সোমবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২১, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

চোর চক্রে ওসির ‘চাচাতো ভাই’—অভিযোগ কাউন্সিলরের, চ্যালেঞ্জ নিলেন ওসি

প্রকাশিতঃ বুধবার, নভেম্বর ৩, ২০২১, ৫:১৭ অপরাহ্ণ


মোহাম্মদ রফিক : চট্টগ্রাম নগরে একটি আইফোন চুরির ঘটনা নিয়ে তুঘলকি কাণ্ড চলছে। ভুক্তভোগীর স্ত্রী চসিকের সংরক্ষিত ওয়ার্ডের কাউন্সিলর রুমকি সেনগুপ্তের অভিযোগ, গত ৬ অক্টোবর দুপুরে আলকরণ এলাকা থেকে তার স্বামী প্রেমাংশু সেনগুপ্তের ব্যবহৃত আইফোন-১২ কৌশলে ‘চুরি’ করে তিন দুর্বৃত্ত। এ ঘটনায় আব্বাস উদ্দিন নামে এক যুবককে শনাক্ত করে কোতোয়ালী থানায় জিডি করতে গেলে তা গ্রহণ করেননি ওসি নেজাম উদ্দিন।

তবে কোতোয়ালী থানার ওসি নেজাম উদ্দিন বলছেন, গত ৬ অক্টোবর প্রেমাংশু সেনগুপ্তের জিডি নিয়েছেন তারা; যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, রহমতগঞ্জের নিজের দোকান থেকে আইফোনটি হারিয়ে ফেলেছেন প্রেমাংশু। তাহলে কার কথা সত্যি? ভুক্তভোগী স্বামীর নাকি কাউন্সিলর স্ত্রীর?

এদিকে ঘটনার পর ২৬ দিন পর্যন্ত স্বামীর আইফোনটি উদ্ধারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নগর পুলিশ কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীরের কাছে গত ১ নভেম্বর আবেদন করেছেন কাউন্সিলর রুমকি সেনগুপ্ত। লিখিত অভিযোগে রুমকির দাবি, তার স্বামীর আইফোন ‘চুরির’ সঙ্গে জড়িত আব্বাস উদ্দিন ওসি নেজাম উদ্দিনের আপন চাচাতো ভাই। আব্বাসের গ্রামের বাড়ি লোহাগাড়া থানার চুনতি গ্রামে। বাবার নাম আবুল হোসেন। নগরের রিয়াজউদ্দিন বাজারে মোবাইল মার্কেটে ভাড়ায় তার দুটি দোকান আছে। ওই দোকানে চোরাই মোবাইল ফোনের আইএমইআই পরিবর্তন করা হয়। যেসব মোবাইলের আইএমইআই পরিবর্তন করতে পারে না, সেগুলো ভারতসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করে সে। তার হাতে আছে মোবাইল ফোন চোর চক্রের ১০-১২ জন সদস্য। রিয়াজউদ্দিন বাজারের মোবাইল ফোন বিক্রির যে দুটি দোকান আছে সেগুলোর মালিকও ওসি নেজাম উদ্দিন।

কাউন্সিলর রুমকি সেনগুপ্তের অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে কোতোয়ালী থানার ওসি নেজাম উদ্দিন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমি কোন আব্বাস উদ্দিনকে চিনি না। আব্বাস আমার চাচাতো ভাই এবং রিয়াজউদ্দিন বাজারে আব্বাসের দুটি দোকানের মালিকও আমি- এসব অভিযোগ যদি কাউন্সিলর রুমকি প্রমাণ দিতে পারেন তাহলে আমি পুলিশের চাকরি ছেড়ে দেব। আর যদি তিনি প্রমাণ দিতে না পারেন তাহলে তাকে প্রশ্ন করুন তিনি কাউন্সিলর পদ ছেড়ে দেবেন কি না। আমি চ্যালেঞ্জ করলাম।’

এক প্রশ্নের উত্তরে ওসি নেজাম উদ্দিন বলেন, ‘ঘটনার পর আমি রুমকি সেনগুপ্তকে বলেছি, কারও বিরুদ্ধে সন্দেহ থাকলে আপনি মামলা দায়ের করুন। তিনি বা তার স্বামী মামলা করতে থানায় আসেননি। তবু আমরা তার স্বামীর আইফোনটি উদ্ধারের চেষ্টা করছি।’

