রবিবার, ২৯ মে ২০২২, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

৩১ জেলে হত্যা: অভিযোগপত্রে নিরীহদের নাম, মূল হোতারা বাদ!

প্রকাশিতঃ ২৪ ডিসেম্বর ২০২১ | ৮:১২ অপরাহ্ন


মোহাম্মদ রফিক : চট্টগ্রামের বাঁশখালীর ৩১ জেলে হত্যা মামলায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) যে অভিযোগপত্র আদালতে জমা দিয়েছে তাতে দুইজন নিরীহ ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন খোদ নিহতের স্বজনেরা। তাদের আরও অভিযোগ, অভিযোগপত্রে মূল আসামিদেরও বাদ দেওয়া হয়েছে।

এর আগে গত ২৬ অক্টোবর কক্সবাজার আদালতে ৩১ জেলে হত্যা মামলার অভিযোগপত্র জমা দেন তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সিআইডির কক্সবাজার জেলা ইউনিটের সহকারী পুলিশ সুপার মো. নুরুল আমীন। তদন্ত শেষে ৮ বছর পর এ মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করা হলো। এতে পলাতক ২৬ জনসহ মোট ৩৬ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। এ মামলায় সাক্ষী করা হয় ৪০ জনকে। গত ১ ডিসেম্বর আদালতে ওই অভিযোগপত্র গ্রহণের ওপর শুনানি হয়।

আদালত সূত্র জানায়, উক্ত মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ৩১ জেলে হত্যার নেপথ্যে অন্যান্য অপরাধীদের পাশাপাশি বাঁশখালীর ছনুয়া ইউপি চেয়ারম্যান হারুনুর রশিদের নাম উঠে আসে। তবে রহস্যজনক কারণে ঘটনায় তার সম্পৃত্ততার বিষয়টি তুলে ধরেননি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। আরও চেয়ারম্যান হারুনসহ ২৬ জনকে মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দিতে আদালতে ‘প্রার্থনা’ করেন এ কর্মকর্তা।

কিন্তু গ্রেপ্তার হওয়া আসামি ওয়াসিমের আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে ছনুয়ার চেয়ারম্যান হারুনুর রশিদ ও তার সহযোগী ছনুয়া ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক মেম্বার নাসিরের নাম আসায় তাদেরকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র গ্রহণ করে আদালত। ফলে মামলায় চেয়ারম্যান হারুনসহ অভিযুক্ত আসামির সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৮ জনে। অভিযুক্ত ৩৮ জনের মধ্যে চলতি বছরের ১৩ সেপ্টেম্বর র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন মামলার আসামি আলম ডাকাত। এছাড়া অভিযুক্ত আরও পাঁচ আসামি ইতোমধ্যে মারা গিয়েছেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর আগে ২০১৩ সালের ২৪ মার্চ রাতে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে গেলে জলদস্যুদের কবলে পড়েন তিন ফিশিং বোটের ৩৮ মাঝিমাল্লা। এরমধ্যে ৩১ জেলেকে হত্যা করে দুটি বোট এবং মাছ লুট করে নিয়ে যায় জলদস্যুরা। তিনজন জেলে তাদের কবল থেকে প্রাণে বেঁচে যান। এ ঘটনায় ২০১৩ সালের ১ এপ্রিল কুতুবদিয়া থানায় হত্যা মামলা করেন ঘটনার শিকার বাঁশখালী শেখেরখীলের বাসিন্দা নিহত নেজাম উদ্দিনের ছোটভাই শাহাব উদ্দিন। এতে ৩০-৪০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়। সিআইডি উক্ত মামলায় অভিযোগপত্র দিয়েছে।

