সোমবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২১, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

সীতাকুণ্ড পোস্ট অফিস থেকে টাকা তুলতে হয় ঘুষ দিয়ে!

প্রকাশিতঃ রবিবার, অক্টোবর ৩১, ২০২১, ৯:৪৫ অপরাহ্ণ


এম কে মনির, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) : চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলা পোস্ট অফিসে সেবা নিতে আসা গ্রাহকদের চরম হয়রানি ও ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। একইসাথে পোস্ট অফিসে গ্রাহকের জমাকৃত সঞ্চয়পত্রের টাকা তুলতেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘুষ দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ ওঠেছে।

সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ শেষ হলেও টাকা ফিরে পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা, বারবার পোস্ট অফিসে এসেও ফিরে যাওয়া, সকাল থেকে বিকাল অবধি পোস্ট অফিসের বারান্দায় অপেক্ষা করা, সঠিক সময়ে সঞ্চয়পত্র ভাঙাতে না পারা ও মুনাফা না পাওয়াসহ নানাবিধ ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সেবাপ্রার্থীদের।

সরেজমিনে ১৯ অক্টোবর সীতাকুণ্ড উপজেলা পোস্ট অফিসে গিয়ে বেশ কয়েকজন বৃদ্ধ নারী-পুরুষকে পোস্ট অফিসের বাইরে তীব্র রোদে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। এসময় তাদের সাথে কথা হলে এ প্রতিবেদকের কাছে হয়রানির কথা তুলে ধরেন।

তারা জানান, সকাল নয়টায় পোস্ট অফিসে সেবা নিতে আসলেও দুপুর ৩ টায়ও সেবা নিয়ে বাড়িতে ফিরতে পারেনি। কেউ কেউ জমাকৃত সঞ্চয়পত্র ভাঙাতে কর্মচারীর দ্বারস্থ হতে হতে রীতিমতো হাঁপিয়ে ওঠেছেন। তারপরও কাঙ্খিত টাকা ফিরে পাননি। আবার কেউ সঞ্চয়পত্রের মুনাফার টাকা উত্তোলনের জন্য সকালে আসলেও দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষায় রেখে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এসময় বেশ কয়েকজন নারীকে ছোট শিশু কোলে নিয়ে প্রচণ্ড রোদে শারীরিক সমস্যায় ভুগতে দেখা গেছে।

একই চিত্র দেখা গেছে ২৬ ও ২৭ অক্টোবর দুপুরে। এ দুদিন সীতাকুণ্ড পোস্ট অফিসে গিয়ে দেখা যায়, নারী-পুরুষের জটলা। তাদের কেউ কেউ মুনাফা উত্তোলন ও সঞ্চয়পত্র ভাঙাতে এসেছেন। কিন্তু সকাল থেকে দুপুর গড়ালেও মুনাফা ও সঞ্চয়পত্র ভাঙাতে পারেনি। পোস্ট অফিসের কর্মচারীরা তাদেরকে অপেক্ষা করতে বলেছে। ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকেও কাঙ্খিত সেবা জুটেনি। দিনশেষে সেবা ছাড়াই ফিরতে হচ্ছে তাদের।

ভুক্তভোগী গ্রাহক কাউছার সুলতানা বলেন, ‘আমার ৫ বছর মেয়াদী সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ শেষ হয়েছে চলতি বছরের মে মাসে। নিয়মানুযায়ী ১ মাসের মধ্যে সঞ্চয়পত্রের টাকা পাওয়ার কথা থাকলেও আজ নয় কাল করে করে ৫ মাস পার হয়ে গেছে। অবশেষে নানা ভোগান্তি শেষে জনৈক ব্যক্তির রেফারেন্সে টাকা পেয়েছি। তবুও আমার কাছ থেকে চা-নাস্তার কথা বলে টাকা চাওয়া হয়েছে। শেষে দু’শ টাকা দিয়ে এসেছি।’

পোস্ট অফিসে সেবা নিতে আসা মো. বিবলু বলেন, ‘আমি সঞ্চয়পত্র ভাঙাতে আসলে নানাভাবে আমাকে ঘুরিয়েছে অফিস। যেখানে এক মাসের মধ্যে টাকা পেয়ে যাওয়ার কথা সেখানে লেগেছে ৫ মাস। তাও তারা চা-নাস্তার টাকা দাবি করছে। পরে আমি এক সাংবাদিককে ফোন করতে চাইলে চুপসে যান।’

