বুধবার, ১৮ মে ২০২২, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

সীতাকুণ্ডে সরকারি টাকার হিসাব দিতে পারছেন না কর্মচারী

প্রকাশিতঃ বুধবার, নভেম্বর ২৪, ২০২১, ৯:০৩ পূর্বাহ্ণ


এম কে মনির, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) : সরকারি ১৮টি খাতের টাকা ও নথিপত্রের হিসাব চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক তেজেন্দ্র কুমার দেবনাথ দিতে পারছেন না; এ কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন খাতের ব্যাংক হিসাব যথাযথ সংরক্ষণ ও সময়মতো উপস্থাপন না করার অভিযোগও আছে।

এর আগে গত ২৭ জুলাই সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে তেজেন্দ্র কুমার দেবনাথকে চিঠি দিয়ে সরকারি ১৮টি খাতের নথিপত্রাদি, বিল, ভাউচার, ক্যাশ বহি, ব্যাংক বহি হালনাগাদ করে ১০ অক্টোবরের মধ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর উপস্থাপন করতে বলা হয়। তবে উক্ত সময়ের মধ্যে তিনি এসব নথিপত্র উপস্থাপন করেননি।

এরপর গত ১৬ নভেম্বর তেজেন্দ্র কুমার দেবনাথকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন সীতাকুণ্ডের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাহাদাত হোসেন। ওই নোটিশে পত্রপ্রাপ্তির ৩ কর্মদিবসের মধ্যে যথাযথ ব্যাখ্যা প্রদানের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়। তবে এখনও তিনি যথাযথ হিসাব উপস্থাপন করতে পারেননি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে ইস্যুকৃত ওই নোটিশে যে ১৮টি খাতের হিসাব দিতে বলা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে- উপজেলার রাজস্ব তহবিল, উপজেলা পরিষদের সরকারি কোয়ার্টার বরাদ্দ ও বাসা ভাড়া আদায় রেজিষ্টার, উপজেলা উন্নয়ন তহবিল, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, সদস্য/সদস্যাদের বেতন ভাতা, দফাদার/ মহল্লাদারদের বেতন ভাতা সংক্রান্ত চলতি হিসাব, উপজেলা সুপার মার্কেট, উপজেলা মহিলা মার্কেট, মুক্তিযোদ্ধা ওয়েলফেয়ার তহবিল, উপজেলা হাটবাজার ইজারা তহবিল সোনালী ব্যাংক ও এবি ব্যাংক হিসাব।

বাকি খাত গুলোর মধ্যে আছে- বাংলা সনের ১৪২৫-১৪২৮ এর হাটবাজার ইজারার অর্থ, ভ্যাট, আয়কর আদায়সহ সরকারি কোষাগারে জমা টি আর চালান ও ব্যাংক জমা রশিদ, বিবিধ খাতের চলতি হিসাব সোনালী ব্যাংক, মোবাইল কোর্ট রেজিষ্টার, জরিমানা আদায়, সরকারি কোষাগারে জমা টি আর চালান রেজিষ্টার, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও অন্যান্য মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দকৃত ও ব্যয়িত অর্থের বিল, ভাউচার ও রেজিষ্টার, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সমতল ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ বছর ভিত্তিক বরাদ্দকৃত ও ব্যয়িত অর্থের বিল, ভাউচার ও রেজিষ্টার, উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার ক্যাশ/ব্যাংক বহি, উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির ক্যাশ/ব্যাংক বহি, সাটিফিকেট মামলা রেজিষ্টার অনুযায়ী বছর ভিত্তিক মামলাসমূহের তালিকা প্রস্তুতকরণ।

অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর তেজেন্দ্র কুমার দেবনাথকে দেয়া উক্ত নোটিশের অনুলিপি জেলা প্রশাসক ও সীতাকুণ্ড উপজেলা চেয়ারম্যান বরাবর প্রেরণ করা হয়েছে।

এদিকে একই তারিখে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে কার্যালয়ের কম্পিউটার অপারেটর সামশুল আরেফিনকে এক অফিস আদেশে ৬টি খাতের দাপ্তরিক কাজগুলো যথাসময়ে সম্পন্ন ও দ্রুত নিষ্পত্তি করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর উপস্থাপন করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

