সোমবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২১, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

ঈশ্বর কেবল কঠিনতম খেলোয়াড়দের কঠিন বল দেন

প্রকাশিতঃ রবিবার, অক্টোবর ১৭, ২০২১, ১:০৮ অপরাহ্ণ

শান্তনু চৌধুরী : দীনেন্দ্রকুমার রায়ের পল্লীচিত্র বইয়ে দেবী দুর্গার আগমনের কথা বলেছিলাম গেল সংখ্যার চিঠি দিও কলামে। এবারে বলবো গমনের কথা। অসাধারণ বর্ণনায় বলা হচ্ছে, ‘পূজা-বাড়িতে বাদ্যধ্বনি থামিয়া গিয়াছে। এই কয় দিন যে বেদীর উপর দুর্গাপ্রতিমা অলৌকিক গৌরবে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন-আজ চ-ীম-পে সেই বেদী শূন্য পড়িয়া আছে; নিকটে একটি ক্ষুদ্র মৃৎপ্রদীপ জ্বলিতেছে, তাহাতে গৃহের অন্ধকার দূর হইতেছে না! যেন আনন্দময়ী কন্যাকে দীর্ঘকালের জন্য বিদায়দানের পর পিতৃগৃহের সুগভীর নিরানন্দভাব ও মাতৃহৃদয়ের সুতীব্র বিরহ বেদনা উৎসবনিবৃত্ত কর্মশ্রান্ত অবসাদ-শিথিল ক্ষোভবিহ্বল বঙ্গগৃহের সেই ম্ল­ান দীপালোকে সুস্পষ্ট হইয়া উঠিতেছে’।

অধ্যাপক যতীন সরকারের একটি লেখা পড়ে দুর্গাপূজার মূল দর্শনটা কিছুটা বোঝা যাবে। ‘গণেশের পাশে দাঁড়ানো কলাবউ’ নামে ছোট্ট একটি রচনায় দুর্গাপূজার চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন তিনি। গণেশের পাশে দাঁড়ানো গণেশের বউ অথবা কলাবউ নামে লম্বা ঘোমটা দেওয়া বউটি আসলে একটি কলাগাছ। শাড়ি প্যাঁচিয়ে, লম্বা ঘোমটা দিয়ে পল্লীবধূর মতো কলাগাছটি দাঁড় করিয়ে রাখা হয় বলে ও রকম নাম পড়েছে। তার আসল নাম ‘নবপত্রিকা’। কারণ শুধু কলাগাছ নয়, নয় রকম গাছের পাতা একত্রে জড়িয়ে কলাবউটি তৈরি করা হয়েছে। কলা হলদি ধান কচু মানকচু জয়ন্তী ডালিম অশোক ও বেল-এই কটি উদ্ভিদের পল্ল­ব নিয়েই নবপত্রিকা। নয়টি পল্লবের আবার নয়জন আলাদা আলাদা অধিষ্ঠাত্রী দেবী আছেন। কলার হচ্ছেন ব্রী, হলদির দুর্গা, ধানের লক্ষ্মী, কচুর কালিকা, মানকচুর চামুন্ডা, জয়ন্তীর কার্তিকী, ডালিমের রক্তদন্তিকা, অশোকের শোকরহিতা আর বেলের শিবা। এই নবপত্রিকার পূজাই হচ্ছে দুর্গাপূজার প্রধান অঙ্গ। দুর্গাসহ নবপত্রিকার সব দেবীই উদ্ভিদজগতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তাই এই দেবীরা মূলত কৃষিদেবী। মার্কন্ডেয় পুরাণে দেবী নিজেই বলেছেন, ‘অনন্তর বর্ষাকালে নিজদেহে সমুদ্ভুত প্রাণধারক শাকের সাহায্যে আমি সারা জগতের পুষ্টি সরবরাহ করব। তখন আমি জগতে শাকম্ভরী নামে বিখ্যাত হব।’

