সোমবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২১, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

‘সিডিএ’র টাকায় বাড়ি বানাব, নাকি কবরস্থানের জায়গা কিনব’

‘ফতেয়াবাদ নিউ টাউন’ প্রকল্পে ভিটা হারানোর আতংকে এলাকাবাসী

প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৮, ২০২১, ১:১৩ পূর্বাহ্ণ

বাপ-দাদার বসতভিটা রক্ষায় স্থানীয়দের বৈঠক

মোহাম্মদ রফিক : চট্টগ্রাম শহরতলী ১ নং দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ড এলাকায় ‘ফতেয়াবাদ নিউ টাউন’ আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে ক্ষোভে ফুঁসছে স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের আশংকা প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে নিশ্চিত বাপ-দাদার ভিটেমাটি হারাবেন তারা । ২০০৭ সালে ফসলি জমি ও বসতবাড়ি মিলে এলাকার ২ হাজার ৭শ’ একর জায়গা অধিগ্রহণ করে প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক)।

স্থানীয়দের ভাষ্য, তারা সরকারের এ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে নয়। তাদের দাবি, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করুক চউক। তবে বাপ-দাদার বসতভিটা উচ্ছেদ করে নয়। প্রকল্প এলাকার পশ্চিমে জঙ্গল দক্ষিণ পাহাড়তলীতে বিপুল পরিমাণ সরকারি খাস জমি ও পাহাড়ি এলাকা আছে। সেখানে গড়ে উঠুক ‘ফতেয়াবাদ নিউ টাউন’। এদিকে স্থানীয় বাসিন্দারা প্রকল্পটি বাতিলের দাবিতে আগামী কয়েকদিনের মধ্যে চউক চত্বরে অবস্থান কর্মসূচি, এলাকায় মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালন করতে যাচ্ছে। ১ নং দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ড বসতভিটা রক্ষা কমিটির উদ্যোগে এ কর্মসূচি পালন করা হবে।

অভিযোগ আছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে সেখানে বাড়িঘর নির্মাণের জন্য ২০০৭ সাল থেকে স্থানীয় বাসিন্দাদের নকশা অনুমোদন দিচ্ছে না চউক। প্রকল্পের অজুুহাতে কমে গেছে জমির দাম। এ সুযোগে কিছু কর্পোরেট গ্রুপ, ডেভেলপার কোম্পানি পানির দরে জমি বিক্রি করতে বাধ্য করছে স্থানীয় হতদরিদ্র মানুষদের। বাপ-দাদার জমি রক্ষার জন্য ২০০৭ সালের দিকে ‘বসতভিটা রক্ষা কমিটি’ গঠন করেন স্থানীয়রা। বসতভিটা উচ্ছেদ করে দক্ষিণ পাহাড়তলীতে ‘ফতেয়াবাদ নিউ টাউন’ নামে প্রকল্পটি বাতিল চেয়ে সম্প্রতি চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে একটি সংবাদ সম্মেলনও করেছে সংগঠনটি। এর আগে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি, স্থানীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদসহ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে প্রকল্প বাতিলের ব্যবস্থা চেয়ে আবেদন করেছে ১ নং দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ড বসতভিটা রক্ষাকমিটি।
সংবাদ সম্মেলনে স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর গাজী শফিউল আজিম, বসতভিটা রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক দুর্গাপদ নাথ, সদস্য সচিব সিরাজুল ইসলাম রাশেদ, অধ্যাপক ফজলুল কাদেরসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন।

প্রকল্প প্রসঙ্গে ওয়ার্ড কাউন্সিলর গাজী শফিউল আজিম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমরা সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পবিরোধী নই। কিন্তু আবাসন সংকট নিরসনের নামে আমাদের বাড়িঘর উচ্ছেদ করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যাবে না। প্রয়োজনে প্রকল্প এলাকা সরিয়ে পশ্চিমে জঙ্গল দক্ষিণ পাহাড়তলীতে নিয়ে যাক। এছাড়া প্রকল্পের অজুহাতে বিগত ২০০৭ সাল থেকে এখানে ভবন নির্মাণের জন্য নকশা অনুমোদন দিচ্ছে না চউক। বসতভিটা যে উচ্ছেদ করবে না সে বিষয়টি চউককে পরিষ্কার করতে হবে।’

