রবিবার, ২৯ মে ২০২২, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

শহীদজায়া মুশতারী শফীর শেষ সাক্ষাৎকার

প্রকাশিতঃ ২২ ডিসেম্বর ২০২১ | ২:৫২ অপরাহ্ন


শহীদজায়া বেগম মুশতারী শফী। মুক্তিযুদ্ধের শব্দসৈনিক, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবির আন্দোলনের অন্যতম নেতা তিনি। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে চট্টগ্রাম মহানগরীর এনায়েত বাজারে মুশতারী শফীর বাড়িতেই কালুরঘাটে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক আলোচনা হয়েছিল। একাত্তরের শুরুর সময় থেকেই মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়, সেবা ও অর্থায়নসহ নানা কাজে যুক্ত ছিলেন তিনি। মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র বাসায় রাখায় ১৯৭১ সালের ৭ এপ্রিল মুশতারীর স্বামী ডা. মোহাম্মদ শফী এবং মুশতারীর ভাই এহসানুল হক আনসারীকে স্থানীয় রাজাকাররা ধরে নিয়ে যার। পরে তাদের হত্যা করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। এরপর ভারতে গিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে শব্দ সৈনিক হিসেবে কাজ করেন মুশতারী শফী। লেখালেখিতেও তিনি ছিলেন সমান সক্রিয়। ‘স্বাধীনতা আমার রক্তঝরা দিন’, ‘মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রামের নারী’, ‘চিঠি জাহানারা ইমামকে’, ‘একুশের গল্প’, ‘দুটি নারী ও একটি যুদ্ধ’, একদিন এবং অনেকগুলো দিন’, ‘আমি সুদূরের পিয়াসি’সহ বেশ কিছু কয়েকটি গ্রন্থের রচয়িতা মুশতারী শফী। ২০ ডিসেম্বর মারা যাওয়ার আগে এটিই তাঁর শেষ সাক্ষাৎকার। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রেহানা বেগম রানু। অনুলিখন করেছেন এম কে মনির

আপনার শৈশব, শিক্ষাজীবন, বেড়ে ওঠা নিয়ে আমাদের যদি কিছু বলতেন…

মুশতারী শফী : ভারত যখন ব্রিটিশ শাসনামলে ছিল তখন আমার জন্ম। আমার আব্বা পুলিশে চাকরি করতেন। তিনি পুলিশ ইন্সপেক্টর ছিলেন। ওনি মালধায় কর্মরত ছিলেন। মালধায় আমার জন্ম। তবে আমার বাবার বাড়ি ফরিদপুর। ৩ মাস বয়সে আমি মা হারাই। এরপরই আমার ছন্নছাড়া জীবন। কখনো এখানে, কখনো সেখানে, যেখানে বদলি হতেন আমার বাবা, সেখানের স্কুলে পড়াশোনা করতে হতো আমাকে। ঘুরতে হতো। সর্বশেষ ১৯৪৮ সালে ঢাকায় এলাম। এর আগে যখন আমরা কলকাতায় ছিলাম, কলকাতায় ভীষণ মারামারি লেগেছিল হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে। সে বার আমি রাস্তায় রক্তের ঢল দেখেছি। তখন আমি ছোট। সেই অবস্থায় আব্বা বেরিয়ে যেতেন অফিসের কাজে। আমরা ভাই-বোনরা সবাই ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে তটস্থ থাকতাম। এমন অবস্থায় আব্বা পোস্টিং নিয়ে নিলেন ঢাকায়।

১৯৪৮ সালে দেশ ভাগ হলো। আমরা পড়ে গেছি পূর্ব পাকিস্তানে। আমার আব্বা বেশি দিন বাঁচলেন না, তিনি ১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মারা গেলেন। তখন আমি আরও ছন্নছাড়া। বয়সে ছোট। তখন আমার বড় বোনের মাত্র বিয়ে দিয়েছে। আমরা চার বোন। বড় বোন ও মেজ বোনের বিয়ে হয়েছে। বড় বোন থাকতেন ঢাকায়। আব্বা মারা যাওয়ার পর আমি বড় বোনের কাছে চলে আসলাম। এসেই গালর্স স্কুলে ভর্তি হলাম।

বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদার দাবিতে আপনি সোচ্চার ছিলেন…

মুশতারী শফী : গালর্স স্কুলে পড়ার সময় দেশের টালমাটাল অবস্থা। চারদিকে রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই, স্লোগান। একদিন একটা মিছিল যাচ্ছিল আমাদের স্কুলের সামনে দিয়ে। সেসময় গেইটে তালা লাগিয়ে দেয়া হলো। স্কুলের পিছনে বড় একটা নিম গাছ ছিল। স্কুলের মেয়েরা নিম গাছ বেয়ে উপরে ওঠে, দেয়াল টপকে নামতে লাগল। সেসময় আমি সপ্তম শ্রেণীতে। আমি তখন তাদের সাথে সাথে ওঠে গেলাম। সেই মিছিলে গিয়ে যখন গভর্নর হাউজের সামনে গেলাম। আমাদের হাটখোলা রোড থেকে গভর্নর হাউজের সামনে গেছি, তখনই গুলি ছুঁড়লো। প্রচণ্ড গুলি, ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলো সবাই। তখন আমি পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেলাম। কে যেন আমাকে ধরে বাসায় নিয়ে গেলো। এরপর জ্ঞান ফিরে পেয়ে কথা বললাম। খুব বকা খেলাম বড় বোনের কাছে। কেন গেলাম মিছিলে? আমাকে বেঁধে রাখলো। বললো তোমার আর যেতে হবে না কোথাও। শৈশব থেকে সেই ভাষা আন্দোলন দেখে আসছি।

