রবিবার, ২৯ মে ২০২২, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

ইউএনও’র গাড়িচালক ও স্টারলাইনের জিএম দুটোই যখন একসঙ্গে

প্রকাশিতঃ ১২ ডিসেম্বর ২০২১ | ৭:১৫ অপরাহ্ন


জসিম উদ্দিন, কক্সবাজার : জানে আলম স্বপন (৫৫)। কাগজে-কলমে তিনি কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) চালক হিসেবে কর্মরত। অথচ দীর্ঘ এক যুগ ধরে স্টারলাইন পরিবহনের উচ্চ পদে চাকরি করে যাচ্ছেন তিনি। এতে সরকারি সকল ধরনের সুযোগ-সুবিধা পেতে তার কোন রকম অসুবিধা হচ্ছে না। অপরদিকে দীর্ঘ বছর ধরে ইউএনও’র গাড়ি চলছে বহিরাগত চালক দিয়ে; যাদের নিয়োগ দেন জানে আলম স্বপনই।

অভিযোগ আছে, গাড়ি না চালালেও উপজেলা ও জেলা প্রশাসনে তদবির বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন স্বপন। একই সঙ্গে চাকরির সুবাদে পরিবহন সেক্টরের মাধ্যমে মাদক পাচার নিয়ন্ত্রণ করেন স্বপন। তার সিন্ডিকেটের অনেকেই ধরা পড়েছেন আইনশৃংঙ্খলা বাহিনীর হাতে। অবৈধ টাকায় একাধিক বিলাসবহুল বাড়িসহ বিপুল সম্পদের মালিকও হয়েছেন তিনি।

এদিকে তথ্য-প্রমাণসহ অভিযোগ সামনে আসার পর ব্যবস্থার পরিবর্তে রহস্যজনকভাবে গাড়িচালক জানে আলম স্বপন যেন কোন সমস্যায় না পড়েন সে ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছেন কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০০৮ সালে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে গাড়িচালক স্বপন তার পরিবর্তে নুরুল আলম মনিয়া নামের একজনকে গাড়ি চালক হিসেবে নিয়োগ দেন। এরপর বেশ কয়েকজন চালক পরিবর্তন করেন। পরবর্তীতে গত ৬ বছর ধরে গাড়িচালক হিসেবে তার ভাই মনজুর আলম। সবাইকে নিজের মত করে নিয়োগ দিয়েছেন জানে আলম স্বপ্নই। ১৯৮৪ সালের ১০ মে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের গাড়ি চালক পদে যোগদান করেন স্বপন। আরও কয়েক বছর তার চাকরির মেয়াদ রয়েছে।

অন্যদিকে সরকারি চাকরিতে বহাল থেকে ২০০৮ সাল থেকে স্টারলাইন পরিবহনের কক্সবাজারস্থ এজিএম হিসেবে চাকরি নেন জানে আলম স্বপন। পরে ২০১৫ সাল থেকে জিএম হিসেবে পদোন্নতি হয় তার।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপজেলায় কয়েকজন কর্মকর্তার দাবি, রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার বাসনা থেকে জানে আলম স্বপন মূলত মাদকের ব্যবসার জন্য পরিবহন সেক্টরে চাকরি নেন। কক্সবাজারের বড় বড় ইয়াবা কারবারিদের মাদক রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে নিরাপদে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন তিনি। একই সঙ্গে উপজেলা ও জেলা প্রশাসনে তদবির বাণিজ্যের সঙ্গে স্বপন জড়িত বলে বিস্তর অভিযোগ পাওয়া গেছে।

পরিবহন সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি অভিযোগ করে জানান, গত বছর স্বপনের ছেলে ফাহিম এবং মাদক সিন্ডিকেটের সদস্য মিজান স্টার লাইন পরিবহনের করে ঢাকা যাওয়ার সময় চট্টগ্রামের সিটি গেইট এলাকায় পুলিশের চেকপোস্টে বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ আটক হন। পরে মোটা অংকের বিনিময় ছেলে ফাহিমকে ছাড়িয়ে নেন। তবে মাদক মামলায় জেলে যেতে হয় মিজানকে। এছাড়াও মাদকের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে চাকরি গেছে স্বপনের ভাই কক্সবাজার জেলা পরিষদের গাড়িচালক কামরুলের।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্টার লাইন পরিবহনের একজন কর্মচারী দাবি করেন, স্টারলাইন পরিবহনের কক্সবাজার লাইনের যে সকল চালক মাদক নিয়ে আইনশৃংখলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়েছেন তারা প্রায় সকলেই স্বপন সিন্ডিকেটের সদস্য এবং আস্থাভাজন।

কথা হয় ইয়াবাসহ ধরা পড়ে কারাবরণ করা কয়েকজনের সঙ্গে। তাদের দাবি, গাড়িচালক স্বপনের মাধ্যমে পরিবহনে করে মাদকের চালান পাঠালে সহজে তা ধরা পড়ে না। রহস্যজনক কারণে গাড়িগুলো তল্লাশি করা হয় না। তারা নিজেরাও একাধিকবার সফলভাবে স্বপনের মাধ্যমে ইয়াবার চালান পাঠিয়েছেন দাবি করে তারা এখন আর ইয়াবার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নয় বলে জানান।

