সোমবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২১, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

দখল-দূষণে একাকার কর্ণফুলী

প্রকাশিতঃ সোমবার, নভেম্বর ২২, ২০২১, ২:৩৩ অপরাহ্ণ

  • নদী রক্ষায় সর্বোচ্চ আদালতের রায় ও নির্দেশনা বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই
  • নদী উদ্ধারে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সুপারিশও কাজে আসছে না
  • নির্দেশনা ও সুপারিশ বাস্তবায়নে বড় আকারের কার্যকর উদ্যোগ নেই
  • নদীর সঙ্গে যুক্ত খাল অস্তিত্ব হারাতে বসেছে

শরীফুল রুকন : কর্ণফুলী নদী অব্যাহতভাবে দখল হয়েছে, হচ্ছে। ধনী-দরিদ্র, শিক্ষিত-নিরক্ষর, রাজনীতিক-ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধি-সাধারণ মানুষ-সমাজের প্রায় সর্বস্তরের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ অবৈধভাবে নদী দখলের সঙ্গে যুক্ত। এমনকি কর্ণফুলী নদীর জায়গা দখল করেছে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। চট্টগ্রাম নদী ও খাল রক্ষা আন্দোলন নামের একটি সংগঠন বলছে, ২০১৪ সালে শাহ আমানত সেতুর নিচে কর্ণফুলীর প্রস্থ ছিল ৮৬৬ মিটার। এখন তা ৪১০ মিটারে এসে ঠেকেছে। বিভিন্ন সময়ে কর্ণফুলী নদীর দখল ও দূষণ রোধে নির্দেশনা চেয়ে উচ্চ আদালতে রিট হয়েছে। আদালত রায় ও নির্দেশনা দিয়েছেন। তবে বছরের পর বছর পার হলেও দখলকারীদের নানা উদ্যোগে ও আইনি জটিলতায় নির্দেশনার পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি।

জানা গেছে, কর্ণফুলী নদী রক্ষা ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা চেয়ে ২০১০ সালে আরেকটি রিট করে এইআরপিবি। রিটের চূড়ান্ত শুনানি নিয়ে ২০১৬ সালের ১৬ আগস্ট হাইকোর্ট কয়েক দফা নির্দেশনাসহ রায় দেন। তখন নদীটির তীরে ২ হাজার ১৮১টি অবৈধ স্থাপনা ছিল। রায়ে চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর তীরে থাকা অবৈধ স্থাপনা সরাতে ৯০ দিন সময় দেওয়া হয়েছিল। রায় হাতে পাওয়ার সাত দিনের মধ্যে স্থানীয় পত্রিকায় নোটিশ দিতে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সচিব, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ছাড়া এসব স্থাপনা অপসারণ করতে পরিবেশ অধিদপ্তরকেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলে বিষয়টি সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। সর্বোচ্চ আদালত ২০১৯ সালে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন। রায়ে দুই হাজার ১৮১টি অবৈধ স্থাপনা সরাতে ৯০ দিনের সময় দেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় জেলা প্রশাসন ২০১৯ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি প্রথম ধাপে ২৩০টি স্থাপনা উচ্ছেদ এবং ১০ একর ভূমি উদ্ধার করে। কিন্তু বাকি অবৈধ স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ এবং দখলদারদের কবল থেকে নদী উদ্ধার সম্ভব হয়নি। অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত হলেও উচ্ছেদ অভিযান নানাভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

এদিকে ফিরিঙ্গিবাজার থেকে নতুন মাছবাজার, ভেড়া মার্কেট থেকে বাকলিয়া চরের মোড় পর্যন্ত এক হাজারের বেশি অবৈধ স্থাপনা আছে। এসব স্থাপনা উচ্ছেদে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২০১৯ সালের ২০ ডিসেম্বর নোটিশ প্রদান করা হয়। নোটিশ দেওয়ার পর দীর্ঘদিন পার হলেও রহস্যজনক কারণে এত দিন উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেনি জেলা প্রশাসন। দখলের কারণে কর্ণফুলী নদী ভরাট হয়েছে, নাব্যতা হারিয়েছে। দখলের পাশাপাশি কর্ণফুলী ব্যাপকভাবে দূষণের শিকার। দূষণে নদীর পানি ও নদীনির্ভর প্রাণবৈচিত্র্য নষ্ট হয়েছে।

