সোমবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২১, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

চট্টগ্রাম নগর আ. লীগের সম্মেলন, শীর্ষ দুই পদে থাকছেন কারা?

প্রকাশিতঃ রবিবার, অক্টোবর ১৭, ২০২১, ১১:৪৯ পূর্বাহ্ণ

মোহাম্মদ রফিক : তিন বছর মেয়াদের কমিটিতে সাড়ে ৭ বছর পার করা আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় বৃহত্তম ইউনিট-চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলন অত্যাসন্ন। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামি জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে সম্মেলন অনুষ্ঠানের কথা ভাবছে দলের হাইকমান্ড। এই লক্ষ্যে পদপ্রত্যাশীদের সাংগঠনিক ভিত্তি কার কেমন, দলের জন্য কার কী অবদান, নানা বঞ্চনা, না পাওয়ার পরও কারা দলের সংশ্রব ত্যাগ করেননি তাদের ব্যাপারে দেশের দুটি গোয়েন্দা সংস্থা ছাড়াও নিজস্ব জরিপের কাজ শেষ করেছে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড।

এদিকে সম্মেলনের আভাস মেলায় চট্টগ্রামের তৃণমূলে দেখা দিয়েছে প্রাণচাঞ্চল্য, শুরু হয়েছে পদপ্রাপ্তির মসৃণ-অমসৃণ প্রতিযোগিতা, অসম দৌড়ঝাপ।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, গেলো চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে কমিটি গঠন নিয়ে তোড়জোর শুরু হলেও পরে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড সিদ্ধান্ত পাল্টায়। সিটি নির্বাচনের পর মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলন ও নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের কথা জানানো হয় দলের কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে। ওই সময় সম্মেলন না করার কারণ ছিল কমিটিতে অনেকেই পদবঞ্চিত হতে পারেন, হতে পারে সংযোজন-বিয়োজন। এতে পদবঞ্চিতদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হতে পারে। যার প্রভাব গিয়ে পড়বে প্রকারান্তরে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে। সেই শংকা থেকে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের পরে কমিটি গঠন করার পরিকল্পনা নেয় দলীয় হাইকমান্ড। এমনই তথ্য দিয়েছে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র।

এদিকে, কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর যে প্রশ্নটি বড় হয়ে উঠেছে তা হলো- কমিটিতে প্রয়াত মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারীদের কর্তৃত্ব থাকবে নাকি বর্তমান সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীনের ধারা শক্তিশালী হবে?

জানা গেছে, বর্তমান কমিটির ছয় সহ-সভাপতিই এবার সভাপতি পদের দাবিদার। নগর আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, মহিউদ্দিন চৌধুরী জীবিত থাকা অবস্থায় সভাপতি পদে তাঁকে বিবেচনায় নিয়ে অন্য পদ নিয়ে ভাবতে হতো। এখন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের পদ দুটোই উন্মুক্ত। প্রতিদ্বন্দ্বী অনেক, আছে বিভক্তিও। গেলো সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে রেজাউল করিমকে বেছে নেওয়া ছিল চট্টল রাজনীতির বড় চমক। নগর কমিটি নির্বাচনেও এমন চমক থাকবে না, সে কথা আগাম কেউ বলতে পারছে না। তবে সবাইকে নিয়েই কমিটি করা হবে বলে জানান বিভাগের দায়িত্বে থাকা নেতারা।

এ ব্যাপারে সরকার দলীয় হুইপ ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক (চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্ব) আবু সাঈদ মাহমুদ আল স্বপন বলেন, ‘নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা থাকবে। থাকবে গ্রুপিং। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার পরিবেশ তৈরি করাই আমাদের লক্ষ্য।’

এদিকে, আসন্ন সম্মেলনকে ঘিরে এখন তৃণমূলের প্রতিটি সাংগঠনিক সভায় প্রায় নেতাকর্মীর দেখা মিলছে। পাশাপাশি নগর কমিটির সভাগুলোতেও উপস্থিতি আগের তুলনায় বেড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ইস্যুতে বিরোধে জড়িয়ে পড়া নগর আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাকেও সর্বশেষ কয়েকটি সভায় থাকতে দেখা গেছে। সিআরবি এলাকায় হাসপাতাল নির্মাণের সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে নগর আওয়ামী লীগে বিভক্তি থাকলেও দলীয় সভাগুলোতে প্রায় সবাই (অসুস্থ কয়েকজন ছাড়া) নিয়মিত উপস্থিত থাকছেন। একই সুরে কথা বলছেন।

নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, ‘সামনে জাতীয় নির্বাচন ঘিরে চট্টগ্রাম মহানগরীর সংগঠনকে ঢেলে সাজানোর জন্য এরই মধ্যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংগঠনকে আরো গতিশীল করতে সম্মেলনের মাধ্যমে নিয়মিত কমিটি করার বিকল্প নেই। কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা সদস্য সংগ্রহ ও নবায়ন কার্যক্রম শুরু করেছি। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে তৃণমূলের সব কমিটির সম্মেলনের পর দলীয় সভাপতি প্রধানমন্ত্রী যখনই নির্দেশনা দেবেন, তখনই চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলন হবে। নবীন-প্রবীণে নতুন নেতৃত্ব শক্তিশালী হবে।’ সুবিধাভোগী, হাইব্রিড, অনুপ্রবেশকারী ও বিতর্কিত কেউ যাতে সাধারণ সদস্যও হতে না পারে সে ব্যাপারে নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকার অনুরোধ জানান তিনি।

তবে নগর আওয়ামী লীগের শীর্ষপদে কারা আসছেন তা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়া আর কেউ জানেন না। প্রকৃতপক্ষে রাজনীতির মাঠ কারা আঁকড়ে আছেন তাদের বিষয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে দলীয় হাইকমান্ডের কাছে রিপোর্ট দিচ্ছে দেশের প্রভাবশালী দুটি গোয়েন্দা সংস্থা। এবার তাদের রিপোর্টকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে বলেও একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
এ পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন মাঠে না থাকা পদপ্রত্যাশী কিছু নেতা কমিটি গঠনকে সামনে রেখে ওই দুটি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন বলেও জানা গেছে।

নগর আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগে বিভক্তির রাজনীতির কারণে অপেক্ষাকৃত কম সাংগঠনিক ভিত্তির রেজাউল করিম চৌধুরীকে মেয়র পদে দলের মনোনয়ন পাইয়ে দেওয়া হয়েছিল। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর এই নগরে একজন মেয়র বা অভিভাবক আছেন বলে মনেই হয় না। স্রেফ অফিস-উিউটির মতোই বিশাল, ডায়নামিক ‘মেয়র’ পদটি উপভোগ করছেন তিনি। অভিভাবক থেকেও নগরবাসীর এই অভিভাবকশূন্যতা নগরবাসীর পাশাপাশি খোদ দলীয় হাইকমান্ডও টের পাচ্ছে বলে সূত্রগুলো জানাচ্ছে।

এদিকে ৬ মাসের প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন বেশ দৌড়ঝাঁপ ও হাকডাক দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন প্রশাসকের দায়িত্ব পালনকালে। কয়েকটি ত্বরিৎ উদ্যোগ নিয়ে প্রশংসিতও হয়েছেন। তবে কিছু কিছু সিদ্ধান্তে বদনামও যে হয়নি তা নয়।

বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন রাজনীতি করলেও সিটি করপোরেশনের প্রশাসক পদটি ছাড়া তেমন কিছুই পাননি সুজন। আর সেই ৬ মাসের দায়িত্ব পালনকে সুজন ‘এসিড টেস্ট’ হিসেবে নিয়েছিলেন। দায়িত্ব পালনে মুন্সীয়ানা দেখাতে পারলে, টেস্ট পরীক্ষায় উতরে গেলে সুজনের পক্ষের কেউ কেউ ভেবেছিলেন মেয়র পদের মনোনয়নও হয়তো পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে। আর তা না হলে পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের ফল তিনি ভোগ করবেন নগর কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়ে অথবা আগামীতে এমপি মনোনয়ন নিশ্চিত হওয়ার মধ্যদিয়ে।

তবে পাদপ্রদীপের আলোয় আসতে সুজনের সব চেষ্টা বা কৌশল আটকে যেতে পারে ‘বাকশালী তকমায়’-এমন অভিমতও দিয়েছেন কোনো কোনো মহল।

