রবিবার, ২৯ মে ২০২২, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

সাংসদ জাফর আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়

প্রকাশিতঃ ২০ ডিসেম্বর ২০২১ | ৫:৫৫ অপরাহ্ন

  • আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নির্যাতন-নিপীড়ন
  • বিদ্রোহী প্রার্থীকে জেতাতে একাট্টা
  • ইউপি নির্বাচনের আচরণবিধি ভঙ্গ
  • পাহাড় কাটা ও সন্ত্রাসে সম্পৃক্তদের প্রশ্রয়
  • ভুয়া মালিক সাজিয়ে জমি আত্মসাত

জসিম উদ্দিন, কক্সবাজার : টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় রয়েছে আওয়ামী লীগ। দলটি দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকলেও শান্তিতে নেই কক্সবাজারের চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের একাংশের নেতাকর্মীরা। অনুপ্রবেশকারীদের ভিড়ে প্রকৃত নেতাকর্মীরাই এখন কোনঠাসা। বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে হওয়া খুনের মামলায় পর্যন্ত আসামি করা হয়েছে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীকে। এসব মামলার আসামি হয়ে এলাকা ছাড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতির মতো নেতারাও। পেকুয়ায় ইউনিয়ন থেকে উপজেলা কমিটি- সব জায়গাতেই আওয়ামী লীগ নেতাদের পদ দখলে নিচ্ছেন একসময়ের চিহ্নিত বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীরা।

চকরিয়া ও পেকুয়া আওয়ামী লীগের একাংশের অভিযোগ, স্থানীয় সংসদ সদস্য ও চকরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি জাফর আলমের নেতৃত্ব আওয়ামী লীগ নিধন করা হচ্ছে। গড়ে তোলা হয়েছে ‘জাফরলীগ’। যদিও এমপি জাফর ছত্রছায়ায় থাকা সন্ত্রাসীদের নির্যাতনের ভয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার সাহস নেই কারও। তারা জানান, এমপি জাফরের অনুগত হিসেবে পরিচিত সন্ত্রাসীরা চকরিয়া ও পেকুয়ার সব জায়গায় খুন, চাঁদাবাজি, জমি দখল, ইয়াবা ব্যবসাসহ নানা অপরাধের মাধ্যমে সমানতালে তাণ্ডব চালাচ্ছেন। স্থানীয় নির্বাচনে নৌকার বিরুদ্ধেও অবস্থান নিয়েছেন কক্সবাজারের প্রভাবশালী এ এমপি। এসব কারণে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন চকরিয়া ও পেকুয়ার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের পাশাপাশি এই দুই উপজেলার সাধারণ মানুষও।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের অভিযোগ, জাফর আলম ছাত্র ইউনিয়ন ও জাসদ ঘুরে আওয়ামী লীগে এসে সংসদ সদস্য হয়েছেন। ভাগ্যের জোরে এমপি হওয়া জাফর তাই নিজের অতীত ইতিহাসের প্রতিফলন ঘটাচ্ছেন। আর পেকুয়া-চকরিয়ায় চালিয়ে যাচ্ছেন আওয়ামী লীগ নিধন। পেকুয়া ও চকরিয়া উপজেলার বিভিন্ন পর্যায়ের আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যারা স্বাধীনতাবিরোধী ও আওয়ামী লীগের মিটিং-মিছিলে হামলা চালিয়েছে এখন তাদের রাজত্ব চলছে- এই দুই উপজেলায়। এলাকায় যারা দলের দুঃসময়ে মাঠে অবস্থান করে আওয়ামী লীগের জন্য লড়াই সংগ্রাম করেছেন, হাইব্রিডদের উৎপাতে তাদের খুঁজে পাওয়ায় এখন দুষ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পেকুয়া উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের একটি মগনামা। এই মগনামা ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি ও ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সোলতান মোহাম্মদ রিপন। তিনি মগনামা ইউনিয়েনের মহুরীপাড়া গ্রামের মৃত মাহাবুবুর রহমানের ছেলে। পরিবারের বড় সন্তান রিপনের জীবনের ভয়াবহ দিন গেছে ২০১৬ সালের ৪ এপ্রিল। যুবদল ও বিএনপির ক্যাডাররা তাকে হাতুড়ি ও লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর আহত করে।

রিপন বলেন, ‘৩১ মার্চ পেকুয়ার ইউপি নির্বাচন শেষ হয়। ধানের শীষের প্রার্থী শরাফত উল্লাহ ওয়াসিম নির্বাচনে বিজয়ের পর নৌকার প্রার্থী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে উঠে। গত ৪ এপ্রিল রাতে আমার ওপর বিনা কারণে হামলা করা হয়। ওয়াসিমের নির্দেশে বিএনপির ক্যাডাররা আমাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিলো। সে সম্পর্কে আমার চাচাতো ভাই। ওই সময়ে নৌকা প্রার্থী খাইরুল আনামের সাথে আমার কিছু সমস্যা ছিলো। আমাকে সে মেরে ফেললে কেউ তাকে সন্দেহ করতো না। সে চেয়েছিলো আমাকে মেরে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রার্থীকে ফাঁসাতে। আমি ১১ দিন আইসিউতে ছিলাম। প্রাণে বেঁচে গেলেও দুই বছর এলাকা ছাড়া ছিলাম। খাইরুল আনাম তার টার্গেট ছিলো। সেখানে আমাকে বলির পাঠা বানাতে চাচ্ছিলো।’

