রবিবার, ২৯ মে ২০২২, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

দুর্নীতি কমাতে সুপারিশ অনেক, বাস্তবায়ন কম

প্রকাশিতঃ ১৭ ডিসেম্বর ২০২১ | ৬:০১ অপরাহ্ন


শরীফুল রুকন দেশের সরকারি-বেসরকারি সব খাতেই কম-বেশি দুর্নীতি রয়েছে। দুর্নীতি কমাতে বিভিন্ন সময়ে প্রধানমন্ত্রী ও উচ্চ আদালতের কঠোর নির্দেশনা বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। দুর্নীতি প্রতিরোধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সুপারিশও কাজে আসছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্দেশনা ও সুপারিশ বাস্তবায়নে বড় আকারের কার্যকর উদ্যোগ নেই।

এদিকে দুর্নীতির ধারণা সূচকে আগের বছরের তুলনায় আরো দুই ধাপ নীচে নেমে এসেছে বাংলাদেশ। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) কর্তৃক পরিচালিত ‘দুর্নীতির ধারণা সূচক (সিপিআই) ২০২০’ অনুযায়ী ১৮০টি দেশের মধ্যে তালিকার নীচের দিক থেকে বাংলাদেশ ১২তম অবস্থানে আছে। যেটা সিপিআই-২০১৯ এর তুলনায় দুই ধাপ নীচে নেমেছে বলে উল্লেখ করা হয়। ২০১৯ সালে নিম্নক্রম অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৪ তম।

এর পেছনে করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক দুর্নীতির বিষয়টিকে অন্যতম কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এছাড়া ক্ষমতার অপব্যবহার, বিচারহীনতা, মতপ্রকাশ ও জবাবদিহিতার অভাবকে অন্যতম কারণ বলে উল্লেখ করেছে টিআইবি।

দুদক কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারি সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণেই অধিকাংশ দুর্নীতি সংঘটিত হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এ সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকায় সেবায় বিঘ্ন ঘটে। ফলে বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি ও সেবায় দীর্ঘসূত্রতা হয়। এ কারণে মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোতে দৈনন্দিন কর্মপদ্ধতির উন্নয়ন, নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন ও কাজে গতিশীলতা আনার পরামর্শ দিয়ে আসছে দুদক। পাশাপাশি সরকারি দপ্তর ও সেবা সংস্থাগুলোর দুর্নীতির উৎস চিহ্নিত করে সেগুলো প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট সুপারিশও দিয়েছে সংস্থাটি।

২০১৯ সালের ১৫ মে দুদক তাদের বার্ষিক প্রতিবেদন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের হাতে তুলে দেয়। ওই প্রতিবেদনে ভূমি ব্যবস্থাপনা, পাসপোর্ট প্রদান সহজীকরণ, স্বাস্থ্য, আয়কর, হিসাবরক্ষণ অফিস, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ, সরকারি নিয়োগ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি, শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ, আইন-শৃঙ্খলা, মন্ত্রণালয়ের কার্য উন্নয়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে দুর্নীতি-অনিয়ম এবং জনহয়রানির সম্ভাব্য উৎসসমূহ চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি এসব দুর্নীতি-অনিয়ম বা হয়রানি দূর করতে ১২০টি সুপারিশ তুলে ধরা হয়; যদিও এসব সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হয়নি।

এসব খাতের মধ্যে নিয়োগ দুর্নীতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে দুদকের প্রতিবেদনে। তারা বলেছে, সরকারি-আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও সংবিধিবদ্ধ সরকারি সংস্থার নিয়োগে দুর্নীতি-অনিয়ম কিংবা স্বজনপ্রীতির কথা সবাই জানেন। তাদের মতে, নিয়োগ দুর্নীতিকে আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতির আঁতুড়ঘর হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। তাই নিয়োগ দুর্নীতি প্রতিরোধে বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরে দুদক।

