রবিবার, ২৯ মে ২০২২, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

‘জাফর লীগের’ কাছে ‘অসহায়’ আওয়ামী লীগ

প্রকাশিতঃ ১৪ ডিসেম্বর ২০২১ | ৭:১৩ অপরাহ্ন


জসিম উদ্দিন, কক্সবাজার : কক্সবাজারের চকরিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য চতুর্থ ধাপের ইউপি নির্বাচনেও সরকারদলীয় স্থানীয় সংসদ সদস্য জাফর আলম নৌকার প্রার্থী ও তার অপছন্দের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করে জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোন ধরণের হস্তক্ষেপ না করতে সংসদ সদস্যদের প্রতি সরকারি নির্দেশনা থাকলেও জাফর আলম তা মানছেন না। নৌকার প্রার্থীসহ অন্য স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বিপক্ষে গিয়ে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে জয়ী করতে সরকারদলীয় এ সংসদ সদস্য নানা ধরণের বক্তব্য দিচ্ছেন।

চকরিয়ার আটটি ইউপিতে ২৬ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জাফর আলম ভোটারদের হুমকি-ধমকি ও ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক চেয়ারম্যান প্রার্থী।

এর আগে তৃতীয় দফায় সম্পন্ন হওয়া নির্বাচনে চকরিয়া-পেকুয়ার ১১টি ইউপির নির্বাচনে নৌকার ভরাডুবির জন্য এমপি জাফর আলমকে দায়ী করেছেন আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। তাদের দাবি, চকরিয়া-পেকুয়ায় এমপি জাফর আলমের অনুসারি ছাড়া যারাই নৌকা পেয়েছেন তাদের পরাজিত করতে নানাভাবে ভূমিকা রেখেছেন তিনি।

ফলে চকরিয়ার কৈয়ারবিল ইউনিয়নে নৌকার প্রার্থী জন্নাতুল বকেয়া রেখা মাত্র ৯৯ ভোট পেয়ে দেশে নৌকার হেরে যাওয়া ইউনিয়নগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন ভোট পাওয়ার রেকর্ড গড়েছেন।

আবার নিজের পছন্দের স্বতন্ত্র প্রার্থী, দক্ষিণ চট্টগ্রামের গরুচোর সিন্ডিকেটের প্রধান হিসেবে পরিচিত নবী হোসেন প্রকাশ নইব্যা চোরার চেয়ারম্যান হওয়ার পেছনে এমপি জাফর আলম সহযোগিতা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

সদ্য সমাপ্ত হওয়া তৃতীয় ধাপের নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে হেরে গেছেন পেকুয়ার উজানটিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম শহিদ। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘স্বতন্ত্রপ্রার্থী তোফাজ্জাল করিমকে জেতানোর জন্য নৌকার বিরুদ্ধে যা যা করা দরকার সবই করেছেন এমপি জাফর আলম।’ নির্বাচনের আগেও একই অভিযোগ করেছিলেন শহিদুল ইসলাম শহিদ।

একই ধরনের অভিযোগ করেছেন, নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে হেরে যাওয়া আরও কয়েকজন প্রার্থী।

এদিকে আগামী ২৬ ডিসেম্বর চতুর্থ ধাপের নির্বাচনকে সামনে রেখে ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী নাছির উদ্দিন চৌধুরীর কর্মী-সমর্থকদের স্থানীয় সাংসদ জাফর আলম প্রকাশ্যে হুমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী নাছির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘আমার প্রতি মানুষের বিপুল সমর্থন দেখে ঈর্ষান্বিত হয়ে সাংসদ জাফর আলম প্রকাশ্যে হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন। তিনি হুংকার দিচ্ছেন যেকোন মূল্যে প্রতিটি ভোটকেন্দ্র দখলে নিয়ে আমাকে চেয়ারম্যান হতে দেবেন না।’

তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচন উপলক্ষে ফাঁসিয়াখালীতে অবৈধ অস্ত্রধারী বহিরাগতদের আনাগোনা বেড়েছে। ২৬ ডিসেম্বর নির্বাচনে ইউনিয়নের ৭ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটকেন্দ্র দখলে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন এমপি জাফর আলম।’