তিনি বলেন, ‘গত ২ মে মগনামা ইউনিয়নের ফুলতলা স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় খুন হন জয়নাল আবেদীন। সে ওয়াসিম বাহিনীর ক্যাডার ছিলো। বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে খুন হওয়া জয়নালের মামলায় ইউনিয়ন ছাত্রদল সভাপতিসহ বিএনপি নেতাকমীদের আসামি করা হয়। কিন্তু প্রধান আসামি করা হয়েছে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আনোয়ারুল আজিমকে। ঘটনার সময় আমি দেড় কিলোমিটার দূরে থাকলেও আমাকে ৮ নম্বর আসামি করা হয়। এরপর থেকে এখনও আমি পলাতক রয়েছি। মামলার ২ নম্বর আসামি ইউনুছ চৌধুরী ও আমি আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী। ওয়াসিম এখন থেকেই আমাদের কীভাবে সরিয়ে দেয়া যায় সে লক্ষে কাজ করছে।’

জানা গেছে, ক্ষমতার পালাবদলে রঙ বদলানো ওয়াসিম এক সময়ে দুর্ধর্ষ শিবির ক্যাডার ছিলো। যুদ্ধাপরাধের মামলায় ফাঁসি কার্যকর হওয়া মীর কাসেম আলীর প্রতিষ্ঠান কেয়ারি সিনবাদে চাকরি করতেন তিনি। এরপর সেখান থেকে বিএনপি নেতা বনে যান। ২০১৬ সালে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করে হয়ে যান ইউনিয়ন চেয়ারম্যান। উপজেলা বিএনপির সাবেক আপ্যায়ন বিষয়ক সম্পাদক ওয়াসিম এখন অঘোষিত আওয়ামী লীগ নেতা। বর্তমানে সংসদ সদস্য জাফর আলমের সাথে নানা অনুষ্ঠানে দেখা যায় তাকে। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথেও রয়েছে তার ছবি। আর এসব দেখিয়েই তিনি দিনদিন প্রভাব বাড়াচ্ছেন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে। থানায় হত্যা, মাদকসহ অর্ধডজন মামলায় অভিযুক্ত থাকলেও সংসদ সদস্য জাফর আলমের ছত্রছায়ায় এসে তিনিই এখন বড় আওয়ামী লীগার।

জানা গেছে, একাদশ সংসদ নির্বাচনের কয়েকদিন পর অনুষ্ঠান করে সংসদ সদস্য জাফর আলমের হাতে ফুল দিয়ে শতাধিক অনুসারীসহ আওয়ামী লীগে যোগ দেন চেয়ারম্যান ওয়াসিম। সেসময় ওয়াসিমকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেন জাফর আলম। জমি দখল, নিরীহদের ওপর নির্যাতন, চাঁদাবাজি, ইয়াবা ও মাদক বিক্রি কোনো কিছুতেই বাদ নেই ওয়াসিমের নাম। অভিযোগ আছে, পেকুয়ার মগনামা ঘাট দিয়ে মগনামা-কুতুবদিয়া সাগর চ্যানেল হয়ে সাগরপথে চালান পৌঁছে দেন তিনি। আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের শুধু নির্যাতনই নয়। ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিতে নাম লেখানো ওয়াসিমের মামলার ফাঁদে পড়ে গেলো কয়েক বছরে এলাকাছাড়া হয়েছেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতিসহ শত শত নেতা-কর্মী। এসব বিষয়ে দলের নেতাদের জানিয়েও প্রতিকার পাননি তারা।

চেয়ারম্যান ওয়াসিমের সাথে থাকা লোকজনও বিএনপি-জামায়াতের সাথে সম্পৃক্ত। তাদের সমন্বয়ে তিনি তৈরি করেছেন সশস্ত্র বাহিনী। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ওয়াসিম সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে মগনামা ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ নেতা ইউনুস আলীকে অপহরণ করার অভিযোগ উঠে। দুর্ধর্ষ ওয়াসিমের মামলার জালে ফেঁসে এরই মধ্যে দেশ ছেড়েছেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আনোয়ারুল আজিম। ভালো নেই বর্তমান সভাপতি খায়রুল এনামও। ওয়াসিমের সশস্ত্র বাহিনীর কারণে দেড় থেকে দুই বছর হলো এলাকা ছাড়া তিনি। আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের ওপর ওয়াসিম চালানো নির্যাতন নিয়ে ‘দুঃখি আওয়ামী লীগের কান্না। কান্দে আওয়ামী লীগ, কান্দে মানবতা, একজন শিবির ক্যাডারের হাতে জিম্মি ৩০ হাজার জনতা’ নামে উপজেলায় পোস্টারিংও করেছেন মগনামা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা।

পেকুয়া উপজেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মুহাম্মদ হাসেম বলেন, ‘আওয়ামী লীগের প্রত্যেক নেতা-কর্মী তার মামলার আসামি। আমাদের এমপি জাফর আলম একসময় বিএনপি করতেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ভোট কেন্দ্র থেকে নৌকার এজেন্টকে বের করে দেন তিনি। নিজেও অনুপ্রবেশকারী, যা তদন্ত করলে বেরিয়ে আসবে। ১৯৭৮ সালের দিকে বঙ্গবন্ধু হত্যার খুনিদের পুনবার্সনেও সহায়তা করেছেন তিনি।’

তিনি বলেন, আমরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বুকে লালন করে রাজনীতি করি। বিএনপি থেকে নির্বাচিত চেয়ারম্যানের নির্যাতন আর কত সহ্য করবো। চেয়ারম্যান ওয়াসিম ও তার ক্যাডার বাহিনীদের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পিছনে লেলিয়ে দিয়েছেন জাফর আলম। একসময়ের শিবির নেতা ওয়াসিম এখনো ধানের শীষের চেয়ারম্যান। ইয়াবা বিক্রি করে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছে। ওয়াসিম যা বলে তাই করেন এমপি। পেকুয়া ও চকরিয়া থেকে আওয়ামী লীগ নিধন করতে এমপি একাই যথেষ্ট।’