২০১৪ সালে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘মাস্টার প্ল্যান ফর চিটাগং পোর্ট’ শীর্ষক জরিপে চাক্তাই খালের মুখে কর্ণফুলী নদীর প্রবহমান ধারা ছিল ৯৩৮ মিটার। রাজাখালী খালের মোহনায় তা ছিল ৮৯৪ মিটার। শাহ আমানত সেতুর নিচে ছিল ৮৬৬ মিটার।

কিন্তু ২০২০ সালের ২১ সেপ্টেম্বর ‘চট্টগ্রাম নদী ও খাল রক্ষা আন্দোলন’ নামের একটি সংগঠন কর্ণফুলী নদীর শাহ আমানত সেতু থেকে ফিরিঙ্গিবাজার মনোহরখালী পর্যন্ত এর প্রস্থ জরিপ করে। বিএস শিট, এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংক, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রণীত কৌশলগত মহাপরিকল্পনা ২০১৪-এর সঙ্গে তুলনা করে এ জরিপ করা হয়। জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৪ সালে কর্ণফুলী নদীর শাহ আমানত সেতুর নিচে প্রবহমান ধারা ছিল ৮৬৬ মিটার প্রস্থ। এখন তা ভাটার সময় দাঁড়িয়েছে ৪১০ মিটারে। জোয়ারের সময় তা ৫১০ মিটার পর্যন্ত পাওয়া গেছে। রাজাখালী খালের মুখে প্রশস্ততা ৪৬১ মিটার পাওয়া গেছে, যা আগে ছিল ৮৯৪ মিটার। চাক্তাই খালের মুখে এখন নদীর প্রশস্ততা ৪৩৬ মিটার, যা আগে ছিল ৯৩৮ মিটার। ফিরিঙ্গিবাজার মোড়ে নদীর প্রস্থ ছিল ৯০৪ মিটার, বন্দর কর্তৃপক্ষ খননের পর সেখানে নদী আছে ৭৫০ মিটার। বাকি অংশ বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজেদের ইচ্ছামতো গাইড ওয়াল নির্মাণ করে চিরতরে বিলুপ্ত করে দিয়েছে।

জরিপ প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, শাহ আমানত সেতুর উত্তর অংশে ৪৭৬ মিটার নদী ভরাট হয়ে গেছে। ২০১৬ সালে নদী ভরাট করে গড়ে তোলা মাছবাজার, বরফকল, অবৈধ দখল ও ভেড়া মার্কেটের কারণে চাক্তাই খালের মোহনা এলাকায় কর্ণফুলী নদীর প্রবহমান ধারা কমে দাঁড়ায় ৪৬১ মিটারে।

অন্যদিকে চাক্তাই ও রাজাখালী খালের মোহনায় নদী ভরাট করে মাছবাজার গড়ে ওঠায় উজানের চেয়ে ভাটির মোহনা অংশ উঁচু হয়ে গেছে বলে চুয়েট প্রফেসর ড. স্বপন কুমার পালিতের নেতৃত্বে ২০১৮ সালে জরিপে দেখা যায়। যে কারণে চট্টগ্রাম মহানগরীর কোতোয়ালী, বাকলিয়া ও চকবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় সামান্য বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। এদিকে জাহাজের তেল, কর্ণফুলী পেপার মিলের বর্জ্য, সিটি করপোরেশনের আবর্জনা ও কলকারখানার বর্জ্যে কর্ণফুলীর দূষণ বাড়ছে। ২০১৮ সালের এক জরিপে দেখা গেছে, কর্ণফুলীর প্রতিটি শাখা খালের মুখে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ ১ মিলিগ্রামের নিচে। স্বাভাবিকভাবেই এমন পরিস্থিতিতে খালের মুখগুলোতে কোনো প্রাণী বেঁচে থাকতে পারে না। ১৯৮৬ সালের এক জরিপে দেখা গেছে, ৫৯ প্রজাতির মিশ্র মাছ, ৬৫ প্রজাতির স্বাদু পানির মাছ, বিভিন্ন প্রজাতির ১৫ প্রকারের পরিযায়ী মাছ পাওয়া যেত কর্ণফুলীতে। এ গবেষণাকে ভিত্তি করে ২০০৯ সালে কর্ণফুলী নদীর মাছ ও দূষণের ওপর আরেকটি গবেষণা করা হয়। তাতে দেখা যায়, মিশ্র পানির ২৫ প্রজাতির, মিঠা পানির ৩০ প্রজাতির এবং পরিযায়ী প্রজাতির মাছ প্রায় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বর্তমানে টেংরা জাতীয় ফাইস্যা, পোয়া ও কাঁচকি ছাড়া অন্য প্রজাতির মাছ তেমন পাওয়া যায় না।

সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের অর্থনীতির প্রাণপ্রবাহ কর্ণফুলীর সবচেয়ে বড় ক্ষতি করেছে অবৈধ দখল। নদীর উভয় পাড়ে তিন হাজারেরও বেশি স্থাপনা নানাভাবে নদী দখল করেছে। এর পাশাপাশি নদীর পাড় জুড়ে গড়ে ওঠা ৩৯০টি ছোট বড় শিল্প কর্ণফুলীর গলা টিপে ধরছে। দূষণের পাশাপাশি কারখানাগুলো থেকে বিপুল পরিমাণে বর্জ্য নদী দূষণ করছে। এতে নদীর গভীরতা কমেছে। কমেছে প্রস্থও। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ মালয়েশিয়ান একটি কোম্পানির মাধ্যমে নদী ড্রেজিং করতে গিয়েও নদী ভরাট করেছে। নদীর মাটি বিক্রি করার জন্য মালয়েশিয়ান ওই কোম্পানির স্থানীয় এজেন্ট নদীর উভয় পাড় এমনভাবে ভরাট করেছে যাতে দেশের অর্থনীতির এই প্রাণপ্রবাহের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়েছে। শহরের বর্জ্যও পড়ছে এই নদীতে। এতে নদীর তলদেশে ২০ থেকে ২৫ ফুটের পলিথিনের স্তর জমেছে। নদীর পানি ধারণ ক্ষমতা অনেক কমে গেছে। নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে যাওয়ায় জোয়ারের পানি নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত করছে। কর্ণফুলীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ায় চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার উপর মারাত্মক রকমের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এভাবে চলতে থাকলে কর্ণফুলী স্বাভাবিক নাব্যতা হারিয়ে ফেলবে। দেশের আমদানি রপ্তানি বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, শহরের সব বর্জ্য নানা পথ ঘুরে কর্ণফুলীতে গিয়ে পড়ছে। কিন্তু ঠিকভাবে নদী ড্রেজিং হয়নি। প্রতি দশ বছর অন্তর কর্ণফুলী নদীতে ক্যাপিটাল ড্রেজিং পরিচালনার জন্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ থাকলেও তাও হয়নি। গত দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে ক্যাপিটাল ড্রেজিং এর নামে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে নানা ঝক্কিঝামেলা মোকাবেলা করতে হচ্ছে। বর্তমানে ক্যাপিটাল ড্রেজিং এর একটি প্রকল্পের কাজ চললেও পলিথিন বিপত্তিতে পড়ে পুরো প্রকল্পটি হুমকির মুখে রয়েছে। কর্ণফুলীর তলদেশের পলিথিনের পাহাড় সরাতে গিয়ে চীনা ড্রেজারের স্বাভাবিক কার্যক্রম বহুবার ব্যাহত হয়েছে। নতুন করে গ্রেভ দিয়ে পলিথিন তোলার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। ‘সদরঘাট টু বাকলিয়ার চর ড্রেজিং’ নামের এই প্রকল্পের আওতায় কর্ণফুলীর তলদেশ থেকে ৫১ লাখ ঘনমিটার মাটি ও বালি উত্তোলনের কাজ চলছে। কিন্তু পলিথিনের কারণে কাজটি পদে পদে এতভাবে ব্যাহত হয়েছে যে, একদিকে মাটি তোলা শুরু হলে অন্যদিকে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এতে করে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ড্রেজিং এর শতভাগ সুফল মিলছে না। অন্যদিকে কর্ণফুলীর পাড়ে ৩৯০টি ছোট বড় কারখানা থাকলেও এগুলোর অধিকাংশটিতে কোন ইটিপি নেই। কারখানাগুলোতে ইটিপি স্থাপনের একটি প্রস্তাবনা রয়েছে, কিন্তু তা কার্যকর করা হয়নি। ইটিপি স্থাপন নিয়ে নানাভাবে চাঁদাবাজি এবং দুর্নীতিরও অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে কর্ণফুলী নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা অবৈধ ইটভাটাটি আট বছরেও উচ্ছেদ হয়নি। বিধি মোতাবেক সিটি কর্পোরেশন এলাকার তিন কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা নির্মাণের নিয়ম নেই। তবে অনেকটা প্রভাব খাটিয়ে গড়ে তোলা ইটভাটাটি উচ্ছেদে কার্যকর ভূমিকাও নেই প্রশাসনের। শাহ আমানত সেতু লাগোয়া ওই ইটভাটার কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও এটিকে কেন্দ্র করে নতুন নতুন স্থাপনা গড়ে তুলছে দুষ্কৃতকারীরা।

জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দরের অর্থায়নে প্রায় ২৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে কর্ণফুলী নদীর ‘ক্যাপিটাল ড্রেজিং অ্যান্ড ব্যাংক প্রটেকশন’ প্রকল্পের কাজ পায় আন্তর্জাতিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মালয়েশিয়ান মেরিটাইম অ্যান্ড ড্রেজিং কর্পোরেশন। প্যাসিফিক মেরিন সার্ভিস নামের স্থানীয় এজেন্ট ২০১১ সালের মাঝামাঝি সময়ে ওই প্রকল্পের কাজ শুরু করে। ওই সময় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় এজেন্ট ড্রেজিং কাজের পাশাপাশি কর্ণফুলীর পাড়ে গড়ে তুলে ইটভাটাটি। পরে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ইটভাটাটির উচ্ছেদ প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়ে।

এদিকে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন সম্প্রতি ১৫ দিনের মধ্যে কর্ণফুলীর মোহনাসহ নদীতীরের অবৈধ দখল উচ্ছেদের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণপূর্বক প্রতিবেদন দিতে বলেছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক (আহ্বায়ক, চট্টগ্রাম জেলা নদী রক্ষা কমিটি), চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, চট্টগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলীকে চিঠি দিয়ে এ প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে। ‘কর্ণফুলী নদী দখল করে গড়ে ওঠা মাছবাজার ও মেরিনার্স পার্কের নামে বালুমহালসহ অন্যান্য অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের আবেদন’ শিরোনামে বাংলাদেশ নদী রক্ষা কমিশন গত ২৮ আগস্ট ওই চিঠি দেয়। চিঠিতে স্বাক্ষর করেন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সচিব মো. আমিনুল ইসলাম। নদী রক্ষা কমিশনের বেধে দেওয়া ১৫ দিন সময় পার হয়ে গেছে অনেক দিন আগেই। কিন্তু এ চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে কোনো সংস্থার তরফে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ এখনও গ্রহণ করা হয়নি।

গত ১১ অক্টোবর চট্টগ্রাম নদী ও খাল রক্ষা আন্দোলনের এক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, হাইকোর্টের আদেশে জলাশয় সংরক্ষণ আইন ২০০০ এর ধারা ৫ অনুযায়ী, খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান ও প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে চিহ্নিত জায়গার শ্রেণিকর্তন (পরিবর্তন) করা যাবে না। ভাড়া, ইজারা বা অন্য কোনোভাবে হস্তান্তরও করা যাবে না। কিন্তু বিএস ১নং খতিয়ানের ৮৬৫১ দাগ অনুযায়ী কর্ণফুলী নদী জাতীয় মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেডকে ২০১৫ সালে ১৫ বছরের চুক্তিনামা দিয়ে নদী দখল ও ভরাট করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ হাইকোর্টের আদেশ অমান্য করেছে।

চট্টগ্রাম নদী ও খাল রক্ষা আন্দোলনের সংবাদ সম্মেলনে আরও দাবি করা হয়, মাছবাজার ও ভেড়া মার্কেট উচ্ছেদের বিষয়ে হাইকোর্টের আদেশের ৪ নম্বর কলামে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু বন্দর কর্তৃপক্ষ তা তোয়াক্কা না করেই নতুন মাছবাজার চলমান রেখেছে। ২০১৯ সালের আদেশের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন মাছবাজার উচ্ছেদ করা বাধ্যতামূলক ছিল। বন্দর কর্তৃপক্ষ মাছবাজার উচ্ছেদ না করে নতুন করে বরফকল স্থাপনের জন্য কর্ণফুলী নদীর মাঝখানে শাহ আমানত ব্রিজের মাঝপিলার বরাবর ২০০০ স্কয়ার ফিট নদী নতুন করে লিজ দিয়েছে। যা সরাসরি মহামান্য হাইকোর্টের আদেশের লঙ্ঘন।

