বুধবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২২, ৬ মাঘ ১৪২৮

সমুদ্র উপকূল ‘ধ্বংসে’ ক্যাপিটালের সঙ্গী এনবি স্টিল

প্রকাশিতঃ শুক্রবার, ডিসেম্বর ১৭, ২০২১, ১১:৩৪ পূর্বাহ্ণ


এম কে মনির, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) : সীতাকুণ্ডের বাড়বকুণ্ডে সমুদ্র উপকূল থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে কয়েক একর নিম্নভূমি ভরাট করেছে ক্যাপিটাল পেট্রোলিয়াম লিমিটেড। এতে উপকূলীয় বন ধ্বংসের পাশাপাশি সমুদ্র তীরে তৈরি হয়েছে গভীর সব খাদ। এবার ক্যাপিটালের মতোই পরিবেশ বিধ্বংসী কাজে যোগ দিয়েছে পাশ্ববর্তী আরেক প্রতিষ্ঠান এনবি স্টিল লিমিটেড।

ক্যাপিটালের সহযোগিতা নিয়েই প্রায় এক হাজার মিটার লম্বা জোড়া পাইপ বসিয়ে সমুদ্র থেকে বালু উত্তোলনের সব আয়োজন সম্পন্ন করেছে সদ্য ওই এলাকায় গেড়ে বসা প্রতিষ্ঠানটি। ইতিমধ্যে সাগরে চষে বেড়াচ্ছে এনবি স্টিলের একাধিক বালু উত্তোলনকারী ড্রেজারও। কোন ধরণের বৈধতা ছাড়াই বালু উত্তোলনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে তারা। আর এ কাজে তাদের সহযোগিতা দিচ্ছে ক্যাপিটাল পেট্রোলিয়াম।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে বাড়বকুণ্ড সমুদ্র উপকূলে গড়ে ওঠা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য সমুদ্র উপকূল থেকে বালু উত্তোলন চলছে। উপকূলীয় বনাঞ্চলও রেহাই পায়নি তাদের আগ্রাসী কর্মকাণ্ড থেকে। এখানকার বিস্তৃত এলাকাজুড়ে থাকা কেওড়া বন গেল বছরেই কেটে সাবাড় করেছে ক্যাপিটাল। স্কেভেটর দিয়ে সমুদ্র তীরবর্তী মাটি কেটে ফেলায় গভীর খাদ তৈরি হয়েছে। এতে উপকূলীয় বন উজাড় হয়ে সমুদ্রের গভীরতা বাড়ছে।

ঘূর্ণিঝড়-সাইক্লোনসহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে উপকূলবাসীকে রক্ষার প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ বন ধ্বংস হওয়ায় ক্ষোভে ফুঁসছেন স্থানীয়রা। দিনরাত ড্রেজার দিয়ে সমুদ্র থেকে বালু উত্তোলন করা হলেও এখনো কোন ধরণের ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন। অপরদিকে কৃষিজমিতে অপরিকল্পিতভাবে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলায় সীতাকুণ্ডে কমে গেছে কৃষিজমি।

১৪ ডিসেম্বর সরেজমিন বাড়বকুণ্ড মাহমুদাবাদস্থ সমুদ্র উপকূলে গিয়ে দেখা যায়, বেড়িবাঁধের পূর্বপাশ ঘেঁষে অবস্থিত প্রায় ২শ’ শতক কৃষি জমিতে মাটি কেটে স্তূপ করেছে এনবি স্টিল। চারপাশে পুকুরের পাড়ের মতো মাটি স্তূপ করা হলেও মাঝখানে করা হয়েছে বিশালাকার খাদ। আর খাদ ভরাটেই বালু উত্তোলনের আয়োজন। তিনটি স্কেভেটর দিয়ে চালানো হচ্ছে মাটি খননের কাজ। একইসাথে সাগর থেকে বালু উত্তোলনের জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।

বেঁধিবাধ এলাকা থেকে প্রায় ১ হাজার মিটার পশ্চিমে অবস্থিত সাগরে লম্বা জোড়া পাইপ বসানোর কাজ শেষ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। আর এ কাজের ইজারা নিয়েছে তাদের ভাতৃপ্রতিম প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটাল। বালু উত্তোলনের পাইপ বসানো হয়েছে ক্যাপিটালের জায়গার উপর দিয়েই। সাগরেও নামানো হয়েছে দুটি শক্তিশালী বালু উত্তোলনকারী ড্রেজার। এসব কিছু দেখভালে নিয়োজিত রয়েছে বেশকিছু শ্রমিক। তাদের কেউ কেউ বালুর পাইপ মেরামত ও ড্রেজার চালুর সরঞ্জামের যোগান দিচ্ছেন। ক্যাপিটাল ও এনবি স্টিলের শ্রমিকরা যৌথভাবে বালু উত্তোলনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