চেয়ারম্যান ওয়াসিমের সশস্ত্র বাহিনী গোপন হামলা চালাতে পারে এ জন্য এলাকায় কম যান জানিয়ে মগমনা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি খায়রুল আমিন বলেন, ‘আমি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নির্বাচিত সভাপতি, সাবেক চেয়ারম্যানও ছিলাম। এখন এলাকার পরিস্থিতি খুবই খারাপ। চেয়ারম্যান ওয়াসিম এমপির সহায়তায় কয়েকশ’ কোটি টাকার মালিক। আমরা খাবার জুটাতে পারি না। আমার ওপর একদিন রাতে হামলা করেছিলো। তার সাথে এমপি, থানা প্রশাসনের ভালো সম্পর্ক। উনি মিথ্যা বললেও মামলা নিয়ে নেয়। আর না হলে রাতে ধরে নিয়ে যাবে। আমরা আওয়ামী লীগ করি। অথচ আমাদের কথা জেলা, উপজেলা আওয়ামী লীগ কেউ শুনে না। এমপিও ওয়াসিরে পক্ষে কথা বলে। এখন আমরা যাই কই? আমাদের কথা কি কেন্দ্র শুনবে?’ এসব বিষয়ে প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রী, আইজিপি, র‌্যাব মহাপরিচালক বরাবর অভিযোগ দিয়েছি। আমার কাছে রিসিভ কপি আছে। কিন্তু কোনো কাজ হয় না।’

রাজাখালী ইউনিয়ন প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা নুরুল ইসলাম বিএসসি। ছিলেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতির দায়িত্বে। কাউন্সিল ছাড়াই হঠাৎ একদিন শুনেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। সেই পদে দায়িত্ব দেয়া হয় ছৈয়দ নুরকে। এলাকায় যিনি একজন ডাকাত সর্দার ও অস্ত্র ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত। রাজাখালী ইউপি নির্বাচনে দলীয় প্রতীক নৌকার বিরুদ্ধে ভোট করে নির্বাচিত হন ছৈয়দ নুর। ওই কমিটির সাধারণ সম্পাদক করা হয় নাছির উদ্দিনকে। উপজেলা শ্রমিকদলের সাবেক নেতা নাছিরের বিরুদ্ধেও একাধিক মামলা রয়েছে। তাদের দু’জনই সংসদ সদস্য জাফর আলমের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত।

জানা গেছে, ছৈয়দ নুরের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন থানায় ডজনেরও বেশি মামলা রয়েছে। র‌্যাবের কক্সবাজার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালের ৩০ এপ্রিল রাতে পেকুয়ার বারাইয়াকাটা এলাকা থেকে একটি পিস্তল ও দুই রাউন্ড গুলিসহ ছৈয়দ নূরকে হাতেনাতে আটক করে র‌্যাব। পরে তার দেয়া তথ্যমতে, অভিযান চালিয়ে একটি এসএমজি (অটোমেটিক সাব মেশিন কারবাইন), একটি রিভলভার, একটি ওয়ান শুটার গান ও পাঁচ রাউন্ড রিভলবারের গুলি উদ্ধার করা হয়। ২০২০ সালের মে মাসে তার বিরুদ্ধে দুই ইউপি সদস্যকে মারধর ও অপহরণের অভিযোগ উঠে। চেয়ারম্যান ছৈয়দ নুর ও তার পুরো পরিবার বিএনপির রাজনীতির সাথে সক্রিয়। তার ছোটভাই নুরুল আবসার বধু উপজেলা বিএনপির বর্তমান কমিটির সহ-সভাপতি। তার অপর ভাই জাহাঙ্গীর আলম ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি। তাদের বিরুদ্ধে ২০১৩ সালে রাজাখালী সবুজ বাজারে আওয়ামী লীগের মিছিলে গুলিবর্ষণ করে হামলা করার অভিযোগও রয়েছে।

জানা যায়, পেকুয়া সদর ইউনিয়নে বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন সাবেক যুবদল নেতা মাহাবুল করিম ও বিএনপি নেতা ঈসমাইল মেম্বার। নির্বাচনে বিজয়ের কিছু দিন পর তাদেরকে ফুলের মালা দিয়ে আওয়ামী লীগে বরণ করে নেন এমপি জাফর। জানা গেছে, উপজেলা আওয়ামী লীগের আহবায়ক আবু হেনা মোস্তফার পিতা আব্দুল গণী ছিলেন জামায়াত নেতা। তার পরিবারের মধ্যে তিনিই একমাত্র আওয়ামী লীগ করেন। জেলা আওয়ামী লীগের প্রয়াত এক নেতার মেয়েকে বিয়ে করা ও সাংসদ জাফর আলমের কারণে পেয়ে গেছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ পদ।

সংসদ সদস্য জাফর আলমের বিরুদ্ধে চলতি বছরের জুন মাসে আওয়ামী লীগের কয়েকজন কর্মী-সমর্থককে পিটুনি দেয়ার অভিযোগ উঠে। পরে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ১০ জুন জাফর আলমকে চকরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। একইসাথে তাকে দল থেকে বহিষ্কারের জন্য কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে সুপারিশ করে জেলা আওয়ামী লীগ। যদিও এর কয়েকদিনের মাথায় সমঝোতার মাধ্যমে আবারো তাকে পুনর্বহাল করে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ। গত ২১ জুনের পৌরসভা নির্বাচনে সংসদ সদস্যের ভাতিজা জিয়াবুল হক নৌকার বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন।

এদিকে এমপি জাফর আলমের বিরুদ্ধে পেকুয়া ও চকরিয়ার আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের কোণঠাসা করে রাখার অভিযোগ পুরনো। এসব এলাকার নেতাকর্মীদের অভিযোগ, কোটিপতিদের দলে অনুপ্রবেশ করিয়ে তাদের রাজত্ব কায়েম করছেন জাফর আলম। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে এমপি হলেও এখন কৌশলে আওয়ামী লীগ নিধনের মিশনে নেমেছেন তিনি। তৃণমূলের ত্যাগী নেতা-কর্মীদের রক্ষায় কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের হস্তক্ষেপ চান তারা।

