শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

বোন-ভাগনের জীবন বাঁচাতে যুক্তরাজ্যে ওয়েটার ছিলেন উপসচিব

| প্রকাশিতঃ ১ ডিসেম্বর ২০২১ | ১১:৩৯ অপরাহ্ন


আজাদ তালুকদার : মরণব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত বোন ও বোনের ৭ বছরের একমাত্র ছেলেকে বাঁচাতে বিদেশে পড়ার নাম করে রেস্টুরেন্টে চাকরি করতে গিয়েছিলেন চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (উপসচিব) শাব্বির ইকবাল। সংশ্লিষ্ট বাছাইপর্বে উত্তীর্ণ হয়ে সরকারের প্রণোদনায় যুক্তরাজ্যে পড়তে গেলেও সবকিছুর মূলে ছিল বোন ও ভাগনের ‘জীবনরক্ষা’র সর্বাত্মক চেষ্টা। বাংলাদেশ ও ভারতে সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যাওয়ার পর থমকে গিয়েছিল দুটি প্রাণ, থেমে গিয়েছিল অর্থসংস্থানের সমস্ত চাকা।

নিভু নিভু ‘জীবন-সময়’র করুণতম এক অধ্যায়ের মুখোমুখি হয়ে শাব্বির ইকবাল পড়ার নাম করে অবশেষে ছুটলেন যুক্তরাজ্যে। পড়ালেখার ফাঁকে যুক্তরাজ্যের রেস্টুরেন্টে কাজ করেছেন ওয়েটারের। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র ২ ঘণ্টা ঘুমিয়ে বাকি সময়টুকু দিয়েছেন নিরন্তর পড়াশোনা আর রেস্টুরেন্টের কাজে। অন্তর্গত রক্তক্ষরণের পাশাপাশি অনবরত ঘাম ঝরিয়েছেন, আরামকে হারাম করেছেন। অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন কেবল দুটি প্রাণ বাঁচাবেন বলে। সমস্ত চ্যালেঞ্জ তিনি উতরে গেছেন দৃঢ় প্রত্যয় আর অমানুষিক, অমানবিক পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে। কিন্তু বোন আর ভাগনে- কাউকেই শেষপর্যন্ত বাঁচাতে পারলেন না। এই কষ্ট অনুক্ষণ তিনি বয়ে বেড়ান, বয়ে বেড়াবেন আজীবন।

মঙ্গলবার (৩০ নভেম্বর) সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের অফিস-কক্ষে অনির্ধারিত এক আলোচনায় একুশে পত্রিকাকে এই কষ্ট আর রক্তক্ষরণের কথা শুনিয়েছেন প্রজাতন্ত্রের অনন্য জীবনবোধ আর চিন্তার মানুষ শাব্বির ইকবাল সুমন। বলতে বলতে এক পর্যায়ে কষ্টের ঝাঁপিই খুলে দিলেন। করুণতম নস্টালজিয়ায় হারিয়ে গেলেন মানুষটি।

২০১৩ সালে প্রথম ব্রেস্ট ক্যান্সার ধরা পড়ে স্কুল-শিক্ষিকা বড়বোন সায়েরা বেগম শিউলির। তখন ভাই শাব্বির ইকবাল বাঁশখালীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। নীতি-নৈতিকতা ও ইস্পাতকঠিন সততায় গড়ে উঠা শাব্বির ইকবাল সর্বোচ্চ-সর্বস্ব দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন বোনের জীবনরক্ষায়। বেতনের সবটুকু দিয়ে দেশেই নিয়মিত চিকিৎসা চালানোর পাশাপাশি দু’দুবার ভেলোরের সিএমসিতে পাঠান ১০ লাখ টাকা খরচ করে। কিন্তু কিছুতেই উন্নতির দেখা মিলছিল না। বরং চিকিৎসা-খরচ বাড়ছিল দিনকে দিন। ২০১৭ সাল থেকে প্রতিমাসে বোনের চিকিৎসায় খরচ হতে থাকল দেড় লাখ টাকা। এই পরিস্থিতিতেও সততার পরাকাষ্ঠা ভাঙেননি শাব্বির ইকবাল। কারো দয়া-দাক্ষিণ্য ছাড়া চিকিৎসাব্যয় নির্বাহে গলদঘর্ম হচ্ছিলেন বটে; কিন্তু মুষড়ে পড়েননি, হতাশ হননি।