একই ঘটনায় ছেলে আবদুর নুরকে হারান বাঁশখালীর বদিউল আলম। তার অভিযোগ, ‘সিআইডির কর্মকর্তা প্রকৃত আসামিদের কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে চার্জশিট থেকে তাদের বাদ দিয়েছেন। আবুল হোসেন ও নুর মোহাম্মদ নামের দু’জন নিরীহ ব্যক্তির নাম অভিযোগপত্রে ঢুকিয়ে দিয়েছেন।’ বদিউল আলম একুশে পত্রিকাকে আরও বলেন, ‘এসব বিষয় নিয়ে কিছুদিন আগে আদালত চত্বরে আমার সঙ্গে ও মামলার বাদি আমার মামাতো ভাই শাহাব উদ্দিনের সঙ্গে সিআইডি কর্মকর্তা নুরুল আমীনের বাহাস হয়েছে। প্রকৃত আসামিদের বাদ দেয়ার ব্যাপারে তিনি কোন সদুত্তর দিতে পারেননি।’ মামলার আসামি ছনুয়ার চেয়ারম্যান হারুন অত্যন্ত খারাপ লোক বলেও মন্তব্য করেন বদিউল আলম।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী ৩১ জেলে হত্যার ঘটনায় আলোচিত ‘চরিত্রের’ নাম বাঁশখালীর ছনুয়া ইউনিয়নের বিতর্কিত চেয়ারম্যান এম. হারুনুর রশিদ। যার বিরুদ্ধে শুধু বাঁশখালী নয়, কুতুবদিয়া, মহেশখালী ও চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশ থানায় আছে সাংবাদিক অপহরণ, শিশু ধর্ষণ, সরকারি বনভূমি দখল, চাঁদাবাজিসহ ফৌজদারি অভিযোগে অন্তত ১২টি মামলা। এর মধ্যে চারটি থেকে খালাস পেলেও বাকি আটটি মামলা বিচারাধীন।

২০২০ সালের ২ আগস্ট একুশে পত্রিকার তৎকালীন বাঁশখালী প্রতিনিধি মো. বেলাল উদ্দিনকে অপহরণ করেন চেয়ারম্যান এম হারুনুর রশিদের সহযোগিরা। জন্ম নিবন্ধন ইস্যু করতে অতিরিক্ত ‘ফি’ নেওয়ার বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করার জের ধরে বেলালকে অপহরণ করে হারুনের সহযোগী আশেক, মিয়া হোসেন, ছৈয়দুল মোস্তফা ওরফে বাক্কা, এমদাদ, নজরুল সিকদার, শাহাবুদ্দিন রাকিব, আশরাফ হোসাইন। বিষয়টি জানার পর তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের হস্তক্ষেপে পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যরা এক ঘণ্টার মধ্যে সাংবাদিক বেলালকে হারুনের বাড়ি থেকে উদ্ধার করেন। এ ঘটনায় হারুনের ৫ সহযোগীর বিরুদ্ধে বাঁশখালী থানায় মামলা হয়। এজাহারে হারুনের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি উল্লেখ থাকলেও তাকে আসামি করা হয়নি।

এদিকে ১৯৯৮ সালে ১২ বছর বয়সী কাজের মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয় হারুনের বিরুদ্ধে। হারুন ১৯৯৭ সালে ইউপি সদস্য নির্বাচত হন। ২০১৭ সালের ২৫ এপ্রিল ছনুয়া ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর বনে যান আওয়ামী লীগ নেতা। চেয়ারম্যান হারুনের সহোদর মো. আলমগীর, সহযোগী মোহাম্মদ ইউনুছের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অভিযোগে আছে মামলা। এরমধ্যে ২০২০ সালের ১২ নভেম্বর ইউনুছ র‌্যাবের কাছে অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করেন।

৩১ জেলে হত্যা মামলায় চেয়ারম্যান হারুনকে বাদ দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তদন্তকারী কর্মকর্তা কক্সবাজার সিআইডি’র সহকারী পুলিশ সুপার মো. নুরুল আমীন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে তাদেরকে অভিযোগপত্রে আসামি করা হয়েছে। আসামিদের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে চার্জশিট থেকে তাদের নাম বাদ দিয়েছি বলে বাদি পক্ষের যে অভিযোগ তা সঠিক নয়।’

এদিকে ৩১ জেলে হত্যা মামলায় অভিযোগপত্রযুক্ত এবং জেলহাজতে থাকা আসামিরা হলেন- বাঁশখালীর দক্ষিণ গণ্ডামারার রুহুল কাদের ওরফে কালা মিয়ার ছেলে মো. ওয়াসিম (৪৪), পূর্ব চাম্বলের মৃত আবদুর রশিদের ছেলে মো. ফেরদৌস (৪৯), শেখেরখীল কাচারি পাড়ার আহমদ কবির ওরফে আহমদ্যা (৫৫), গণ্ডামারা ইউপি’র পশ্চিম বড়ঘোনা এলাকার মো. নবী হোসেন ওরফে ওরফে কসাই নবীর ছেলে মঞ্জুর আলম (২৪), ছনুয়া খুদুকখালী এলাকার মৃত নুর আহমদের ছেলে আবদুল জব্বার ওরফে আঙ্গুলকাটা জব্বার (৫৬), কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলার দক্ষিণ ধুরুং এলাকার ওবায়েদ উল্লাহ্ ওরফে ওবায়েদ ডাকাত (৩৮)।