একই কথা বলেন সালেহা বেগমও। তিনি বলেন, ‘আমি চট্টগ্রাম শহরের জিপিওতে সঞ্চয়পত্র জমা করেছি। সেখানে কোন ভোগান্তি পোহাতে হয় না। কিন্তু এখানে সকাল থেকে দুপুর অবধি অপেক্ষা করতে হয় সেবা নিতে। ছোট সন্তানকে বাসায় রেখে এসেছি। কখন বাড়িতে ফিরব। কখন গৃহস্থালি কাজকর্ম সারব। দুর্ভোগের যেন শেষ নেই।’

এসময় আরেক সঞ্চয়পত্রধারী নারী বলেন, ‘পোস্ট অফিসে যাদের মুনাফার পরিমাণ বেশি। অর্থাৎ যাদের মুনাফা ৩০-৩৫ হাজার টাকা আসে তাদের কাছ থেকে চা-নাস্তার কথা বলে ৩-৪ হাজার কেটে নেয়। তাছাড়া মুনাফা কম হলেও ভাংতি দুই-তিনশ’ টাকা আসলে সেটা আর দেন না। এ কাজগুলো করে এ অফিসের লোকেরাই।’

কলেজ ছাত্র সাহেদ বলেন, ‘প্রতিমাসে মুনাফা তুলতে পোস্ট অফিসে আসতে হয়। যেদিন এখানে আসি সেদিন আর কোন কাজ হয়না। সারাদিন চলে যায়।’

একাধিক গ্রাহকের সাথে কথা বলে শুধু ভোগান্তি নয় গ্রাহকদের কাছ বিভিন্ন সময় টাকা দাবির কয়েকটি অভিযাগ একুশে পত্রিকার কাছ এসেছে। কেবল সাধারণ মানুষ নয় সরকারি কর্মকর্তার কাছ থেকেও টাকা দাবির অভিযোগ ওঠেছে পোস্ট মাস্টার সৈয়দ শামসুজ্জামান শাহরিয়ারের বিরুদ্ধে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে সীতাকুণ্ড উপজেলায় কর্মরত এক সরকারি কর্মকর্তার কাছ থেকে মেয়াদী সঞ্চয়পত্র ভাঙাতে ১ হাজার টাকা দাবি করেন তিনি।

পরে ওই কর্মকর্তা টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে শামসুজ্জামান শাহরিয়ার তার সঞ্চয়পত্র আটকে দেন। এর দুয়েকদিন পর ভুক্তভোগী কর্মকর্তার অফিসের প্রধান কর্মকর্তা শামসুজ্জামান শাহরিয়ারকে ফোন করে টাকা দাবির বিষয়ে জানালে তিনি অস্বীকার করেন। একই আলাপে ওই কর্মকর্তা শাহরিয়ারকে ভবিষ্যতে টাকা দাবির বিষয়ে সতর্ক হতে বলেন।

সেসময় আরও এক যুবক শামসুজ্জামান শাহরিয়ারের বিরুদ্ধে তার কাছ থেকে টাকা দাবির অভিযোগ তুলেন। এভাবে রীতিমতো কখনও নিজে কখনও অধস্তন কর্মচারীদের দিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা আদায় করার অভিযোগ ওঠেছে পোস্ট মাস্টার সৈয়দ শামসুজ্জামান শাহরিয়ারের বিরুদ্ধে।

এসব বিষয়ে সেসময় জানতে চাওয়া হলে সামশুজ্জামান শাহরিয়ার বলেন, ‘আমি কোন টাকা দাবি করিনি৷ যে বলছে তাকে নিয়ে আসেন আমার কাছে।’ এ সময় তিনি নিজেকে মিরসরাই উপজেলার হাইতকান্দি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পরিচয় দেন এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকার কথা জানান।

যদিও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রাজনৈতিক দলের পদে থাকতে পারেন না। এছাড়া মিরসরাই উপজেলার হাইতকান্দি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাদেরুজ্জামান। এ সম্পর্কে আজ দুপুরে জানতে চাইলে সামশুজ্জামান শাহরিয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি সাবেক সাধারণ সম্পাদক।’