যিনি দুর্গা তিনিই শাকম্ভরী। শাকম্ভরীই আবার বিবর্তিত হয়ে রণরঙ্গিনী, মহিষমর্দিনী বরাভয়দায়িনী দেবীতে পরিণত হয়েছেন। আদিযুগের শস্যদেবীই এ যুগের দুর্গাদেবী। কিন্তু এবার একটু শঙ্কার কথা- দেবী নাকি ফিরবেন দোলা বা পালকিতে চড়ে। আর এতেই সনাতন ধর্মের লোকজন মনে করছেন, মড়ক ও মহামারীর। এমনিতে করোনাসুরের ভয়ে দু’বছর ধরে পৃথিবী প্রকম্পিত। এর মধ্যে কিছু কিছু দেশ চেষ্টা করছে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে। এর মধ্যে ফের যদি করোনাসুর হানা দেয় তাহলে মানুষ মাঠে মারা যাবে!
এমনিতে কি মানুষ খুব বেশি স্বস্তিতে রয়েছে?

একশ্রেণির মানুষ হয়তো স্বস্তিতে আছে, শান্তিতে আছে। ঘুষ, দুর্নীতিতে টাকার পাহাড় গড়ছে। বিদেশে টাকা পাচার করছে। তারা হয়তো স্বস্তিতে আছে। করোনায় কতো মানুষ যে চাকরিহারা হয়েছে তার খবর কেই বা রাখেন। রবি ঠাকুরতো সেই কবেই বলে গেছেন, ‘এই জগতে হায় সে বেশি চায়-আছে যার ভূরি ভূরি’। আবার এটাও ঠিক অনেক বেশি থাকলেও যে সুখ দেওয়া যায় তা নয়।

এই যেমন শাহরুখপুত্র আরিয়ানের কথাই বলি। এতো এতো অর্থও তাকে সুখ এনে দিতে পারেনি। তাই তাকে গ্রেফতার হতে হয় মাদক পার্টি থেকে। আর হবেই বা না কেন। সে নিজেই জানিয়েছে, তার বাবার সাথে দেখা করার জন্যও নাকি তাকে অনুমতি নিতে হয়। এটাও একটা সুখের নমুনা বটে! তবে শাহরুখপুত্রকে লেখা হৃত্বিক রোশনের চিঠিটা বেশ একটা ভাবনা তৈরি করে। তিনি লিখেছেন, ‘আমার প্রিয় আরিয়ান, জীবনে এই যাত্রাপথ বড়ই অদ্ভুত। এখানে অনিশ্চয়তার মধ্যেই দুর্দান্ত কিছু লুকিয়ে রয়েছে। জীবন তোমার দিকে কখনো একটি বাঁকা বল ছুড়ে দেবে, কিন্তু ঈশ্বর করুণাময়। তিনি কেবল কঠিনতম খেলোয়াড়দের সবচেয়ে কঠিন বল দেন। তোমাকে বুঝতে হবে তুমি স্পেশাল, এই খেলায় তাই তিনি তোমাকে বেছে নিয়েছেন। আমি জানি, তুমি খুবই চাপ অনুভব করছ। রাগ হচ্ছে, ভয় পাচ্ছ, অসহায় লাগছে। এই সবকিছুই তোমার মধ্যে লুকিয়ে থাকা হিরোকে জাগিয়ে তুলবে। তবে সাবধান! নিজের মধ্যে থাকা ভালোটাকে নষ্ট হতে দিও না। তোমার ভিতর দয়া, করুণা, ভালোবাসা আছে। নিজেকে দগ্ধ হতে দাও, কিন্তু এগুলিকে বাঁচিয়ে রেখো। ভুল-ভ্রান্তি, জয়-পরাজয় সবই আদতে এক। তোমাকে বুঝে নিতে হবে, কাকে আপন করবে, কাকে বাদ দেবে।’