দুদকের সুপারিশ, সংবিধান অনুসারে একাধিক কর্ম কমিশন সৃষ্টি করে এর মাধ্যমে সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত এবং সংবিধিবদ্ধ সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের সকল স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ করা যেতে পারে। এতে নিয়োগ প্রত্যাশীদের হয়রানি, নিয়োগ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার শ্রম, সময় ও অর্থ এবং দীর্ঘসূত্রতা সর্বোপরি দুর্নীতি, অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ইত্যাদি নেতিবাচক কর্মকাণ্ড কমে যাবে। স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিয়োগ পাওয়ারা নিজেদের আত্মমর্যাদাশীল কর্মচারী হিসেবে প্রজাতন্ত্রের কাজে আত্মনিয়োগ করতে পারবেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পদ্ধতিতে কোচিং বাণিজ্য, প্রশ্নপত্র ফাঁস, অনুদান, উন্নয়ন তহবিলের নামে বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতির সুযোগ থাকে। এর পরিবর্তনের সুপারিশ করছে দুদক। তারা মনে করে, চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়গুলোর বিদ্যমান ভর্তি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সরকারি-বেসরকারি সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের মাধ্যমে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার প্রক্রিয়া অনুসরণ করা যেতে পারে। একইভাবে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়ে সমন্বিত একক পরীক্ষার মাধ্যমে ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন একটি সমন্বিত ভর্তি নীতিমালা প্রণয়ন করতে পারে।

দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ প্রায়ই উঠছে। দুদকও বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে মামলা-মোকদ্দমা চালাচ্ছে। শিক্ষক নিয়োগের দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতি দেশের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ভাবমূর্তি ম্লান করে দিচ্ছে বলে মনে করে দুদক। এ জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আলোকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের মাধ্যমে সকল সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। দুদকের বক্তব্য, সর্বোচ্চ মেধাবী এবং যোগ্য প্রার্থীরাই কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের সুযোগ পাওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের মাধ্যমে একটি সমন্বিত ভর্তি নিয়োগ-নীতিমালা প্রণয়ন করে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যেতে পারে।

দেশের পুলিশি সেবার প্রাণ থানাগুলোর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন পুলিশের পরিদর্শক (নন-ক্যাডার) পদমর্যাদার কর্মকর্তারা। সেবাপ্রার্থীরা থানা থেকে কাঙ্খিত মাত্রার সেবা পাচ্ছেন না মর্মে প্রায়ই অভিযোগ পাওয়া যায়। কোনো ক্ষেত্রে আচরণগত, হয়রানি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দুর্নীতির অভিযোগও পাওয়া যায়। এসব সমস্যা সমাধানে দুদক মনে করে, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (পুলিশ) ক্যাডারের সহকারী সুপারিনটেনডেন্ট অব পুলিশ অথবা অতিরিক্ত সুপারিনটেনডেন্ট অব পুলিশ পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের পদায়নের ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। পুলিশের প্রতি জন আস্থাকে আরও বিকশিত করা এবং উপজেলা পর্যায়ে আইন-শৃঙ্খলা বিষয়ে কার্যকর সমন্বয়ের জন্য থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পদে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (পুলিশ) ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদায়নের বিষয়টি সরকার বিবেচনা করতে পারে।

দালালের দৌরাত্ম্য, যাচাই কার্যক্রমে পুলিশের ঘুষ গ্রহণ, জনশক্তির স্বল্পতা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাবে অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতির সুযোগ গ্রহণ পাসপোর্ট অফিসে দুর্নীতির অন্যতম প্রধান উৎস। তাই পাসপোর্ট দেওয়ার পদ্ধতির উন্নয়ন ও সহজ করতে বেশ কয়েকটি সুপারিশ করেছে দুদক। এর মধ্যে অন্যতম হলো গেজেটেড অফিসারের হাতে আবেদনপত্র ও ছবি সত্যায়ন করার প্রক্রিয়া বিলুপ্ত করা এবং পাসপোর্ট তৈরির ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশন প্রথা সময়াবদ্ধ অথবা বিলুপ্ত করা। এ ছাড়া পদ্ধতিগত সংস্কারের কথাও বলেছিল তারা। ভূমি ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতি এবং দীর্ঘসূত্রতা রোধেও নানা সুপারিশ করেছে দুদক।