স্থানীয় সংসদ হিসেবে জাফর আলমের সাথে সুসম্পর্ক থাকলেও তার বিরুদ্ধে ওঠা সকল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ওয়াসিম শারাফাত চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘আমাকে যারা ইয়াবা ব্যবসায়ী বলছে, প্রকৃতপক্ষে তারাই ইয়াবা কারবারি।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নিজের বিরুদ্ধে উঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সাংসদ জাফর আলম।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, ‘আমরা যখন কোনো জেলায় সফরে যাই তখন সেখানে শতশত নেতাকর্মী আসে। তখন কেউ বিএনপি বা অন্য কোন দল থেকে আগত কি-না তা জানা সম্ভব হয় না। তবে আমরা দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের শক্তভাবে নির্দেশনা দিয়েছি যে, বিএনপি বা অন্য কোন দল থেকে কোনো সন্ত্রাসী কিংবা যার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে এ ধরণের লোকদের দলে যোগদান না করাতে। এর আগে এই (ওয়াসিম) বিষয়টি আমাদের কানে এসেছে, ওই সময় আমরা চকরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি জাফর আলমকে জিজ্ঞেস করেছি। তিনি বিষয়টি অস্বীকার করেছিলেন।’

নির্বাচনে নৌকার বিপক্ষে নেয়ার অভিযোগ
এদিকে চকরিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য চতুর্থ ধাপের ইউপি নির্বাচনেও সরকারদলীয় স্থানীয় সংসদ সদস্য জাফর আলম নৌকার প্রার্থী ও তার অপছন্দের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করে জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোন ধরণের হস্তক্ষেপ না করতে সংসদ সদস্যদের প্রতি সরকারি নির্দেশনা থাকলেও জাফর আলম তা মানছেন না। নৌকার প্রার্থীসহ অন্য স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বিপক্ষে গিয়ে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে জয়ী করতে সরকারদলীয় এ সংসদ সদস্য নানা ধরণের বক্তব্য দিচ্ছেন।

চকরিয়ার আটটি ইউপিতে ২৬ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জাফর আলম ভোটারদের হুমকি-ধমকি ও ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক চেয়ারম্যান প্রার্থী। এর আগে তৃতীয় দফায় সম্পন্ন হওয়া নির্বাচনে চকরিয়া-পেকুয়ার ১১টি ইউপির নির্বাচনে নৌকার ভরাডুবির জন্য এমপি জাফর আলমকে দায়ী করেছেন আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। তাদের দাবি, চকরিয়া-পেকুয়ায় এমপি জাফর আলমের অনুসারি ছাড়া যারাই নৌকা পেয়েছেন তাদের পরাজিত করতে নানাভাবে ভূমিকা রেখেছেন তিনি। ফলে চকরিয়ার কৈয়ারবিল ইউনিয়নে নৌকার প্রার্থী জন্নাতুল বকেয়া রেখা মাত্র ৯৯ ভোট পেয়ে দেশে নৌকার হেরে যাওয়া ইউনিয়নগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন ভোট পাওয়ার রেকর্ড গড়েছেন।

আবার নিজের পছন্দের স্বতন্ত্র প্রার্থী, দক্ষিণ চট্টগ্রামের গরুচোর সিন্ডিকেটের প্রধান হিসেবে পরিচিত নবী হোসেন প্রকাশ নইব্যা চোরার চেয়ারম্যান হওয়ার পেছনে এমপি জাফর আলম সহযোগিতা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। সদ্য সমাপ্ত হওয়া তৃতীয় ধাপের নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে হেরে গেছেন পেকুয়ার উজানটিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম শহিদ। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘স্বতন্ত্রপ্রার্থী তোফাজ্জাল করিমকে জেতানোর জন্য নৌকার বিরুদ্ধে যা যা করা দরকার সবই করেছেন এমপি জাফর আলম।’ নির্বাচনের আগেও একই অভিযোগ করেছিলেন শহিদুল ইসলাম শহিদ।

একই ধরনের অভিযোগ করেছেন, নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে হেরে যাওয়া আরও কয়েকজন প্রার্থী। এদিকে আগামী ২৬ ডিসেম্বর চতুর্থ ধাপের নির্বাচনকে সামনে রেখে ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী নাছির উদ্দিন চৌধুরীর কর্মী-সমর্থকদের স্থানীয় সাংসদ জাফর আলম প্রকাশ্যে হুমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী নাছির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘আমার প্রতি মানুষের বিপুল সমর্থন দেখে ঈর্ষান্বিত হয়ে সাংসদ জাফর আলম প্রকাশ্যে হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন। তিনি হুংকার দিচ্ছেন যেকোন মূল্যে প্রতিটি ভোটকেন্দ্র দখলে নিয়ে আমাকে চেয়ারম্যান হতে দেবেন না।’

তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচন উপলক্ষে ফাঁসিয়াখালীতে অবৈধ অস্ত্রধারী বহিরাগতদের আনাগোনা বেড়েছে। ২৬ ডিসেম্বর নির্বাচনে ইউনিয়নের ৭ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটকেন্দ্র দখলে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন এমপি জাফর আলম।’

ডুলাহাজারা ইউনিয়নে লাঙ্গল প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থী ও বর্তমান চেয়ারম্যান নুরুল আমিন এবং স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী কলিম উল্লাহ কলির বিরুদ্ধেও এমপি জাফর আলম তৎপর রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ওই ইউনিয়নে বিশেষ বাহিনী দিয়ে দখলে নিয়ে এমপির সাবেক পিএস বিদ্রোহী প্রার্থী হাসানুল ইসলাম আদরকে (আনারস মার্কায়) জয়ী করা হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন প্রার্থীরা। এ ধরনের বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