আপনার বিয়ে, স্বামী ও সংসার জীবন নিয়ে যদি কিছু বলতেন…

মুশতারী শফী : অল্প বয়সেই লেখাপড়ার মাঝখানে আমাকে বিয়ে দিয়ে দেয়া হলো। ১৫ বছর বয়সে বিয়ে। বিয়ে হলো ডা. শফী সাহেবের সঙ্গে। তখন ১৯৫৪ সাল। যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন। নির্বাচনে দেশ টালমাটাল। ডা. শফী সাহেব তখন পলিটিকাল নেতাদের জেলখানায় দেখতে যেতেন। ওদের চিকিৎসা করতেন। তো একদিন ধরলেন পূর্ণেন্দু দস্তিদারকে। ওনাকে নিয়ে এলেন। তিনি জয়ী হয়েছেন যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে। আমি তো এদের নামও জানতাম না, কিছুই জানতাম না। ডা. শফী সাহেবের কাছে তারা আসতেন। আসলে ডা. শফী সাহেব আমাকে ডেকে নিয়ে পরিচয় করিয়ে দিতেন।

আপনার বাবার বাড়ি ফরিদপুরে। ডা. শফী সাহেবের বাড়ি কোথায়?

মুশতারী শফী : ওনার বাড়ি পশ্চিমবঙ্গ। হুগলী জেলার তারেকেশ্বর। আমার শ্বশুর হাওড়াতে বাড়ি করেছিলেন। ওনি সেখানেই লেখাপড়া শিখেছেন। কলকাতা থেকে মেডিক্যাল পাশ করেছেন। তখন তো ওনি জেলখানার রোগীদের দেখতেন। রাজবন্দি যারা তাদেরকে। শুধাংশু বিমল দত্ত, অনেক রাজনীতিবীদরা থাকতো। সেসময় যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জয়ী হলেন পুর্নেন্দু দস্তিদার, জয়ী হওয়ার পরে মুক্ত হলেন যেদিন, সেদিন সারা বাংলাদেশ, চট্টগ্রাম শহর স্লোগানে মুখর। একদিন আমার বাসায় এলেন, আসার পরে আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। পরিচয় হলো, অনেক কথাবার্তা হলো। তখন তিনি একটা হরলিক্সের বয়াম আমার কাছে চাইলেন। ডিমের খোসা বের করলেন ওনার পকেট থেকে। জেলখানায় ওনি ডিম খেতেন ফুটো করে ভিতরের ডিম খেতেন। পুরো খোসাটা আস্ত থাকতো। সেই খোসার ওপর তিনি ছবি আঁকতেন। তিনি অত্যন্ত গুণী শিল্পী ছিলেন। তো ওরকম একটা খোসা বের করলেন। যেটা ওনার পকেটেই ছিল। সেদিন তিনি ওই খোসাতেই রবীন্দ্রনাথের একটা স্ক্রেচ আঁকলেন। স্ক্রেচ এঁকে আমাকে দিয়ে বললেন এটা আমি তোমাকে উপহার দিলাম। এভাবেই তাঁর সাথে আমার পরিচয়। তারপর থেকে ওনি সবসময় আমার এখানে আসতেন। ধীরে ধীরে অনেক রাজনীতিবিদদের সাথে পরিচয় হলো। রাজনীতিবিদরা ডা. শফী সাহেবের কাছে আসতেন। ডা. শফী সাহেবের সাথে বন্ধুত্ব ছিল। তখন রাজনীতির বইগুলো আমি পড়তে শুরু করলাম। এভাবে আস্তে আস্তে রাজনীতির চেতনা ভিতরে চলে আসে ডা. শফী সাহেবের কল্যাণে, পূর্ণেন্দু দস্তিদারের কল্যাণে, আরও অন্যান্য সঙ্গী যারা ওনার কাছে আমার বাড়িতে আসতেন তাদের কল্যাণে। তাদেরকে সবসময় আমার রান্না করে খাওয়াতে হতো।

১৯৬৪ সালে চট্টগ্রামে নারীমুক্তি আন্দোলনের লক্ষ্যে আপনার উদ্যোগেই প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বান্ধবী সংঘ’। এটি ছিল চট্টগ্রামে নারীদের প্রথম কোনো সংগঠন। বান্ধবী সংঘের উদ্যোগে আপনারা বের করতেন ‘বান্ধবী’ পত্রিকা। সেই সুবাদে ‘৬৯ সালে ‘মেয়েদের প্রেস’ নামে একটি পরিপূর্ণ ছাপাখানাও চালু করেছিলেন আপনি। এ সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন…

মুশতারী শফী : এই প্রেসে কাজ করতেন কেবল নারীরাই। ৩০ জন মেয়ে ছিল। কেউ কম্পোজ করছে। কেউ প্রুফ কাটছে। কেউ প্রেসের মেশিন চালাচ্ছে। আমাদের প্রেসে ছাত্রলীগের, ছাত্র ইউনিয়নের লিফলেট ছাপা হতো। শুধু আমাদের পত্রিকা না বাইরের বিভিন্ন কিছু ছাপা হতো।