এছাড়াও জামিন নিয়ে পলাতক আছেন ২২জন আসামি। তারা হলেন-কক্সবাজার মহেশখালী উপজেলার চরপাড়া এলাকার মৃত আবদুল জলিলের ছেলে লাল মিয়া ওরফে লালু (৪৭), একই উপজেলার কালামারছড়া ইউপি’র উত্তর নলবিলা এলাকার মৃত আবদুল গণির ছেলে মোজাম্মেল ওরফে শেকু (৩৫), কুতুবদিয়া উপজেলার গফুর ওরফে গফুর (৪০)(পালক পিতা ছনুয়া আবাখালী এলাকার মাহবুবুল আলম), বাঁশখালীর ছনুয়া ইউপি’র খুদুকখালী এলাকার মৃত মো. আলীর ছেলে আবদুল হাকিম ওরফে বাইশ্যা (৪৫), খাটখালী নদীর পাড় এলাকার আবুল হোছেনের ছেলে নুরুল কাদেও (৫৫), গণ্ডামারা ইউপি’র পূর্ব বড়ঘোনা এলাকার মৃত মোক্তার আহমদের ছেলে জাকের আহমেদ (২৭), একই এলাকার মৃত ফজল আহমদের ছেলে আক্তার হোসেন (৩৪), গণ্ডামারা ইউপি’র পশ্চিম বড়ঘোনার মৃত ইসলাম মিয়ার ছেলে আমিন ওরফে আমিন ডাকাত (৪৩), একই এলাকার মৃত আবদুর রশিদের ছেলে জসিম উদ্দিন (৩৪), আবদুর রশিদ ওরফে বাইশ্যার ছেলে মো. রফিক, পূর্ব বড়ঘোনার মৃত আবদুস সালামের ছেলে মমতাজ ওরফে মন্তাজ মাঝি (৫৬), একই এলাকার মৃত মোক্তার আহমদের ছেলে কামাল উদ্দিন ওরফে কামাল মাঝি (৫০), মৃত মোজাফফর আহমদের ছেলে এরফানুল হক ওরফে এরফান (৪৪), আবদুস শুক্কুর ওরফে আবদুল্লাহর ছেলে রবি আলম ওরফে ছোট রবি (৪৩), শাহ আলমের ছেলে মোর্শেদ ওরফে বাদুইল্যা (৩২), মৃত কালু সিকদারের ছেলে আবু বক্কর (৩৫)।

অভিযোগপত্রভুক্ত ৬জন আসামি মারা গেছেন। তারা হলেন-বাঁশখালী উপজেলার উত্তর কবলা পাড়ার মৃত ইউসুফের ছেলে দিদারুল ইসলাম ওরফে ডাকাত দিদার (৩২), পশ্চিম বড়ঘোনার জাকের হোসেনের ছেলে আরিফ (৩২), একই এলাকার মৃত মোক্তার আহমদের ছেলে আমান উল্লাহ্ (৩৭), মৃত আলী আহমদের ছেলে আলম ডাকাত (৪৫), ছনুয়া ইউনিয়নের হাজী কালামিয়া পাড়ার শাহ আলমের ছেলে বাহাদুর ওরফে বাহাদুর ইসলাম (৩৯), পূর্ব বড়ঘোনার মৃত আবদুল জব্বারের ছেলে মো. ইয়াছিন, পূর্ব গণ্ডামারার আবুল হাশেমের ছেলে সোহাগ (৩৭), দক্ষিণ গণ্ডামারার মৃত ফয়েজ আহমদের ছেলে মো. জমির ওরফে তারেক মাঝি (৪৫), মৃত আবুল বশরের ছেলে মামুন (৩২), মৃত শফিকুর রহমানের ছেলে রবি আলম (৪৮), গণ্ডামারা পশ্চিম বড়ঘোনার মৃত কালু মেম্বারের ছেলে মো. রবিউল আলম ওরফে রবি আলম (৩৬), আলী হাছানের ছেলে মো. সেলিম (৩০), দক্ষিণ গণ্ডামারার মৃত বেলায়েত হোসেন ওরফে নুর আহমদের ছেলে আলী আকবর ওরফে আকবর হোসেন ওরফে আকবর ড্রাইভার (৪৫), কুতুবদিয়া থানার লঞ্চঘাট এলাকার নুরুল আলম ওরফে মাইন্যা’র ছেলে হোসাইন (২৫), মহেশখালী মাতারবাড়ি এলাকার হংস মিয়াজি পাড়ার জকির আহমদের ছেলে বশির আহমদ (৫০)।