অপরদিকে, চিরিংগা ইউনিয়নে এমপি জাফরের বেয়াই, স্বতন্ত্র প্রার্থী জামাল হোসেনকে নির্বাচনে জেতানোর কৌশল হিসেবে তার আপন ভাইপো তৃণমূলে গ্রহণযোগ্যতাহীন প্রার্থীকে নৌকার মনোনয়ন এনে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে এমপি জাফরের বিরুদ্ধে।

চিরিংগা ইউনিয়নের টানা তিনবারের নির্বাচিত বর্তমান চেয়ারম্যান ও স্বতন্ত্র প্রার্থী জসিম উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের এমপি (জাফর আলম) উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হয়েও নৌকার পক্ষে প্রচারণা না করে, আমাকে হারানোর অপকৌশল হিসেবে প্রকাশ্যে আমার কর্মী-সমর্থকদের হুমকি-ধমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করছেন এবং ভোটকেন্দ্র দখলে নেবেন- এমন ঘোষণাও দিয়েছেন।’

একই ইউনিয়নের তিনবারের সাবেক চেয়ারম্যান ও মোটরসাইকেল প্রতীকের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা খাজা সালাহউদ্দিনও এমপি জাফর আলমের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ করে বলেন, ‘নির্বাচন চলাকালে ওনি (এমপি) স্থানীয় সরকার নির্বাচন আচরণবিধির ১২ ধারার তোয়াক্কা না করে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে, ওনার পছন্দের প্রার্থী (বিদ্রোহী প্রার্থী) জামাল হোসেন চৌধুরীর আনারস প্রতীকে ভোট চাইছেন।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে চকরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের একজন দায়িত্বশীল নেতা বলেন, ‘মূলত চকরিয়া-পেকুয়ায় এমপি জাফর লীগই শেষ কথা। এমপির অনুসারীরা নৌকা না পেলে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করা প্রার্থীদের পরাজিত করতে যা যা করা দরকার সবই করেছেন বা করছেন জাফর আলম। এবং অনুসারীদের বিদ্রোহী প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিয়ে জয়ের জন্য ভূমিকা রেখেছেন তিনি। চতুর্থ ধাপের নির্বাচনকে সামনে রেখেও একই পথ অবলম্বন করেছেন এমপি। এতে করে অসহায় হয়ে পড়া আওয়ামী লীগের প্রার্থীর করুণ পরিণতি হতে পারে।

এমপি জাফর আলমের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র ও বিদ্রোহী প্রার্থী দাঁড় করিয়ে নৌকার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ সত্য করে মন্তব্য করেছেন কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পৌর মেয়র মুজিবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘এমপি জাফর আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। ইতিমধ্যে কেন্দ্রে বিষয়টি অবগত করা হয়েছে।’

তবে সকল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সাংসদ জাফর আলম। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী একজন সাংসদ নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার অংশ নিতে পারেন না, সেই সুযোগ নেই। অগ্রহণযোগ্য প্রার্থীর হাতে নৌকা দেয়ায় তৃতীয় ধাপে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে কয়েকটি ইউনিয়নে নৌকার শোচনীয় পরাজয় হয়েছে।’ তার বিরুদ্ধে একটি মহল নানাভাবে ষড়যন্ত্র লিপ্ত বলেও জানান এমপি জাফর আলম।

এদিকে পাহাড় কাটায় জড়িতদের প্রশ্রয় দেয়ার অভিযোগও আছে এমপি জাফরের বিরুদ্ধে। গত বছরের ৯ অক্টোবর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভায় জানানো হয়, সারা দেশের মধ্যে কক্সবাজারে সবচেয়ে বেশি, ৫৯ হাজার ৪৭১ একর বনভূমি বেদখল হয়ে গেছে। সারা দেশে দখল হয়েছে ২ লাখ ৮৭ হাজার একর। এ স্থায়ী কমিটির সদস্য মো. জাফর আলম কক্সবাজারের চকরিয়া এলাকার সাংসদ। যারা পাহাড় কাটায় সম্পৃক্ত, তিনি তাদের প্রশ্রয় দেন বলেও অভিযোগ আছে।

চকরিয়ার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ফজলুল করিম সাঈদীর বিরুদ্ধে অবৈধভাবে পাহাড় কাটা এবং বালু উত্তোলন, ডুলাহাজারার ইউপি চেয়ারম্যান নুরুল আমিন, চকরিয়ার ফাসিয়াখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন, ইউপি সদস্য গিয়াস উদ্দিনসহ অনেক জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে পাহাড় ও বন উজাড়ের অভিযোগ রয়েছে। যাদের অনেকেই এমপি জাফর আলমের অনুসারী হিসেবে এলাকায় পরিচিত।

দখল-বাণিজ্যের অভিযোগ
অভিযোগ আছে, চকরিয়া পৌর বাস টার্মিনালের পূর্ব পাশের প্রাচীনতম জলাশয় দখল ও ভরাট করে একটি শিল্প গ্রুপের বিক্রি করেছেন এমপি জাফর আলম। চকরিয়া থানা রাস্তার মাথায় সিস্টেম কমপ্লেক্স ও নিজের স্ত্রী শাহেদা বেগমের নামে তৈরি করা মাল্টিপ্লেক্স ভবন ‘শাহেদা কমপ্লেক্স’ তৈরি করেছেন অন্যের জায়গায়। উক্ত জমি কেনার ক্ষেত্রে নানা অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ আছে।

অভিযোগ আছে, কয়েক মাস আগে গ্রামীণ ব্যাংকের নামে বরাদ্দকৃত রামপুর মৌজায় ৩০০ একর চিংড়ি প্রজেক্ট জামাল হোসেন চৌধুরীকে দিয়ে রাতের অন্ধকারে জবর দখল করে নিয়েছেন জাফর আলম। এ ছাড়াও এমপি জাফর আলমের প্রশ্রয় পাওয়া সন্ত্রাসীরা পেকুয়া ও চকরিয়াতে ব্যক্তি মালিকানাধীন কয়েকটি চিংড়ি ঘের, হাজার একর বনভূমি দখল করে রেখেছেন। বরইতলী-মগনামা সড়কে নবনির্মিত বানৌজা শেখ হাসিনা ঘাঁটি সড়কে মাটি দেওয়ার নাম করে মছনিয়া কাটা এলাকার বিশাল পাহাড় কেটে ফেলার অভিযোগ আছে এমপি জাফর আলমের বিরুদ্ধে।