বরং বোনের জীবনরক্ষার কঠিন যুদ্ধে আরও বেশি মনোনিবেশ করলেন। আর তখনই নিদারুণ নির্মমতায় সামনে হাজির হল ভয়াবহ দুঃসংবাদটি–ক্যান্সার-আক্রান্ত বোনের একমাত্র ছেলে মেরনসান স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ফার্স্টবয় সাদমান (৭) ব্রেন টিউমারেই আক্রান্ত শুধু নয়, সেই টিউমারে ভয়াবহ ক্যান্সার বসত গড়েছে। এ যেন আরেক নতুন যুদ্ধ, যে যুদ্ধের ফল যুদ্ধ শুরুর আগেই জানান দিচ্ছে বারবার।

ফুরফুরে, মেধাবী, সপ্রতিভ ভাগিনার শরীরে জীবনসংহারী রোগ, আর সেই রোগের ভয়াবহতায় এবার সত্যি সত্যি বিচলিত, উৎকণ্ঠিত শাব্বির ইকবাল। বোনের চিকিৎসায় এরমধ্যেই ফতুর। দেনা করার মানুষও নন তিনি। তাই বলে থেমে যাবে অন্তপ্রাণ শিশুটির দাপুটে বাড়বাড়ন্ত, এতটুকুতেই থমকে যাবে জীবন?

না, তা হয় না। হতে পারে না। বোনের পাশাপাশি আদুরে ভাগনের জীবনরক্ষায় কোমর বেঁধে নামলেন শাব্বির ইকবাল। ৫ লাখ টাকা খরচ করে পাঠালেন ভেলোরে, ক্যান্সার হাসপাতালে। চিকিৎসকরা বললেন, এই টিউমার অপারেশন তো দূরঅস্ত, সুঁই ঢুকিয়ে ডায়াগনোসিস করাও রীতিমতো ঝুঁকিপূর্ণ। দেশে ফিরে এলো সাদমান। বোন-ভাগনে দুজনেই জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। মনকে কোনোভাবেই প্রবোধ দেওয়া যায় না। শাব্বির ইকবালের কেবল মন পুড়ে, আর মনে পড়ে তুমুল অনিশ্চিত ভাবনা-ভবিষ্যৎ। ফের গা-ঝাড়া দিলেন, যেভাবেই হোক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সর্বোচ্চ চেষ্টাটা চালিয়ে যাবেন। এক্ষেত্রে অন্তরায় শুধু অর্থ।

শূন্য থেকে সৎ, বিলাসব্যসনহীন জীবনে অভ্যস্ত শাব্বির ইকবাল চাকরিজীবনে একবারও ভাবেননি সরকারি সুযোগ-সুবিধায় বিদেশে পড়তে যাবেন। ইচ্ছে করলেও বয়সসীমার ব্যারিয়ার মেনে আরও আগে সেই সুযোগটি নিতে পারতেন। অর্থাৎ ৪০-৪২ বয়সসীমার মধ্যেই সরকারি খরচে কেবল বাইরে পড়তে যাবার সুযোগ থাকে। ২০১৮ সালে সরকার বয়সের ব্যারিয়ার তুলে দিয়ে নতুন নিয়ম করলো ৪৫ বছর বয়সী ক্যাডার-কর্মকর্তারা বিদেশে পড়তে যেতে পারবেন। শাব্বির ইকবালের বয়স তখন ৪৪-এর একটু বেশি। কর্মস্থল চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের সচিব। বাছাইপর্বে সিলেক্ট হতে পারলে সরকার থেকে একবছর মেয়াদি পড়াশোনা ও থাকা-খাওয়ার জন্য ৩৫ লাখ টাকা পাবেন। উদ্দেশ্য মূলত সেই টাকা থেকে বোন-ভাগনের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। ২০১৮ সালের মে মাসে নিয়ম মেনে আবেদনটা করেই ফেললেন। কয়েকশ’ আবেদনকারীর মধ্যে মেধা বিবেচনায় সংস্থাপন মন্ত্রণালয় ২০১৮ সালের জন্য যে ৬০ জন কর্মকর্তার নাম বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য ঘোষণা করলেন তাদের একজন শাব্বির ইকবাল।

