সোমবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২১, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

দলীয় কর্মসূচি নয়, ফেসবুক রাজনীতিতেই সক্রিয় মেয়র রেজাউল!

দলীয় নেতাকর্মীদের ক্ষোভ

প্রকাশিতঃ মঙ্গলবার, নভেম্বর ১৬, ২০২১, ৪:১০ অপরাহ্ণ

জোবায়েদ ইবনে শাহাদত : দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের কোনো ধরনের সাংগঠনিক কার্যক্রমে উপস্থিত হচ্ছেন না নগর আ. লীগের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের  মেয়র এম রেজাউল করিম চৌধুরী। অভিযোগ ওঠেছে, দলের প্রয়াত নেতাদের স্মরণসভা কিংবা দলীয় সভা-সমাবেশে দলের কেন্দ্রীয় নেতারা ঢাকা থেকে এসে উপস্থিত থাকলেও গত দুমাসে দলীয় কোনো কর্মসূচিতে অংশ নেননি রেজাউল।

এক সময়ের ত্যাগী ও দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় রেজাউলের দলীয় কার্যক্রমবিমুখ হওয়ার এমন ভূমিকায় বিস্মিত নগর আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দরাও। বিষয়টিকে ভালোভাবে নিচ্ছেন না কেউই। দলীয় মনোনয়নে মেয়র নির্বাচিত হওয়া রেজাউলের আকষ্মিক এই পরিবতন জন্ম দিয়েছে নানা প্রশ্নের।দায়িত্বশীল সিনিয়র নেতার এমন অরাজনৈতিক আচরণে ক্ষোভ জানিয়েছেন তৃণমূলকর্মীরাও।

অনেকে মনে করছেন, হঠাৎ করে (আলোচনার বাইরে থাকা) মেয়রের মনোনয়ন বা দায়িত্ব প্রাপ্তির জন্য তিনি (রেজাউল) প্রস্তুত ছিলেন না। যার কারণে শুধু দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমেই শুধু নয় মেয়রের দায়িত্ব পালনেও হিমিশিম খেতে হচ্ছে তাকে। আবার অনেকে মনে করছেন মেয়রের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সিটি কর্পোরেশনের নানা কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে ইতোমধ্যে নানা সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন তিনি। জনসম্মুখে আসলে এসব বিষয়ে সদুত্তর দিতে পারবেন না রেজাউল, তাই সভা-সমাবেশ এড়িয়ে চলছেন তিনি।

জানা গেছে, চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের উদ্যোগে আয়োজিত গত ১০ নভেম্বর মহানগর আ. লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এম এ রশিদের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীর স্মরণসভা, ৭ নভেম্বর গণতন্ত্র হত্যা দিবসের আলোচনা সভা, ৬ নভেম্বর, মুক্তিযোদ্ধা, লেখক ইদরিস আলমের ১৫তম মৃত্যুবার্ষিকীর স্মরণসভা, ৫ নভেম্বর সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ‘সম্প্রীতি সমাবেশ’, ৪ নভেম্বর বাংলাদেশ আ. লীগের সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর ৯ম মৃত্যুবার্ষিকীর স্মরণ সভা এবং ৩ নভেম্বর জাতীয় জেল হত্যা দিবসের স্মরণসভা– কোনোটাতে দেখা যায়নি রেজাউলকে।

একইভাবে ৩ অক্টোবর চট্টগ্রাম শহর আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি জাতীয় পরিষদের সাবেক সদস্য চৌধুরী এন জি মাহমুদ কামালের ৩০তম মৃত্যুবার্ষিকীর স্মরণসভা এবং ১৯ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কনিষ্ঠ পুত্র শহীদ শেখ রাসেলের ৫৮তম জন্মদিনে নগর আ. লীগের আলোচনা সভায়ও যোগ দেননি মেয়র রেজাউল।

শুধু তাই নয়, ২৩ অক্টোবর ৩১ নং আলকরন ওয়ার্ডের ৪ বারের কাউন্সিলর, নগর আওয়ামী লীগের সাবেক সদস্য তারেক সোলায়মান সেলিমের স্মরণসভায়ও ছিলেন না রেজাউল করিম চৌধুরী। অথচ বাংলাদেশ আ. লীগের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক একেএম আফজালুর রহমান বাবু, দক্ষিণ জেলা আ.লীগের সভাপতি সাংসদ মোছলেম উদ্দিন আহমদের মতো নেতারা সাংগঠনিক বাধ্যবাধকতা না থাকা সত্ত্বেও ওই স্মরণসভায় হাজির হয়েছেন।