তাহলে তো সেই ষাটের দশকে মেয়েরা অনেক এগিয়ে ছিল। অনেক সচেতন, সৃজনশীল ছিল…

মুশতারী শফী : হ্যাঁ, অনেক এগিয়ে ছিল। হিন্দু মেয়েরা বেশি আসতো। মুসলিম মেয়েরা কম ছিল। যদিও পরে মুসলিম মেয়েও আস্তে আস্তে আসছিল। এরমধ্যে জাহানারাকে পেলাম। তার বাবা মুসলিম লীগ নেতা। তার ভাইরা সবাই মুসলিম লীগ করতো। সে সিটি কলেজে পড়তো। চুপ করে সে চলে আসতো। আমরা তখন নাটক করবো। তখন তাকে নিয়ে আসলাম। নিয়ে এসে আমরা এক মাস দেড়মাস রিহার্সাল করে মেঘবতী ভট্টাচার্যের মেঘবতী নাটক আমরা মুসলিম হলে তখন করলাম দুই রাতব্যাপী। টিকিট বিক্রি হয়েছিল। মহিলা-পুরুষ দর্শক ছিল। অভিনয় করেছিল শুধু মেয়েরা। আমি তখন বৃদ্ধের অভিনয় করেছি। যখন মেকআপ নিয়ে ধুতি পড়ে, পাকা চুল-দাঁড়ি, হাতে লাঠিসহ মঞ্চে ঢুকেছি আবুল ফজল সাহেব সামনে বসেছিলেন। ওনি আমাকে চিনলেন না। শুধু ওনি না, কেউই চিনতে পারেন নাই। তখন বেলাল মোহাম্মদ চুপি চুপি বললেন চিনতে পেরেছেন? ইনি মুশতারী শফী! ওনি অবাক! কি বলছ? ওনি ওঠে যাবেন মনে করলেন, আবার বসে পড়লেন। আমি অভিনয় করলাম। সবাই দেখলেন।

এরপর যখন শিল্পীদের পরিচয় করিয়ে দেয়া হচ্ছিল তখন আমি আবুল ফজল সাহেবকে পায়ে ধরে সালাম করলাম। তখন ওনি বললেন, মা তুমি যেটা করেছো চমৎকার হয়েছে। এভাবে তখন টাকাও আমাদের ওঠেছিল। দুদিন নাটকে প্রায় সাত হাজার টাকা ওঠেছিল। তা দিয়ে আমরা পত্রিকা বের করলাম। নাটকের কাজ করলাম। এই নাটকটা করেছিলাম ১৯৬৮ সালে, তারপরে ৬৯ সালে আবার নাটক করলাম। তখন নাটকের নাম ছিল সেই তিমিরে। সেই তিমিরে নাটক আমরা সবাই মিলে আবার মুসলিম হলে করলাম। ৭০ সালে দেশের অবস্থা আরও ভয়ানক হলো। তারপর এভাবে করে চলছে… আমরা সবাই সচেতন ছিলাম।

তখনকার মেয়েদের অনেকেই রক্ষণশীল ছিলেন কিনা?

মুশতারী শফী : হ্যাঁ। বাড়ি থেকে, পরিবার থেকে বাধা দিবে, অভিভাবকরা বাধা দিবে, সমাজ বাধা দিবে- এসব ভেবে তারা ভয় পেতো। আমি তাদের বুঝিয়ে শুনিয়ে আস্তে আস্তে আনতে লাগলাম। চিটাগং কলেজের মেয়ে, মহসিন কলেজের মেয়ে, সিটি কলেজের মেয়ে- এদেরকে আনতে লাগলাম। তাদের মধ্যে অনেকেই এখন বেঁচে আছেন।

আমরা জানি, মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে চট্টগ্রাম মহানগরীর এনায়েত বাজারে আপনার বাড়িতেই কালুরঘাটে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক আলোচনা হয়েছিল। পরে ৭ এপ্রিল আপনার স্বামী ও ভাইকে ধরে নিয়ে যায় পাকসেনারা। সাত সন্তান নিয়ে আপনি ভীষণ বিপদে পড়েন। যুদ্ধদিনের ঘটনা যদি আমাদের জানাতেন…

মুশতারী শফী : ২৪, ২৫ মার্চ পাকিস্তানের দুটো জাহাজ অস্ত্র নিয়ে চট্টগ্রামে ভিড়েছিল। সেখান থেকে পাকিস্তানিরা অস্ত্র নামাতে বলল শ্রমিকদের। কিন্তু তারা রাজি হয়নি। রাজি না হওয়াতে গুলি চালিয়েছিল। অনেক শ্রমিককে মেরেছে। অনেক শ্রমিককে মারার পরে চট্টগ্রাম একেবারে অশান্ত হয়ে ওঠল। বাইরে তো আরও হচ্ছে। চট্টগ্রাম একেবারে আগুন হয়ে ওঠলো। সেসময় পথে পথে মিছিল। তখন আমার খুব খারাপ লাগলো। সেসময় অফিস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তখন বেলাল মোহাম্মদ (শব্দসৈনিক) তার পরিবারকে সন্দ্বীপে পাঠিয়ে দিলেন। পাঠিয়ে দিয়ে আমার বাসায় অবস্থান নিলেন। তখন আবুল কাশেম ফটিকছড়ি কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন। কলেজ বন্ধ করে দিয়ে তিনিও সন্দ্বীপে বাড়িতে যাবেন। যেতে পারেননি। কোন ট্রেন নাই। তিনিও আসলেন আমার বাড়িতে। আব্দুল্লাহ আল ফারুক রেডিও’র পিপি ছিলেন। তিনিও বাড়ি যাবেন, তার বাড়ি ঢাকায়। স্থায়ী বাড়ি উত্তরবঙ্গে। ঢাকায় তার বাবা-মাসহ যাবেন, যাওয়ার পথ নেই। যেতে পারেননি। তিনিও এসে ওঠলেন আমার বাসায়। তারপর কাজী হাবিব উদ্দিন, তিনিও এসে ওঠলেন। এছাড়া ডা. শফী সাহেবের রোগী, আমাদের আত্মীয়-পরিচিত মিলে বাড়িতে অনেক লোক আশ্রয় নিলেন, ৫০-৬০ জন হবে। অনেক কিছুর স্বাক্ষী আমার বাড়ি।