এ প্রসঙ্গে নগর আওয়ামী লীগের একজন নেতা নাম প্রকাশ না করে বলেন, একসময় বাকশালে চলে গিয়েছিলেন, এটাই খোরশেদ আলম সুজনের বড় দুর্বল দিক। যদিও বাকশালী তকমা নিয়ে অনেকে এমপি, মন্ত্রী এমনকি মেয়রও হয়েছেন অতীতে।’

নতুন কমিটি গঠন নিয়ে জানতে চাইলে খোরশেদ আলম সুজন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘কমিটি গঠন নিয়ে দলের হাইকমান্ড ভালো জানবে। এ ব্যাপারে আমার কিছু বলার নেই। তবে দল আমাকে যখন যে দায়িত্ব দিয়েছে, তা নিষ্ঠার সঙ্গে পালনের চেষ্টা করেছি। ভবিষ্যতে দল যেখানে দায়িত্ব দেবে, সেই দায়িত্বও মন-প্রাণ দিয়ে পালন করব।’

এদিকে মহিউদ্দিন চৌধুরী ও আ জ ম নাছিরের বাইরে নিজ নিজ সমর্থকগোষ্ঠী রয়েছে সাবেক মন্ত্রী ডা. আফছারুল আমীন ও নগর কমিটির সহ সভাপতি সাবেক মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বি.এসসি’র। তবে স্থানীয় রাজনীতিতে আগের মতো তাদের প্রভাব নেই বলে মনে করছেন নেতাদের অনেকে। এর কারণ হিসেবে আফছারুল আমীনের অসুস্থতা ও নুরুল ইসলাম বিএসসি’র বার্ধক্যকে দুষছেন তারা।

অন্যদিকে নগর কমিটির সহ সভাপতি অ্যাডভোকেট ইব্রাহীম হোসেন চৌধুরী বাবুল, সিডিএ চেয়ারম্যান ও নগর আওয়ামী লীগ সহ সভাপতি জহিরুল আলম দোভাষ এবং সিডিএ’র সাবেক চেয়ারম্যান ও বর্তমান কমিটির অর্থ সম্পাদক আবদুচ ছালামও বড় পদের দাবিদার হয়ে উঠতে পারেন বলে একাধিক সূত্রে আভাস মিলছে। কিন্তু ধারে, ভারে, অর্থনৈতিক অবস্থান সর্বোপরি কর্মীবলয়-এসব বিষয় বিবেচনায় শেষপর্যন্ত তাদের চাওয়া বা দাবি পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবে এদের মধ্যে আবদুচ ছালামের প্রমোশন হতে পারে, তিনি হতে পারেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অথবা সহ সভাপতি। – বলছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।

সূত্র মতে, নগর আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি খোরশেদ আলম সুজন সভাপতি হওয়ার জন্য চেষ্টা করছেন। কিন্তু তার বিষয়ে ওই একটাই উস্মা- তিনি একসময় বাকশাল করতেন। ফলে তৃণমূল থেকে উঠে আসলেও সুজনকে নগর আওয়ামী লীগের শীর্ষ পদে বসাবেন কিনা এ নিয়ে দলীয় হাইকমান্ডও রীতিমতো সন্দিহান। নানা বঞ্চনা, দীর্ঘ পথ-পরিক্রমার পর সুজনকে ৬ মাসের জন্য চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রশাসক পদে বসানো হয়েছিল। দলীয় হাইকমান্ড মনে করে, সুজনকে প্রশাসক পদে যে বসানো হয়েছিল সেটাই যথেষ্ট। ফলে খোরশেদ আলম সুজন বর্তমান সহ সভাপতির পদটিই পুনরায় পেতে পারেন বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষও নগর কমিটির সভাপতির পদ প্রত্যাশী। তবে দলীয় হাইকমান্ডের একটি অংশ মনে করে, দোভাষ পরিবারের সাথে একসময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠতা ছিল। সেই তকমায় ২০১৫ সালে ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে পরাজিত হওয়ার পরও জহিরুল আলম দোভাষকে সিডিএ চেয়ারম্যান পদে বসানো হয়েছে পরপর দুবার। অবশ্য ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে হারলেই যে, বড় পদ বা দায়িত্বে আসতে পারবেন না রাজনীতিতে এমন দিব্যি নেই।

যেমন ২০১০ সালে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) এর তরুণ নেত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস পপির কাছে বিপুল ভোটে চসিকের সংরক্ষিত ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদে পরাজিত হওয়ার পর একলাফে সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য হয়েছিলেন সাবিহা মুসা।