এছাড়াও গত ৯ অক্টোবর চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা আ. লীগের উদ্যোগে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য আতাউর রহমান খান কায়সারের ১১তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত স্মরণ সভায়ও উপস্থিত ছিলেন না মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী।

অথচ সেই সভায় উপস্থিত ছিলেন আ. লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন (এমপি), আ. লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল-আলম হানিফ (এমপি), আ. লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সংসদের হুইপ আবু সাইদ আল মাহমুদ স্বপন, দ. জেলা আ. লীগ সভাপতি মোছলেম উদ্দিন আহমদ এমপি ও সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান, শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, আ. লীগের অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক সম্পাদক ওয়াসিকা আয়েশা খান এমপি, উপ-প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম, উত্তর জেলা আ. লীগ সভাপতি ও চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এম এ ছালাম, সাধারণ সম্পাদক শেখ আতাউর রহমান, মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী এমপি, নজরুল ইসলাম চৌধুরী এমপি প্রমুখ।

দলীয় সভা-সমাবেশে উপস্থিত না থাকলেও নিজের ফেইসবুক থেকে উল্লিখিত দিনে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের পোস্ট দিয়েছেন রেজাউল করিম চৌধুরী। এসব দিনের কোনোটিতে মেয়র কার্যালয়ে অলস সময় পার করে আবার কখনো বাণিজ্যিক অনুষ্ঠান উদ্বোধন করতেও দেখা গেছে তাকে। কিন্তু রাজনীতি-সচেতনদের প্রশ্ন–মাঠের রাজনীতিক রেজাউল করিম চৌধুরী কি তবে সব ছেড়েচুড়ে নিজের সীমাবদ্ধতা ঢাকতে শেষ পর্যন্ত ফেসবুক-নির্ভর রাজনীতিতে ঝুঁকে পড়েছেন?

বিষয়টিকে বাজেভাবে নিয়েছেন মহানগর আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দরা। নগর আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল এক নেতা বলেন, তার (রেজাউল করিম) ভুলে গেলে চলবে না আগে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কর্মী। সেই সুবাদে দলের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। যেহেতু তিনি দল করেন দলীয় কর্মসূচি, সভা সমাবেশে যোগ দেওয়া তো তার রাজনীতির অংশ। যেই দলের জন্য তিনি নগরপিতা হতে পেরেছেন সেই দলকেই যেহেতু তিনি ভুলে গেছেন তাকে সুবিধাবাদী বললেও ভুল হবে না।

নগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও সাবেক প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন একুশে পত্রিকাকে বলেন, তিনি কেন দলের কর্মসূচি, সভা-সমাবেশে উপস্থিত হচ্ছেন না সেটা তিনি ভালো জানবেন। দলে বিষয়টি লক্ষণীয় হলেও এখন পর্যন্ত এবিষয়ে কোনো আলোচনা কিংবা সিদ্ধান্ত হয়নি। আমি মনে করি তিনি যত ব্যস্তই থাকুন না কেন, সময় সুযোগ করে দলীয় অনুষ্ঠানে তার উপস্থিত থাকা উচিত। কারণ তিনি দল করেন, দলের লোক, গুরুত্বপূর্ণ পদেও আছেন।

এদিকে, সাবেক সিটি মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘সাংগঠনিকভাবে উনার (মেয়র রেজাউল করিম) একটা দলীয় পদ আছে। এবং উনি দলের মনোনীত মেয়র প্রার্থী ছিলেন। ভুলে গেলে চলবে না, উনার নির্বাচিত হওয়ার ক্ষেত্রে দলের বলিষ্ঠ ভূমিকা ছিল। নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার ফলেই কিন্তু তিনি মেয়র হতে পেরেছেন। সে হিসেবে দলের প্রতি উনার অবশ্যই দায়বদ্ধতা আছে। এখন তিনি কেন দলীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করছেন না সেটা তিনিই ভালো বলতে পারবেন।’

এদিকে, দীর্ঘদিন সাংগঠনিকভাবে নিষ্ক্রিয় রেজাউল করিম চৌধুরী গত ১৪ নভেম্বর নগর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় হঠাৎ উপস্থিত হন। এদিন অনেকটা মারমুখী ভঙ্গিতে দেখা যায় তাকে এবং বেশকিছু বিষ্ফোরক মন্তব্য করে নতুন বিতর্কের জন্ম দেন মেয়র রেজাউল।