তারপর ২৫ মার্চ রাতে বেলাল মোহাম্মদ গেলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। আমি যেতে চাইলে আমাকে বললেন তোমার কণ্ঠ পরিচিত, তোমার কণ্ঠ অনেক মানুষে শুনেছে। তোমার কণ্ঠ দিব না। এই বলে বেলাল মোহাম্মদ বেরিয়ে গেলেন। তিনি কালুরঘাট স্টেশন থেকে চালু করলেন। আগ্রাবাদ স্টেশনে করতে পারলেন না, কারণ জাহাজ ওদিক দিয়ে কাছে। আক্রমণ হতে পারে এজন্য সেখান থেকে করতে পারলেন না। রেডিও’র যিনি পরিচালক ছিলেন নাজমুল আলম সাহেব, তিনিও বললেন না এখানে না, ওখানে কালুরঘাটে একটা স্টুডিও ছিল আলাদা, সেখান থেকে চালু করলো স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র।

আমি বাড়িতে বসে আকাশবাণী, ভয়েস অব আমেরিকা, বিবিসি লন্ডন শুনে শুনে বাংলাদেশের সব অবস্থার কথা লিখে রাখতাম। ছোট ট্রানজেস্টারে অনুবাদ করতাম। বিদ্যুৎ বন্ধ, সমস্ত কিছু বন্ধ, ট্রানজেস্টার শুনে শুনে আমি আর আমার ছোট ভাই লিখে রাখতাম। বেলাল মোহাম্মদ আসতেন, ওখান থেকে পায়ে হেঁটে এখানে আসতেন। এসে বাসায় বসতেন। আসলে তাদেরকে দিতাম। তারা নিউজ তৈরি করতেন। প্রতিদিন.. এভাবে করে ২৭ মার্চ, ২৮ মার্চ… অনেকগুলো অস্ত্র আমার বাড়িতে এনে রাখলেন ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টির লোকজন। প্রায় দুই ট্রাক অস্ত্র রাখলেন। আমার বাড়িটার দু’তলা খালি ছিল।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর দুই ট্রাক অস্ত্র নিজের বাড়িতে রাখতে দেয়া তো ভীষণ সাহসী ব্যাপার…

মুশতারী শফী : হ্যাঁ, দুই ট্রাক অস্ত্র, কোথা থেকে যেন এনেছে, এনে রাখলো। এরপর একটা উইল করলো যে বাড়িতে পাকিস্তানিরা আছেন তারা করাচি না কোথায় চলে গেছেন, সেখান থেকে এনেছে। ডা. শফী সাহেব, আমাকে বললেন অসুবিধা নেই। এগুলো আমাদের যুদ্ধের কাজে লাগবে। তাদেরকে পরে দিয়ে দিব। সেসময় ২৯ মার্চ প্রথম বোম্বিং করলো, একটা প্লেন আসলো, প্লেন এসে বোম্বিং করলো কালুরঘাট বেতারের উপরে। ওরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলো। ছত্রভঙ্গ হওয়ার পরে আমরা আর কোন খবর পাই না। টেলিফোন লাইনও বিচ্ছিন্ন। রাত প্রায় দেড়টায় সময় বেলাল মোহাম্মদ ফোন করলেন যে আমরা বেঁচে আছি, তোমরা চিন্তা করো না। এইটুকু বলে আবার কেটে দিলো। ৩০ মার্চ চলে গেলো, ওদের সাথে বিচ্ছিন্ন, কেউ নাই। আমরা একা হয়ে গেলাম। একদম একা।

এরপর ৭ এপ্রিল ২ ট্রাক আর্মি এসে আমাদের বাড়ি ঘেরাও করে তালা ভেঙে সমস্ত অস্ত্র বের করলো। ডা. শফী সাহেব, আমার ছোট ভাই এবং আমাকে তিনজনকেই নিয়ে যাবে। ইয়ার মাহমুদ আমাদের এখানে ছিলেন। আর সফিউন্নবী রেডিওতে গান করতেন। ওরা দুজন শালা-ভগ্নিপতি হয় সম্পর্কে। মাসুদা নবী আমার কাছে ছিলেন। ওনি বের হয় নাই। উনারা বাচ্চাদেরকে ধরে রেখেছে। আমাদেরকে বের করে নিবে। অনেক বিরাট কাহিনী। আমি জানালা দিয়ে ডাকছি। বাঙালি কেউই নেই। বাঙালিরা চলে গেছে। এই বাড়িগুলোতে বিহারী ছিল। আমি ডাকছি, কারো কোন সাড়া নেই। তারা সবাই পাকিস্তানি পতাকা হাতে নিয়ে উল্লাস করে করে গান গেয়ে যাচ্ছে। তারপর আর্মিরা আমাদের বিরুদ্ধে লিখিত কতগুলো অভিযোগ পড়ে শোনাচ্ছিল। আমাকে প্রশ্ন করেছিল, তুমি এটা করেছ? ওটা করেছ? আমি সব না না করছি। দেয়ালে আমার আব্বার পুলিশের ড্রেস পরা ছবি ছিল। এদিকে ছবি একটা লেলিনের। ডা. শফী সাহেব বাঁধিয়ে রেখেছিলেন। খেয়াল নেই আমাদের এতোকিছু সরাতে। আমার আব্বার ছবির দিকে তাকিয়ে বললো এটা কে? আমি বললাম যে আমার আব্বা। বললো উসকে বোলাও, আমি বললাম ওনি তো নেই। ওনি মারা গেছেন। আবার লেলিনের ছবির দিকে চোখ পড়েছে ওদের। বললো এ কে? আমি চট করে মুখ দিয়ে বের করে বললাম বড় ভাই। বললো উসকে বোলাও। আমি বললাম ওনিও বেঁচে নেই। বললো বাপকা মরগিয়া, বেটাকা মরগিয়া! তারপর বললো, দাঁড়াও কথা আছে। আমার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ তৈরি হচ্ছে।

