যে সিইপিজেড ও কেইপিজেড (রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল) এলাকায় দেশি-বিদেশি কারখানা ২০১টি। বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ’র অধীন পোাশাক ও নিট কারখানা আছে প্রায় ২০০। এসব কারখানায় মোট ৫ লাখ ৩১ জন শ্রমিক কাজ করেন।

অভিযোগ রয়েছে, এসবের অধিকাংশ কারখানায় শ্রমআইন মানা হচ্ছে না। সিইপিজেড, কেইপিজেড এলাকাসহ চট্টগ্রামে রপ্তানিমুখী বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের বিপুল সংখ্যক কারখানায় শ্রমিকদের দিনে ১৫ ঘণ্টারও বেশি কাজ করানো হচ্ছে।

এ নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। যে কোনো মুহূর্তে শ্রমিকেরা বিক্ষোভে ফেটে পড়লে চট্টগ্রামের শিল্পাঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। তবে শিল্পপুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা এমন আশঙ্কার কথা উড়িয়ে দিয়েছেন।

তারা বলছেন, পরিস্থতি নিয়ন্ত্রণে আছে। সিইপিজেড এলাকায় কিছু বিদেশি কারখানায় ভোর সাড়ে ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত শ্রমিকদের কাজ করানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে খোদ বাংলাদেশ এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন অথরিটি (বেপজা)। শ্রমিক অসন্তোষ এড়াতে শ্রমআইন এবং বেপজা’র নিয়মনীতি মেনে চলতে সংশ্লিষ্ট কারখানা কর্তৃপক্ষকে ইতোমধ্যে চিঠি দিয়ে নির্দেশনাও দিয়েছে বেপজা।

সিইপিজেড’র বিদেশি যেসব কারখানায় অতিরিক্ত কাজ করানোর কারণে শ্রমিক অসন্তোষ এড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বেপজা থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সেগুলো হলো – এইচ কে ডি ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, লটসে বাংলাদেশ লিমিটেড, এম জেড এম টেক্সটাইল লিমিটেড, মেসার্স কামপেক্স (বিডি) লিমিটেড, ক্যাম্পভ্যালী গ্লোবাল লিমিটেড (ইউনিট-১)। এসব কারখানায় তাবু তৈরি করা হয়।

শুধু অতিরিক্ত ডিউটিই নয়, এইচ কে ডিসহ সিইপিজেড’র বিভিন্ন কারখানায় অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা সমন্বয়ের নামে ওভারটাইম, সাধারণ ছুটি, মাতৃত্বকালীন ছুটি ও বেতন পরিশোধসহ নানা বিষয় নিয়েও আছে বিস্তর অভিযোগ। নানা ছলছুঁতোয় শ্রমিকদের উপর অমানুষিক নির্যাতনের খবরও পাওয়া যাচ্ছে।

জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে সিইপিজেড’র পাঁচটি কারখানাকে চিঠি দেন বেপজা’র উপপরিচালক (লেবার অ্যান্ড আইআর) মশিউদ্দিন এম মিসবাহ। গত ৭ জুলাই মেসার্স কামপেক্স (বিডি) লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাখাওয়াত এম খানকে দেওয়া চিঠিতে বলা হয়, ‘আমরা গভীর উদ্যোগের সাথে লক্ষ করছি, আপনার কারখানায় সকাল সাড়ে ৭ টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত কাজ করানোর কারণে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। এর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে যে কোনো মুহূর্তে শ্রমিকরা বিক্ষোভে ফেটে পড়বে। এতে আপনার কারখানাসহ ইপিজেডের সার্বিক পরিবেশ অশান্ত হয়ে ওঠবে। আপনি শ্রমিকদের অধিকার এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করুন। কারখানা তথা ইপিজেড এলাকায় সম্ভাব্য শ্রমিক অসন্তোষ এড়াতে ব্যর্থ হলে আপনার কারখানার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ইপিজেড শ্রমআইন ২০১৯ এর ১৮৮ ধারা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চিঠিতে এও বলা হয়েছে, চট্টগ্রামের কোনো কোনো কারখানায় দিনে ১৪ ঘণ্টারও বেশি কাজ করানো হচ্ছে। বাড়তি আয়ের জন্য ওভারটাইমকে কিছু শ্রমিক ইতিবাচক মনে করলেও অধিকাংশ শ্রমিকের মনোভাব নেতিবাচক।