তারা আরও বলেন, আত্মস্বীকৃত ইয়াবা-ডন খ্যাত শাহাজান আনছারি, নফরসহ কক্সবাজারের প্রায় ইয়াবা গডফাদাররা স্বপনের মাধ্যমে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইয়াবার চালান পাঠান। তবে এ জন্য মোটা অংকের কমিশন দিতে হয় স্বপনকে।

জানা যায়, জানে আলম স্বপন ফেনী জেলার লালপুলের মৃত আবুল কাশেমের পুত্র। তারা তিন ভাই কক্সবাজারের সরকারি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের গাড়িচালক হিসেবে কর্মরত। স্বপনের বড় ভাই শাহাজান বর্তমানে কক্সবাজার গণপূর্ত অফিসের গাড়িচালক। ছোট ভাই কামরুল জেলা পরিষদের কার্যালয়ের চালক। তবে মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে কামরুলকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে জানে আলম স্বপন অবৈধ পন্থায় আয়ের মাধ্যমে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। খোঁজ নিয়ে যায়, কক্সবাজার শহরের প্রবেশমুখ সদরের ঝিলংজা ডিক্কুলে নিজের নামে ক্রয়কৃত ৪০ শতক জমিতে বহুতল ফাউন্ডেশন দিয়ে একতলা পর্যন্ত একটি ভবন নির্মাণ করেছেন। সদরের ঝিলংজা পশ্চিম হাজীপাড়া এলাকায় মেয়ের নামে ২০ শতক জমিতে ৭ তলা বিশিষ্ট একটি আলিশান বাড়ি করেছেন। একই এলাকায় আরও একটি ২ তলা বাড়ি করেছেন তিনি।

এ ছাড়াও কক্সবাজার শহরের কলাতলিস্থ সরকারি কর্মচারীদের ৫১ একর প্লটে নিজের নামে একটি, স্ত্রীর নামে একটি, মেয়ে ও ভাইয়ের নামে দুটিসহ ৪টি প্লট কিনেছেন স্বপন। ফেনীতে থাকা স্বপনের আত্মীয়-স্বজনের দাবি, খালা ও বিশ্বস্ত আত্মীয়দের নামে ২০ একরের বেশি জমি ক্রয় করেছেন তিনি।

অভিযোগ স্বীকার করে জানে আলম স্বপন বলেন, ‘আমি অসুস্থতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে ইউএনও স্যারের গাড়ি চালাতে যাই না। এ জন্য নিজের ভাইকে সেখানে গাড়িচালক হিসেবে দিয়েছি।’

স্টারলাইনে চাকরি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘স্টারলাইনের মালিক আলা উদ্দিন আমার মামা হয়। তাই ওনার অনুরোধে সেখানে চাকরি করছি। ২০ হাজার টাকা করে সেখান থেকে বেতন পাই। তবে এখন বুঝতে পেরেছি, ভুল হয়েছে। এ জন্য আমি আপনাদের কাছে ক্ষমা চাই।’

মাদক ও তদবির বাণিজ্যে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে স্বপন বলেন, ‘যে পরিমাণ সম্পদের কথা বলা হচ্ছে আমার আসলেই কিছু নাই।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইউএনও মিল্টন রায় বলেন, ‘আমিও আসলে প্রথমে জানতাম না আমার গাড়ি চালক কে? পরে বিষয়টি জানতে পারি আমার ড্রাইভার অন্য আরেকজন।’

একযুগ ধরে চাকরিতে অনুপস্থিতি ও অন্যত্র চাকরি করা প্রসঙ্গে কোন ব্যবস্থা নেয়া হবে কিনা জানতে চাইলে ইউএনও বলেন, ‘গত মাসে জানে আলম স্বপন অসুস্থ বলে জানিয়ে চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়ার জন্য আবেদন করেছেন। এতে কী আর করা! তার আবেদন অনুযায়ী ব্যবস্থা করব।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সদর উপজেলার একজন সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, ‘গাড়িচালক স্বপনের দীর্ঘদিন অনুপস্থিতি ও প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরির বিষয়টি যখন আমি প্রথম জানতে পারি। তখন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করি। পরে ঊর্ধ্বতন মহলের চাপের কারণে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে স্বপন মাদকের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত জেনে তাকে আইনশৃংঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরিয়ে দিতে চেষ্টা করেছি কয়েকবার। শেষ পর্যন্ত আমার কর্মস্থল বদলি হওয়ায় তা আর সফল হয়নি।’

জানে আলম স্বপন মাদকের সঙ্গে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্টারলাইন পরিবহনের মালিক ও ফেনী পৌরসভার সাবেক মেয়র হাজী আলাউদ্দিন। তিনি বলেন, স্বপন আমার আত্মীয় হয়। তার এক ভাই আমার এখানে চাকরি করেন। স্বপন যেহেতু কক্সবাজারে থাকে, তাই তাকে তার ডিউটি শেষে স্টারলাইন পরিবহনের দিকে একটু নজর রাখতে বলা হয়েছিল।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার গাড়ি চালকের একযুগ ধরে চাকরিতে অনুপস্থিতি ও অন্যত্র চাকরি করা প্রসঙ্গে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আলামিন পারভেজ বলেন, ‘বিষয়টি সত্য হলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তদবির বাণিজ্যের বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। মাদকের অভিযোগের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট আইনশৃংঙ্খলা বাহিনী দেখবেন।’

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার প্রশাসন মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার চালক জানে আলম স্বপন মাদকের সঙ্গে জড়িত থাকার যে অভিযোগ উঠেছে তা খতিয়ে দেখা হবে। সত্যতা পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।’