বলাবাহুল্য, বিশ্বসেরা চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য মনোনীত হয়েছিলেন শাব্বির ইকবাল। এগুলো হলো-কানাডার ওন্টারিও ইউনিভার্সিটিতে (বিশ্ব র‌্যাংকিং ৩৪) সাসটেনবল ডেভেলপমেন্ট বিষয়ে, সাসেক্স ইউনিভার্সিটিতে (বিশ্ব র‌্যাংকিং ১৩৮ ও সাসনেটনেবল ডেভেলপমেন্ট বিষয়ে বিশ্ব র‌্যাংকিং ১, যা আমেরিকার হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়েরও শীর্ষে) সাসটেনেবল ডেভেলপমেন্ট বিষয়ে, ইউনিভার্সিটি অব ডাবলিনে (বিশ্ব র‌্যাংকিং ১৭৫) পাবলিক পলিসি বিষয়ে ও যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব রেডিংয়ে (বিশ্ব র‌্যাংকিং ২১৩) পাবলিক পলিসিতে। শাব্বির ইকবাল বেছে নিলেন সবচেয়ে কম খরচ হবে যে বিশ্ববিদ্যালয়ে, যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব রেডিং। রেডিং ইংল্যান্ডের দক্ষিণ-পূর্বভাগের ঐতিহাসিক বার্কশার কাউন্টির একটি শহর। এটি যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডন থেকে প্রায় ৬১ কিলোমিটার পশ্চিমে, টেমস নদী ও উপনদী কেনেট-এর সঙ্গমস্থলে অবস্থিত। ১৮৯২ সালে এখানে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সম্পর্কিত একটি মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯২৬ সালে এটি স্বাধীন রেডিং বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষি, উদ্যানবিদ্যা ও দুগ্ধজাত দ্রব্য উৎপাদনের উপর বিশেষ গবেষণা সম্পাদন করা হয়।

যাই হোক, এরমধ্যে উপসচিব হিসেবেও পদোন্নতি পান শাব্বির ইকবাল। সব প্রস্তুতি শেষে বিমানে উঠার আগে সরকার থেকে পাওয়া ৩৫ লাখ টাকার মধ্যে ১০ লাখ টাকা, সেই সাথে একবছর বেতনের সমুদয় অর্থের অগ্রিম চেক বোন-ভাগনের চিকিৎসার জন্য লিখে দিলেন শুধু নয়, তাদের গাইডার হিসেবেও লোক নিয়োজিত করে গেলেন।

যাওয়ার আগে প্রশাসন ক্যাডার, একই ব্যাচের বন্ধু চট্টগ্রামের তৎকালীন এডিএম মাসুদের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। একইভাবে বিদেশে পড়াশোনার অভিজ্ঞতাটা আরও আগে অর্জন করে নিয়েছেন বন্ধু মাসুদ। অভিজ্ঞতা গ্রহণ করতে গিয়ে বন্ধুকে জানালেন পড়াশোনা মূল নয়, রেস্টুরেন্টে ওয়েটারের চাকরি করে অর্থ রোজগার করে বোন-ভাগনের চিকিৎসার অর্থসংস্থানই বিদেশযাত্রার প্রকৃত উদ্দেশ্য।

শাব্বির ইকবালের এমন কথায় একগাল হাসলেন বন্ধু। ওমা কী বলে বন্ধু! মনে মনে হয়তো পাগলও ভাবলেন। তারপর টিপ্পনি কেটে বললেন, ‘শোন্, চাকরি দূরের কথা; রাতদিন পড়েও শুধু পাশমার্কস পেতে তোর লাল সুতা বের হয়ে যাবে। আর যুক্তরাজ্যের রেস্টুরেন্টে ওয়েটারের চাকরি ধরে রাখা এত সহজ? সেখানকার রেস্টুরেন্টের ভিআইপি কাস্টমারদের সন্তুষ্ট রেখে ওয়েটারের চাকরি ধরে রাখা সপ্তমাশ্চর্যের চেয়েও কঠিন। তখন তোর … দিয়ে কালো সুতা বের হবে। দেখা গেল- আমও যাবে, ছালাও যাবে। নিশ্চিত একূল-ওকূল দুকূল হারাবি তখন।’