এই প্রসঙ্গে বেপজা’র ব্যবস্থাপক (লেবার অ্যান্ড আইআর) হাসানুজ্জামান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘কোনো কারখানায় শ্রমিকদের দিনে ১৪/১৫ ঘণ্টা ডিউটি করানোর কারণে শ্রমিক অসন্তোষ বা কর্মপরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ার আশংকা দেখা দিলে আমরা তাৎক্ষণিক সংশ্লিষ্ট কারখানা কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিই। সম্প্রতি সিইপিজেড’র তাবু তৈরির বিদেশি কিছু কারখানায় এ ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব হওয়ায় তাদের চিঠি দিয়ে সতর্ক করা হয়। তবে কারখানাগুলোয় শ্রমিক অসন্তোষ তৈরি হওয়ার মতো পরিস্থিতি এখন আর নেই।’

বিজিএমই’র প্রথম সহসভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম একুশে পত্রিকাকে বলেন, আল আমীন, ওপেক্স গ্রুপ, ক্লিফটনসহ কিছু কারখানায় সমস্যা চলছে। কোভিড-এর কারণে পরিস্থতি খারাপ হয়েছে বিধায় অনেক বায়ার অর্ডার বাতিল করেছে। এজন্য পেমেন্ট নিয়ে হয়তো কিছু কিছু কারখানায় দেরি হচ্ছে। এসব নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ থাকতে পারে। বেতন বকেয়া থাকার কারণে কিছু কারখানায় শ্রমিকরা রাস্তায় বের হয়ে অতিরঞ্জিত করে ফেলে। আবার কিছু কিছু কারখানায় শ্রমিকরা বের হয় না। তারা মালিকপক্ষের পরিস্থিতি বুঝে চুপ মেরে থাকেন। এক্ষেত্রে শুধু শ্রমিকদের দোষ দিলেও হবে না। আবার মালিকের দোষ দিলেও হবে না। এখন অধিকাংশ শ্রমিক মালিককে সহযোগিতা করে। কিন্তু বেতন কর্তন, ওভারটাইমের টাকা পরিশোধ নিয়ে কোনো মালিক কারচুপি করে না। এখন শ্রমিক অসন্তোষ নেই। আমরা পোশাক কারখানা পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখছি।’

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন চট্টগ্রাম কার্যালয়ের উপ মহাপরিদর্শক আবদুল্লাহ আল সাকিব মুবাররাত একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ইপিজেড তো বেপজা’র নিয়ন্ত্রণে। আইনগতভাবে সেখানে আমাদের প্রবেশের সুযোগ নেই। আমাদের সংস্থার নিয়ন্ত্রণাধীন শিল্প কারখানা বিশেষ করে পোশাক কারখানায় আগে যেভাবে শ্রমিক অসন্তোষ হতো এখন সেই ধরনের পরিস্থতি নেই। তবে ইতোমধ্যে আমরা যেসব কারখানায় অসন্তোষের তথ্য পেয়েছি মালিকপক্ষের সাথে বসে আলোচনা সাপেক্ষে শ্রমিকদের সাথে নেগোসিয়েশন করে সংশ্লিষ্ট কারখানায় কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করেছি। গত এক বছরে ৮০টি কারখানায় সৃষ্ট সমস্যা নিরসনে মালিক ও শ্রমিকপক্ষের সাথে বৈঠক করেছি। যার ফলে গত এক বছরে চট্টগ্রামের কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ হয়নি। অভিযোগ পেলেও সাথে সাথে ঘটনাস্থলে গিয়ে মালিকপক্ষ এবং এলাকার গণ্যমান্যদের নিয়ে আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করি।’

বিজিএমই’র অধীনে ৭৮টি এবং বিকেএমই’র অধীনে ১২০টি পোশাক কারখানা আছে জানিয়ে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন চট্টগ্রামের এই শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ‘খুশির খবর হচ্ছে আমাদের সংস্থার মহাপরিদর্শক মৌখিকভাবে নির্দেশনা দেওয়ার প্রেক্ষিতে গত এক মাস ধরে চট্টগ্রামের ইপিজেড এলাকার কারখানাগুলোয় আমাদের নজরদারি বাড়াচ্ছি। ইতোমধ্যে আমরা বেপজা’কে চিঠি দিয়েছি। আগামী এক মাসের মধ্যে বেপজা’র সাথে আমরা বসব। সেখানকার কোন কোন কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ হওয়ার মতো পরিস্থিতি আছে সেগুলোর একটি তালিকা করে ছক অনুযায়ী কাজ করব।’