শুধু তাই নয়, দুর্নীতি প্রতিরোধে ২০১৬ সাল থেকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর বা সংস্থাগুলোর দুর্নীতির বিভিন্ন উৎস চিহ্নিত করে এর পরিপ্রেক্ষিতে কার্যপ্রক্রিয়া ও পদ্ধতিগত সংস্কারের জন্য পদক্ষেপ নিতে দুদক সুপারিশ সংবলিত প্রতিবেদন পাঠালেও এসব সুপারিশ আমলে নিচ্ছে না সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি বন্ধ হচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, গত কয়েক বছরে দুদক সরকারি সেবায় অনিয়ম-দুর্নীতি-দীর্ঘসূত্রতা রোধে খাতভিত্তিক বেশকিছু সুপারিশ করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরে। এতে সুনির্দিষ্টভাবে ২৩টি খাত বা বিষয়ে সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ), স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ রেলওয়ে, ঢাকা ওয়াসা, গণপূর্ত অধিদপ্তর, অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ), মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় (ওসিজিএ), সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট, আয়কর বিভাগ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি, ঢাকা মহানগরের সব সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, দেশের সব স্থলবন্দর, ঔষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর, ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর, খাদ্য অধিদপ্তর ও অর্থ মন্ত্রণালয়।

জানা গেছে, হাসপাতালের যন্ত্রাংশ, ওষুধ, আসবাবপত্র ও আধুনিক প্রযুক্তি কেনায় দুর্নীতি-অনিয়মের বিভিন্ন চিত্র তুলে ধরে তা বন্ধে ২০১৭ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে বেশকিছু সুপারিশ পাঠিয়েছিল দুদক। এক বছরেও এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ না নেয়ায় সুপারিশ বাস্তবায়নের তাগাদা দিয়ে ২০১৮ সালে দ্বিতীয় দফায় চিঠি দেয় সংস্থাটি। কিন্তু এসব সুপারিশের অধিকাংশই কানে তোলেনি মন্ত্রণালয়। গত বছরের জুনে মন্ত্রণালয় কেবল ১৪টি চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করে। সুপারিশ কার্যকর করা হয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে সর্বশেষ চলতি বছরের মার্চে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কাছে দ্বিতীয় দফা চিঠি দেয় দুদক।

এছাড়া ২০১৯ সালের ৩১ জানুয়ারি স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে দুর্নীতির ১১টি খাত চিহ্নিত করে তা প্রতিহতের জন্য মন্ত্রণালয়ে ২৫ দফা সুপারিশ করে দুদক। প্রতিবেদনে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে বিভিন্ন ক্রয়, নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, পদায়ন, চিকিৎসা দেওয়া, চিকিৎসায় ব্যবহৃত ইক্যুপমেন্ট ব্যবহার, ওষুধ সরবরাহসহ বিভিন্ন দুর্নীতির উৎস চিহ্নিত করা হয়। দুর্নীতির এসব উৎস বন্ধে দুদকের করা সুপারিশের মধ্যে রয়েছে- তথ্যবহুল সিটিজেন চার্টার প্রদর্শন, মালামাল রিসিভ কমিটিতে বিশেষজ্ঞ সংস্থার সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত, ওষুধ ও যন্ত্রপাতি কেনার ক্ষেত্রে ইজিপি টেন্ডার প্রক্রিয়া অনুসরণ, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও বেসরকারি হাসপাতাল স্থাপন ও অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে নিজস্ব স্থায়ী চিকিৎসক বা কর্মচারী ও কার্যনির্বাহী কমিটি ইত্যাদি রয়েছে কিনা এসব বিষয় নিশ্চিত হওয়া, কর্মকর্তা-কর্মচারী বদলির নীতিমালা প্রণয়ন, চিকিৎসকদের ব্যবস্থাপত্রে ওষুধের নাম না লিখে জেনেরিক নাম লেখা বাধ্যতামূলক করা, ইন্টার্নশিপ এক বছর থেকে বাড়িয়ে দুই বছর করা এবং বর্ধিত এক বছর উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালে থাকা বাধ্যতামূলক করা, চিকিৎসকদের (সরকারি/বেসরকারি) পদোন্নতির জন্য সরকারি চাকুরেদের ক্ষেত্রে পিএসসি ও বেসরকারিদের ক্ষেত্রে মহাপরিচালক (স্বাস্থ্য) এবং পিএসসির প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে সুপারিশ দেওয়া যেতে পারে।

