শুক্রবার, ২২ অক্টোবর ২০২১, ৭ কার্তিক ১৪২৮

ওসি, মন্ত্রীর নাম ভাঙিয়ে রাঙ্গুনিয়ায় বনকর্মীর চাঁদাবাজি, টাকা না দিলে মামলা!

প্রকাশিতঃ সোমবার, অক্টোবর ১১, ২০২১, ৩:২৬ পূর্বাহ্ণ

আবছার রাফি : ‘একজন ৫ হাজার টাকা, চারজন ১৬ হাজার টাকা। যদি বলেন, ১৫ হাজার ৯৯৯ টাকা দেবেন, তাও নেব না। আমি নিজেই অনেক বারগেইনিং করে ১ হাজার টাকা করে কমিয়েছি’ – এভাবেই গ্রামের চায়ের দোকানের সামনে বসে অসহায় গ্রামবাসীর কাছে টাকা দাবি করছেন এক বনকর্মকর্তা। টাকা দাবি করার এমন দৃশ্যটি গোপনে মুঠোফোনে ধারণ করেন গ্রামবাসী।

দাবিকরা টাকা না দিলে মামলা দেওয়ার হুমকি-ভয়ভীতি দেখান তিনি। আবার টাকা দিলেও কাউকে কাউকে জড়িয়ে দেন মামলায়। দীর্ঘ দুই বছর ধরে এমন একজন বনকর্মকর্তার আচরণে অতিষ্ঠ পটিয়া উপজেলার পাশ্ববর্তী রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পদুয়া ইউনিয়নের ৬ নং ওয়ার্ডের পেকুয়া-ছিপছড়ি গ্রামের দুই শতাধিক বাসিন্দা।

টাকা দাবি করা ব্যক্তিটি চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের পটিয়া রেঞ্জের আওতাধীন কেলিশহর বনবিট কর্মকর্তা শিবু দাস। পটিয়া উপজেলার পাশ্ববর্তী রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পদুয়া ইউনিয়নের ৬নং পশ্চিম খুরুশিয়া ওয়াডের্র পেকুয়া-ছিপছড়ি গ্রামে অবস্থিত এই বিটে তিনি কর্মরত আছেন দুই বছর ধরে। এই গ্রামে ৪০-৫০ বছর ধরে বসবাসকারী দুই শতাধিক গ্রামবাসীকে কখনো মামলার ভয়, কখনো থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি), কখনো রাজনৈতিক নেতার নাম ভাঙিয়ে নিয়মিত টাকা নেন তিনি। টাকা দিলে সবঠিক, না দিলে খড়গহস্ত হয়ে পড়েন অসহায়-নিরহ গ্রামবাসীর ওপর। এভাবেই গ্রামবাসীকে ভয়ভীতি দেখিয়ে চাপের মুখে তটস্ত করে রেখেছেন এই বনকর্মকর্তা।

মামলার ভয় দেখিয়ে টাকা দাবি করার মুহূর্তের মুঠোফোনে ধারণকৃত একাধিক ভিডিও ও অডিও রেকর্ড সংরক্ষিত আছে একুশে পত্রিকার কাছে। উল্লিখিত পরিমাণ টাকা দাবি ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পরিমাণে টাকা দাবি করার তথ্য রয়েছে সেখানে।

একটি রেকর্ডে বনকর্মকর্তা শিবুদাসকে বলতে শোনা যায়, ‘তিনজনে ৪ হাজার করে ১২ হাজার আর সোহেলকে যে ৪ হাজার দিতে বলেছি সেখানে ১ হাজার কমিয়ে ৩ হাজার দিয়ে সবমিলিয়ে ১৫ হাজার দিলে হবে’। আরেকটি রেকর্ডে বলতে দেখা যায়, ‘মোবাইলে কথা বলা যাবে না, মোবাইলে কথা বলা ঠিক হবে না। আপনার যদি সময় থাকে তাহলে আমার অফিসে আসেন। যদি আসেন কথা হবে, না হয় কোর্টে কথা হবে। আপনার আব্বা আর সোহেল এক বছর আগে লেখা মামলার সময় আসতেছি আসতেছি করে আর আসেনি। যেহেতু আমার পোস্টিং অর্ডার, আমি সপ্তাহখানেকের ভেতর চলে যাব এখান থেকে। আমি সোহেলকে বলেছি, আমাকে রেঞ্জার বলেছে, আপনি কি টাকা খেয়ে ছেড়ে দিয়েছেন নাকি মামলা দিয়েছেন। রেঞ্জার বলেছেন, মামলা দেন আমার টাকার দরকার নেই। বলেছি, রাখেন আমি একটু তদবির করে নিই। পরে সোহেলকে গিয়ে বললাম। সোহেল আমাকে ভালো রেন্সপন্স দেয়নি। তাই কালকে গিয়ে বিস্তারিত নোটগুলো করে নিয়ে আসলাম। সেজন্য কালকে আপনাদের বাড়িতে গিয়েছিলাম। এখন যেহেতু বিস্তারিত শুনেছেন সোহেলের কাছে, কাজেই আপনারা যদি না আসেন তাহলে মামলা সাবমিট হবে।’