শ্রমআইন লঙ্ঘন করে শ্রমিকদের দিনে ১৪-১৫ ঘণ্টা কাজ করানোর অভিযোগ অস্বীকার করে এইচকেডি ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড এর মানবসম্পদ কর্মকর্তা মো. রাফাত একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমরা শ্রমআইন ও বেপজা কর্তৃপক্ষের নিয়মনীতি মেনেই কারখানা পরিচালনা করছি।’

প্রশ্ন করলে একই ধরনের মন্তব্য করেছেন লটসে বাংলাদেশ লিমিটেড-এর মানবসম্পদ কর্মকর্তা এইচ জি লিম। শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কায় চিঠি দিয়ে সতর্কবার্তা দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে মি. লিম বলেন, ‘আমাদের কারখানায় শ্রমিকরা দিনে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা কাজ করছেন। আমরা শ্রমআইন মেনে চলছি।’

মেসার্স কামপেক্স (বিডি) লিমিটেড-এর মানবসম্পদ কর্মকর্তা বদরুল হুদা বলেন, ‘আমাদের কারখানায় ১৭ শ’ শ্রমিক কাজ করছে। কেউ ৮-১০ ঘণ্টার বেশি কাজ করছে কিনা আপনারা দেখে যান। কারখানা সম্পর্কে বেপজা কর্তৃপক্ষকে কেউ হয়তো ভুল বুঝাচ্ছে।’ শ্রমআইন ও বেপজা’র নিয়মনীতি কঠোরভাবে পালন করা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন ক্যাম্পভ্যালী গ্লোবাল লিমিটেড (ইউনিট-১) এর মানবসম্পদ কর্মকর্তা মি. সিম ক্যাম্পভ্যালী।

শিল্পপুলিশের চট্টগ্রাম পুলিশ সুপার মো. আনোয়ার বলেন, ‘সিইপিজেড এলাকায় তাবু তৈরির বিদেশি কোনো কারখানায় শ্রমিকদের অতিরিক্ত ডিউটি করানোর বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো অভিযোগ আসেনি। কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ বা অন্যান্য কোনো সমস্যা নিয়ে জটিলতা দেখা দিলে বেপজা কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট কারখানা মালিকপক্ষের বৈঠকে শিল্প পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকেন।’

চট্টগ্রাম শিল্পপুলিশের অধীনে ১ হাজার ২৫০ কারখানায় ৫ লাখ ৩১ জন শ্রমিক কাজ করছে জানিয়ে শিল্পপুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, চট্টগ্রামের পোশাক কিংবা অন্যান্য কারখানায় কোনো শ্রমিক অসন্তোষের খবর নেই। সার্বিক পরিস্থিতির উপর নজরদারি আছে আমাদের।’

জানা গেছে, ইপিজেড ও বেশকিছু পোশাকশিল্পের কর্মপরিবেশ উন্নয়ন নিয়ে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) একটি সমীক্ষা চালায়। আইএলও’র পক্ষে সমীক্ষার কাজটি করেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)। ইপিজেডে ১১১ পোশাক কারখানার ২ হাজার ১৮৪ শ্রমিক ওই সমীক্ষায় অংশ নেন।

সমীক্ষায় বলা হয়েছে, শ্রমিকদের দিনে ১৪ ঘণ্টার বেশি কাজ করাচ্ছে ইপিজেডের ১২ কারখানায়। ১৩ ঘণ্টার কাজ করেছে ৮ কারখানার শ্রমিক। অথচ শ্রম আইন অনুযায়ী দৈনিক কর্মঘণ্টা ৮ ঘণ্টা। আর ওভারটাইম সর্বোচ্চ ২ ঘণ্টা। কিন্ত এ নিয়ম মানা হচ্ছে না। শ্রমআইন মেনে কাজ হচ্ছে হাতেগোনা কয়েকটি কারখানায়।

চট্টগ্রাম ইপিজেডের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মশিউদ্দিন বিন মিসবাহ বলেন, চট্টগ্রাম ইপিজেডের ১৫১টি কারখানায় ১ লাখ ৬০ হাজার শ্রমিক কর্মরত। শ্রমিকদের অতিরিক্ত কাজ করানোর কারণে শ্রমিক অসন্তোষের বিষয়টি নজরে আসায় সংশিষ্টদের চিঠি দিয়ে সতর্ক করা হয়েছে।