এ অফিস আদেশে উল্লেখিত খাতের কাজসমূহ হলো, পত্রজারী ও পত্র নিবন্ধন রেজিষ্টার, বীর মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক যাবতীয় কার্যক্রম, মোবাইল কোর্ট রেজিষ্টার, জরিমানা আদায় ও সরকারি কোষাগারে জমা টি আর চালান রেজিষ্টার, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও অন্যান্য মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দকৃত ও ব্যয়িত অর্থের বিল, ভাউচার ও স্টক রেজিষ্টার, গার্ড ফাইল রেজিষ্টার, উপজেলা সুপার মার্কেট বরাদ্দ সোনালী ব্যাংক হিসাব সীতাকুণ্ড শাখা ক্যাশ/ব্যাংক বহি, দোকান ভিত্তিক নথিপত্র রেজিষ্টার, উপজেলা মহিলা মার্কেট বরাদ্দ চলতি হিসাব এবি ব্যাংক সীতাকুণ্ড শাখা ক্যাশ/ ব্যাংক বহি ও দোকান ভিত্তিক নথিপত্র রেজিষ্টার।

ওই আদেশের অনুলিপিও চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ও উপজেলা চেয়ারম্যান বরাবর প্রেরণ করা হয়েছে।

উক্ত আদেশে সামশুল আরেফিনকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রেকর্ডপত্র গ্রহণপূর্বক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর উপস্থাপন করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর তেজেন্দ্র কুমার দেবনাথকে ২০ নভেম্বরের মধ্যে উল্লেখিত রেকর্ডপত্রাদি হস্তান্তর করে উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে অবহিত করার নির্দেশ দেয়া হয়। যার অনুলিপি উপজেলার প্রশাসনিক কর্মকর্তা অনিল কান্তি বড়ুয়াসহ উভয় অফিস সহকারীকে প্রেরণ করা হয়।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘তেজেন্দ্র বাবুর অনিয়মের শেষ নেই। তিনিই যেন উপজেলার সর্বেসর্বা। তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হলেও ভাবসাবে তিনি প্রথম শ্রেণি। গেল আম মৌসুমে উপজেলা পরিষদের মসজিদের সামনের আম গাছের সব আম তিনি রাতের অন্ধকারে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যান। শুধু তাই নয় সুযোগ বুঝে সরকারি পুকুরের মাছ আত্মসাৎ করতেও দ্বিধা করেন না।’

শুধু মাছ-গাছ নয় উপজেলা পরিষদের পুকুর পাড়ে ঝড়-ঝাপটায় উপড়ে পড়া দুটি কড়ই গাছ বিক্রি করে দেয়ার অভিযোগ ওঠেছে তেজেন্দ্র কুমার দেবনাথের বিরুদ্ধে। এছাড়াও কোরবানি ঈদের আগে উপজেলার বিভিন্ন হাটবাজার ইজারদারদের কাছ থেকে দরখাস্ত জমা ও ইজারা নেয়ার পর ১ থেকে ২ হাজার টাকা আদায় করার অভিযোগও উঠে এ কর্মচারীর বিরুদ্ধে। যদিও সেসময় তিনি মৎস্য ও ফল আত্মসাৎ এবং ইজারাদারদের কাছ থেকে টাকা দাবির অভিযোগ অস্বীকার করেন।

টাকার হিসাব না দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে মঙ্গলবার অফিস সহকারী তেজেন্দ্র কুমার দেবনাথ একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘এখানে অর্থ নয়ছয়ের কোন ঘটনা ঘটেনি। শুধুমাত্র যথাযথ সময়ে ভাউচারগুলো তালিকাভুক্ত করা হয়নি। আমি ইউএনও স্যারের কাছ থেকে সময় নিয়েছি। তিনি আমাকে সময় দিয়েছেন। আমি একা হওয়ায় সবকাজ গোছাতে পারিনি। আমি স্যারকে কয়েকবার বলেছিলাম জনবল বাড়াতে। আসলে একজন দিয়ে এতোকিছু করা সম্ভব নয়।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. শাহাদাত হোসেন মঙ্গলবার একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘এটি অফিসের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আমি ওনাকে ফাইলগুলো আমাকে বুঝিয়ে দিতে বলেছি। এখানে আর কিছু নেই।’