১ নং দক্ষিণ পাহাড়তলী বসতভিটা রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক দুর্গাপদ নাথ একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমরা এ প্রকল্প বাতিল চাই। বাপ-দাদার ভিটেমাটিতেই বেঁচে থাকতে চাই, মরতে চাই। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে লাভবান হবে উচ্চমধ্যবিত্তরা। সিডিএ এ পর্যন্ত চট্টগ্রাম শহরে যেসব আবাসিক প্রকল্প করেছে সেখানে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জন্য কোনো আবাসনের ব্যবস্থা নেয়নি। দক্ষিণ পাহাড়তলীর বেশিরভাগ বাসিন্দা নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত। আর এটা কোনো রাষ্ট্রীয় প্রকল্প নয়। গুটি কয়েক উচ্চবিত্তের আবাসন সংকট নিরসনের নামে কৃষিনির্ভর বাসিন্দাদের বাপ-দাদার জমি অধিগ্রহণ করছে সিডিএ। ক্ষতিগ্রস্থদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া হলেও সেই টাকায় আশপাশের এলাকায় বসতি স্থাপন সম্ভব হবে না। ফলে দক্ষিণ পাহাড়তলীর মানুষ ভূমিহীন ও ভাসমান মানুষে পরিণত হবে। যা কাম্য নয়।’

সংগঠনের সদস্য সচিব সিরাজুল ইসলাম রাশেদ বলেন, ‘প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকায় প্রায় দুই লাখ লোকের বসবাস। কোনো ধরনের ঘোষণা এবং গেজেট নোটিফিকেশন ছাড়াই ভবন নির্মাণের অনুমোদন বন্ধ রেখেছে সিডিএ। ফলে কমে গেছে জমির দাম। চিকিৎসাসহ জরুরি প্রয়োজনে কেউ জমি বিক্রি করতে চাইলেও ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। পবিত্র হজ্ব পালন, তীর্থযাত্রা, বিয়েশাদীসহ প্রয়োজনীয় কাজ করতে পারছেন না এলাকার মানুষ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর থেকে গৃহহীনদের ঘর করে দিচ্ছেন। ফসলি জমি নষ্ট করে কোনো ধরনের স্থাপনা না করতে নানা নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন। দক্ষিণ পাহাড়িতলীকে বসতি ছাড়া বাকি সব কৃষি জমি। সঙ্গে রয়েছে মৎস্যও কৃষি খামার। রয়েছে বিখ্যাত আউলিয়ার মাজার, সাধুর মঠ, মসজিদ, মন্দির, স্কুল কলেজ ও মাদ্রাসা। এলাকার বেশিরভাই কৃষিজীবী । তারা বাপ-দাদার জমিতে চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করে।’

চউক’র প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন সামস জানান, ২০০৭ সালে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সাম্প্রতিক সময়ে গতি পায় প্রকল্পটি। ইতোমধ্যে ভুমি জরিপ সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে শিগগির কনসালটেন্ট নিয়োগ দেওয়া হবে। প্রকল্প কর্মকর্তা মো. শামীমের ভাষ্য, প্রকল্পটি এখন অ্যানালাইসিং পর্যায়ে আছে। প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা প্রকল্পব্যয় নির্ধারণ করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে সম্প্রতি ডেভলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রোফাইল (ডিপিপি) পাঠায় চউক। বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যমেও উঠে আসে। কিন্তু প্রকল্প কর্মকর্তা প্রকল্পের কাজ এতদূর এগোনোর বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছেন।

এ প্রকল্পটি নিয়ে আপত্তি থাকলে স্থানীয়দের গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে লিখিতভাবে জানানোর কথা বলেছেন জাতীয় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন অনুবিভাগ-১) আবদুল গাফফার খান।

তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘প্রকল্পের বিষয়টি দেখছে চউকের চেয়ারম্যান, প্রধান প্রকৌশলী এবং প্রকল্প কর্মকর্তা। স্থানীয় বাসিন্দারা এটি নিয়ে যে আপত্তি করছেন সে বিষয়ে চউক আমাদের জানায়নি। এখন এলাকাবাসী আপত্তি দিলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

স্থানীয় বাসিন্দা লোকমান হাকিম বলেন, ‘আবাসন সংকট নিরসনের নামে ২৭ বছর আগে কর্ণফুলীর নদীর দক্ষিণ পাড়ে আবাসিক প্রকল্প গড়ে তুলেছিল সিডিএ। অথচ এখনো সেখানে একটি ঘরও তুলতে পারেনি। সেখানে তৈরি হয়েছে ভুতুড়ে পরিবেশ। অন্যদিকে ১৬-১৭ বছর আগে অক্সিজেন কুয়াইশ এলাকায় ‘অনন্যা আবাসিক’ গড়ে তুলে সিডিএ। সে প্রকল্পটির এখনো সিকিভাগও বাস্তবায়ন করতে পারেনি সিডিএ। আমাদের বাপ-দাদার ভিটেমাটি অধিগ্রহণ করে ক্ষতিপূরণের টাকা দিবে সিডিএ। এ টাকা দিয়ে কী করব, জমি কিনব নাকি বাড়ি বানাব, নাকি কবরস্থানের জায়গা কিনব? আর ক্ষতিপূরণের টাকা যে পাব সেটার নিশ্চয়তা আমাদের কে দেবে?