বন্ধুর কথায় কিছুটা মন খারাপ হলেও অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার পণ-প্রতিজ্ঞায় স্ত্রী সানজিনা চৌধুরী ও দুই শিশুকন্যাকে (একজনের বয়স ২, আরেক জনের ১) নিয়ে ২০১৮ সালের ১৫ অক্টোবর বিমানে চড়লেন শাব্বির ইকবাল। পৌঁছেই বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে অপেক্ষাকৃত কম টাকায় একটি বাসা ভাড়া নিলেন। সেই বাসায় কোনো আসবাবপত্র নেই, নেই সাজসজ্জার ছোঁয়া। এরপর দুদিনের মধ্যে ব্যাংক হিসাব খুললেন, আনুষঙ্গিক কাগজপত্র প্রস্তুত করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ক্লাশ শুরু করে দিলেন। ৫ দিনের মাথায় যোগ দেন শহরের সবচেয়ে অভিজাত রেস্টুরেন্ট ‘রিবার স্পাইস’-এ। কাজ নিলেন ওয়েটারের। ওয়েটারের কাজ বলতে আমরা বুঝি, কাস্টমারকে অভ্যর্থনা জানানো ও টেবিল বাছাইয়ে সাহায্য করা; কাস্টমারকে খাবারের মেন্যু দেওয়া; মেন্যু সম্পর্কে কাস্টমারের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া; ঠিকভাবে খাবারের অর্ডার নেওয়া ও কিচেনে জানানো; খাবার তৈরি হয়ে গেলে কাস্টমারদের কাছে পরিবেশন করা; কাস্টমারের কোনো অসুবিধা হলে সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া; কাস্টমারকে বিল/রিসিট দেওয়া; খাবারের টেবিল পরিষ্কার ও সুন্দর রাখা।

টেমস নদীর তীরে অবস্থিত শাব্বির ইকবালের কাজ নেওয়া রেস্টুরেন্টটির আছে নানা কিংবদন্তি। শহরের অভিজাত, ভিআইপিরাই মূলত এর কাস্টমার। কাস্টমারদের রুচি, চাহিদা, মেজাজ বুঝতে না পারার ফলে সেখানে চাকরি পাওয়া যায় বটে, কিন্তু হারাতে সময় লাগে না। মজার ব্যাপার হলো, প্রতিদিনই চাকরি হারানোর শঙ্কায় থাকা শাব্বির ইকবাল টানা প্রায় ১ বছরই চাকরি করে গেছেন সেখানে। চাকরি হারানোর পরিবর্তে বিদায়বেলায় উল্টো তাকেই ছাড়তে চায়নি রেস্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষ।

এ প্রসঙ্গে শাব্বির ইকবাল বললেন, ‘শুরুতে সাতদিন কাজ করে বাংলাদেশি ২৫ হাজার টাকা হাতে পেয়ে মনে হলো আমি আলেকজান্ডার হয়ে যাবো। সেই যে টাকা কামানোর চাকা, নানা শঙ্কা, কঠোর পরিশ্রম আর ব্যালেন্সিংয়ের মাধ্যমে সেই চাকা সচল রাখতে সমস্ত সুখ, বিলাসব্যসন বর্জন করেছি। আরামের ঘুম হারাম করেছি।’

বলেন, বিকেল ৫টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত ওয়েটারের চাকরি শেষ করে বাসায় এসে ঘুমানোর পরিবর্তে মেঝেতে বসে দেওয়ালে পিট ঠেকিয়ে কোলে কম্পিউটার নিয়ে বসতাম। রাজ্যের সমস্ত মানুষ যখন নিদ্রাদেবীর কোলে, আমি তখন এক বসাতেই পড়তে পড়তে রাত পার করি। এভাবে সকাল ৬টা পর্যন্ত পড়াশোনায় একটানা নিমগ্ন থাকার পর ঘুমাতে যেতাম। সকাল ৮টা পর্যন্ত দুই ঘণ্টা ঘুমিয়ে গোসল, নাশতা সেরে ৯টার মধ্যে ক্লাশে হাজির হতাম। মাঝে অল্প সময়ের বিরতি ছাড়া ৯টা থেকে ৫টা পর্যন্ত জগতের কঠিন সব পড়াশোনার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা; রীতিমতো এক যুদ্ধ। সেই যুদ্ধ শেষে সরাসরি চলে যেতাম রেস্টুরেন্টে। রেস্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষ ও ভিআইপি কাস্টমারদের মন জুগিয়ে চাকরি রক্ষার যুদ্ধটাও কোনো অংশে কম ছিল না। – বলেন শাব্বির ইকবাল।