কাউন্সিলর রুমকি সেনগুপ্ত আজ বুধবার একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আব্বাস উদ্দিন যে ওসি নেজামের চাচাতো ভাই সেটার প্রমাণ হিসেবে আমাদের কাছে একটি ভিডিও আছে।’ আরেক প্রশ্নের উত্তরে রুমকি সেনগুপ্ত বলেন, ‘গত ১ নভেম্বর পুলিশ কমিশনারকে অভিযোগ দেয়ার পর উপকমিশনার (দক্ষিণ) বিজয় বসাকসহ বিভিন্ন পুলিশ কর্মকর্তারা আমাকে ফোন দিয়েছেন। তারা আমার স্বামীর আইফোনটি উদ্ধারে পদক্ষেপ নেবেন বলে জানিয়েছেন।’

এদিকে আব্বাস উদ্দিন ওসি নেজাম উদ্দিনের আপন চাচাতো ভাই বলে প্রমাণ হিসেবে থাকা কথিত ‘ভিডিওটি’ এ প্রতিবেদকের কাছে পাঠানোর জন্য অনুরোধ করলেও তা পাঠাননি কাউন্সিলর রুমকি সেনগুপ্ত।

পুলিশ কমিশনারকে দেওয়া লিখিত অভিযোগে রুমকি সেনগুপ্ত জানান, গত ৬ অক্টোবর বেলা সাড়ে ১২টায় তার স্বামী প্রেমাংশু সেনগুপ্ত সদরঘাট মেমন হাসপাতাল এলাকার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার সময় আলকরণ মোড়ের অদূরে দুই-তিনজন অপরিচিত লোক তার পিছু নেয়। এসময় তিনজনের মধ্যে একজন তার স্বামী প্রেমাংশু সেনগুপ্তকে পেছন থেকে ধাক্কা দেয়।

ওই তিনজনের একজনের ছবি দেখে শনাক্ত করতে সক্ষম হন তারা। তার নাম মোহাম্মদ আব্বাস উদ্দিন। ঘটনার দিন এ ব্যাপারে জিডি করতে কোতোয়ালী থানায় যান প্রেমাংশু সেনগুপ্ত। কিন্তু ডিউটি অফিসার জিডি গ্রহণ করেনি। পরে একই বিষয়ে কাউন্সিলর রুমকি সেনগুপ্ত নিজেই যান ওসি নেজাম উদ্দিনের কাছে। ভুক্তভোগীর পক্ষ থেকে জিডি বা মামলা গ্রহণ না করে উল্টো রুমকি সেনগুপ্তের উদ্দেশে ওসি নেজাম উদ্দিন বলেন, ‘এটা তো প্যানেল মেয়রের গিফট দেওয়া মোবাইল, হারিয়ে গেছে কী হয়েছে? আরেকজন অন্যজন গিফট দিবে।’

মোবাইল চোরদের ছবি দেখে আব্বাসকে শনাক্ত করার কথা গত ২৬ অক্টোবর ফোনে ওসি নেজাম উদ্দিনকে জানান রুমকি। এসময় ওসি নেজাম রুমকির উদ্দেশে বলেন, ‘যদি আব্বাস উদ্দিনকে ধরে মোবাইল উদ্ধার করতাম তাহলে থানা, পুলিশ ও ওসির কাজ কি? লিখিত অভিযোগে আব্বাস উদ্দিন ওসি নেজাম উদ্দিনের আপন চাচাতো ভাই এবং রিয়াজউদ্দিন বাজারের মোবাইল ফোন বিক্রির দুটি দোকানের মালিকও ওসি নেজাম বলে দাবি করেন কাউন্সিলর রুমকি সেনগুপ্ত।

এদিকে পুলিশ কমিশনার বরাবর কাউন্সিলর রুমকির অভিযোগ করা প্রসঙ্গে কোতোয়ালী থানার ওসি নেজাম উদ্দিন বলেন, ‘কাউন্সিলর রুমকি বিভিন্ন বিষয়ে পুলিশের সঙ্গে আদেশের সুরে কথা বলেন, প্রায় সময় তদবির করেন। এসব অন্যায় তদবির না শুনায় তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে মিথ্যা অভিযোগ করছেন।’

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সিএমপির উপকমিশনার (দক্ষিণ) বিজয় বসাক আজ বুধবার বিকালে একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। আগে জেনে নিই। আপনি পরে ফোন দেবেন।’