এদিকে বসতবাড়ি রেখেই নতুন করে প্রকল্পের একটি নকশা তৈরি করার কথা জানিয়ে চউক’র প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস জানান, ‘আমরা বাড়িঘর উচ্ছেদ করব না। প্রকল্প এলাকায় প্রচুর খালি জায়গা আছে। সেখানে আবাসন গড়ে তোলা হবে। সেখানে অবকাঠামোগত যে উন্নয়ন হবে স্থানীয় বাসিন্দাদের বাড়িঘরের সাথে সমন্বয় করে রাস্তাঘাটসহ নানা স্থাপনা গড়ে তোলা হবে। এতে এলাকাবাসী উপকৃত হবেন। এখানে আতংকিত হওয়ার কিছু নেই। বসতভিটা রক্ষা করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশ করে স্থানীয় বাসিন্দাদের জানিয়ে দিচ্ছেন না কেন, এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রধান প্রকৌশলী বলেন, ‘এটা ঘোষণা দিলে যেখানে খালি জায়গা আছে সেখানেও বাড়িঘর তৈরি করবে স্থানীয়রা।’

প্রায় ১৫ বছর ধরে স্থানীয়দেকে ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদন না দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে চউকের এই প্রধান প্রকৌশলী বলেন, ‘নকশা অনুমোদন দিলে অপরিকল্পিত বাড়িঘর গড়ে উঠবে। তাই বন্ধ রাখা হয়েছে। আমরা বাড়িঘর বাদ দিয়ে নতুন করে একটি প্রকল্পের নকশা তৈরি করছি। সেটা চিহ্নিত হয়ে গেলে সংশ্লিষ্টদের নকশা অনুমোদন দেওয়া হবে।’ কিন্তু বসতভিটা বাদ দিয়ে যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হবে চউকের এমন কথায় আস্থায় নিতে পারছে না স্থানীয়রা।

নাম প্রকাশ না করে স্থানীয় এক ব্যাংকার একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘মূলত আবাসন সংকট নিরসন নয়। ১৫-১৬ বছর আগে পাশ্ববর্তী একটি দেশের বড় একটি কর্পোরেট গ্রুপের সাথে আঁতাত করে ফতেয়াবাদে উপশহর গড়ে তোলার প্রথম উদ্যোগ নিয়েছিলেন চউকের তৎকালীন এক চেয়ারম্যান। কারণ এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পকেট ভারি হবে চউক কর্মকর্তা, সরকারি আমলা ও মন্ত্রীদের। এতে নিঃশেষ হবে এলাকার গরিব মানুষগুলো।’

এ ব্যাপারে বক্তব্য নিতে মঙ্গলবার বিকেলে একাধিকবার কল করলেও রিসিভ করেননি চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষ। একই বিষয়ে বক্তব্য নিতে কল করলে মোবাইল ফোন রিসিভ করেননি স্থানীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আসিনুল ইসলাম মাহমুদ।

এদিকে চউক ২৭০০ একর জায়গায় ‘ফতেয়াবাদ নিউ টাউন’ প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বললেও একুশে পত্রিকার হাতে আসা প্রকল্প এলাকার একটি ম্যাপ বলছে ভিন্ন কথা। ওই ম্যাপে দেখা যায়, ১ নং দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের ভাটিয়ারি লিংক রোড (চট্টগ্রাম নাজিরহাট ও বিশ্ববিদ্যালয় রেললাইনের পশ্চিম কোণা থেকে) উত্তরে চৌধুরীহাট, ফতেয়াবাদ, ছড়ারকুল, নন্দীরহাট হয়ে পাশ্ববর্তী ফতেপুর ইউনিয়নের মাইজপট্টি মৌজা এবং পশ্চিমে জঙ্গল দক্ষিণ পাহাড়তলী মৌজার একাংশ পর্যন্ত বিস্তৃত চউক’র প্রকল্প এলাকা।

চউক সূত্র জানিয়েছে, ২ হাজার ৭০০ একর নয়। ৪ হাজার ৭০০ একর জায়গার ওপর ‘ফতেয়াবাদ নিউ টাউন’ নামে আধুনিক উপশহর গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল ২০০৭ সালে। প্রকল্প গ্রহণের ৬ বছর পর ২০১৩ সালের জুলাই মাসে প্রণীত মাস্টার প্ল্যানে প্রকল্পটি নিয়ে নতুন করে আলোচনা হয়। ওই সময় প্রকল্পের এলাকা ২ হাজার ৩০০ একর বাড়িয়ে ৭ হাজার একরে উন্নীত করা হয়। ২০১৩ সালের জুলাই মাসে প্রকল্পটি শুরু করে ২০১৮ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়ন করার কথা ছিল। ২০১৪ সালে প্রকল্প সারপ্রাইজ তৈরি করা হয়। আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে গৃহীত প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। ২০১৯ সালের জুলাই মাসে প্রকল্পটির কাজ শুরু হওয়ার কথা। শেষ হওয়ার কথা ২০২২ সালের জুন মাসে।