চট্টগ্রাম নদী ও খাল রক্ষা আন্দোলনের নেতারা আরও বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী কর্ণফুলী নদীতে স্থাপিত মাছবাজার ও বরফ কলের চুক্তি বাতিল করতে গত ৩০ সেপ্টেম্বর বন্দর চেয়ারম্যান বরাবর ১০ দিনের সময়সীমা দিয়ে আবেদন করেছিলাম। এ বিষয়ে ১১ অক্টোবর পর্যন্ত বন্দর কর্তৃপক্ষ কোনো সিদ্ধান্ত আমাদের জানায়নি। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, কর্ণফুলী নদীর চাক্তাই ও রাজাখালী খালের মোহনায় জাতীয় মৎস্যজীবী সমবায় সমিতিকে ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর চুক্তির মাধ্যমে সেই জায়গা দেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ। ১৫ বছরের ওই চুক্তির ফলে সে জায়গায় এখন অন্তত ১৮শ’ স্থাপনা গড়ে উঠেছে। ওই মাছবাজারের কারণে কর্ণফুলী নদীর প্রবহমান ধারা প্রায় অর্ধেক কমে গেছে এবং পানির চলমান প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। বন্দর চেয়ারম্যানকে অনতিবিলম্বে ওই চুক্তি বাতিলের আহ্বান জানান চট্টগ্রাম নদী ও খাল রক্ষা আন্দোলন কমিটি।

চট্টগ্রাম নদী ও খাল রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক আলীউর রহমান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বর্জ্যের কারণে নদী দূষিত হচ্ছে, দখলে সংকুচিত হচ্ছে। নদীর নাব্যতা কমে গেছে। বারবার তাগাদা সত্ত্বেও কর্ণফুলীর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ হচ্ছে না। মাছবাজার ও ভেড়া মার্কেট উচ্ছেদের বিষয়ে হাইকোর্টের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু বন্দর কর্তৃপক্ষ তার তোয়াক্কা না করেই নতুন মাছবাজার চলমান রেখেছে। এছাড়া ১৫ বছরের চুক্তিনামা দিয়ে কর্ণফুলী নদী দখল ও ভরাট করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ মহামান্য হাইকোর্টের আদেশ অমান্য করেছে। ২০১৯ সালের আদেশের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন মাছবাজার উচ্ছেদ করা বাধ্যতামূলক ছিল। বন্দর কর্তৃপক্ষ মাছবাজার উচ্ছেদ না করে নতুন করে বরফকল স্থাপনের জন্য কর্ণফুলী নদীর মাঝখানে শাহ আমানত ব্রিজের মাঝপিলার বরাবর ২ হাজার স্কয়ার ফিট নদী নতুন করে লিজ দিয়েছে।’

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের উপব্যবস্থাপক (ভূমি) জিল্লুর রহমান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বন্দর কর্তৃপক্ষের অধীনে যেসব অবৈধ স্থাপনা আছে সব উচ্ছেদ করা হয়েছে। হাইকোর্ট থেকে যে উচ্ছেদের তালিকা দেওয়া হয়েছে সেই তালিকায় মাছবাজার নেই, তাই তাদেরকে উচ্ছেদ করা যাবে না। এখন যেগুলো উচ্ছেদের বাকি আছে তা করবে জেলা প্রশাসন।’

কর্ণফুলী তীরের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের বিষয়ে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘স্বার্থান্বেষী মহল নামে বেনামে দখল করে কর্ণফুলীর প্রবাহমান ধারাকে সংকুচিত করে নিয়ে এসেছে। দেশের অর্থনীতির স্বার্থে এবং পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে কর্ণফুলী নদীর তীরে আগেও আমরা অভিযান চালিয়েছি। কর্ণফুলী নদীর দুই তীরে অবৈধ দখলদার যারা আছেন, ভূমিদস্যু যারা আছেন, তারা যত বড় স্থাপনাই করেন না কেন, কোন অবৈধ স্থাপনা আমরা রাখবো না। ফের বড় পরিসরে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ শুরু হবে।’ কর্ণফুলী রক্ষায় সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান তিনি।