ডা. শফী সাহেব কথা বলতে পারছিলেন না। ছবি বের করে আমাকে দেখিয়ে বললো, এই দেখ। আমরা যে মিছিল করেছিলাম আবুল ফজলের স্ত্রী, সুফিয়া বেগম ছিল- সেই ছবিটাই দেখাল। আমরা সামনের সারিতে। আমিও আছি। বললো এইগুলো কি মিথ্যা? তখন আমি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললাম, মিছিলটা বের হয়েছিল আমরা গিয়েছিলাম দেখতে। তখনতো সবাই গিয়েছিল, আমরাও গিয়েছিলাম। তখন মাথা নেড়ে হু বলে বললো, এখানে থাকো। তখন উপরের দুতলা’র তালা ভেঙে অস্ত্রগুলো সব বের করলো। অস্ত্রগুলো বের করে তখন আমাকে বলে, তাহলে এগুলো?

আমি বললাম, এগুলো ভাড়াটিয়ারা কোথায় কি রেখেছে আমি জানি না। তারা সবাই চলে গিয়েছে। ওরা জানুয়ারি মাসে চলে গিয়েছে। তখন ছিল মার্চ। একটা বাক্সে লাল কালি দিয়ে লেখা ছিল ২৭-৩-৭১, ইংরেজিতে লেখা আছে। আমরা তখন দেখি নাই। দেখে চমকে গেলাম। মানে যে অপরাধ ধরা পড়েছিল তারা আমাদেরকে ব্রাশ ফায়ার করে দেয়ার কথা। কিন্তু সেটা না করে বললো সব ওঠাও। তারা অনেকগুলো মেজর, ডা. শফী সাহেব, আমার ভাই সবাই মিলে ওঠালো। এরপর বললো, তোমরা তিনজন চলো। আমার বাচ্চারা সবাই কান্না করছিল। আমার মেয়েটা সাড়ে তিন বছরের। পরে আমার ভাই ও ডা. শফী সাহেবকে নিয়ে গেলো। আমাকে বললো তোমাকে এখন নেব না, তোমার ছেলে-মেয়ে কাঁদছে। কিন্তু খবরদার কোথাও যাবে না। যদি যাও তাহলে তোমাকে তো মারবই বাড়িটাও ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দিব। আমি বললাম, তোমরা আমার স্বামীকে নিয়ে যাচ্ছ, আমার ভাইকে নিয়ে যাচ্ছ। তাদেরকে নিয়ে গেলে আমিও যাব, বাচ্চারা কাঁদছে। সেই দিন রাত্রি বেলা, সেই রাত ছিল পূর্ণিমার রাত! কুকুর খালি ঘেঁও ঘেঁও করছে। জানালার পর্দা সব লাগিয়ে রেখেছি। একটু ফাঁক করলাম। দেখলাম চাঁদের ভীষণ আলো, দিনের মতো লাগছে। তারপর দেখি এদিকে দুজন আর্মি, ওদিকে দুজন আর্মি। দুইদিকে রাস্তা। মাঝখানে আমার বাড়িটা। আর্মি টহল দিচ্ছে। কেউ খায়নি। বাচ্চারা সবাই কান্নাকাটি করছে। আমি সবার মুখ চেপে ধরে আটকে রেখেছি।

তখন আপনার বড় সন্তান ও সবচেয়ে ছোট সন্তানের বয়স কত?

মুশতারী শফী : বড় সন্তান তখন ক্লাস সেভেনে। বোধহয় ১৪। ছোট সন্তানের বয়স সাড়ে তিন বছর। খুব কঠিন অবস্থা। সাতটা বাচ্চা নিয়ে…। তারপর হঠাৎ দেখলাম একটা কালো মেঘ এসে চাঁদটাকে ঢেকে দিলো। তখন বাড়িটা ঘুটঘুটে অন্ধকারে। একটু পরে দেখি বৃষ্টি নামছে। তখন ওই যে ইয়ার মাহমুদ ও সফিউন্নবী ঝপ করে এসে বললেন, আপা চলেন, পালাবেন… আমি বললাম তোমার ভাইকে নিয়ে গেছে, কী করে পালাব? ওরা আসবে। বললো, না ওদের আশা ছেড়ে দেন। ওদের যদি আয়ু-হায়াত থাকে তাহলে ওদের পাবেন। আর যদি না থাকে তাহলে পাবেন না। কিন্তু আপনি বাচ্চাদের নিয়ে বেঁচে থাকেন। তখন আমি আমার ডায়েরিটা নিলাম। শাড়িটা খুলে যেমন করে হিন্দুরা একপেচা করে পড়ে তেমন করে পড়লাম। আমার তো বোরকা নাই। কী করব? আলমারিটা খুব আস্তে করে খুলে চাদর বের করে চাদর জড়িয়ে নিলাম। এভাবে করে নিয়ে, পায়ে স্পন্স স্যান্ডেল। আমার বাচ্চাদেরকে আমার বড় মেয়েটা দুটো করে পেন্ট আর দুটো করে জামা পরিয়ে দিয়েছে। আমি বললাম কোন কিছু নেবে না। তখন আলম দিপু বলছে তাড়াতাড়ি বের হন।