বৃহস্পতিবার (৭ অক্টোবর) সরেজমিন ছিপছড়ি-পেকুয়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, এই এলাকার বেশিভাগ মানুষের কাছে বনকর্মকর্তা শিবুদাসের টাকা দাবি করার ব্যাপারটা এখন ‘ওপেন সিক্রেট’। যুবক থেকে বৃদ্ধ সবার চোখেমুখে আতঙ্কের চাপ। ৪০-৫০ বছরের ভেতর কোনো বনকর্মকর্তা তাদের এতটা ক্ষতি করেনি বলে দাবি তাদের। নানাভাবে হয়রানি আর টাকা দাবির বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন এক বৃদ্ধ নারী।

তাদের অভিযোগ, ‘করোনা মহামারির উপর্যুপরি থাবায় যখন দেশে লকডাউন চলছিল তখনও থামেনি এ বনকর্মকর্তার চাঁদাবাজি। লকডাউনের কবলে পড়ে কর্মহীন হয়ে পড়া গ্রামবাসীর উপর যেন এই চাঁদাবাজি মরার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। টাকা দিতে অপরাগতা জানিয়ে সাধারণ খেটে খাওয়া গ্রামবাসীর শত আকুতি-মিনতিতেও যেন মন গলেনি শিবুদাসের।’

এভাবে দীর্ঘদিন ধরে গ্রামবাসীকে নানাভাবে হয়রানি করার পর এবার নতুন ফাঁদ পেতেছেন এই বনকর্মকর্তা। গ্রামবাসীকে বলছেন, এবার তিনি বদলি হয়ে অন্যত্র চলে যাবেন। তাই তাকে টাকা দিতে হবে নয়তো মামলা দিয়ে ফাঁসিয়ে দিয়ে যাবেন তিনি। বসবাসের বিকল্প জায়গা না থাকায় দিনের পর দিন এমন অত্যাচার মুখবুঝে সহ্য করে এলেও এবার মুখ খুলেছেন গ্রামবাসী।

তারা বলছেন, ৪০-৫০ বছর ধরে সরকারি রিজার্ভ জায়গায় বসবাস করলেও কোনোদিন কোনো বনকর্মকর্তা এভাবে টাকা চাননি তাদের কাছে বা কাউকে টাকা দিতে হয়নি। কিন্তু এই কর্মকর্তার দেখানো মামলা-হামলার ভয়ে এখন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন এই গ্রামের দুই শতাধিক পরিবার।

স্থানীয় বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব বয়সী আবদুল মালেক একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমি এই সমাজে আজ দীর্ঘদিনের বাসিন্দা। আমাদের আগে কোনোদিন কোনো বনকর্মকর্তা এভাবে নির্যাতন করেনি। বিগত দুই বছরের মধ্যে আমাদের বেশি নির্যাতন করেছে। আমরা অল্প সবজি ক্ষেত করতে গেলেও আমাদের কাছ থেকে চাঁদা দাবি করে। আমাদের প্রত্যেককে এক একর করে জায়গা দেবে বলে আমাদের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ থেকে ভোটার আইডি কার্ড নিয়ে গেছে। সেই আইডি কার্ড নিয়ে এখন মামলা দিচ্ছে। শুধু বলে, আমাকে টাকা দাও, টাকা দাও। টাকা না দিলে আমি মামলা দিব। এভাবে আমাদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে।’

ভুক্তভোগী আরেকজন বাসিন্দা একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমার জন্ম এখানে। বয়স ৪৭ বছর। বাবা মারা যান ১৯৯৭ সালের ঘূর্ণিঝড়ে। আমরা রিজার্ভের জায়গায় বসবাস করছি। আমাদের ক্ষেত-খামার সবকিছু রিজার্ভের জায়গায়। আজ এতবছর হলো কেউ মামলা করেনি, কেউ কিছু করেনি। আমাদের কাছ থেকে শিবুদাস টাকা দাবি করছে। গতবছর নিল ৪ হাজার, এই বছর নিয়েছে ৫ হাজার। আবার ৫ হাজার দিতে পারি নাই বলে আমার নামে দুইটা মামলা দিয়েছে। আমরা কীভাবে চলবো? আমরা এখানে থাকতে পারবো কি পারবো না; সেটার বিচার চাই এলাকার এমপি তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের কাছে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকজন বাসিন্দা বলেন, ‘আমি পানের বরজের চাষ করি। রিজার্ভ জায়গার ভেতর আমার কোনো ক্ষেত-খামার নেই। এখন একটা মামলা দিয়েছেন তিনি। টাকা দিতে বলতেছে। আমি বলছি, টাকা নেই দিতে পারবো না। তখন তিনি বলেন, তাহলে মামলা আরও দুইটা দিব। আমি জিজ্ঞেস করলাম, মামলা কেন দিবেন? তিনি বলেন- তোমরা রিজার্ভ জায়গায় পানের চাষ করো। অথচ রিজার্ভ জায়গায় আমার কোনো চাষ নেই।