এরপর গত বছরের ১০ নভেম্বর দুর্নীতির ১১টি খাত চিহ্নিত করে, তা প্রতিহতের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দুদকের করা সুপারিশের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের প্রতি এ নির্দেশনা দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে কথা বলতে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব ও অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের মোবাইল নম্বরে কয়েক দফা চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘দুদক থেকে যেসব সুপারিশ দেয়া হয়েছে, আমরা প্রায় অধিকাংশ সুপারিশ বাস্তবায়নে নির্দেশনা দিয়েছি। অনেকগুলো বাস্তবায়িত হয়েছে। এবং যেখানে যেখানে আমরা দুর্নীতি দেখেছি সেখানেই আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করছি।’

এদিকে বিমানের দুর্নীতির বিভিন্ন উৎস ও তা প্রতিরোধে সুপারিশ করে ২০১৭ সালে চিঠি দেয় দুদক। এক বছরে তারাও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়ায় ২০১৮ সালে দ্বিতীয় দফা চিঠি দেয়া হয়। স্বাস্থ্য ও বিমানের মতো গণপূর্ত অধিদপ্তরে দুবার চিঠি গিয়েছে দুদক থেকে। দুর্নীতি বন্ধে এ সুপারিশ বাস্তবায়নে তারাও নির্বিকার।

২০১৭ সালের ১৩ ডিসেম্বর শিক্ষা খাতে দুর্নীতি বন্ধে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে ৩৯টি সুপারিশ করে দুদক। শিক্ষা খাতে সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রশ্নপত্র ফাঁস, নোট অথবা গাইড, কোচিং-বাণিজ্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণ, এমপিওভুক্ত, নিয়োগ ও বদলিসহ বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতির উৎস এবং তা বন্ধের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব বরাবর ৩৯টি সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করা হয়। শিক্ষা খাতে দুর্নীতি প্রতিরোধের লক্ষ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন থেকে গঠিত প্রাতিষ্ঠানিক টিমের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এ সুপারিশমালা তৈরি করা হয়। কিন্তু এসব সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

দুদকের সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়ার বিষয়ে বক্তব্য জানতে দুদকের মুখপাত্র ও পরিচালক (জনসংযোগ) প্রণব কুমার ভট্টাচার্যের সঙ্গে যোগাযোগ করে একুশে পত্রিকা। তবে তিনি কোন ধরনের মন্তব্য করতে রাজী হননি। তবে একই বিষয়ে দুদকের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান আইন, বিধিবিধান, পরিচালন পদ্ধতি, সরকারি অর্থ অপচয়ের দিকগুলো পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে ওই প্রতিষ্ঠানের সীমাবদ্ধতা, প্রতিবন্ধকতা, দুর্নীতির সম্ভাব্য উৎস ও তা প্রতিরোধের লক্ষে বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশমালা প্রণয়ন করেন দুদক কর্মকর্তারা। কমিশন সর্বোচ্চ এসব প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে অনুমোদন দেয়। দুর্নীতি প্রতিরোধে এসব রিপোর্টে করা সুপারিশমালা বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু এগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা, তার সঠিক চিত্র আমাদের কাছে নেই। হয়তো কিছু কিছু বাস্তবায়ন হচ্ছে আবার কিছু কিছু হচ্ছে না।