সেই যাই হোক, চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ অলংকৃত করার মতো শক্তি, সামর্থ্য, কর্মী-সমর্থক বা সাংগঠনিক ভিত্তি, দক্ষতা কিছু নেই জহিরুল আলম দোভাষের- এমনই মনে করছেন রাজনৈতিক বোদ্ধামহল।

চট্টগ্রামের আলোচিত নেতা নগর আওয়ামী লীগের প্রয়াত সভাপতি এবং সাবেক সিটি মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুর পর বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর, সাবেক মন্ত্রী প্রয়াত জহুর আহমদ চৌধুরীর ছেলে মাহতাবউদ্দিন চৌধুরীকে নগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করা হয়েছিল। তার পরিবারের প্রতি সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দেখিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী এখন বয়সের ভারে ন্যুব্জ। কানেও কম শোনেন। বার্ধ্যক্যজনিত নানা রোগশোকে ভুগছেন তিনি।

ফলে নগর আওয়ামী লীগের সভাপতির পদে মাহাতাব উদ্দিনকে রাখার সম্ভাবনা নেই বলে দলীয় একাধিক সূত্র মনে করে। সে ক্ষেত্রে মাহাতাব উদ্দিন চৌধুরী নগর আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হতে পারে। তাই যদি হয় তার পরিবারের আরেক সদস্য গার্মেন্টস ব্যবসায়ী হেলাল উদ্দিন চৌধুরী তুফানও নগর আওয়ামী লীগে গুরুত্বপূর্ণ পদ পেতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সাবেক চট্টগ্রাম সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন আসন্ন নতুন কমিটিতে কোথায় থাকবেন তা নিয়ে তুমুল আলোচনা আছে নগর রাজনীতিতে। একপক্ষ বলছেন, তাকে কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হবে। আরেক পক্ষ বলছে কমিটিতে তার প্রমোশন হবে। কিন্তু দলীয় হাইকমান্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ মনে করে, আ জ ম নাছির একদিনে তৈরি হওয়া কোনো নেতা নন। সরকারি মুসলিম হাই স্কুলের সপ্তম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মিছিল থেকে আ জ ম নাছিরের সৃষ্টি। এরপর অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে চট্টগ্রামের রাজনীতির মাঠে আ জ ম নাছির উদ্দীন ঈর্ষন্বীয় ব্যক্তিত্ব গড়ে তুলেছেন। মহিউদ্দিন চৌধুরীর পরে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের রাজনীতির তৃণমূলে কারো গ্রহণযোগ্যতা যদি থেকে থাকে তা হলো আ জ ম নাছির উদ্দিন। আ জ ম নাছিরের আছে বিশাল বলয়, কর্মীবাহিনী, ছাত্র ও যুবসমাজ। পদ-পদবী ছাড়াও তিনি ডাক দিলে মুহূর্তের মধ্যে লাখ লাখ কর্মীবাহিনীর সমাগম ঘটে রাজনীতির মাঠে। তার আছে প্রবল সাংগঠনিক ভিত্তি, ইস্পাত কঠিন মনোবল।

রাজনীতি সচেতনরা মনে করেন, সেসব বিবেচনায় আ জ ম নাছিরকে হয় আগের পদে বহাল রাখা হবে, না হয় সভাপতি করা হতে পারে। যদি আ জ ম নাছিরকে সভাপতি করা হয় প্রশ্ন আসে তাহলে কে হবেন সাধারণ সম্পাদক?

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, এক্ষেত্রে সাধারণ সম্পাদক পদে মহিউদ্দিনপুত্র শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলকে ভাবতে পারে হাইকমান্ড। চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তার প্রয়াত পিতা এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর অবদান স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নওফেলকে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পর্যন্ত করেছিলেন। অপেক্ষাকৃত তরুণ বয়সে করেছেন এমপি, তারপর মন্ত্রী।

