রবিবার, ২৯ মে ২০২২, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

ভূমিহীনের আরেক আখ্যান: পুলিশে চাকরি হয়নি দিবা রায়েরও

প্রকাশিতঃ ১১ ডিসেম্বর ২০২১ | ৭:৪৯ অপরাহ্ন


আবছার রাফি : চট্টগ্রাম নগরের ওমরগণি এমইএস কলেজের শিক্ষার্থী দিবা রায় (২১)। তিনি চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের আজিমপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা বিপ্লব রায় ও শিপ্রা দম্পতির বড় মেয়ে। দিবা রায় ও তার একমাত্র ছোট ভাই দেবু রায় দীপ্ত’র জন্ম ও বেড়ে ওঠা- সবকিছুই চট্টগ্রাম শহরের ২ নং গেইটস্থ নাসিরাবাদ এলাকায়। ২০ বছর আগে ভিটেমাটি নদীগর্ভে বিলীন হলে শহরে চলে আসেন বিপ্লব রায় ও শিপ্রা দম্পতি।

অসুস্থ মা শিপ্রা রায় ও একটি ওষুধ কোম্পানিতে স্বল্প বেতনে চাকরি করা বাবা বিপ্লব রায়ের আর্থিক টানাপোড়েন ঘোচাতে বড় সন্তান হিসেবে পরিবারের পাশে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন দিবা রায়। পড়াশোনা শেষ করে বড় সরকারি কর্মকর্তা হওয়ার স্বপ্ন থাকলেও এইচএসসি অধ্যয়নকালেই প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়েছেন একটা ছোট্ট চাকরির। কিছুতেই যেন মিলছিল না চাকরি নামের সোনার হরিণ। এরই মধ্যে পুলিশের কনস্টেবল পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। বুকভরা আশা নিয়ে সেখানে আবেদন করেন দিবা রায়।

আবেদনের পর ২০১৯ সালের ১ জুলাই চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ লাইনে অনুষ্ঠিত ট্রেনিং রিক্রুট কনস্টেবল (নারী) পদে শারীরিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন দিবা। পরদিন ২ জুলাই লিখিত পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হন তিনি। যথারীতি ৬ জুলাই মৌখিক পরীক্ষায়ও পাশ করেন। সর্বশেষ ১০ জুলাই মেডিকেল টেস্টে অংশগ্রহণ করে ১৪ জুলাই প্রকাশিত মেডিকেল টেস্টের রিপোর্টে ‘ট্রেনিং রিক্রুট কনস্টেবল’ পদের জন্য যোগ্য বলে নির্বাচিত হয়েছিলেন দিবা রায়।

দীর্ঘদিনে শ্রম আর মেধা দিয়ে কয়েক হাজার চাকরিপ্রত্যাশীকে পেছনে ফেলে যখনই কনস্টেবল পদে নিয়োগ পাবেন, ঠিক তখনই ঘটলো মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মতো ঘটনা। নিভে যায় দিবা রায়ের আশার প্রদীপ। পুলিশ ভেরিফিকেশনে ‘ভূমিহীন’ বলে উল্লেখ থাকায় কনস্টেবল পদের জন্য অযোগ্য বলে ঘোষণা করা হয় দিবা রায়কে। পরে বাবা বিপ্লব রায়ের সন্দ্বীপ উপজেলাস্থ আদি বাড়িটি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার সত্যতার স্বপক্ষে ১৩ নং আজিমপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান প্রত্যয়নপত্র নিয়োগ সংশ্লিষ্টদের দেখালেও কারো কর্ণকুহরে যেন ঢুকেনি তার আকুলি-বিকুলি।

তারপরও থেমে যাননি দিবা। কনস্টেবল পদে নিয়োগের জন্য প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত হওয়ার পরও পুলিশ ভেরিফিকেশনে চাকরির অযোগ্য ঘোষণার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা এবং নিয়োগের সুযোগ দিতে লিখিত আবেদন জানান পুলিশের আইজিপি বরাবর। তাতেও কোনো লাভ হয়নি দিবা রায়ের। এভাবে শুধু পুলিশ নয়, দিবা রায় ঘুরেছেন চট্টগ্রামের অনেক রাজনীতিবিদদের দুয়ারে দুয়ারে। সান্ত্বনার বাণী শুনলেও দুঃখ ঘুচেনি দিবা রায়ের।

এরপর দেশজুড়ে দ্রুত বেড়ে যায় করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব। লকডাউনে চাকরি হারান দিবা রায়ের বাবা। একদিকে কর্মহীন ঘরবন্দি অসুস্থ বাবা, অন্যদিকে অসুস্থ মা। অকস্মাৎ দিবা রায়ের পরিবারের নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। অস্থিমজ্জায় প্রবলভাবে ঝেঁকে বসে দুশ্চিন্তা। তারওপর ছোট্ট একটা দুর্ঘটনায় ঘরবন্দি হয়ে পড়েন দিবা রায়ও। থেমে যায় তার পড়াশোনা, ভর্তি হতে পারেননি এইচএসসি পরবর্তী অন্য কোনো ক্লাসে।

এ বিষয়ে দিবা রায় একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমার বাবা হচ্ছেন হার্টের রোগী, শ্বাস-প্রশ্বাসেরও সমস্যা আছে। আমার মা ব্র্যাকের স্কুলে শিক্ষক ছিলেন। মা অসুস্থ হয়ে যাওয়ার পর গৃহিনী হয়ে যান। আর যেহেতু আমার কোনো ভাই নেই, বড় বোন নেই, সুতরাং সমস্ত দায়িত্ব আমার ওপরে। বাবা-মা আমাকে এত কষ্ট করে এসএসসি ও এইচএসসি পড়ালেন; এখন আমারও তো তাদের প্রতি কিছু দায়িত্ব থাকে।’

‘আমার আশা ছিল, আমি কনস্টেবল পদে যোগ দিয়ে পদোন্নতি পরীক্ষা দিয়ে এসআই হবো। পুলিশে আমার চাকরি হয়ে গেলে আমি পরিবারকে সহযোগিতা করতে পারতাম। চাকরির পাশাপাশি পড়াশোনাটাও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারতাম। কিন্তু আমার চাকরিটা হলো না।’

আক্ষেপের সুরে দিবা বলেন, ‘আমার একটাই প্রশ্ন- মানুষকে কেন যোগ্যতা দিয়ে বিচার করা হচ্ছে না। আমি যদি ভূমিহীন হই, সেটা তো আমার জন্মগত দোষ না। আমি কী জন্ম হওয়ার আগ থেকেই কী জানতাম যে, আমি ভূমিহীনভাবে জন্মগ্রহণ করবো। আমাদের জায়গাগুলো নদী ভাঙনের ফলে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে, এটা কী আমার দোষ ছিল। আমার তো কোনো দোষ ছিল না, আমি আমার যোগ্যতা দিয়ে টিকেছি।’

দিবা রায় বলেন, ‘আমি শুনেছি, ভূমিহীন হলেও আসপিয়ার চাকরি হচ্ছে। তাহলে আমারটা কেন হবে না? মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার আকুল আবেদন, আমাকে দয়া করে পুলিশে চাকরির সুযোগ দিন। আমি আমার পরিবারের হাল ধরতে চাই।’