বৃহস্পতিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৫ ফাল্গুন ১৪২৬

‘এটি খাইলে মনে দুঃখ থাকে না, ক্ষুধাও লাগে না’

প্রকাশিতঃ মঙ্গলবার, মে ৯, ২০১৭, ১২:২১ পূর্বাহ্ণ

অনিমেষ দাস, তাহিরপুর সীমান্ত থেকে ফিরে : সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর উপজেলার সীমান্ত অঞ্চলের কম বয়সী ছেলেরা ড্যান্ডি নামক মরণ নেশায় আসক্ত হয়ে পড়েছে। উপজেলার চারাগাঁওসহ কলাগাঁও, বালিয়াঘাট, শ্রীপুর, বড়ছড়া, বুড়ুংগাছড়া, পাহাড়তলী, ট্যাকেরঘাট, লাকমা, লালঘাট, রজনী লাইন চানপুর, লাউরেরগড়, চিলাবাজার, বাদাঘাট এলাকার পথশিশুরাই বেশি আসক্ত হচ্ছে এই নেশায়।

এই বয়সে যাদের বই খাতা নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা এরাই এখন সবচেয়ে বিপথগামী। সাময়িক সুখের প্রত্যাশায় অন্ধকারের চোরাবালিতে হারিয়ে যাচ্ছে শিশুরা। জরাজীর্ণ হয়ে পড়ছে তাদের জীবন। জড়িয়ে পড়ছে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে। মাদক বহনের ক্ষেত্রে হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে এখানকার শিশুরা। সবচেয়ে বেশি এই নেশায় আসক্ত তাহিরপুর উপজেলার সীমান্তের শিশুরা। অন্যান্য নেশার পাশাপাশি এই নেশাটিও ভারত থেকে অবৈধভাবে চুনাপাথরের সাথে নামানো হয় বলে সরেজমিনে জানা গেছে।

তোমাদের নাম কী জিজ্ঞাসা করলেই, উল্টো তারা প্রশ্ন করে ‘আপনারা এখানে কেন আইছেন?’ আবার তাদের মধ্যে জোড় গলায় নাম না জানা একজন বলে ওঠে, ‘ড্যান্ডি বানাইয়া খাই। এটা খাইলে কী হয় জানতে চাইলে বলে, ‘এটি খাইলে মনে দুঃখ থাকে না, ক্ষুধাও লাগে না, ঘরে ভাত, মাছ, বিদুৎ কিছুই লাগে না।’

সন্ধ্যা হলেই দেখা যায় অনেক শিশু পথে বসে বসে সেবন করছে ড্যান্ডি নামক এই নেশাদ্রব্য। জুতা কিংবা ফোমে ব্যবহৃত সলিউশন (আঠা) পলিথিনে/সুতি কাপড়ের বাজে ভরে কিছুক্ষণ পরপর মুখের সামনে নিয়ে শ্বাস টেনে নেশা করে তারা। মাদক সেবনের টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে মারামারির ও ঘটনা ঘটছে অনেক সময়।

জানা যায়, ২০ থেকে ৩০ টাকায় এক ধরনের জুতার গাম কেনে শিশুরা। বিভিন্ন দোকানে এসব গাম পাওয়া যায়। পলিথিনের ব্যাগে আঠাল ওই পদার্থ নিয়ে কিছুক্ষণ ঝাঁকানো হয়। তারপর পলিথিন থেকে নাক বা মুখ দিয়ে বাতাস টেনে নেয়। এই নেশা ‘ড্যান্ডি’ নামে পরিচিত।

কলাগাঁও বিজিবি ক্যাম্পের সামনে কথা হয় ১২ বছরের শিশু ইসলাম-এর সাথে। সে জানায়, আমার সঙ্গে আমার অনেক বন্ধু থাকে। তারা সবাই আঠা খায়, তাই ওদের দেখা-দেখি আমিও আঠা খাই। ট্যাকেরঘাট বিজিবি ক্যাম্পের সামনে উত্তরপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায় সীমান্তের পাশে বসে আছে দুই শিশু।

তাদের একজন জানায়, তার মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে। সে সারাদিন এলাকার শুল্ক স্টেশন দিয়ে নামানো কয়লার গাড়িতে কাজ করে ৫০-১০০ টাকা পায়। এরপর বিকেলে ড্যান্ডি নিয়ে নেশা করে, যেদিন টাকা কম রোজগার হয়, সেদিন গাঁজা সেবন করে- জানায় সে।

স্থানীয় সচেতনরা বলছেন, সমাজসেবা অধিদপ্তর, পুলিশ, বিজিবি এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এ সকল শিশুদের উদ্ধার করে ভাল পথে ফিরিয়ে আনতে পারে। সরকারের পাশাপাশি এনজিওগুলো এ ব্যাপারে উদ্যোগী হতে পারে। এ সকল মাদকাসক্ত শিশুদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা না হলে এরা বিপথগামী হয়ে পড়বে। এরা অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়লে সমাজ অন্ধকারের পথে চলে যাবে। কাজেই এদের রক্ষার্থে সমন্বিত উদ্যোগ দরকার।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ৮ থেকে ১০ বছর বয়সের শিশুরা সাধারণত গাঁজা, সিগারেট ও গাম সেবন করে। ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সীরা ফেনসিডিল ও হেরোইন সেবন করে। মধ্যবিত্ত বা উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারের কিশোর-তরুণদের নেশার অন্যতম উপকরণ ইয়াবা। তবে অধিকাংশ পথশিশু ড্যান্ডি নেশায় আসক্ত। তবে তাহিরপুর ৮-২৫ বয়সীরা পর্যন্ত এই নেশায় আসক্ত।