যদিও গত কাউন্সিলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকে বাদ পড়েন নওফেল। অবশ্য এর নেপথ্য কারণ হিসেবে দলীয় সূত্রগুলো বলছে অন্য কথা। সূত্র মতে, সুদূরপ্রসারী চিন্তা থেকে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা নওফেলকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকে বাদ দিয়েছেন। আর তা হলো বাবার পথ ধরে আঞ্চলিক রাজনীতিতে তাকে সক্রিয় করা।
আর তাই যদি হয়, আসন্ন কমিটিতে আ জ ম নাছির উদ্দীন সভাপতি হলে নওফেল সাধারণ সম্পাদক হবেন সেই বিষয়টি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এই হিসাব ও মেরুকরণই এ মুহূর্তে দলীয় হাইকমান্ডে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে বলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি সূত্র আভাস দিচ্ছে।

তবে শেষ কথা, চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বে কে আসছেন সেটি দেখার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করতে হবে।

রাজনীতি-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, নানা সমীকরণ করার পর নওফেল সাধারণ সম্পাদক হতে খুব একটা আগ্রহী নয়। তিনি চাইছেন তার বাবার বলয়ের কাউকে এই পদে বসাতে। সেক্ষেত্রে তার পছন্দ সিটি মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী অথবা বর্তমান কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক শফিক আদনান। রেজাউল করিমকে ফিট করতে ব্যর্থ হলে তিনি চাইবেন শফিক আদনানকে। বিষয়টি সামনে নিয়ে কিছুটা কৌশলে এগোচ্ছেন রেজাউল করিম ও শফিক আদনান। লক্ষ করা যাচ্ছে, রেজাউল করিমের মাছে মহিউদ্দিনবন্দনা আগের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইতোমধ্যে নগরের বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে ফ্লাইওভারের মোড়ে মোড়ে আলোকোজ্জ্বল বিলবোর্ড টাঙিয়েছেন মেয়র রেজাউল করিম। সেখানে লেখা আছে- ‘এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর দেখানো পথে এগিয়ে যেতে চাই- এম রেজাউল করিম চৌধুরী, মেয়র চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন।’

অপরদিকে মহিউদ্দিন চৌধুরীর পরিবারের একনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত শফিক আদনানও পরিবারটির প্রতি আনুগত্য প্রকাশে আরও যত্নবান হতে দেখা যাচ্ছে শফিক আদনানকে।

এসব ব্যাপারে বারবার চেষ্টা করেও মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। ফোন রিসিভ করলেও তাৎক্ষণিক তিনি কোনো মন্তব্য না করে দুদিন পর ফোন করতে বলেন। সেই অনুযায়ী ফোন করা হলে পরবর্তীতে তিনি আর ফোন ধরেননি।ম

সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আলোচনায় থাকা চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক শফিক আদনান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির নেতৃত্ব নির্বাচনের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে নেত্রীর হাতে। কোন প্রক্রিয়ায় নেতা নির্বাচন করা হবে সেটা তিনিই জানেন। এখানে কিছু বললেও হবে না। কিছু কিছু বিষয় তিনি সরাসরি দেখেন। আমরা আশাবাদী আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ইউনিট, ওয়ার্ড ও থানা পর্যায়ে কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শেষ করব। সেই লক্ষ্যে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে যাচ্ছি। নগর কমিটি গঠনের বিষয়ে আমাদের কিছু বলার নাই, করারও নাই।’

চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগে কোন বিভক্তি নেই দাবি করে শফিক আদনান বলেন, ‘বড় দল হিসেবে আওয়ামী লীগে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা থাকাটা স্বাভাবিক। এটা সবসময় ছিল, থাকবে। যোগ্যতার মাপকাঠিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নেতৃত্ব নির্বাচন করবেন।’

প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলকে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক রাজনীতিতে সক্রিয় করতে চান প্রধানমন্ত্রী। দলের হাইকমান্ডে এ নিয়ে আলোচনা আছে। বিষয়টির সাথে একমত পোষণ করে শফিক আদনান বলেন, ‘আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে ওবায়দুল কাদের, ড. হাছান মাহমুদ ও ডা. দিপু মনি ছাড়া অন্য কাউকে মন্ত্রীত্ব দেয়ার পাশাপাশি দলীয় পদপদবী দেননি। তবে আসন্ন চট্টগ্রাম নগর কমিটিতে ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলকে অন্তর্ভুক্ত করার চিন্তা নেত্রীর রয়েছে বলে দলে আলোচনা আছে। তাছাড়া নগর কমিটির নেতৃত্বে থাকার মতো যোগ্যতাও নওফেল ভাইয়ের আছে।’