শাব্বির ইকবাল বলেন, সেখানকার পড়াশোনা এতটাই কঠিন ছিল যে মাত্র ‘একরাত’ না পড়লে আমাকে অনেক পিছিয়ে যেতে হবে, পড়াশোনাবিহীন একরাতের ক্ষত-ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া ছিল অসম্ভব কঠিন এক ব্যাপার। তাই সৃষ্টিকর্তার কাছে মিনতি জানাতাম, তিনি যেন যুক্তরাজ্যের কঠিন সময়গুলোতে আমাকে এক সেকেন্ডের জন্যও অসুস্থ, আনফিট করে না তুলেন।

তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে না পড়ে পাশ করা যায়। কিন্তু সেখানে পাশ করতে হলে পড়তে হবে। যে জানবে না, পড়বে না- সে পাশ করতে পারবে না। তারা আপনাকে পড়িয়েই ছাড়বে। পড়ালেখার এক অদৃশ্য বাঁধনে আপনাকে পাগল বানাবে। সেই বাঁধনে আটকা পড়ে গেলে আপনার রেহাই নেই। যদি বাধনমুক্ত হতে চান সেটা অন্য ব্যাপার। তখন সে পড়া বা পাশ আপনার জন্য নয়।’

ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখা কেমনতর কঠিন, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক সে গল্পেরও বর্ণনা দেন ২৪ তম বিসিএস (প্রশাসন) কর্মকর্তা শাব্বির ইকবাল। বলেন, উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেমিস্টার সিস্টেমের কোনো প্রোগ্রামের জন্য সর্বনিম্ন ১২৪ ক্রেডিট আওয়ার এবং ট্রাইমেস্টার সিস্টেমের জন্য ১৪৩ ক্রেডিট আওয়ার নির্ধারণ করা হয়। ১৫০-১৮০ মিনিটের ক্লাস এক ক্রেডিট আওয়ার হিসেবে বিবেচিত হয়। আমি যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম সেখানে ১৮০ ক্রেডিট আওয়ারের পড়াশোনা শেষ করতে হবে একবছরের মধ্যে। রাতদিন পড়েও এই ক্রেডিট আওয়ার সম্পন্ন করা দুরূহ ব্যাপার। চাকরি করি বলে আমার জন্য ব্যাপারটি আরও দুরূহ। আর এই দুরূহ, দুর্ভেদ্য কাজটি আমাকে করতে হয়েছে কঠিন সাধনার মধ্য দিয়ে।

তিনি বলেন, একটা অ্যাসাইনমেন্টের জন্য ৩০-৪০টা বই পড়তে হতো। এখানে ‘আমেরিকা ইজ অ্যা ডেভেলপড কান্ট্রি’ লিখে পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যদি তাই হয় ‘জাস্ট ইউ গট অ্যা লস…।’ আপনাকে বলতে হবে আমেরিকা কেন উন্নত রাষ্ট্র, কোন সূচকে কতটা এগিয়ে, কেন এগিয়ে। দেশটির একশ’ বছর আগের অবস্থা, এখনকার অবস্থা, ভবিষ্যৎ হাতছানি সবকিছুই আপনাকে পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য-উপাত্ত দিয়ে বিশ্লেষণ করে বুঝিয়ে দিতে হবে। এখানে প্লাগারিজম বা চুরি করেও পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আপনি যদি সামান্যতমও প্লাগারিজমের আশ্রয় নেন, তবে বিশেষ সফটওয়্যার ব্যবহার করে তারা সেটি ধরে ফেলবে। যদি ধরতে পারে আপনি নিশ্চিত বহিষ্কার।’- যোগ করেন শাব্বির ইকবাল।

এমনই এক কঠিন বাস্তবতায় একদিকে পড়াশোনা, অন্যদিকে রেস্টুরেন্টের চাকরি করতে করতে লাল সুতা আর কালো সুতার উদ্ধৃতি দেওয়া বন্ধু মাসুদের কথা ভাবতেন শাব্বির ইকবাল। না, একবিন্দুও তো মিথ্যে বলেননি বন্ধু। বস্তুত এই নির্মম, কঠিন সত্যের উপর দাঁড়িয়েই লাল আর কালো সুতা কোনোটাই যেন বের না হয় সেজন্য কঠিন তপস্যাকে বেছে নিয়েছিলেন তিনি।