কি ঘটেছিল সেদিন?

২০১৩ সালের ২৩ মার্চ সকালে বাঁশখালী উপজেলার শেখেরখিল ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ড গুইল্লাখালী এলাকার বাসিন্দা মৃত নুরুল আলমের ছেলে নেজাম উদ্দিনসহ ১২ মাঝিমাল্লা ‘আল্লাহর দান’ নামক ফিশিং বোট নিয়ে কুতুবদিয়া চ্যানেলের ২২ কিলোমিটার পশ্চিমে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যান। পরের দিন ২৪ মার্চ দিবাগত রাতে তারা ১৫/১৬ মণ ইলিশ আহরণ করেন। পাশাপাশি ‘আল্লাহর দান-১’ ও ‘আল-মক্কা’ নামে আরও দুটি ফিশিং বোটও মাছ ধরেন। এসময় ৩০/৩৫জন অজ্ঞাতনামা জলদস্যূ অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তিন ফিশিং বোটে হামলা চালান। বোটের অধিকাংশ মাঝি-মাল্লাদের হাত-পা বেঁধে সাগরে ফেলে দেয়। কিছু মাঝিকে অপহরণ করে মাছসহ দুটি ফিশিং বোট নিয়ে যায় সংঘবদ্ধ ডাকাতের দল। এসময় ‘আল্লাহর দান-১’ ফিশিং বোটের মাঝি নুর হোসেন অন্য একটি বোটে উঠে গেলে প্রাণে বেঁচে যান তিনি। ডাকাতদের গুলিতে কয়েকজন জেলে আহত হন। নুর হোসেনসহ প্রাণে বেঁচে যান তিনজন। ৩১জন জেলেকে হাত-পা বেঁধে সাগরে ফেলে হত্যা করা হয়।

ঘটনার ৮ দিন পর ১ এপ্রিল দুপুরে মামলার বাদি বঙ্গোপসাগরের জাহাজখারী নামক স্থানে তার ভাই নেজাম উদ্দিনসহ ইউনুচ ও মতিন মাঝির হাত-পা বাঁধা অবস্থায় মরদেহ দেখতে পান। তাদের লাশ নৌকায় তুলে বাঁশখালী থানা পুলিশকে খবর দেন তিনি। এরপর শেখেরখীল ফাঁড়িরমুখ এলাকায় লাশগুলোর সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায় পুলিশ। এ ঘটনায় দণ্ডবিধি ৩৯৬ ধারায় কুতুবদিয়া থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন নিহত নেজাম উদ্দিনের ছোটভাই শাহাব উদ্দিন।

মামলার এজাহারে বলা হয়, জলদস্যূদের হাতে অপহৃত দুটি ফিশিং বোটের ৩১ মাঝিমাল্লার মধ্যে ৩জনের লাশ পাওয়া যায়। বাকি ২৮জনের কোন হদিস মেলেনি। বাদি শাহাব উদ্দিনের অভিযোগটি বাঁশখালী থানার মাধ্যমে কক্সবাজারের কুতুবদিয়া থানা গ্রহণ করে নিয়মিত মামলা হিসেবে রুজু করেন। মামলার তদন্তভার গ্রহণ করেন কুতুবদিয়া থানার এসআই আবুল কালাম।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, তিনটি ফিশিং বোটের ৩৪জন মাঝিমাল্লাদের মধ্যে শুধু তিনজন জীবিত ফেরত আসে। বাকি ৩১জনের মধ্যে ২৮জন জেলের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারের পর ২৮ মৃতদেহের মধ্যে ২১জনের সুরতহাল তৈরি করে কুতুবদিয়া থানা পুলিশ। বাকি ৭জনের সুরতহাল তৈরি করে মহেশখালী থানা পুলিশ। এরপর জলদস্যূদের ফেলে যাওয়া দুটি ফিশিং বোট উদ্ধার করেন তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আবুল কালাম।

দেশজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী ৩১ জন জেলে হত্যা মামলাটি তফসিলভুক্ত হওয়ায় ২০১৪ সালের ১৫ জানুয়ারি এ মামলার তদন্তভার নেন কক্সবাজার সিআইডি’র পুলিশ পরিদর্শক ফখরুল ইসলাম। তিনি বদলির পর ২০১৬ সালের ১৪ মে মামলার তদন্তের দায়িত্বপান একই সংস্থার এসআই হাসান জাহাঙ্গীর। ২০১৮ সালের ৩০জুন হাসান জাহাঙ্গীর পিবিআইতে বদলি হয়ে গেলে মামলাটি তদন্তের দায়িত্বপান একই সংস্থার সহকারী পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান। কিছুদিন পর এ কর্মকর্তাও সিআইডি’র ফেনী ইউনিটে বদলি হওয়ায় সর্বশেষ এ মামলা তদন্তের দায়িত্ব পান একই সংস্থার সহকারী পুলিশ সুপার মো. নুরুল আমীন। ২০১৯ সালের ২৫ মে তিনি এ মামলা তদন্তের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।

জানা গেছে, ৩১ জেলে হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে পেশাদার ডাকাত আবদুর রহিম, মো. জব্বার, মকসুদ, আহমদ উল্লাহ, নেজাম উদ্দিন ওরফে নেজাইম্মা ডাকাত, শেকুব ওরফে শেকু, রমিজ আহমদ, ইসহাক, ইউনুছ, সালেহ আহমদ, গিয়াস উদ্দিনসহ এ যাবত ৩১জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ এবং সিআইডি। এর মধ্যে অনেকে আদালত থেকে জামিন নিয়ে পলাতক হয়ে গেছে। গ্রেপ্তার হওয়া কিছু আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ না মেলায় মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দিতে আদালতে আবেদন করা হয়েছে। এদিকে গ্রেফতারের পর ২০১৩ সালের ১৬ জুন সাগরে ৩১ মাঝিমাল্লা হত্যার দায় স্বীকার করে বাঁশখালীর ম্যাজিস্ট্রেট আমিরুল ইসলামের আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন আসামি মো. ওয়াসিম (৩০) নামের এক জলদুস্য। বাঁশখালীর গণ্ডামারা এলাকার বাসিন্দা ওয়াসিমকে গ্রামের বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

ওয়াসিম জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন, তাদের (ডাকাতদের) চিনে ফেলায় ৩১ মাঝিমাল্লাকে হত্যা করা হয়। জবানবন্দিতে তিনি ৩৫ জনের নাম উল্লেখ করেন। অভিযোগ আছে, ওই জবানবন্দিতে ছনুয়ার চেয়ারম্যান হারুনুর রশিদ ও তার সহযোগী নাসিরের নাম উঠে আসলেও তদন্তকারী সিআইডির কর্মকর্তা রহস্যজনক কারণে তাদের মামলার দায় থেকে আব্যাহতি দিতে আদালতে ‘প্রার্থনা’ করেন।

প্রকৃত আসামিদের কাছ থেকে অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা নিয়ে তাদের অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, বাদী ও ভুক্তভোগীর এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে তদন্তকারী কর্মকর্তা কক্সবাজার সিআইডি’র সহকারী পুলিশ সুপার মো. নুরুল আমীন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘মূল এজাহার দায়েরকারী হলেন শাহাব উদ্দিন। পরে আদালতে যে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে সেটি ভিন্ন ব্যাপার। এ ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় এনে আদালতের মাধ্যমে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে আমি এবং আমার পূর্ববর্তী কর্মকর্তারা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে তাদেরকে অভিযোগপত্রে আসামি করা হয়েছে। আসামিদের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে অভিযোগপত্র থেকে তাদের নাম বাদ দিয়েছি বলে বাদী পক্ষের যে অভিযোগ তা সঠিক নয়।’