পেছনে গেট ছিল। আমরা পেছনের গেট দিয়ে বের হলাম। কোন মানুষ নেই। তখন ভোর হচ্ছে। বৃষ্টি একটু কমে আসছে। আমরা গিয়ে চৈতন্য গলিতে নামতে একটা লোক ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁত ব্রাশ করছে। আমি কাছে গিয়ে বললাম, কিছু মনে করবেন না একটা কথা বলি.. আমাদের একটু বসবার জায়গা দিবেন? আপনারা কারা? কোথা থেকে এসছেন? আমি বললাম, এখানেই আমাদের বাসা। একটু বসার জায়গা দেবেন? কারফিউ উঠে গেলে চলে যাব। তখন বললেন, দেখুন আমি একজনের বাসায় আশ্রিত। আমার বাসা লালখান বাজার। লালখান বাজারটা ধ্বংস করে দিয়েছে। আমি এখানে আমার এক আত্মীয়ের বাসায় এসেছি। তারপর দেখে বললেন, আচ্ছা আসেন, আপনাদের বসার জায়গা দিই। আমি আর মিসেস নবী ওনার সাথে ওই বাড়িতে গেলাম। ওই বাড়িতে যাওয়ার পর, টিনের বাড়ি.. তখন পাকা বাড়ি ছিলো না। ভদ্রমহিলা দরজা খুলে দিলেন। বসলাম। আমি আমার বাচ্চাদের আগে বের করে দিয়েছিলাম। বাচ্চাদেরকে নিয়ে লাশ রাখার ঘর আছে, কবরস্থানে রেখে আসছিলাম। বললাম একদম শুয়ে থাক। মুখে টু শব্দ করবে না।

বৃষ্টি থামলো তারপর আমি ইয়ার মাহমুদকে বললাম ওদেরকে নিয়ে আসার জন্য। ওদেরকে নিয়ে আসলো। বাচ্চারা সবাই বুকে জড়িয়ে ধরেছে। এখন কোথায় যাব? কারো কথা মনে নেই। এতো পরিচিত মানুষ আমার এখানে। সব ভুলে গেছি। মনে নেই। কারও নাম মুখে আসছে না। পরে অনেক চিন্তা করে আমার ছোটবোনের কথা মনে পড়ল। ছোটবোন আসকার দীঘির পাড়ে থাকে। আমার ভগ্নিপতি আমেরিকান একটা কোম্পানির ম্যানেজার। ওখানে থাকে। আমি বললাম, ওদেরকে দিয়ে আস। তারপর বাচ্চারা কান্নাকাটি করে। যাবে না। আমি বললাম তোমরা যাও। আমি আসছি। দুইটা রিকশা করে ইয়ার মাহমুদ ওদের নিয়ে গেলো। আমরা দুজন রইলাম। এই এখান থেকে বেরিয়ে হেঁটে গেলাম আমিন মঞ্জিল। আমিন মঞ্জিলে আমিন শাবীর মা আমাদের কিছু খাওয়ালেন। তারপর ওখান থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কোথায় যাব? কোথায় যাব? তখন মনে পড়লো বাকলিয়ার কথা। বাকলিয়া যেতে টাউনের ভিতর দিয়ে যেতে হয়।

এদিকে জুবলী রোডে কাঁচা বাড়ি যা ছিল সব জ্বালিয়ে দিয়েছে। সিনেমা প্যালেসের ওখানে অস্ত্রশস্ত্রসহ ঘুরছিল একদল বাঙালি ছেলে। তো ইয়ার মাহমুদ সাহবের তো চট্টগ্রামে বাড়ি। তিনি চাটগাঁইয়া ভাষায় কথা বলতেন। তখন বললেন, আমরা বাসায় যাব। তো ওর মধ্যে একটা ছেলে ইয়ার মাহমুদকে চিনলো। বললো যে ইয়ার ভাই না? বলে হ্যাঁ, সে ছিল ফজল কাদের চৌধুরীর গুণ্ডা। সে ওখানে আসকার দীঘির পাড়ে লোকদের তল্লাশি করছে। তারপর ওর সঙ্গে কথা বলার পর বললো যে, ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও। ওই রিকশা ছেড়ে দাও। এরা আমার পরিচিত। তারপর ছেড়ে দিলো। সেখান থেকে রিকশা করে বাকলিয়া গেলাম। বাকলিয়ার আজিম সাহেব নামে এক ভদ্রলোক আছেন। তাঁর বাড়িতে ওঠলাম। আজিম সাহেবের স্ত্রী আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন। তারপর আজিম সাহেব এসে বসলেন। চিন্তা করলাম কী করব? কোথায় যাব? চিন্তা করতে করতে করতে মিরসরাইয়ের কথা মনে হলো। আজিম সাহেব বললেন, ভাবী মিরসরাই যেতে হলে শহরের ভিতর দিয়ে যেতে হবে। আমি বললাম, কী করবো আর তো কোন রাস্তা নেই। ওখানে মিরসরাই মিঠাছড়ার হুজুর সূফী আব্দুল লতিফ আছেন। সেখানে যাব।