বেপজা’র এক কর্মকর্তা একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘অসহায় শ্রমিকরা দিন-রাত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে বিশ্বমানের পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরি করে। সেই পণ্য বিদেশে রপ্তানি করে মালিকরা প্রচুর মুনাফার মাধ্যমে বিত্তবান হয়েছেন। দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী হয়েছে। অথচ শ্রমিকদের সামান্য মানবিক চাহিদাগুলো পূরণে মালিকরা নারাজ। শ্রমের ন্যায্য মজুরি ও শ্রমিকদের আইনি সুযোগ-সুবিধা দিতে চায় না তারা। সব সময় শ্রমিকদের সাথে মালিক কর্তৃপক্ষের লোকেরা নির্দয় ও অমানবিক আচরণ করে থাকে।

গত তিন দিন একুশে পত্রিকার অনুসন্ধানেও উঠে আসে শ্রমিকদের দুঃখগাথার সেই চিত্র। লটসের একজন শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘অনেক সময় রাত ১১-১২টা পর্যন্ত কাজ করি, সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও ডিউটি করি। মালিকপক্ষের অত্যাচারে জীবন বিষিয়ে উঠেছে। তবু চাকরি বাঁচানোর জন্য বাধ্য হয়ে কাজ করি। ওভারটাইম করলেও পেমেন্ট নিয়ে লুকোচুরি করে। মাসের ৫-৬ তারিখের বেতন-ভাতা দেয় ২০ তারিখে। সেখানেও আছে শুভঙ্করের ফাঁকি।’

জলিলের মতো শ্রমিকদের নিদারুণ কষ্টের চিত্র মিলেছে সিইপিজেড’র আরও কমপক্ষে ৬টি কারখানার শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে। লটসে বাংলাদেশ লিমিটেড এর শ্রমিক কামাল উদ্দিন বলেন, ‘অধিকাংশ কারখানায় প্রতিদিন ১৫-১৬ ঘণ্টা কাজ করানো হচ্ছে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও শ্রমিকদের ওভারটাইমে কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। শ্রমিকদের বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। শ্রমিকরা শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। ওভারটাইম কাজ করতে না চাইলে শ্রমিকের চাকরিও থাকছে না।’

বিডি কামপেক্স লিমিটেডের শ্রমিক আবদুল হাসান বলেন, ‘শ্রমআইন অনুযায়ী দৈনিক ৮ ঘণ্টা কর্মদিবস হলেও সিইপিজেডের অধিকাংশ কারখানায় কর্মঘণ্টার কোনো সীমা নেই। সকাল সাড়ে ৭টায় শ্রমিকদের কারখানায় ঢুকতে হয়। বের হতে হয় কারখানা মালিকের ইচ্ছায়। জোরপূর্বক ওভারটাইম কাজের চাপে শ্রমিকরা নাজেহাল। অনেক শ্রমিক ক্ষুব্ধ।’

বাংলাদেশ শ্রমআইন ২০০৬ এর নবম অধ্যয়ে কর্মঘণ্টা বা কাজের সময়সীমা, ওভারটাইম ও ছুটির বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। সেখানে ১০০ ধারায় বলা হয়েছে কোনো কারখানায় একজন প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিককে দিয়ে দৈনিক ৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করানো বা করতে দেওয়া যাবে না। সে হিসেব অনুযায়ী সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করানোর ব্যাপারে নিষেধ করা হয়েছে।

তবে ধারা ১০৮ অনুযায়ী ওভারটাইমসহ একজন প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিক দৈনিক সর্বোচ্চ ১০ ঘণ্টা আর প্রতি সপ্তাহে ৬০ ঘণ্টা এবং একবছরে প্রতি সপ্তাহে গড়ে ৫৬ ঘণ্টা কাজ করতে পারবে। অপ্রাপ্ত বয়স্ক বা কিশোর (১৪ বছরের বেশি কিন্তু ১৮ বছরের কম) শ্রমিক দিয়ে দৈনিক ৫ ঘণ্টার বেশি কাজ করানো যাবে না। সে হিসেবে সপ্তাহে ৩০ ঘণ্টার বেশি কাজ করানো যাবে না। তবে ওভারটাইমসহ দৈনিক ৬ ঘণ্টা হিসেবে সপ্তাহে ৩৬ ঘণ্টা কাজ করতে পারবে।