ডুলাহাজারা ইউনিয়নে লাঙ্গল প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থী ও বর্তমান চেয়ারম্যান নুরুল আমিন এবং স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী কলিম উল্লাহ কলির বিরুদ্ধেও এমপি জাফর আলম তৎপর রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ওই ইউনিয়নে বিশেষ বাহিনী দিয়ে দখলে নিয়ে এমপির সাবেক পিএস বিদ্রোহী প্রার্থী হাসানুল ইসলাম আদরকে (আনারস মার্কায়) জয়ী করা হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন প্রার্থীরা। এ ধরনের বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

অপরদিকে, চিরিংগা ইউনিয়নে এমপি জাফরের বেয়াই, স্বতন্ত্র প্রার্থী জামাল হোসেনকে নির্বাচনে জেতানোর কৌশল হিসেবে তার আপন ভাইপো তৃণমূলে গ্রহণযোগ্যতাহীন প্রার্থীকে নৌকার মনোনয়ন এনে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে এমপি জাফরের বিরুদ্ধে।

চিরিংগা ইউনিয়নের টানা তিনবারের নির্বাচিত বর্তমান চেয়ারম্যান ও স্বতন্ত্র প্রার্থী জসিম উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের এমপি (জাফর আলম) উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হয়েও নৌকার পক্ষে প্রচারণা না করে, আমাকে হারানোর অপকৌশল হিসেবে প্রকাশ্যে আমার কর্মী-সমর্থকদের হুমকি-ধমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করছেন এবং ভোটকেন্দ্র দখলে নেবেন- এমন ঘোষণাও দিয়েছেন।’

একই ইউনিয়নের তিনবারের সাবেক চেয়ারম্যান ও মোটরসাইকেল প্রতীকের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা খাজা সালাহউদ্দিনও এমপি জাফর আলমের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ করে বলেন, ‘নির্বাচন চলাকালে ওনি (এমপি) স্থানীয় সরকার নির্বাচন আচরণবিধির ১২ ধারার তোয়াক্কা না করে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে, ওনার পছন্দের প্রার্থী (বিদ্রোহী প্রার্থী) জামাল হোসেন চৌধুরীর আনারস প্রতীকে ভোট চাইছেন।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে চকরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের একজন দায়িত্বশীল নেতা বলেন, ‘মূলত চকরিয়া-পেকুয়ায় এমপি জাফর লীগই শেষ কথা। এমপির অনুসারীরা নৌকা না পেলে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করা প্রার্থীদের পরাজিত করতে যা যা করা দরকার সবই করেছেন বা করছেন জাফর আলম। এবং অনুসারীদের বিদ্রোহী প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিয়ে জয়ের জন্য ভূমিকা রেখেছেন তিনি। চতুর্থ ধাপের নির্বাচনকে সামনে রেখেও একই পথ অবলম্বন করেছেন এমপি। এতে করে অসহায় হয়ে পড়া আওয়ামী লীগের প্রার্থীর করুণ পরিণতি হতে পারে।

এমপি জাফর আলমের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র ও বিদ্রোহী প্রার্থী দাঁড় করিয়ে নৌকার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ সত্য করে মন্তব্য করেছেন কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পৌর মেয়র মুজিবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘এমপি জাফর আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। ইতিমধ্যে কেন্দ্রে বিষয়টি অবগত করা হয়েছে।’

তবে সকল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সাংসদ জাফর আলম। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী একজন সাংসদ নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার অংশ নিতে পারেন না, সেই সুযোগ নেই। অগ্রহণযোগ্য প্রার্থীর হাতে নৌকা দেয়ায় তৃতীয় ধাপে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে কয়েকটি ইউনিয়নে নৌকার শোচনীয় পরাজয় হয়েছে।’ তার বিরুদ্ধে একটি মহল নানাভাবে ষড়যন্ত্র লিপ্ত বলেও জানান এমপি জাফর আলম।