আবার দুটো রিকশা নিয়ে, ওখান থেকে বোরকা কিনে নিলাম। আমার কিছু গয়না খুলে দিলাম। দিয়ে টাকা নিলাম ওনার কাছ থেকে। ওনি খুঁজে খুঁজে দুটো বোরকা বের করে দিলেন। শুধু উপরের অংশটা ছিল। আমি বললাম, তাই হবে। এই পথের মধ্যে আর্মি অনেক ধরলো। স্টেশন রোডে, দেওয়ানহাটে। ইয়ার মাহমুদ কোন রকম তাদেরকে ম্যানেজ করে। আর্মিরা দেখছে সাথে কোন জিনিসপত্র আছে কিনা? কিন্তু জিনিসপত্র কিছুই নেই। এভাবে রিকশা করে যাচ্ছি, আবার হাঁটছিও। দেওয়ানহাট পর্যন্ত গেলাম। দেওয়ানহাট থেকে রিকশাযোগে কুমিরা। কুমিরায় একটা বট গাছতলায় অনেক ভিড়। ওয়াপদা, কাস্টমসসহ বিভিন্ন লোক ওখান থেকে ভাড়া করে যাচ্ছে। ওখান থেকে একটা বেবিট্যাক্সি ভাড়া করে আমি, ইয়ার মাহমুদসহ আমরা তিনজন সামনে বসলাম। ওই টেক্সিওয়ালাও দেখলাম দুইটা পতাকা। পাকিস্তানি পতাকা তুলছে আবার বাঙালি পতাকা নামাচ্ছে, আবার তুলছে। এভাবে সীতাকুণ্ড পর্যন্ত গেলাম। তখন একের পর এক গুলি। এখন ট্যাক্সি ঘুরিয়ে নিয়ে বলছে আমরা আর যাব না। আপনাদের এখানে নামতে হবে। তো অনেকেই নেমে যাচ্ছে। তখন আমরা ওই ট্যাক্সি ছেড়ে দিলাম। টাকা দিলাম। টাকা দিয়ে ধান খেতে নেমে গেলাম। ধান খেতে নেমে দেখলাম কত হাজার হাজার মানুষ। ধান খেত মানে চষা জমি, তার উপর মাটির ঢেলা। তার উপর হাঁটছি.. আর হাঁটছি। এভাবে করে করে আমার পা মছকে গেলো কতবার। কতবার পড়ছি, কতবার ওঠছি। এভাবে করে হাঁটতে হাঁটতে একেবারে সমুদ্রের বাঁধে গিয়ে পড়লাম। সেই বাঁধে গিয়ে দেখি সারি সারি মানুষ বাঁধের উপর দিয়ে যাচ্ছে, অজস্র মানুষ। বয়স্কদের কাঁধে ঝুলিতে নেয়া হয়েছে।

আপনারা সেসময় কেয়ামতের দৃশ্য দেখেছেন বলা চলে…

মুশতারী শফী : কিরকম দৃশ্য দেখেছি কল্পনাও করতে পারবেন না। যেতে যেতে পথে একজনের বাচ্চা হয়ে গেলো। কেউ থামছে না। থামার সুযোগও নেই। আমরা থামলে গ্রামের মানুষ তরমুজ কেটে খাওয়াচ্ছে, পানি দিচ্ছে। এসব দেখতে দেখতে গেলাম। তারপর মিরসরাই যাব। ওখান থেকে রিকশা নিলাম। রিকশা নিয়ে তারপর আবার কিছুদুর গেলাম। এভাবে করে মিঠাছড়া। রাত্রি তিনটার সময় গিয়ে মিঠাছড়া পৌঁছলাম। মিঠাছড়া হুজুরের (সুফী আব্দুল লতিফ) ওখানে। দেখলাম অনেক মানুষ ওখানে আশ্রয় নিয়েছে। সেখানে আমরা থাকলাম।

মুক্তিযুদ্ধে আপনি মালেকা বেগমসহ অন্যান্যদের কোথায়, কীভাবে পেয়েছেন?

মুশতারী শফী : আগরতলায় তাদের পেয়েছি। এরপর দুদিন পরে আমার ছেলে-মেয়েদের নিয়ে এলাম। ওই মে মাসে, আমি তো এপ্রিলে গেলাম। এপ্রিলটা কাটল। মে মাসে ওখানে সাংঘাতিক রকমের পাকিস্তানিদের গোলাগুলি শুরু হলো। মিরসরাই শুভপুর ব্রিজ ভেঙে দিয়েছে। চারদিকে মানুষ মারছে। হাহাকার। মিরসরাই মিঠাছড়া ইউনিয়ন পরিষদের এক মেম্বারকে বাড়িতে ধরে মারলো। তার পরিবারের স্ত্রী, পুত্র সবাইকে আম গাছের সাথে বেঁধে মারলো। মিরসরাইয়ের ওই বাড়িটাতেই পাকিস্তানিরা কয়েকবার ঢুকার চেষ্টা করেছিল, ঢুকতে পারেনি। আমরা সবাই মাজারে ছিলাম। ওখানে বসে আছি। এই অবস্থা.. তারপর আমরা ঠিক করলাম যে…ওখানে জাফর সাহেব ছিলেন। জাফর সাহেব মিরসরাই স্কুলের হেডমাস্টার। তিনি আসতেন সবসময়। তিনি বললেন, এখানে আর থাকা যাবে না। আপনারা তা হলে ওপারে চলে যান। কিছু আওয়ামী লীগের ছেলে, ছাত্রলীগের ছেলে, ছাত্র ইউনিয়নের ছেলে এসে বললেন, হ্যাঁ আপা এখানে থাকতে পারবেন না। ওপারে যেতে হবে। আমি বললাম, ঠিক আছে। আমরা ওপারে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।