তার মানে যে সব সুখ তা হয়তো নয়। কারো একটি সান্ত¡না, একটু আশার বাণী বা একটু ভালোবাসা যে সুখ এনে দিতে পারে তা আর কিছুই পারে না। তবে অর্থ থাকলে আলোচনায় থাকা যায়। এই যেমন নীতা আম্বানির কথাই বলি। রিলায়্যান্স কর্তা মুকেশ অম্বানীর স্ত্রী নীতা অম্বানী যে পানীয় জল খান, তার দাম শুনলে হতবাকই হবেন। দাবি করা হয়, নীতা নাকি বিশ্বের সবচেয়ে দামি জল খান। ৭৫০ মিলিলিটার জলের বোতলের দাম প্রায় ৬০ হাজার ডলার। যা ভারতীয় মুদ্রায় ৪৪ লক্ষ টাকারও বেশি। তা হলে এবার হিসেব করে নিন, নীতার এক ঢোক জলের দাম কত পড়ে! দাম তো না হয় জানলেন।

কিন্তু জলের কেন এত দাম, এ বার সেই বিষয়টাও একটু জেনে নেওয়া যাক। স্বাস্থ্যকে তরতাজা রাখতে যে জল নীতা খান তার নাম ‘অ্যাকোয়া ডি ক্রিস্টালো ড্রিবিউটো আ মদিগ্লিয়ানি’। এটি বিশ্বের সবচেয়ে দামি জলের মধ্যে একটি। বোতলবন্দি ওই জল আসে ফ্রান্স এবং ফিজি থেকে। দাবি করা হয়, এই পানীয় জল স্বর্ণভস্ম মিশ্রিত। ৫ গ্রাম স্বর্ণভস্ম থাকে এতে। যা মানবদেহের পক্ষে খুবই স্বাস্থ্যকর। সে জন্যই এই জলের দাম লক্ষ লক্ষ টাকা। আরও কারণ আছে। শুধু জল নয়, বোতলের জন্যও এই পানীয় জলের দাম এত বেশি। ২০১০-এ ‘অ্যাকোয়া ডি ক্রিস্টালো ড্রিবিউটো আ মদিগ্লিয়ানি’ গিনেস বুকে বিশ্বের সবচেয়ে দামি জলের বোতল হিসেবে খ্যাতি পেয়েছিল। বোতলের নকশা তৈরি করেছিলেন ফার্নান্দো আলতামিরানো। চামড়ার খাপে থাকে ২৪ ক্যারেট সোনা দিয়ে তৈরি এই বোতল। এই ব্র্যান্ডের সবচেয়ে সস্তা বোতলের দাম ২২ হাজার টাকা।

নীতা আম্বানির পানির বাহার থাকতেই পারে। কিন্তু জাতিসংঘ সতর্ক করেছে, ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বের ৫শ’ কোটির বেশি মানুষ পানি সংকটে পড়বে। ‘দ্য স্টেট অব ক্লাইমেট সার্ভিসেস ২০২১ : ওয়াটার’ শীর্ষক প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ২০১৮ সাল থেকে বিশ্বের ৩৬০ কোটি মানুষ অন্তত পক্ষে এক মাস পানির পর্যাপ্ত সরবরাহ পায় না।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা জোর দিয়ে বলেছে, গত ২০ বছর ধরে ভূপৃষ্ঠে তুষার ও বরফে সঞ্চিত পানির স্তর প্রতি বছর এক সেন্টিমিটার হারে কমে এসেছে। সবচেয়ে বেশি কমেছে অ্যান্টার্কটিকা ও গ্রিনল্যান্ডে। তবে অনেক জনবহুল নিম্নভূমির এলাকাগুলোতে যেখান থেকে ঐতিহ্যগতভাবে পানি সরবরাহ হতো সেসব এলাকায় উল্লে­খযোগ্য হারে পানির পরিমাণ কমেছে। সংস্থাটি বলেছে, পানির নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের প্রভাব রয়েছে। কারণ পৃথিবীতে মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ পানি ব্যবহারযোগ্য এবং মিষ্টি পানি পাওয়া যায়। নীতা আম্বানি অবশ্য এতো বছর বাঁচবেন কিনা সন্দেহ!

শান্তনু চৌধুরী সাংবাদিক ও সাহিত্যিক