এদিকে সংসদ সদস্য জাফর আলম ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও প্রতারণার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ পরিবারের জমি আত্মসাতের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, মালিক না হলেও একাধিক ব্যক্তিকে জমির মালিক বানিয়ে পেকুয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে জমি রেজিস্ট্রি করে নিয়েছেন চকরিয়া আওয়ামী লীগের সভাপতি জাফর আলম। আর এতে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি নানামুখী বিপাকে পড়েছেন আওয়ামী পরিবারের স্থানীয় নেতা-কর্মীরাও। দলে অনুপ্রবেশকারীদের সঙ্গে নিয়ে তাদের জমি দখল করে মার্কেট নির্মাণের কাজও করাচ্ছেন জাফর আলম।

ভুক্তভোগীরা জানান, সংসদ সদস্য হওয়ার আগে জমি-জমা দখলের কাজ না করলেও নির্বাচিত হওয়ার পর রূপ বদলাতে থাকেন জাফর আলম, এখন তিনি আগ্রাসী ভূমিকা নিয়ে চলছেন। পেকুয়া মৌজায় ২০২০ সালে এক মাসের ব্যবধানে ৬টি দলিলে নিঃস্বত্বদের কাছ থেকে স্বাক্ষর নিয়ে সংসদ সদস্য নিজে ছাড়াও তার মেয়ে এবং নিকটাত্মীয়দের নামে প্রায় ১ একর জমির মালিক বনে গেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ভুক্তভোগীদের দাবি, জাফর আলম যে ব্যক্তিদের কাছ থেকে জমির মালিকানা নিয়েছেন এসব জমি তাদের পূর্বসূরীরা সম্পূর্ণ স্বত্ব ত্যাগ করে ১৯৬৪ সালে চট্টগ্রাম মহকুমা ডিসির কাছে সরকার বরাবর হস্তান্তর (রেজিস্ট্রেশন) করেন। সে সময়ে আরএস খতিয়ানে বেশ কয়েকজন মালিক ছিলেন। তার মধ্যে কয়েকজন ১৯৬৪ সালে তাদের অংশ সরকার বরাবর বিক্রি করেন। এরপর একই জমি তাদের উত্তরসূরীদের তথ্য গোপন করে রেজিস্ট্রি করেন জাফর আলম। আর অনিয়ম করে নিঃস্বত্বদের ভুয়া খতিয়ানের মালিক করেছেন তিনি।

অন্যদিকে কিছু মালিক সে সময়ে আরএস খতিয়ানের জমি বিক্রি করেননি এবং পরবর্তীতে বিএসও করেননি। ২০১৪ সালে মার্চে এসব জমির ভোগ দখলে থাকা ৫০ মালিক বিএস ৭৯২ নম্বর খতিয়ানের অপ্রত্যাহারযোগ্য আম-মোক্তারনামামূলে ফরিদুল ও অন্যান্যদের হস্তান্তর করেন। আম-মোক্তারনামার এ তালিকায় জাফর আলমের নামও ছিলো। পরে আম-মোক্তারনামার শর্ত ভঙ্গ করে নিঃস্বত্বদের স্বাক্ষর নিয়ে দলিল সৃষ্টি করে এসব জমি কিনে নিয়েছেন জাফর। এখন ফরিদুল আলমদের জায়গা জবর-দখলের চেষ্টা করছেন এমপি জাফর। এর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ায় গুম ও মেরে ফেলার হুমকি দেয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

বিরোধীয় খতিয়ানের জমির কাগজপত্র আইনজীবীরা পর্যালোচনা করে দেখেছেন, জাফর আলম ও তার আত্মীয়দের নামে কেনা এসব জমির মালিক নিঃস্বত্ব। এসব জমি বিক্রি করার আইনি কোনো অধিকারই তাদের নেই। আর আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে রেজিস্ট্রিযুক্ত আম-মোক্তারনামামূলে হস্তান্তরসহ যাবতীয় কাজ করার জন্য আম-মোক্তার নিয়োগ করার পর আইনত উক্ত আম-মোক্তারনামা কোনো উপযুক্ত আদালত কর্তৃক বাতিল না হওয়া পর্যন্ত কার্যকারিতা বলবৎ থাকে। এবং তা বলবৎ থাকাবস্থায় পরবর্তীতে নতুন কোনো দলিল তৈরি করা হলে তা অকার্যকর ও বাতিল দলিল হিসেবে গণ্য হয়। এছাড়া আইনত মামলা চলমান থাকলে কোনো জমি কেনা, বেচা ও হস্তান্তর নিষিদ্ধ।

অথচ মামলা চলাকালীন এসব জমি নিজের ও আত্মীয়-স্বজনের নামে দাবি করে কক্সবাজারের পেকুয়ার কবির আহমদ চৌধুরী বাজারে নিউ মার্কেট নির্মাণে তোড়জোর শুরু করেছেন সংসদ সদস্য জাফর আলম। ওই দলিলের ভিত্তিতে চালাচ্ছেন নির্মাণকাজও। জমির জবরদখল ঠেকাতে ২০১৫ সালে কক্সবাজারের যুগ্ম জেলা জজ ২য় আদালতে মামলা করেছে আরএস মূলে মালিক দাবিকারী পক্ষ।