এদিকে জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত একের পর এক পোস্ট অফিসে গ্রাহক হয়রানির অভিযোগ আসতে থাকে। সম্প্রতি ভুক্তভোগী কয়েকজন গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলেন এ প্রতিবেদক। না প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেন, ব্যাংক থেকে টাকা তুলে এনে এ পোস্ট অফিসের কর্মচারীরা টাকা মানুষকে দেয় না। সবসময় টাকা সংকটের অজুহাতে ফিরিয়ে দেয়। মুনাফা তুলতে ঘুষ নেন। সঞ্চয়পত্র ভাঙাতেও তা করেন। সঠিক সময়ে টাকা পাওয়া যায় না। আজ নয় কাল, কাল নয় পরশু করতে করতে বিপদের সময় টাকা পাওয়া যায় না। তারা সরকারি চাকরি করে বেতন নেয়, আবার ঘুষও নেয়।

গ্রাহকদের এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখতে সীতাকুণ্ড উপজেলা পোস্ট মাস্টার সৈয়দ শামসুজ্জামান শাহরিয়ারের সাথে কথা হয় তার দপ্তরে। এসময় সুনির্দিষ্ট কিছু গ্রাহক হয়রানির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা কখনো টাকা দাবি করিনি কারও কাছ থেকে। আমাদের তারল্য সংকট রয়েছে। ব্যাংক টাকা না দেয়ায় গ্রাহককে দিতে পারছি না।’

অথচ ১৯ অক্টোবর সঞ্চয়পত্র ভেঙে পোস্ট অফিস থেকে বের হয়ে এক ব্যক্তি তার কাছ থেকে সৈয়দ শামসুজ্জামান শাহরিয়ার ৬শ’ টাকা নিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন। এসময় ওই গ্রাহককে সৈয়দ শামসুজ্জামান শাহরিয়ারের মুখোমুখি করাতে চাইলে তিনি রাজি হয়নি এবং পরিচয় না দিয়ে চলে যান। পরে জানতে চাইলে সামশুজ্জামান শাহরিয়ার বলেন, ‘তিনি আমার আত্মীয়। খুশি করে দিয়েছেন।’

গ্রাহকের সঞ্চয়পত্র ভাঙাতে ঘুষ দাবির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কেউ খুশি করে দুয়েকশ’ টাকা দিলে সেটা আমাদের কিছু করার নেই। অনেক সাংবাদিক আসেন, তাদের তদবিরগুলো করে দিই। আপনিও আনেন করে দেব।’

এ বিষয়ে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পোস্ট মাস্টার জেনারেল মো. আমিনুর রহমান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘পোস্ট মাস্টার সৈয়দ শামসুজ্জামান শাহরিয়ারকে গ্রাহকের কিছু অভিযোগের ভিত্তিতে ইতিমধ্যেই নোয়াখালী জেলায় বদলি করা হয়েছে। আমরা তৎপর রয়েছি এসব বিষয়ে।’

শামসুজ্জামান শাহরিয়ারের ঘুষ গ্রহণের অভিযোগের সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এসব ঘটনা তো আমাদের জানাতে হবে। না জানালে আমরা ব্যবস্থা কিভাবে কীভাবে নেব। তাছাড়া বদলির পর নোয়াখালীতে তিনি অন্য কর্মকর্তার অধীনে থাকবেন। সে হিসেবে অনিয়ম করার সুযোগ নেই। এখানে তিনি প্রধান ছিলেন বলে হয়তো সুযোগ ছিল।’

পোস্ট মাস্টার সৈয়দ শামসুজ্জামান শাহরিয়ারের রাজনৈতিক পরিচয় দেয়া প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পোস্ট মাস্টার জেনারেল মো. আমিনুর রহমান বলেন, ‘এটি সম্পূর্ণ আলাদা একটি বিষয়। কেউ যদি সেটা বলে তাহলে সে সরকারি চাকরির বিধান লঙ্ঘন করেছে। সরকারি চাকরীজীবী কখনো এ ধরণের পরিচয় বহন করতে পারে না। আমরা যদি প্রমাণ পাই তার বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।’