স্থানীয় ভুক্তভোগী রমজান আলী বলেন, ‘আমাদের বাড়িটা করেছি ৪৫ বছর হয়েছে। আমি একজন প্রবাসী। আগে ছিল ছনের ছাউনি ঘর। বিগত দুই বছর আগে আমরা ছনের ছাউনী পরিবর্তন করে টিন লাগিয়েছি। টিন লাগানোর পর কেলিশহর বনবিট কর্মকর্তা শিবুদাস আমাদের কাছে টাকা দাবি করে। আমাদের পাশে রয়েছে খালার বাড়ি। সেখানেও দুই ঘর মিলে ১৬ হাজার টাকা দাবি করেছে। এবং ১৫ হাজার ৯৯৯ টাকা হলেও নেবে না বলেছে। আমি প্রবাসী মানুষ। যদি টাকা না দিই তাহলে আমাকে মামলা দিয়ে দেবে। চার-পাঁচটা মামলা দিবে যাতে আমি বিদেশ যেতে না পারি। আরও বলেছে, রাঙ্গুনিয়া থানার ওসি হচ্ছে তার ক্লাসমেট। আমাকে বিভিন্ন ধরনের মামলা দিয়ে ফাঁসাবে।

আরেকটা বিষয়, আমাদের মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ নাকি রেঞ্জ অফিসারকে বলেছে আমাদের রিজার্ভ জায়গা থেকে তুলে দেওয়ার জন্য। শিবুদাস এসে বলে, মন্ত্রী তোমাদের উঠে যেতে বলেছে। তবে টাকা দিলে বসবাস করতে পারবে।’

একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান বলেন, বিট অফিসার শিবুদাস বাড়ি-ঘর আর রাস্তা নিয়ে আমাকে অনেক হয়রানি করেছে, শেষে টাকা নিয়েছে। এখন বলছে, আমি ট্রান্সফার হয়ে চলে যাব। আমাকে টাকা দিয়ে এটা তোমরা মীমাংসা করলে করতে পারো, নয়তো যাওয়ার সময় দু-চারটা মামলা দিয়ে চলে যাব। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আমার জন্য কীসের মামল দিবেন? আমি কি পাহাড় কাটছি, পাহাড়ে জুমচাষ করছি, বাঁশ কাটছি? তাহলে কীসের মামলা দিবেন?- তখন বললো, জবরদখলের মামলা দিবে। আমি বলেছি আমার বাবাতো দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে এখানে এসেছে, যুদ্ধের পর এই ঘরগুলো বাঁধছে। আপনি কীসের মামলা দিবেন? যখন তাকে বলছি, আমি মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। তখন তিনি আমাকে অনেক বকাঝকা করেছেন।’

স্থানীয় ছিপছড়ি-পেকুয়া রেজিস্টার্ড বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সহ-সভাপতি বিধান চন্দ্র রায় বলেন, ছিপছড়ি খালের পাড়ে আমার ভাইয়ের খতিয়ানভুক্ত জায়গায় ওরা বাগান করে দিয়েছে, যেটা সিট নং-১, আরএস নং ৪১৪-৩৬১, বিএস নং ৮১-৮২। আমার ভাইকে আবার একটা মামলাও দিয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কেলিশহর বনবিট কর্মকর্তা শিবুদাস একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘তাদের স্বার্থে আঘাত আসছে বিধায় এসব করছে। টাকা নেওয়ার বা দাবি করার বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি বলেন, আমি যদি টাকাই নিতাম তাহলে এতগুলো মামলা হতো না। যে অপরাধ করবে তাকে ভুক্তভোগী হতে হবে। একটি ভিডিওতে আপনাকে বলতে দেখা যাচ্ছে, ১৬ হাজারের মধ্যে ১৫ হাজার ৯৯৯ টাকা দিলেও আপনি নেবেন না। সেটা কী অসত্য তাহলে?- জবাবে তিনি বলেন, এটা সত্য নয়।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে পটিয়া বনবিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা রিটা আকতার একুশে পত্রিকাকে বলেন, আমি পটিয়া রেঞ্জে যোগদান করেছি বেশিদিন হচ্ছে না। নতুন হিসেবে আমি উনার সম্পর্কে যতটুক জানি, ভালোই জানি। উনার বিরুদ্ধে এই ধরনের অভিযোগ আজ পর্যন্ত আসেনি। আপনি যেহেতু বলছেন, আমি বিষয়টা মাথায় রাখলাম। সেখানে যদি কোনো অনিয়ম হয় তাহলে আমি আমার মতো করে যেভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার দরকার, সেভাবে ব্যবস্থা নেব।’

চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. সফিকুল ইসলাম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘যদি তিনি এটা করে থাকেন তাহলে অন্যায় করেছেন। আমি এই প্রথম আপনার কাছ থেকে জানলাম। আপনি যেহেতু বলছেন আমরা তদন্ত করে দেখে ব্যবস্থা নেব। আর উনি কীসের মামলা দেবেন, এমন তো না যে ওখানে বড় গাছ আছে যা কেটে নিয়ে গেছে সেজন্য মামলা দেবেন সত্যতা যাচাই করে অ্যাকশন নিব।