জানা যায়, বেড়িবাঁধের পূর্ব ও পশ্চিমে স্বল্পমূল্যে কেনা নিচু কৃষিজমি ও উপকূলীয় ভূমিকে ব্যবহার উপযোগী করতেই পরিবেশ বিধ্বংসী ভয়াবহ খেলায় মেতেছে ক্যাপিটাল ও এনবি স্টীল নামক এ দুই শিল্প প্রতিষ্ঠান। ২০১০ সালের বালু মহাল আইনে সমুদ্রের তলদেশ থেকে বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ হলেও এ আইনের কোন তোয়াক্কাই করছে না প্রতিষ্ঠান দুটি। মূলত মেরিন ড্রাইভের বিশাল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সমুদ্র পাড়েই একইসাথে শীপ ইয়ার্ড ও স্টিল মিল গড়ে তোলার কাজ চালাচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলো।

স্থানীয়রা জানান, এর আগে ক্যাপিটাল কর্তৃপক্ষ কোন ধরণের অনুমোদন ছাড়াই অবৈধভাবে সাগর থেকে বালু উত্তোলন করেছিল। ক্যাপিটালের বিশাল আয়তনের উপকূলীয় নিম্নভূৃমিকে ভরাট করা হয়েছে সাগরের বালু দিয়েই। এবার একই কায়দায় বালু উত্তোলন করতে যাচ্ছে এনবি স্টিল। ক্যাপিটালের উপর দিয়েই পাইপ বসানো শেষ হয়েছে। এভাবেই ক্যাপিটাল সাগরের বালু উত্তোলন করেছিল। এখন করছে এনবি স্টিল। এ কাজের ঠিকাদারিও ক্যাপিটালের হাতে। এনবি স্টিলের নিম্নভূমি ভরাট করে দিতে দুই প্রতিষ্ঠানের মাঝে চুক্তিও হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

স্থানীয়রা বলছেন, ক্যাপিটাল ও এনবি স্টিল সাগর থেকে বালু উত্তোলন করলেও এর মাশুল দিতে হয় জনগণকে। সমুদ্রের গভীরতা বেড়ে গেলে মাছ ধরা দূরে থাক কেউ সাগরের তীরেও যেতে ভয় পায়। গত বছর বাঁশবাড়িয়া সৈকতে ৫ পর্যটক সমুদ্রের গভীরে তলিয়ে গেছেন। এছাড়া লম্বা পাইপের কারণে তাদের গবাদিপশু চরতেও পারছে না। কোম্পানির লোকজন আশেপাশে কাউকে যেতে দিচ্ছে না। চারদিকে তারা ঘেরাও করেছে। আগে সমুদ্র পাড়ে শতশত কেওড়া গাছ ছিল। এখন সবগুলো উপড়ে ফেলা হয়েছে বহু আগে। পুরো সমুদ্র উপকূলটা তারা গিলে খাচ্ছে। কেউ তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুলছে না, সবাই মুখে কুলুপ এঁটেছে।

এ বিষয়ে ক্যাপিটালের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দায়িত্বে থাকা সৈয়দ বখতিয়ার সুমন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বালু উত্তোলন করা হচ্ছে না। শুধু সাগর থেকে এনে ভরাট করা হচ্ছে।’ ক্যাপিটালই বালু উত্তোলন করছে স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘সাগর থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে কিনা আমি জানি না। যারা আনছে তারাই জানে।’ বালু উত্তোলনের অনুমোদন আছে কিনা প্রতিবেদকের এমন প্রশ্ন এড়িয়ে সুমন বালু উত্তোলনকে সাগর থেকে বালু এনে ভরাট বলেই আখ্যা দেন। এসময় প্রতিষ্ঠানের এডমিন নাজিমকে প্রতিবেদকের মুঠোফোন নম্বর দেয়া হবে এবং তিনিই প্রতিবেদকের সাথে যোগাযোগ করবেন বলে জানান এবং তার সাথেই কথা বলার পরামর্শ দেন।

এ বিষয়ে এনবি স্টিলের স্বত্বাধিকারী মো. তছলিম উদ্দিন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বালু উত্তোলনের বিষয়টি ক্যাপিটাল দেখছে। আমরা তাদেরকে কন্ট্রাক্টে দিয়ে দিয়েছি। আমি বলেছি অনুমোদন নিয়ে তারপর যাতে বালু উত্তোলন করা হয়। অনুমোদন না দিলে আমি বালু উত্তোলন বা ফেলতে দিব না। সংশ্লিষ্ট সকলকে অবগত করেই আইনগতভাবে বালু উত্তোলনের প্রক্রিয়ার পক্ষে আমি।’

এ বিষয়ে সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. শাহাদাত হোসেন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বালু উত্তোলনের জন্য তারা সেটআপ করেছে এটি জানি। তবে বালু উত্তোলন এখনও করছে না বলে জেনেছি। তারা বালু উত্তোলনের জন্য জেলা প্রশাসনে অনুমোদনের জন্য দরখাস্ত দিয়েছে। সেটি এখনো অনুমোদন হয়নি। বিষয়টি আমরা দেখছি। আইন লঙ্ঘন করে সমুদ্র থেকে বালু উত্তোলনের কোন সুযোগ নেই।’

এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের পরিচালক মফিদুল ইসলাম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমরা বালু উত্তোলনের বিষয়ে অবগত ছিলাম না। এখনই বিষয়টি জানলাম। তদন্ত করে সত্যতা পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেব। বালু উত্তোলনের জন্য এ প্রতিষ্ঠানকে কোন বৈধতা দেয়া হয়নি।’