জমির কাগজপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কক্সবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য জাফর আলম, মেহের আলী ও মনছুর আলীকে ২০২০ সালের ২৮ অক্টোবর ১৮৭৯ নম্বর দলিলে পেকুয়া উপজেলার পেকুয়া মৌজার বিরোধীয় বিএস ৭৯২ খতিয়ানের ৪৬৩১ দাগ থেকে ১৫ দশমিক ৯০ শতক জমি লিখে দেন মমতাজ বেগম ও অন্যরা। এই জমির কাগজপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১৪ সালের ২৪ মার্চ রেজিস্ট্রিযুক্ত আম-মোক্তারনামামূলে ফরিদুল আলমদের এই জমি হস্তান্তর করেন পেকুয়ার পূর্ব বাইম্যাখালী গ্রামের মৃত ছৈয়দ আহমদের স্ত্রী মমতাজ বেগম। এর আগে এই খতিয়ানের জমি ১৯৬৪ সালে ২৪ সেপ্টেম্বর মৃত ছৈয়দ আহমদ সম্পূর্ণ স্বত্ব ত্যাগ করে চট্টগ্রাম মহকুমা ডিসির নিকট সরকার বরাবর হস্তান্তর করেছেন। আইনানুযায়ী এই জমি বিক্রির তার কোনো এখতিয়ার নেই।

২০২০ সালের ২৯ অক্টোবর বিরোধীয় বিএস ৭৯২ খতিয়ানের ৩৭ শতক জমি জাফর আলমের নিকট বিক্রি করেন আনছার উদ্দিন ও অন্যরা। এর মধ্যে ৪৬৩১ দাগের ১৪ শতক এবং ৪৬৩৩ দাগের ২৩ শতক জমি। কিন্তু ১৯৬৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর একই খতিয়ানের মালিক আব্দুল আলী প্রকাশ আবদুল বারীর ওয়ারিশ ১৬৯৮ কবলামূলে এবং হাবিবুর রহমান, কবির আহমদ ও মকবুল আলীর ওয়ারিশ ১৬৯৩ নম্বর কবলামূলে মহকুমা ডিসির নিকট সরকার বরাবরে হস্তান্তর করেছেন। আইন অনুসারে এই জমি বিক্রির অধিকার নেই আনছার উদ্দিনদের।

অন্যদিকে জাফর আলমের মেয়ে তানিয়া আফরিন। ২০২০ সাালের ১০ নভেম্বর ১৯৮৮ নম্বর দলিলে বিরোধীয় বিএস ৭৯২ নম্বর খতিয়ানের ৪৬৩৩ দাগের ৬ শতক জমি মিনার রাইস মিলের পক্ষে তানিয়া আফরিনদের কাছে বিক্রি করেন জাকের হোছাইন চেীধুরী। এই জমির কাগজ অনুযায়ী, দলিলে ৪৬৩১ দাগ লিপিবদ্ধ না থাকায় দলিলের গ্রহীতাগণ ৪৬৩১ দাগের জমির দাবি করার সুযোগ নেই।

বিএস ৭৯২ নম্বর খতিয়ানের মালিক মুছা আলী ও সাইর বিবি পেঠান আলীর ওয়ারিশ করম আলীদের ১৬৯৪ ও ১৬৯৬ নম্বর দলিলে এবং গোলাম ছোবহান, আজিজুর রহমান ও মকবুল আলীর ওয়ারিশ ১৬৯৩ দলিলমূলে ১৯৬৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ৪৬৩১ দাগে তাদের প্রাপ্ত জমি সম্পূর্ণ স্বত্ব ডিসি বরাবরে হস্তান্তর করে দেন। সেই জমির মালিক দাবি করে আবদুর রহমানদের পেকুয়া মৌজার বিরোধীয় বিএস ৪৬৩১ দাগের ৬ দশমিক ৪৬ শতক জমি ২০২০ সালের ১১ নভেম্বর এমপি জাফর আলমের মেয়ে তানিয়া আফরিনের কাছে যায়। অথচ এই দাগের জমি আগে সরকার বরাবর হস্তান্তর করায় আবদুর রহমানরা জমি বিক্রির অধিকার হারান।

পেকুয়া উপজেলার পেকুয়া মৌজার পেঠান আলীর ওয়ারিশ ১৯৬৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ১৬৯৪ এবং মৃত মকবলি আলীর ওয়ারিশ ১৬৮৩ কবলামূলে প্রাপ্ত জমি সম্পূর্ণ স্বত্ব চট্টগ্রাম মহকুমা ডিসি বরাবরে হস্তান্তর করে দেন। সেই জমির মালিকানা দাবি করা হেলাল উদ্দিনের কাছ থেকে ২০২০ সালের ২৯ অক্টোবরে মৃত লাল মোহাম্মদের ছেলে সংসদ সদস্য জাফর আলম জমি কিনে নেন। অথচ বিএস দাগ ৪৬৩১, ৪৬৩৩ ও ৪৬৩৪-এর জমি বিক্রির অধিকারই নেই হেলাল উদ্দিনের।

পেকুয়ার পূর্ব বাইম্যাখালী গ্রামের আব্দুর রহিম বাদশা। তিনি তার কাছে থাকা একই খতিয়ানের সাকল্যে থাকা জমি অর্পণ করার পর ২০২০ সালের ১৯ অক্টোবর ১৯১৯ নম্বর দলিলে জাফর আলমের কাছে হস্তান্তর করেন। কিন্তু এর আগে ২০১৪ সালের ২৪ মার্চ মাসে রেজিস্ট্রার্ড আম-মোক্তারনামায় তিনি জমি অন্যপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেন। আইন অনুযায়ী, যার কারণে জমির গ্রহীতা বা পরবতী ক্রেতারা কোনো জমি পাবে না। অভিযোগ আছে, এরপর জমি নিজের দখলে নিতে এমপি জাফর আলম প্রভাব খাটিয়ে বাদশার স্বাক্ষর আদায় করে নেন।

চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী উপজেলার ছনুয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা কামরুল হাসান চৌধুরী। কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ঢেমুশিয়া ইউনিয়নে পৈত্রিকভাবে পাওয়া ৬ একর ৯ শতক জমি রয়েছে। ওই জমি বর্গা দিয়ে চাষাবাদ করে আসছিলেন তিনি। অভিযোগ আছে, এই জমি জবর দখল করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন জাফর আলম এমপি’র স্ত্রী শাহেদা বেগম ও পেকুয়া সদর ইউনিয়নের বাসিন্দা মেহের আলী। গত ৯ আগস্ট বাঁশখালী উপজেলার ছোট ছনুয়ার বাসিন্দা মো. হোসেন নামের এক ব্যক্তিকে তার জমির ভূয়া মালিক বানিয়ে চকরিয়া সাব-রেজিষ্ট্রি অফিসে জমি রেজিষ্ট্রি সম্পাদন করেন। এরপর গত ৯ সেপ্টেম্বর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত, কক্সবাজার-এ ক্রিমিনাল ল এমেন্ডম্যান্ট এ্যাক্ট এর ৪ ধারা অনুযায়ী এই নালিশী মামলা দায়ের করেন তিনি। যার পিটিশন নং-১৫/২০২০। পরে ১০ সেপ্টেম্বর আদালতের বিচারক নালিশী দরখাস্তটি আমলে নিয়ে ৩০ দিনের মধ্যে অভিযোগ তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য চকরিয়া থানার ওসিকে নির্দেশ প্রদান করেন।

মামলার বাদি পেকুয়া উপজেলা কৃষক লীগের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, ‘ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে মালিক না হওয়া ব্যক্তিদের কাছ থেকে জমি রেজিস্ট্রি নিয়েছেন জাফর আলম। এখন বিরোধীয় জমির রূপ ও শ্রেণী পরিবর্তনের চেষ্টা চলছে। এর প্রেক্ষিতে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা ও স্থানীয় তদন্তসহ পাঁচটি সম্পূরক পিটিশন বিচারিক আদালতে দাখিল করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘২০১৪ সালে ফরিদুল আলমদের এসব জমি আমাদের অনুকূলে রেজিস্ট্রি আম-মোক্তারনামা সম্পাদন করে দেন। কথা ছিলো জমি রেজিস্ট্রি নিয়ে উন্নয়ন ও অবকাঠামো নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করা হবে। কিন্তু সাংসদ জাফর আলম আমাদের জমিতে এসে মার্কেট নির্মাণকাজ আরম্ভ করেছেন। তিনি প্রভাব খাটিয়ে জমি জবরদখলের চেষ্টা করছেন। এমপি জাফর আলম দলে অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে আমাদের নিঃস্ব করার মিশনে নেমেছেন।’

কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও ভুক্তভোগী এসএম গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘আমরা আদালতে আম-মোক্তারনামা থেকে এমপিসহ শর্তভঙ্গকারীদের নাম কর্তনের আবেদন করেছি। জমিতে আওয়ামী পরিবারের ২ শতাধিক নেতা-কর্মীর স্বত্ব আছে। এমপি দলে অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে মার্কেট নির্মাণ কাজ করার চেষ্টা করছেন।’

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আরেফা পারভীন তাপসী বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি অপর কোনো ব্যক্তির জায়গা দখল করে নিয়ে নিজে ভোগ দখল করতে পারবেন না। এক্ষেত্রে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার বিধান আছে। এছাড়াও এটা সুস্পষ্ট মৌলিক অধিকার লংঘন, যেখানে বাংলাদেশ সংবিধানে স্পষ্টভাবে ৪২ নং অনুচ্ছেদে প্রত্যেক নাগরিকের সম্পত্তির অধিকার আছে। জোরপূর্বক কোনো মানুষ অপর কোনো মানুষের জমি দখল বা নিজ নামে নামজারির কোনো সুযোগ নেই।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সংসদ সদস্য জাফর আলম বলেন, ‘জমি দখলের অভিযোগ সত্য নয়। আপনি কি মনে করেন, আমি আইন পরিষদের সদস্য হয়ে আইন বহির্ভূত কাজ করবো? আমি কিছু জমি শরিকদের নিয়ে কিনেছি। এরপর সেখানে ডেভেলপার দিয়ে কাজ চলছে। ডেভেলপাররা তো শতভাগ কাগজ যাচাই-বাছাই না করে কাজ শুরু করবে না। এটা মিথ্যা অভিযোগ।’

মালিক না হওয়া ব্যক্তিদের জমির মালিক বানিয়ে জমি রেজিস্ট্রির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘১৯৫৭ সালে আরএস খতিয়ানে জমির মালিকানা পেয়েছে মাহমুদ আহমদ ও এনামুল হকরা। তারা এক পক্ষের কাছে জমি বিক্রি করেছে। এরপর তাদের কাছ থেকে আরেক পক্ষ সেসব জমি কিনেছে। আমরা সেই পক্ষ থেকে এসব জমি কিনেছি। এরপর নামজারি, খতিয়ান, বিএস করেছি। ডেভেলপাররা আপ-টু-ডেট বিএস না হলে তো কোনো জমিই নেয় না। এই খতিয়ানের মধ্যে ৭ একর জায়গা আছে। এর মধ্যে ২ দশমিক ৬ একর নিয়েছি। আরও ৫ একর তো সেখানে আছে। আমি কারও কোনো জমি নিইনি।’

বিরোধীয় জমিতে মার্কেটের কাজ চলমান আছে জানিয়ে জাফর আলম বলেন, ‘তারা আদালতে মামলা করেছে। তদন্ত দল এসেছে আমরা কাগজপত্র দেখিয়েছি। এরপর আর তাদের জায়গা থাকবে না। আমি তাদের জমি নিয়েছে এসব অভিযোগ ভোগাস। এখনো চকরিয়ায় ১০০ একর জমি অবৈধ দখলে আছে। জমি দখলের অভিযোগ মিথ্যা। এগুলো ভুয়া মালিক। এসব কাজে আমার সম্পৃক্ততা নেই। আমি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।’