সেই ভোর বেলা ওঠে ওপারে হাঁটা শুরু করলাম। দেখলাম স্কুলের টুল বেয়ে বেয়ে রক্ত পড়ছে। বললেন এখানে মানুষ মেরেছে যে সেগুলো রেখেছিল। তারপর ওখান থেকে গিয়ে শুভপুর ব্রিজটা তো উড়িয়ে দিয়েছে। আমরা পাশে নেমে দেখলাম, ফেনী নদী। ফেনী নদীতে নেমে নৌকায় ওঠলাম। নৌকা থেকে যখন ওপারে নামালো এতোটা কাঁদার মধ্যে নামালো। সেখান থেকে এতো কষ্ট হলো পায়ে হেঁটে যেতে বলে বুঝাতে পারব না। তারপর একটা বাঁশের সাঁকো ছিল পার হওয়ার। বেত গাছের সাঁকো। সেটা ভেঙে নিচে পড়ে গেল মাসুদা নবী। অনেক কষ্টে ওনাকে টেনে তোলা হলো। কেটে গেছে সমস্ত কাপড়, রক্তাক্ত। গুলি চলছে আবার। দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে ছাগলনাইয়া। ছাগলনাইয়া গিয়ে দেখি সেখানে ভারতীয় আর্মিরা বর্ডার থেকে ডাকছে। তখন রাখাল বাবু নামক একটা দালাল ছিলেন, তিনি আমাদের পার করে দিচ্ছেন। একেকজনের জন্য তিনি বিশ টাকা নেবেন পার করে দেয়ার বিনিময়ে। তারপর তিনি আমার একেকজন ছেলে-মেয়েকে ছুঁড়ে ছুঁড়ে পার করে দিচ্ছেন। আমার কলিজা ফেটে যাচ্ছে তখন। ওপাশে ভারতের আর্মিরা ধরছে। ওপার থেকে আর্মিরা আমাদের বলছে, না ঘাবড়াও মাত। মানে আমরা আছি, ভয় পেও না।

তারপর শেষে আমি ও মিসেস নবী কোমরে কাপড়টা জড়িয়ে দিলাম দৌঁড়। দৌঁড় দিয়ে ওখানে পার হয়ে গেলাম। সেখানে পড়েই আমি অজ্ঞান হয়ে গেলাম। পরে ওরা ওখান থেকে পানি দিয়ে জ্ঞান ফেরাল। বললাম এটা কোথায়। তারা বললেন এটা ভারত। ভারত এসেছেন। মনু বর্ডার। ওখান থেকে নেমে একটা হোটেলে বসালো আমাদের। একটা বাসার পাশের হোটেল। আমি টাকা বের করে দিলাম। টাকা ভাঙিয়ে ইন্ডিয়ান টাকা দিলো। তারপর রাত্রে বারোটার সময় আমি বললাম এখন যাব কোথায়? বলল উদয়পুর যাব। আমি জানিনা কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। তারপর ট্যাক্সি ভাড়া করা হলো। ট্যাক্সির ভিতর আমরা ছাড়া আরও অন্য পরিবারও আছে। ঠাসাঠাসি করে বসলাম। মানে আশেপাশে কিছু দেখা যাচ্ছে না। উদয়পুর গিয়ে বললো না এখান থেকে না আমরা আগরতলা যাবো। এরপর আগরতলায় গেল। রাত্রে ভোর চারটা বাজে আগরতলায় পৌঁছলাম। ওখানে যাওয়ার পর দেখি মতিয়া বেগম, মালেকা চৌধুরী সব ওখানে।

বখতিয়ার নূর সিদ্দিকীও ছিলেন আপনাদের সঙ্গে…

মুশতারী শফী : হ্যাঁ সবাই। চট্টগ্রামের যত আছে এমনকি ঢাকারও অনেকে। সমস্ত কাপড়, কাঁদা মাখা, রক্ত। সেই রাতটা গেলো। পঙ্কজ বাবু আমাদেরকে শান্ত করলেন। মতিয়া চৌধুরী, সেলিনা হোসেন কথা সাহিত্যিক। তারপর দরজা খুলে দিলেন। ওখানে বসলাম। ওনি মশারি দিয়েছেন। তারপর বিছানায় শুয়ে একদম মরার মতো ঘুমিয়ে গেছি। সকাল বেলা ওঠে বলি, বাচ্চারা কোথায়? বললো আপা আছে আছে, চিন্তা করবেন না।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন অনেক গান করেছিলেন। সেখান থেকে উল্লেখযোগ্য একটা গান যেটা এখনও আপনার মনে গাঁথা আছে, যদি বলতেন…

মুশতারী শফী : হ্যাঁ, অনেক গান করেছি। জয় বাংলা বাংলার জয়। হবে হবে হবে, হবে নিশ্চয়। কোটি প্রাণ এক সাথে জেগেছে অন্ধরাতে। নতুন সূর্য ওঠার এই তো সময়।… এখন আসলে গলা ভেঙে গেছে। অনেক কিছু মনে নেই।

নতুন প্রজন্মের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী?

মুশতারী শফী : নতুন প্রজন্মের কাছে আমার প্রত্যাশা অনেক। আজ আমার বয়স হয়েছে। আজ কথা বলছি তোমাদের সাথে। কালকে হয়তো থাকব না। কিন্তু এই যে নতুন প্রজন্ম আছে, আগামীতে যারা আসবে তাদের কাছে আমার অনেক আশা রইলো। তারা দেশটাকে উন্নত করবে। মানুষের সর্বাঙ্গীন মুক্তি এনে দেবে তারা।

আপনার জীবনটা সংগ্রামমুখর, বৈচিত্র্যময়। সবসময় একটা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে এসেছেন আপনি। এ অবস্থায় আপনার স্বপ্নের কথা জানতে চাই আমরা।

মুশতারী শফী : আমার স্বপ্ন শুধু দেশটাকে ঘিরে। আমি বাংলাদেশকে দেখতে চাই স্বপ্নের সোনার বাংলা হিসেবে। সেই সোনার বাংলা পৃথিবীর সবার সামনে সবসময় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকবে। পৃথিবীর অনেক দেশে যুদ্ধ হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশের মতো এরকম মুক্তিযুদ্ধ কোন দেশে হয়নি, এতো সময় ধরে। কাজেই এটা অনেক বড় ব্যাপার। আমাদের বাংলাদেশ শোষণমুক্ত অসাম্প্রদায়িক দেশ হবে, আরও উন্নত দেশ হবে- সেই স্বপ্নই আমি দেখি।