শ্রমিকদের অভিযোগ, অধিকাংশ কারখানায় এসব আইনি বিধি-বিধান একদমই মানা হচ্ছে না। অনেক কারখানায় উৎপাদন টার্গেটের নামে বাড়তি শ্রমিকদের দিয়ে অতিরিক্ত কাজ করানো হচ্ছে। ১২-১৩ ঘণ্টার কাজ ৮ ঘণ্টায় করিয়ে নিয়ে কোনো ওভারটাইম ভাতা দেওয়া হচ্ছে না। টার্গেট পূরণ না হলে বিনা মজুরিতে অতিরিক্ত সময় খাটিয়ে নিচ্ছে। ঈদের ছুটি ও লকডাউনে কারখানা বন্ধ থাকার দিনগুলো এখন সমন্বয় ও জেনারেল ডিউটির নামে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বিনা মজুরিতে শ্রমিকদের খাটানো হচ্ছে।

শ্রমআইনে বলা হয়েছে, একজন শ্রমিক তার চাকরির সময়কালে মজুরিসহ নিম্নোক্ত বিভিন্ন ছুটি ভোগ করার অধিকারী হবে। ধারা ১০৩ (১) (ক) অনুযায়ী প্রত্যেক শ্রমিক সপ্তাহে ১ দিন পূর্ণ মজুরিতে সাপ্তাহিক ছুটি পাবে। কোনো কারণে উক্ত ছুটির দিনে কাজ করালে তাকে পরবর্তী দিনে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সেই ছুটি ভোগ করতে দিতে হবে। এক্ষেত্রে থাকে ছুটি না দিয়ে ওভারটাইম দিলে তা বৈধ হবে না। প্রত্যেক শ্রমিক বছরে পূর্ণ মজুরিতে ১০ দিন নৈমিত্তিক ছুটি পাবে। প্রতি বছরে পূর্ণমজুরিতে ১৪ দিন পর্যন্ত অসুস্থতাজনিত বা পীড়া ছুটি পাবে। তবে অসুস্থতাজনিত ছুটি ভোগ করতে রেজিস্টার্ড চিকিৎসক (ডাক্তার) এর সার্টিফিকেট প্রদান করতে হবে।

শ্রম আইনের চতুর্থ অধ্যায়ের ধারা ৪৬ (১) অনুযায়ী কোনো নারী শ্রমিক সন্তান প্রসবের পূর্বে অন্তত ৬ মাস কোনো কারখানায় কাজ করলেই সবেতনে মাতৃত্বকালীন ছুটি পাওয়ার অধিকারী হবে। সন্তান প্রসবের পূর্বে ৮ সপ্তাহ এবং সন্তান প্রসবের পরে ৮ সপ্তাহ মোট ১৬ সপ্তাহ মোট বেতনে মাতৃত্বকালীন সুবিধা ভোগ করতে পারবে।
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে প্যাসিফিক জিন্সের একজন নারী শ্রমিক একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘নারী শ্রমিকদের প্রাপ্য ছুটি কিছু সংখ্যক কারখানায় আংশিক দেওয়া হলেও চট্টগ্রামের অধিকাংশ কারখানায় দেওয়া হয় না। পাওনা ছুটির পরিবর্তে শ্রমিকদের মজুরিও দেওয়া হয় না।

চট্টগ্রামের বিভিন্ন পোশাক কারখানা মালিকরা সমন্বয় ও জেনারেল ডিউটির নামে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে শ্রমিকদের বিনা মজুরিতে খাটিয়ে নিচ্ছেন। যা শ্রম আইন পরিপন্থী।’

ভুক্তভোগী একাধিক শ্রমিক অভিযোগ করেন, বিভিন্ন কারখানায় প্রতিনিয়ত শ্রমিকদের মাত্রাতিরিক্ত অত্যাচার, মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করা হচ্ছে। কোনো শ্রমিক প্রতিবাদ করলে তাকে চাকরি থেকে বের করে দেওয়া হয়। বেতন নিয়েও করেন ঘোরাঘুরি। দিনরাত এক করে কাজ করে দিলেও মালিকদের মন ভরে না। ছুটিছাটা ও সুযোগ-সুবিধা চাইতে গেলে মালিকপক্ষ চোখ রাঙায়। শ্রমিকরা পরিবারের কথা ভেবে চোখ বুজে সব সহ্য করে কাজ করে যাচ্ছে।