সেই তপস্যায় তিনি সফল হলেন। চূড়ান্ত পরীক্ষায় শাব্বির ইকবাল অর্জন করেন ফার্স্ট উইথ মেরিট। মাইক্রো ইকোনোমিক্সে পেয়েছিলেন একশতে একশ নম্বর। গড়ে ৬২ শতাংশ মার্কস পেয়ে কৃতিত্বপূর্ণ এই ফলাফল করে বিশ্ববিদ্যালয়ে রীতিমতো তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। বাংলাদেশ থেকে যাওয়া তার দুই সহপাঠীর একজন এভারেজে ৪৫ পাশমার্কস পেয়ে কোনোরকম উত্তীর্ণ হন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে অকৃতকার্য হন অন্যজন। অথচ রাতদিন পড়ালেখা আর কিছুটা ঘোরাঘুরি ছাড়া আর কিছুই করেননি তারা।

পক্ষান্তরে শাব্বির ইকবাল লক্ষ্যপূরণে নিজেকে নিয়োজিত রাখতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় আর রেস্টুরেন্টে আসা-যাওয়ার বাইরে আর কিছুই ভাবেননি। কোথাও বেড়াতে নিয়ে যেতে পারেননি তিন বছর আগে বিয়ে করা স্ত্রীকে। এক কামরায় আবদ্ধ থাকতে থাকতে মন-প্রাণ বিষিয়ে ওঠা স্ত্রী একদা ফিসফাস করে বেড়ানো প্রসঙ্গে কী যেন বলতে চেয়েছিলেন। জবাবে শাব্বির ইকবাল বলেছিলেন, ‘তুমি তো বাজার করতে যাও, তাই না! সেখানে নিশ্চয়ই মানুষ দেখো। নিত্যনতুন মানুষ দেখার চেয়ে, মানুষ বোঝার চেয়ে মহৎ আর কিছুই নেই।’

শাব্বির ইকবাল বলেন, ‘পড়াশোনা আর কাজের ফাঁকে আমি শুধু মানুষ দেখেছি। মানুষকে জানার চেষ্টা করেছি। একদিন রাত ১২টায় রেস্টুরেন্টের ডিউটি শেষ করে পায়ে হেঁটে বাসায় ফিরছি। আমার দুই হাতে থলেভর্তি বাজার। হঠাৎ ১৯-২০ বছরের এক সুদর্শনা আমার সামনে। পথ আগলে ধরেন তিনি। আমি ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলাম। ভয়ে গলা শুকিয়ে যাওয়ার উপক্রম- না জানি কপালে কী আছে আজ! শঙ্কা আর ঘোরের মাঝে হাত বাড়িয়ে দিলেন তরুণী। বললেন, দুই হাতে দুই থলে বহন করতে গিয়ে তোমার তো কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তোমার এই কষ্ট আমি মানতে পারছি না। প্লিজ, একটা থলে আমাকে বহন করতে দাও- বলেই আমার বাঁ হাতের থলেটা তার হাতে তুলে নিলেন। এরপর হাঁটতে লাগলেন আমাকে অনুসরণ করে। শেষটা দেখার অপেক্ষায় আছি, কিছু শঙ্কা তো আছেই। যখন আমি বাসায় ঢুকব, তখনই আমার হাতে থলেটি তুলে দিয়ে ‘ভালো থেকো, গুডনাইট’ বলে বিদায় নিলেন তরুণীটি। স্ত্রীকে এই উপমা টেনে বলি, এমন মানুষ তুমি কই পাবা আমাকে বলো!

সেখানকার মানুষ আর নির্ঝঞ্ঝাট, পরিপাটি ব্যবস্থাপনার আরেকটি চমৎকার গল্প শোনালেন শাব্বির ইকবাল। বললেন, একেবারে শুরুর দিকের কথা। সেখানে একবছর থাকা ও পড়াশোনার জন্য কিছু সিস্টেম ফলো করতে হয়। সেসবের একটি ব্যাংক একাউন্ট খোলা। বাসার কাছেই একটি ব্যাংকে গিয়ে ডেস্কে বললাম, ‘আমি একটি একাউন্ট খুলতে চাই।’ মুহূর্তের মধ্যে ব্যাংকের প্রধান ব্যক্তিটি আমার কাছে চলে এলেন। কম্পিউটারের পাশে নিয়ে বসালেন। আমাকে কফি খেতে দিলেন। কফিতে চুমুক দিচ্ছি, আর আড্ডাচ্ছলে কথা বলছি। কিছুক্ষণের মধ্যে জানানো হলো ‘ডান’। অর্থাৎ আমার একাউন্ট খোলা হয়ে গেছে। উষ্ণ আতিথেয়তায় বিদায় দেওয়ার সময় তারা আমার হাতে ১০ পাউন্ড তুলে তো দিলেন; দিলেন অনেকগুলো বুকস, পেপারস।’