নগর কমিটিতে আপনিও গুরুত্বপূর্ণ পদ পেতে পারেন, তৃণমূল পর্যায়ে এমন আলোচনা আছে। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে শফিক আদনান বলেন, ‘দলে পদ-পদবী পেতে আমি কোনও সময় রাজনীতি করিনি। দলের একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে মাঠে সবসময় ছিলাম, আছি। তবে নেত্রী যদি আমার জন্য দলে কোনও জায়গা রাখেন সে দায়িত্ব অক্ষরে অক্ষরে পালন করব।’

দলীয় সূত্র জানাচ্ছে, চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সম্পাদকীয় পদে থাকার দৌড়ে আছেন অনেকে। এরমধ্যে যেমন আছে ভুঁইফোড়, হাইব্রিড তেমনি আছেন ত্যাগীরা। তবে শেষ কথা হচ্ছে, দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা চট্টগ্রামের রাজনীতির মাঠের খবর জানেন, সবার হাঁড়ির খবরও তাঁর জানা। যারা দলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ শেষতক তাদেরকেই তিনি বেছে নেবেন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট মহল।

এক্ষেত্রে যারা ঢাকায় গিয়ে পড়ে থাকছেন, নিজেদের ঘরানার নেতাদের কাছে ধর্না দিচ্ছেন পদ লাভের আশায়, সেই নেতাদের এধরনের বাঁকা পথের চেষ্টা, তৎপরতা আজকের বাস্তবতায় খুব বেশি ধোপে টিকবে না বলে দলের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র একুশে পত্রিকাকে জানিয়েছেন। সূত্রগুলোর মতে, এবার তোষামোদিতে পদ নেই, পদ আছে কেবল কর্মে, মাঠে কিংবা অতীত প্রোফাইলে।

সূত্র মতে, বর্তমানে জাতীয় রাজনীতির সবচেয়ে আলোচিত নাম চট্টগ্রামের সন্তান ড. হাছান মাহমুদ। চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব ও কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে তার একটা প্রচ্ছন্ন ভূমিকা থাকবেই।

পাশাপাশি আওয়ামী লীগের সভাপতি মণ্ডলীর সদস্য চট্টগ্রামের সন্তান সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেনেরও ভূমিকাও ফেলনা নয়। তবে বর্তমানে তিনি অসুস্থ, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তার শারীরিক অবস্থার উপর নির্ভর করছে তিনি কতটা ভূমিকা রাখছেন বা মনোযোগী হতে পারছেন এক্ষেত্রে।

সর্বশেষ ২০১৩ সালের নভেম্বরে এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীকে সভাপতি এবং আ জ ম নাছির উদ্দীনকে সাধারণ সম্পাদক করে তিন বছর মেয়াদি কমিটি গঠিত হয়েছিল। ২০১৭ সালের ১৫ ডিসেম্বর মহিউদ্দিন চৌধুরী মারা যাওয়ার পর প্রথম সহ সভাপতি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরীকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক জহুর আহমদ চৌধুরীর ছেলে।

দলের একটা অংশ মনে করে, তিনি ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হয়ে দলে নিজের শক্ত অবস্থান সৃষ্টি করতে পারেননি। অবশ্য বয়স ও অসুস্থতাই এক্ষেত্রে বড় অন্তরায়। এ পরিস্থিতিতে নগর আওয়ামী লীগের রাজনীতি, সাংগঠনিক কর্মসূচি অনেকটা আ জ ম নাছির উদ্দীন একাই সামাল দিয়েছেন মাহাতাব উদ্দীনকে সামনে রেখে।

জানা গেছে, চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের আওতায় সাংগঠনিক ওয়ার্ড রয়েছে ৪৩টি। প্রতিটি ওয়ার্ডে ইউনিট আছে তিনটি। সে হিসাবে ১২৯টি ইউনিট, ৪৩টি ওয়ার্ড ও ১৫টি সাংগঠনিক থানা রয়েছে। দলীয় নেতারা জানান, এসব কমিটির বেশির ভাগই মেয়াদোত্তীর্ণ। নিয়মিত সম্মেলন না হওয়ায় বেশির ভাগ চলছে আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে। এর মধ্যে বেশির ভাগ কমিটির সম্মেলন হয়েছে ১৫-২০ বছর আগে।