তিনি বলেন, পদ্ধতিগত দিক থেকে দুর্নীতির ফাঁক-ফোকরগুলো বন্ধ করা হলে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি অনেকাংশ কমে আসবে। জনগণ সরকারের সেবা নিতে এসে প্রতিদিন বিভিন্নভাবে ভোগান্তির শিকার হচ্ছে, যা আমাদের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। অথচ সেবা পাওয়া জনগণের সাংবিধানিক অধিকার। দেশের মানুষ যাতে সহজে সেবা পায়, সেজন্যই আমরা সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতির উৎস চিহ্নিত করে তা প্রতিরোধের সুপারিশ করে থাকি।’

দুদকের সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়ার বিষয়ে গত ৮ ফেব্রুয়ারি অভিযোগের সুরে তৎকালীন দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেছিলেন, মাঠপর্যায় থেকে উচ্চপর্যায় পর্যন্ত দুর্নীতি বিদ্যমান। দুদকের কর্মকর্তারা অনেক পরিশ্রম করে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের দুর্নীতি চিহ্নিত করে তা বন্ধে সুপারিশ করেছিলেন, অথচ সরকারি দপ্তরগুলো এসব সুপারিশকে গুরুত্ব দিচ্ছে না কিংবা বাস্তবায়নে উদ্যোগ নিচ্ছে না। এ কারণে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি বন্ধ হচ্ছে না।

ওইদিন দুদক চেয়ারম্যান বলেছিলেন, ২০১৯ সালে আমরা স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে ড্রাইভ শুরু করি। কারণ সাসটেইনেবল গোল (টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা) পূরণে এ দুই খাতের দুর্নীতি রোধ করা দরকার ছিল। অথচ তা সম্ভব হয়নি। জানা যায়, এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ১০ নভেম্বর স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি রোধে দুদকের দেয়া ২৫ দফা সুপারিশ বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়।

এদিকে দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান এগিয়ে নিতে গত ২৮ জানুয়ারি কয়েকটি পরামর্শ দিয়েছে টিআইবি। এর মধ্যে রয়েছে, “সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন। সামাজিক অবস্থান ও পরিচয় নির্বিশেষে সব দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে বিচারের আওতায় আনা। রাষ্ট্রীয় অবস্থানকে নিজেদের সম্পদ বিকাশের লাইসেন্স হিসেবে বিবেচনা করার সংস্কৃতিতে পরিবর্তন। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় যে স্বার্থের দ্বন্দ্ব বিরাজ করছে এবং বেসরকারি খাতে বেনামি মালিকানা সেটা নিয়ন্ত্রণের জন্য আইনি কাঠামো জোরদার এবং প্রাতিষ্ঠানিক সামর্থ্য বাড়ানো। জবাবদিহিতামূলক প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন, বিচার ব্যবস্থা, দুর্নীতি দমন কমিশন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, প্রশাসন ও জাতীয় সংসদের কার্যকারিতা বাড়ানো এবং এসব প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা। ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত রাখা। যতো ফিন্যান্সিয়াল ট্রানজেকশন হয় সেটা শেয়ারিং-এর যে পদ্ধতি বিশ্বব্যাপী চালু আছে, সেটাতে অংশ নেয়া। এতে আর্থিক খাতে দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও কর ফাকি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। ডিজিটাইজেশনের মাধ্যমে তথ্য অধিকার আরও দ্রুত ও বিস্তৃত করা। সাধারণ মানুষ, এনজিও, গণমাধ্যম যেন জবাবদিহিতা চাইতে পারে সেই সুযোগ বাড়ানো।”

জানতে চাইলে সনাক-টিআইবি চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘দুর্নীতি কমাতে সুপারিশ প্রদান করে দুদকও প্রশংসনীয় কাজ করেছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তৃপক্ষের উচিত ছিল দুদক ও টিআইবির সুপারিশগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে ব্যবস্থা নেয়া। কিন্তু তা হচ্ছে না। দুদক ও টিআইবির সুপারিশ বাস্তবায়নে সরকারকেও সহায়তা করতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর পদক্ষেপ না নিলে দুর্নীতি প্রতিরোধ সম্ভব হবে না।’