বিষয়টা আমাকে অবাক করলো এ কারণে যে, একাউন্ট খুলতে আমার কাছ থেকে কোনো কানাকড়ি তো জমা নিলই না, উল্টো আমাকে ১০ পাউন্ড গিফট করল, কফি খাওয়াল, বইপুস্তক দিল, বন্ধুবৎসল আচরণ করল। আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে, মাঝে মাঝে তারা এসএমস পাঠাত আমার কোনো অর্থসহায়তা বা জামানত ছাড়া সহজ শর্তে ঋণ লাগবে কিনা। আপনিই বলুন এমন ‘মানুষগুলো’ দেখার চেয়ে পৃথিবীতে মহোত্তম আর কী দেখার আছে-উল্টো প্রশ্ন করেন শাব্বির ইকবাল।

অদ্ভুত সব গল্প শুনতে শুনতে শাব্বির ইকবালকে এবার জিজ্ঞেস করি যে দুটি প্রাণ বাঁচানোর জন্য যুক্তরাজ্যের রেডিং শহরে ধ্যান করতে গিয়েছিলেন, শেষপর্যন্ত সেই প্রাণ দুটো তো চলেই গেল জানি। তাদের চলে যাওয়াটা কেমন করে?

এবার একটু থেমে গেলেন তিনি। এতক্ষণের হাস্যোজ্জ্বল চেহারাসৌষ্ঠবে চিন্তার রেখা, কষ্টের ভাজ। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, ভাগনেটা আমি যুক্তরাজ্য থাকাকালেই চলে গেল। আর বোনটা! হ্যাঁ আমি ফেরার দুই মাসের মধ্যে সেও চলে গেল না ফেরার দেশে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের সর্বোচ্চ সুলুক সন্ধানে পাওয়া গেল একটি ইনজেকশন। এক লাখ ৭৬ হাজার টাকা দামের সেই ইনজেকশনটি পুশ করার পর কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছিল বোন। এ দৃশ্য দেখে তো মহাখুশি আমরা! যত ইনজেকশন লাগুক, এখন আর সমস্যা হবে না। চেয়েছি বোনটা আমাদের মাঝে আরও কিছুকাল থাকুক। খুশিতে আরও একটা ইনজেকশন কিনে একজনের ফ্রিজে রেখে দিলাম। কিন্তু  আমাদেরকে আর কোনো সুযোগ দিল না সে। ইনজেকশনটা পুশ করার আগের দিন অকস্মাৎ চলে গেল না ফেরার দেশে। বলেই এবার একেবারে থেমে গেলেন। কিছুক্ষণ চুপ থেকে একেবারে নিচু স্বরে বললেন, যুক্তরাজ্যে প্রতিকূল সব যুদ্ধই করেছি বোন, বোনের ছেলের জীবন বাঁচানোর জন্য। কিন্তু শেষপর্যন্ত তাদের কাউকেই বাঁচানো গেল না।’

তাদেরকে উপলক্ষ্য করে উচ্চতর শিক্ষা অর্জনের জন্য আমার বিদেশ যাওয়া। সেই শিক্ষা আমার অর্জন হয়েছে বটে; কিন্তু তাদেরকে ধরে রাখার, বাঁচিয়ে রাখার অর্জনটা আমার হয়নি। আমার জাগতিক সব অর্জন দিয়েও যদি বোন আর ভাগনেকে বাঁচিয়ে রাখার সুযোগ থাকতো- আমি তা-ই করতাম। এখনও কাজের ফাঁকে আমি তাদের খুঁজি, তাদের স্মৃতি বয়ে বেড়াই। বোনের মৃত্যুর পর বোনজামাই অন্যত্র বিয়ে করে সংসার পেতেছেন। আর আমার বোনের একমাত্র আত্মজাকে আমার কাছে নিয়ে এসেছি। এখন তার মাঝেই খুঁজি বোন-ভাগনের স্মৃতি, তাদের প্রতিচ্ছবি।- দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন বোনের জন্য ভাইয়ের যুগপৎ উৎসর্গের অনন্য উপমা শাব্বির ইকবাল।

# সফলতার সাতকাহন : টানা ১০ বছর ঘুমাননি জেলা পরিষদের সচিব!