সভায় উপস্থিত নগর আ. লীগের একাধিক নেতা ঘটনার বিবরণ দিয়ে জানান, নগর আওয়ামী লীগের ওয়ার্ড সন্মেলনকে কেন্দ্র করে ওর্য়াড-ইউনিট পর্যায়ে কর্মীসংগ্রহ ও সদস্য নবায়নের বিরোধিতা করে, আগে কাউন্সিল করার জন্য তাগাদা দিতে থাকেন তিনি। এসময় রেজাউল উচ্চস্বরে বলে উঠেন, নগর আওয়ামী লীগের বর্তমান কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ ‘অবৈধ কমিটি’। ২০১৩ সালে গঠিত কমিটির মেয়াদ তিন বছর পরেই শেষ হয়েছে। তাই এই কমিটির ওয়ার্ড, ইউনিট এবং থানায় সম্মেলন করার কোনো এখতিয়ার নেই।’

রেজাউলের এমন বিষ্ফোরক মন্তব্যে হট্টগোলের সৃষ্টি হয় সভায়। নগর আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা তার এমন বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বিরোধিতা করেন। একপর্যায়ে সভার মধ্যভাগ থেকেই হন্তদন্ত হয়ে সভাস্থল ত্যাগ করেন তিনি। রেজাউল করিম সভাস্থল ত্যাগ করার পর সভায় ৫টি ওয়ার্ডের (পূর্ব ষোলশহর, বাগমনিরাম, এনায়েত বাজার, আন্দরকিল্লা ও দেওয়ানবাজার) সম্মেলন করার সিদ্ধান্ত নেন দলীয় নেতারা। সম্মেলনের সার্বিক তদারকির জন্য সম্পাদকমণ্ডলীর একজন করে সদস্যকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

সভায় উপস্থিত নগর আওয়ামী লীগের এক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, অনেকদিন দলীয় কর্মসূচি, সভা-সমাবেশের বাইরে ছিলেন রেজাউল। তাই বোধহয় খেই হারিয়ে ফেলেছিলেন। নগর আওয়ামী লীগের কমিটিকে অবৈধ বলে মন্তব্য করেছেন অথচ নিজেই সেই কমিটির সভায় এসেছেন। শুধু এসেছেন তা নয়, হঠাৎ এসে নিজের কর্তৃত্ব জাহির করতে চাইছেন। এটা তো সুন্দর নয়।

শুধু নগর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী নয়, মেয়র রেজাউলের এমন কর্মকাণ্ড গড়িয়েছে দলী হাইকমান্ড পর্যন্ত। বেফাস মন্তব্যের জন্য শীঘ্রই জবাবদিহিতার মুখে পড়তে হবে তাকে (রেজাউল)। পাশাপাশি দলীয় সভাসমাবেশে না থাকার কারণও জানতে হবে তাকে-এমনটাই আভাস দিয়েছেন চট্টগ্রাম বিভাগের সাংগঠনিক দায়িত্বে থাকা আ. লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সংসদের হুইপ আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন।

একুশে পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লড়াইয়ে আমাদের সবাইকে ঐকবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। দলটা আসলে ডেকে করার বিষয় না। দল করতে আন্তরিকতার প্রয়োজন। রাজনীতি করতে গেলে স্বেচ্ছাশ্রম দিতে হবে। তিনি সিটি মেয়র, তার ব্যস্ততা থাকাটা স্বাভাবিক। তবে উনাকেও মনে রাখতে হবে উনি দলের মনোনীত মেয়র। দলের মধ্যে এধরনের কিছু গ্যাপ আছে। আমি সকলের সাথে কথা বলে এসব গ্যাপ পূরণ করার চেষ্টা করছি।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কমিটি অবৈধ একথাটি গ্রহণযোগ্য নয়। বিষয়টি আমি শুনেছি। তার এমন বক্তব্যে নগর আওয়ামী লীগে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। দলের নেতাকর্মীদের পারষ্পরিক সম্মানবোধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপানাদের (সংবাদকর্মী) মাধ্যমে বিষয়টি আমার নজরে এসেছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে অতিসত্বর উনার সাথে কথা বলবো। পাশাপাশি নগর আ. লীগ নেতাদের সাথেও কথা বলবো- যোগ করেন তিনি।

এসব ব্যাপারে কথা বলতে মেয়র রেজাউল করিমকে সোমবার বিকেল থেকে একাধিকবার ফোন দেওয়ার এক পর্যায়ে তিনি ফোন ধরেন। একুশে পত্রিকার প্রশ্ন শুনে পরক্ষণেই জানালেন তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ে, তাই কথা বলতে পারবেন না জানিয়ে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।